টাকা লেনদেনের অংশ হয়ে গেছে!

সমাজের পরিবর্তন হচ্ছে ঘূর্ণায়মান একটি বিষয়। শুধুই ঘুরছে আর ঘুরছে। চারদিকে পরিবর্তন হচ্ছে। নতুন নতুন পরিবর্তন। বলা যায়, একই বই শুধু মলাট আলাদা। সবই এক, প্রেক্ষাপট আলাদা। প্রশ্ন হচ্ছে, সমাজ পরিবর্তনের মাপকাঠি কে ঠিক করবে? গ্রামের গরিব মানুষের কাছে পরিবর্তন এক রকম। আমার মতো মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে আরেক রকম। আবার শহুরে মানুষের কাছে অন্যরকম। রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোয় বিত্তবৈভবের প্রসঙ্গ আসে। সেখানে যদি বিরাট বৈষম্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে পরিবর্তন ঘটে, তাহলে সমাজের মধ্যকার যে ভারসাম্য তা হারিয়ে যায়। এটা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে খুব অনুভব করি। প্রতিটা সমাজের পরিবর্তন নিয়ে মধ্যবিত্তের মধ্যে চাপা অসন্তোষ ও ধূমায়িত অসন্তোষ সবসময় বিরাজ করে। এরপর কোনো এক সময় সে অসন্তোষ জ্বলজ্বল করে জ্বলতেও দেখা যায়।

রাষ্ট্র ও সমাজের মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে কৃষির ওপর। কৃষির ওপরই বাংলাদেশের ৬০-৭০ ভাগ উন্নয়ন নির্ভর করার কথা। কোন জমিগুলো কর্ষণযোগ্য আর কোনগুলো কর্ষণযোগ্য নয়, এগুলোও আমাদের সমাজবাস্তবতার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু এ বাস্তবতায় ব্যাঘাত ঘটেছে ও ঘটছে নানাভাবে। তবে আমাদের এখানে অল্প-বিস্তর উন্নতি তো হলো বটে। যেমন- যোগাযোগ ব্যবস্থাতে বেশ উন্নয়ন হয়েছে। মানুষ চলাফেরায় কতটা অসুবিধায় ছিল, তা তো নিজ থেকেই জানি। বিত্তবান হলে রাজশাহী থেকে ঢাকায় আধা ঘণ্টায় যাওয়া যায়। এসব দিক থেকে বললে, গত ৪৭ বছরে পরিবর্তন ভালোই হয়েছে। তবে রাষ্ট্র ও সমাজের এ পরিবর্তন আমি ‘বাধ্যতামূলক’ ভালো হওয়া বলি। কিন্তু আবার এও সত্য, বাধ্যতামূলক পরিবর্তন সবসময় মানুষের কল্যাণেও আসে না। জলবায়ুর পরিবর্তন তো মানুষের ক্ষতিই বয়ে আনছে। রাজশাহী বিশ্বের মধ্যে অন্যতম দূষণমুক্ত নগরী ছিল। এখন দূষণের কবলে এই রাজশাহীও। আমি রাজশাহী থাকি বলেই দৃষ্টান্ত হিসেবে রাজশাহীর নামটাই সর্বাগ্রে স্মরণে এলো। মানুষ বাড়ছে। ঠেকানোর উপায় নেই। সুতরাং বাধ্যতামূলক পরিবর্তনও মেনে নিতে হচ্ছে।

