জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাযজ্ঞের শতবর্ষ : বৈশাখীতে রক্তস্নান

[১৩ এপ্রিল, ১৯১৯ জালিয়ানওয়ালাবাগে বৈশাখী উৎসবে সমবেত জনতার ওপর অবিরাম গুলিবর্ষণ করে যে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়, এমন নির্মমতা ইতিহাসের বিরল ঘটনাগুলোর একটি; জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের শতবর্ষ স্মরণ করতে যশোবন্ত সিংয়ের ‘ব্লাডবাথ অন বৈশাখী’ রচনাটি ভাষান্তর করেছেন আন্দালিব রাশদী]

অমৃতসরের রাস্তায় দুটো সশস্ত্র সামরিক যান গুড গুড করতে করতে এগিয়ে একটি সরু লেনের সামনে থামল। পাশ দিয়ে মার্চ করে যাওয়া সৈন্যরাও থেমে গেল। গলিটা এতই সরু যে এর ভেতর দিয়ে সশস্ত্র সামরিক গাড়ি ঢোকানো সম্ভব নয়।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড এডওয়ার্ড হ্যারি ডায়ার গাড়ি থেকে নেমে এলেন এবং রাস্তার মুখ অপ্রশস্ত দেখে হতাশার দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। তিনি তার বাহিনীর রাইফেলধারী ২৫ জন গোর্খা ও ২৫ বালুচ সৈনিক এবং খুকরি সজ্জিত ৪০ জন গোর্খা সদস্যকে তাকে অনুসরণ করার নির্দেশ দিলেন। এ গলির শেষ প্রান্তে আয়তাকার একটি খালি, অব্যবহূত জায়গা, একাংশ বালি ও নির্মাণসামগ্রীতে ঢাকা, জায়গাটির নাম জালিয়ানওয়ালাবাগ। বিভিন্ন ভবনের দেয়ালে চারদিকেই ঢাকা। ভেতরে ঢোকার পথে উঁচু জায়গার দুই পাশেই তিনি তার বাহিনীকে মোতায়েন করলেন। ব্রিগেডিয়ার ডায়ার যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখান থেকে ১০০ গজ দূরে একজন বক্তা জনতার উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছিলেন। কেউ কেউ তার কথা আধেক শুনছেন, কেউ মাঠে ঘুমোচ্ছেন, অন্যরা স্রেফ গল্পগুজব করছেন। ডায়ার চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ফায়ার।’

গুলি শুরু হলো, সমাবেশে আতংক ছড়িয়ে পড়ল এবং জনতা ঘের দেয়ালের দিকে ছুটতে শুরু করল। দেয়ালের ফাঁক দিয়ে বেরোনোর মতো তিনটি সরু পথ। সৈন্যরা জনতার ওপর গুলি চালাতে লাগল। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেখিয়ে দিলেন, বেরোনোর পথে যেখানে জনতার ভিড় বেশি, সেখানেই গুলি চালাও। কেউ কেউ ছোট দেয়াল ডিঙিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ডায়ার বন্দুক সেদিকে তাক করে ট্রিগার টেপার নির্দেশ দিলেন। দেয়ালের গোড়ায় জমল মৃত মানুষের স্তূপ, যারা কোনোভাবে দেয়াল ডিঙালেন, জখম নিয়ে সামনের গলিপথে নিষ্প্রাণ ঝরে পড়লেন। বাগের ভেতরে যেমন, বাইরের গলিপথেও কিছুক্ষণের মধ্যে মরদেহে ঠাসাঠাসি অবস্থা।

মৃত্যুর এই নৃত্য ১০ মিনিট ধরে অব্যাহত থাকল। সৈন্যরা গুলি করল, গুলি শেষ হতে আবার ভরল এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের নির্দেশিত টার্গেটে আবার গুলি করল। যখন তাদের সব গুলি খরচ হয়ে গেল, তিনি তাদের প্রত্যাহার করার নির্দেশ দিলেন। মরদেহের স্তূপের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে তিনি তার সদর দপ্তর রামবাগের দিকে গাড়ি ঘোরালেন।

বছরটা ১৯১৯, অসন্তোষ পাঞ্জাবে উপচে পড়ছিল।

প্রথম মহাযুদ্ধ কেবল শেষ হয়েছে। পাঞ্জাব দেশের অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছে। ইউরোপে রফতানির কারণে খাদ্যমূল্য আকাশছোঁয়া। সবচেয়ে বেশিসংখ্যক সৈন্যের জোগান দিয়েছে পাঞ্জাব।

পাঞ্জাবের যুদ্ধংদেহী লেফটেন্যান্ট গভর্নর মাইকেল ও’ডয়ার যুদ্ধঋণ গ্রহণে এবং সেনাবাহিনীতে নিয়োগে যে স্বৈরাচারী ভূমিকা পালন করেছেন, সেজন্য চারদিকে অসন্তোষ।

