আমেরিকার নতুন যুদ্ধপ্রস্তুতি ‘টার্গেট ইরান’

হঠাত্ নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য। ইরানকে লক্ষ্য করে আমেরিকার নতুন যুদ্ধপ্রস্তুতিই এর কারণ। দীর্ঘ সময় থেকে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার বৈরি সম্পর্ক ঘিরে দুই দেশের মধ্যে এর আগেও যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। অন্যদিকে ইসলামি ইরানের বিপ্লবী নেতৃত্বের সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধকে অনিবার্য বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা। যদিও গত দুই বছর আগে ফাইভ প্লাসের সঙ্গে ইরানের পরমাণু চুক্তি সম্পাদিত হলে ইরান মার্কিন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে উত্তেজনা কিছুটা কমে আসে। কিন্তু গত বছর আমেরিকা এই চুক্তি থেকে একতরফাভাবে সরে এলে দুই দেশের সম্পর্ক আবারো শীতল থেকে শীতলতর হয়ে উঠে। এ সময় আমেরিকা ইরানের উপর বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করে। এক্ষেত্রে ট্র্যাম্প প্রশাসন ইরানের তেলের বাজার সংকুচিত করতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো— আমেরিকার এ ধরনের তত্পরতা অনেকটাই ব্যর্থ হয়। সর্বশেষ আমেরিকা ইরানের সশস্ত্রবাহিনী অর্থাত্ আই আর জিসিকে সন্ত্রাসীবাহিনী হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত করে। প্রতিক্রিয়ায় ইরান মধ্যপ্রাচ্য তথা পশ্চিম এশিয়ার মার্কিন সামরিক কমান্ডকে সন্ত্রাসীবাহিনী আখ্যায়িত করে পার্লামেন্টে আইন পাস করে। মূলত এই ঘটনার পর দ্রুতই পাল্টে যায় পারস্য উপসাগরীয় সামরিক পরিস্থিতি। এ সময় আমেরিকার শীর্ষ নেতৃত্ব ইরানকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন ধরনের উত্তেজনাকর বক্তব্য বাড়িয়ে দেন। তাদের বক্তব্যে ইরান আক্রমণের জোরালো সম্ভাবনা দেখা দেয়। ইরানও পাল্টা বক্তব্যে মার্কিনিদের বক্তব্য বিবৃতিকে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করে। এরমধ্যেই আমেরিকা তার বিমানবাহী রণতরী ইউএস আব্রাহামকে পারস্য উপসাগরে পাঠায়। একইসঙ্গে কাতার ও ইউনাইটেড আরব আমিরাতের মার্কিন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে পরমাণু অস্ত্রবাহী বিমান বি-৫২। মূলত আমেরিকার এই দুই সামরিক পরিকল্পনার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে চরম উত্তেজনা। যে কারণে স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হচ্ছে যে, তাহলে কি এবার ইরানে আক্রমণ করবে আমেরিকা? এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে কি প্রতিক্রিয়া ছড়াবে সেটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বিষয়। ঠিক তেমনি গুরুত্বপূর্ণ যে, আদৌ দুইদেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে কি না? কেননা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে আমেরিকার শক্তি আর পূর্বের মতো নেই। একইসঙ্গে ইরানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর সম্পাদিত পরমাণু চুক্তির অবশিষ্টতা এখনো ইরানের সামরিক সক্ষমতার লাগাম টেনে ধরে রেখেছে। সোজা কথায় আমেরিকা সরে যাওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর চুক্তি টিকিয়ে রাখার চলমান প্রচেষ্টায় আমেরিকার অখুশি হওয়ার কিছু নেই। আমেরিকা ছাড়াই এই চুক্তিকে কোনোভাবে কার্যকর রাখা সম্ভব হলে ইরানের পরমাণু উচ্চাভিলাষ সীমাবদ্ধই থাকবে। আর এই নিশ্চয়তা থাকলে পরমাণু অস্ত্রবিহীন ইরানের সঙ্গ যুদ্ধ শুরুর ঝুঁকি আমেরিকা আপাতত নাও নিতে পারে। কিন্তু গত সপ্তাহে এই চুক্তির ভবিষ্যত্ প্রশ্নে ইরান ইউরোপকে একটি আল্টিমেটাম দেয়। একইসঙ্গে দেশটি চুক্তির একটি ধারা এখন থেকে অগ্রাহ্য করবে বলে সময়সীমা বেঁধে দিলে আমেরিকার চিন্তা বেড়ে যায়। এরফলে ইরানের পরমাণু প্রকল্পের সক্ষমতা পূর্বের অবস্থানে ফিরে যেতে পারে। এ ধরনের বাস্তবতা ইরানের পরমাণু অস্ত্র উত্পাদনের কারিগরি লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে। তাই আমেরিকা ইরানকে সত্যিকার