আসলে মানুষের স্বভাব সহজে বদলায় না, যদি শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন না হয়। শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়নের কথা বলা হয়। হয়েছেও বটে। কিন্তু তাতে কী? মানুষের স্বভাব কি বদলাল? আবার প্রকৃত শিক্ষার হার নিয়েও রয়েছে নানা কথা। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষায় কতজন ঝরে গেল, তার কি আসল কোনো চিত্র আমাদের কাছে আছে? এসএসসি, এইচএসসিতে পাসের হার ক্রমেই যে বাড়ছে, তাতে কি বলা যাবে যে শিক্ষার মানোন্নয়ন হয়েছে? আবার শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানেরও একটা সম্পর্ক আছে। কিন্তু মানুষ তার শিক্ষার আলো নিয়ে সঠিক কর্মসংস্থানে যেতে পারছে না। এবার যারা এসএসসিতে কৃতকার্য হলো, তাদের কত শতাংশ মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরবর্তী শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে? এ কোনো অন্তহীন প্রশ্ন নয়। অতীতে এ ক্ষেত্রে যে নিরাশার চিত্র দেখা গেছে এবার হঠাৎ করে তা বদলে আশার চিত্র আলো ছড়াবে এমনটি মনে করার সঙ্গত কারণ নেই। বলছিলাম মানুষের স্বভাবগত পরিবর্তনের কথা। স্বভাবগত পরিবর্তন তো এসবের সঙ্গেও জড়িত। আমরা সমাজের মধ্যে বসবাস করি বিধায় এসব প্রসঙ্গ জীবনে জড়িয়ে যায় কিংবা থাকে। যেমন ধরা যাক, পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্ররা ব্যাংকে বা কোম্পানিতে চাকরি করছে। আবার অন্য যে কোনো বিষয়ে পাস করে স্কুলে শিক্ষকতা করছে। তার মানে এখানে অবশ্যই গরমিল আছে। আবার যেখানে কর্মসংস্থান হচ্ছে, সেখানে সত্যিকার মূল্য পাচ্ছে না। গ্রামের গরিব নারী শ্রমিকদের আয় ভোগ করছেন মধ্যস্বত্বভোগী পোশাক কারখানা মালিকরা। উৎপাদিত মূল্যের সঙ্গে শ্রমিকদের দেওয়া মূল্যের মধ্যে পার্থক্য আছে। এই খাত একটিমাত্র দৃষ্টান্ত। এ রকম খাত আরও অনেক আছে, যেখানে দেখা যাবে বৈষম্যচিত্র প্রকট। তার মানে, শ্রমের জায়গাটা এখনও বৈষম্যে ভরা। আবার পরনির্ভরতাও আমাদের সমাজকে ঠিক এগোতে দেয়নি। জন্মলগ্ন থেকে অন্যের কাছে হাত পেতে চলতে হয়েছে। রাস্তা, কালভার্ট, ব্রিজ বানানোর জন্য কারও কারও কাছে হাত পাততে হয়েছে। শাসন ও শোষণের এটাও একটা হাতিয়ার। কারণ যে ভিক্ষে দেয়, সে খবরদারিও করে। আমাদের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। দাতা সংস্থাগুলো তো মাত্রাতিরিক্ত মাতব্বরি করে অনেক ক্ষেত্রেই। এ কারণে আমরা এখনও নিজেদের শাসন করা শিখলাম না। আর মানসিকতা। এটা সত্য যে, আমরা মানসিকতায় এগোতে পারিনি। স্বনির্ভর হওয়ার জন্য শিক্ষার অর্জন ও প্রয়োগ জরুরি। আমরা সেটা করতে এখনও পারছি না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোর মধ্যে গলদ আছে। গরিব হওয়ার কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রাইমারি স্তর থেকে ঝরে পড়ছে। এখন হয়তো পরিবর্তন হয়েছে কিছুটা। কিন্তু কত সংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে গেল, তার কি কোনো খবর আছে? বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেধাবীরা বের হচ্ছে। কাজ দিতে পারছে না সরকার। বাইরে চলে যাচ্ছে। বাইরে গিয়ে শ্রম দিয়ে ওইসব দেশের উন্নয়নে কাজ করছে। দেশের কিছুই করতে পারছে না। শিক্ষার এ বিষয়গুলো ভাবলে ইতিবাচক ও নেতিবাচক- উভয় বিষয়ই সামনে আসে।

চিন্তা তো আর আকাশ থেকে পড়ে না। চিন্তা হচ্ছে সমাজের সঙ্গে সংলগ্ন। অর্থাৎ সমাজ যেখানে পড়ে আছে, চিন্তার জায়গাটাও সেখানে পড়ে আছে। তুমি যদি শুয়ে থাক, তোমার ভাগ্যও শুয়ে থাকবে। তুমি যদি উঠে দাঁড়াও, তোমার ভাগ্যও দাঁড়াবে। চিন্তার জায়গা থেকে আমরা ঠিক উঠে দাঁড়াতে পারছি না। নইলে সমাজে এত বিভেদ, এত দ্বন্দ্ব্ব কেন হবে? চিন্তার জন্য শিক্ষাও জরুরি। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দর্শন, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, সাহিত্যের আর যেন চাহিদা নেই। ব্যবসায়িক বিষয়ে পড়ার আগ্রহ বাড়ছে। এক ধরনের প্রচেষ্টাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়,আর তা হলো, মানুষকে যন্ত্র বানানোর প্রচেষ্টা। এতে উন্নয়ন হতে পারে, কিন্তু চিন্তার পরিবর্তন হয় না। শিক্ষায় গলদ আছে বলেই সমাজে বর্বরতা বাড়ছে। উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে চিন্তার জায়গায় ঠিক মানুষ হয়ে উঠতে পারছে না। এ শিক্ষা মানুষকে মুক্তি দিতে পারে না। বিগত ৪৭ বছরে শিক্ষাঙ্গনে, বিশেষ করে উচ্চ বিদ্যাপীঠের রাজনীতির নামে অপরাজনীতির ছোবলে কত জীবনপ্রদীপ নিভে গেল, এ জিজ্ঞাসা গুরুত্বপূর্ণ।

টাকার লেনদেন বেড়েছে। শিক্ষাকেও এ লেনদেনের অংশ করে তোলা হচ্ছে। শিক্ষা নিয়ে কত রকম বাণিজ্য চলছে তা তো লুকানোর বিষয় নয়। শিক্ষা যেন পণ্য, তাই দোকানের মতো গজাচ্ছে তথাকথিত শিক্ষাঙ্গন। এ কারণে বিজ্ঞান আর মানবিক বিষয়ে মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। আজ পর্যন্ত একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা গেল না! অথচ এ নিয়ে তো কথা এ পর্যন্ত কম হলো না। প্রত্যেক মানুষ স্বতন্ত্র। তবুও বলা হয় জনসাধারণ। তার মানে, প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এটাই সমাজ। ঠিক বোধের জায়গা থেকে মানুষের সচেতন হওয়ার কথা। আইন করে, বিধিনিষেধ করে সমাজ রক্ষা করা যায় না। হাত-পা বেঁধে পানিতে নামিয়ে দিলে সাঁতার কাটা যায় না। আমাদের এখানে যে যত শিক্ষিত, সে তত কম কাজ করে মাইনে নিচ্ছে। সেই ব্যক্তিই অনেক ক্ষেত্রে কর্তা হয়ে যাচ্ছে। অনিয়মও তারাই জন্ম দিচ্ছে। দুর্নীতি তো অশিক্ষিত কিংবা সুবিধাবঞ্চিতরা করে না। তাদের সে রকম সুযোগও নেই। দুর্নীতির শিরোমণি হলেন শিক্ষিতজনদেরই একাংশ। এই শিক্ষিতরা কী রকম শিক্ষায় শিক্ষিত এ নিয়ে তর্ক চলতে পারে। তবে আপাতত তর্কের দরকার নেই, অন্তত সার্টিফিকেট অনুযায়ী তারা শিক্ষিত। শিক্ষাক্ষেত্রেও এদের উপস্থিতি কম নয়। তাহলে সমাজ আলোকিত করার সে রকম শিক্ষিতজন আমরা পাব, তা আশা করি কী করে?

শিক্ষার আড়ালে অশিক্ষাটাই বারবার সামনে আসছে। তার মানে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেই কোথাও না কোথাও গলদ আছে। ভাঙন। সর্বত্রই ভাঙনের সুর। কোথাও যেন সৃষ্টির উল্লাস নেই। ধ্বংস, বর্বরতার মাঝেই অসভ্য উল্লাস প্রকাশ পাচ্ছে। নারীর যেন কোনো মুক্তি নেই। বন্দিদশা থেকেই কেউ চাকরি করছেন আবার কেউ অনৈতিক কাজ করছেন। নারীর জন্য মাদ্রাসা যেমন নিরাপদ নয়, তেমনি নিরাপদ নয় বিশ্ববিদ্যালয়। সভ্যতার এমন দিনে জঘন্য নানা রকম নিপীড়নের সঙ্গে শিক্ষকরাও জড়িয়ে যাচ্ছেন এবং সে খবর প্রায়ই মিলছে। রীতিমতো অবাক হয়ে যাচ্ছি। শিক্ষার আড়ালে অশিক্ষাটাই বারবার সামনে আসছে। তার মানে এটাই সত্য যে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেই কোথাও না কোথাও গলদ আছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে আজ নারীর যে অবস্থান কিংবা অগ্রগতি, তাতে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো কারণ নেই। শিক্ষাক্ষেত্রেও নারীর নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ। শুধু নিরাপত্তা কেন, বৈষম্যও তো জিইয়ে আছে। একই সঙ্গে অবশ্যই উদ্বেগের বিষয় যে, শিক্ষা টাকা লেনদেনের অংশ হয়ে গেছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের যে প্রসার ঘটছে, তা কিন্তু এই নিরিখেই। সমাজ পরিচালনার মানসিকতায় উন্নয়ন ঘটলেই বৈষম্য-নিপীড়ন কমে আসবে। এ জন্য সত্যিকার শিক্ষার দরকার। গার্মেন্ট শ্রম ও সমাজ পরিবর্তনের একটা নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে এবং স্বাধীনতার পর এ সূচক আমাদের সমাজের জন্য নতুন সংযোজন। এ রকম হাজারো সূচক রয়েছে। গোটা পৃথিবীই তো এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ চাইলেও একেবারে পিছিয়ে থাকতে পারবে না। কোনো দেশই পিছিয়ে পড়ছে না। আমাদের আরও এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, তা কেন হলো না বরং সেটা নিয়েই আলোচনা করা উচিত।

সমাজের যেদিকেই আলোকপাত করি না কেন, সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিতে হবে শিক্ষাকেই। আমাদের নীতিনির্ধারক এবং সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের অবশ্যই দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে- শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণের যে অপপ্রয়াস চলে আসছে, তা থেকে মুক্তকরণের। শিক্ষার গুণগত মান পরিবর্তনে যেমন মনোযোগ বাড়াতে হবে, তেমনি শিক্ষাক্ষেত্রে অধিকারের ভূমিটাও করতে হবে সমতল। সার্টিফিকেট অর্জনকারীদের সংখ্যাচিত্র গণনা করলে হয়তো শিক্ষার হারের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে; কিন্তু তা দিয়ে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে না। এ জন্য করণীয় আছে অনেক কিছু।

লেখক:হাসান আজিজুল হক,শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক

 

 

 

 

সূত্র: সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