ভয় দেখাতেই এবারকার যুদ্ধ প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এখানে উল্লেখ করতে হয় যে, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মার্কিন নীতির মূল লক্ষ্যই হচ্ছে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দশকের পর দশক ধরে ওয়াশিংটন আরব দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে তাদের ইসরায়েল বিরোধী মনোভাব নিষ্ক্রিয় করে রেখেছে। সর্বশেষ আরব বসন্তের মধ্যদিয়ে আরব ইসরায়েল সম্পর্ক এক নতুন ধারণার জন্ম দিয়েছে। ফলে সুন্নি প্রধান আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের দূরত্ব বেড়ে ইসরায়েলের সঙ্গে দূরত্ব কমে গেছে। আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের এ ধরনের সুসম্পর্ক আমেরিকার ঘাটতি পুষিয়ে দিচ্ছে। আমরা যদি লক্ষ্য করি তাহলে দেখব যে সৌদি আরব—ইরান সম্পর্ক ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময় অতিক্রম করছে। অন্যদিকে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক বৃদ্ধি পাওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন সমীকরণ। এই সমীকরণের মুখে ইরান ও সিরিয়ার মধ্যকার ঐক্যের বিপরীতে আরব দেশগুলো সরাসরি ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক গাঁটছড়া বেঁধেছে। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা ইরান আক্রমণ করলে আঞ্চলিক দেশগুলোর শতভাগ সমর্থন থাকবে। এমনকি লেবানন কিংবা শিয়া অধ্যুষিত দেশগুলো যুদ্ধের বিরোধিতা করতে চাইলেও আরব লীগের মাধ্যমে এ ধরনের প্রবণতা রোধ করা সম্ভব হবে। তাই বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতি আমেরিকার জন্য অত্যন্ত অনুকূল। এই সুযোগে দেশটি ইরান আক্রমণ করে বসলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু সমস্যা আছে অন্যদিকে। ইরান আক্রান্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিরোধকামী শক্তিগুলো মরণকামড় দিতে চাইবে। বিশেষ করে লেবাননের হিজবুল্লাহ। ইরান সমর্থিত লেবাননের হিজবুল্লাহ যে কোনো আঞ্চলিক যুদ্ধের গতিপথ পাল্টে দিতে পারে। অন্যদিকে সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ইয়েমেনের হুথিরাও আরো বেপরোয়া হয়ে উঠলে যুদ্ধের গতিপথে আমেরিকা নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে আমেরিকার এই রণ প্রস্তুতিকে ইরানের উপর চাপ তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। একইসঙ্গে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য অর্জনে আমেরিকা কোনো ধরনের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাধার সম্মুখীন না হয়েই মধ্যপ্রাচ্যে তার অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র মোতায়েন করতে সক্ষম হলো। আমেরিকার এ ধরনের শক্তি বৃদ্ধির আরেকটি লক্ষ্য হবে সিরিয়া ও রাশিয়া। বিশেষ করে সিরিয়ার বিভিন্ন ফ্রন্টে পরাশক্তি রাশিয়ার ব্যাপক সামরিক উপস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সামরিক তত্পরতা কিছুটা সীমিত হয়েছে। এক্ষেত্রে সিরিয়ার অভ্যন্তরে ইরান বেশকিছু সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করছে এমন দাবি করে ইসরায়েল। এই ঘটনা ইরানের সামরিক সক্ষমতার সম্প্র্রসারণ বলেই ধরে নেওয়া যায়। একইসঙ্গে ইসরায়েলের দোরগোড়ায় ইরানি উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। এতে করে ইসরায়েলের সামরিক কৌশলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই আঞ্চলিক পর্যায়ে নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে আমেরিকার কৌশলগত সামর্থ্য বৃদ্ধি করা প্রাসঙ্গিক। তবে আমেরিকা নিজ সামর্থ্য বৃদ্ধির এই উদ্যোগ অবশ্যই ইরানকে লক্ষ্য করে। যে কারণে আপাতত যুদ্ধ শুরু না হলেও ভবিষ্যত্ যুদ্ধের লক্ষ্য থেকে আমেরিকা পিছপা হচ্ছে না এটি খুব পরিষ্কার।

লেখক : হাসান জাবির, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

 

 

 

সূত্র:ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