শিক্ষিত শহুরে ভারতীয়দের প্রতি তার যে ঘৃণা, তা গভর্নর কখনো লুকিয়ে রাখেননি।

অন্যদিকে সেনাবাহিনীতে যোগদানে জোরজবরদস্তির কারণে গ্রামীণ পাঞ্জাবও তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন। লম্বরদারি স্বত্ব (জমিদারি) রক্ষা করতে হলে লম্বরদারকে আগে কয়জনকে সেনাবাহিনীতে ঢুকিয়েছে, তার তালিকা পেশ করতে হতো। তহশিলদার গ্রামবাসীকে তার দপ্তরে ডেকে এনে সেনাবাহিনীর জন্য যুবকদের ধরে আনার নির্দেশ দিত।

যুদ্ধের ওপর প্রভাব পড়ত পারে এমন রাজনৈতিক আন্দোলন দমিয়ে রাখার জন্য যে ডিফেন্স অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট প্রণয়ন করা হয়েছিল, প্রথম মহাযুদ্ধের পর সরকার তা পরিবর্তন করতে চাইল। ১৯১৭ সালের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রদ্রোহ কমিয়ে আনার জন্য আইন প্রণয়ন করতে ভারত সরকার কিংস বেঞ্চের স্যার সিডনি রাওলাটের নাম সুপারিশ করে। তিনি দুটো বিল সুপারিশ করেন। এগুলো রাওলাটস অ্যাক্টস নামে পরিচিত। এর একটি আইনে পরিণত হয়। ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল এটি পাস করল, সব ভারতীয় সদস্য এর বিরুদ্ধে ভোট দেন। তিনজন সদস্য—পণ্ডিত মদন মোহন মালব্য, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও মাজহারুল হক পদত্যাগ করেন।

এ আইনে কোনো রকম পরোয়ানা ছাড়া কাউকে গ্রেফতার করার তল্লাশি চালানোর, বিনা বিচারে কারাবন্দি রাখার এবং আপিল করা যাবে না—এমন ক্ষমতাসম্পন্ন স্পেশাল কোর্টে বিচারের ক্ষমতা সরকারকে দেয়া হলো।

এ আইনের বিরুদ্ধে ভারতে অভূতপূর্ব প্রতিবাদ শুরু হলো। এ আইনে ‘আপিল নেই, দলিল নেই, উকিল নেই’—এই হলো সারাৎসার। এ আইনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে তীব্র আন্দোলন স্যার মাইকেল ও’ডয়ারের পাঞ্জাবে। অমৃতসরে দুজন নেতার মাধ্যমে জনগণের দাবি মূর্ত হতে শুরু হলো। একজন ক্যামব্রিজ পড়াশোনা করা মুসলমান উকিল ডক্টর সাইফউদ্দিন কিচলু এবং অন্যজন যুদ্ধের সময় কিংস কমিশনের হাতে এক বছর কারাবাস করা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতিনিধি ডক্টর সত্য পাল।

ভারতবাসী দেখল গান্ধীও রাওলাট অ্যাক্টের তীব্র বিরোধী। তিনি সত্যাগ্রহের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করতে চাইলেন। হরতাল ডাকলেন এবং ৩০ মার্চ ১৯১৯ দেশব্যাপী অনশনের ঘোষণা দিলেন। কিন্তু পরে তিনি তারিখটি পরিবর্তন করে ৬ এপ্রিল ১৯১৯ নির্ধারণ করলেন, কারণ তিনি মনে করলেন ভারতজুড়ে হরতালের জন্য কিছুটা বেশি সময়ের নোটিস দেয়া প্রয়োজন। কিন্তু খবরটি অমৃতসরে দেরিতে পৌঁছে এবং ৩০ মার্চ তা এখানে যথাযথভাবেই পালন করা হয়। লেফটেন্যান্ট গভর্নর গান্ধীর আহ্বান নিয়ে সন্দিহান ছিলেন এবং ২৯ মার্চ ডক্টর সত্য পালকে গণবক্তৃতা প্রদান করা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেন। ততদিনে সংবাদপত্রের টুঁটি চেপে ধরা হয়েছে এবং কোনো কোনো পত্রিকার প্রকাশনাও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ৩০ মার্চ জালিয়ানওয়ালাবাগের সভায় ডক্টর কিচলু ভাষণ দেন, তারপর তাকেও নিষিদ্ধ করা হয়।

অমৃতসরের নেতারা মনে করলেন, ৬ এপ্রিলের হরতালও পালন করতে হবে। ৫ এপ্রিল অমৃতসরের ডেপুটি কমিশনার মাইলস আরডিং স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট ও বিশিষ্ট নাগরিকদের ডেকে হরতাল প্রত্যাহার করতে বলেন। নাগরিকদের কেউ কেউ প্রতিশ্রুতি দিলেও ডক্টর কিচলু ও ডক্টর সত্য পাল তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। ৬ এপ্রিল অমৃতসর হরতালে একেবারে স্থবির হয়ে যায়।

৯ এপ্রিল ছিল রামনবমীর দিন। এবারের মিছিল ছিল ভিন্ন ধরনের। মিছিলে অনেক মুসলমানও অংশগ্রহণ করেছে। মিছিলে স্লোগান উঠেছে—হিন্দু-মুসলমান কি জয়, মহাত্মা গান্ধী কি জয়। একই পাত্র থেকে হিন্দু ও মুসলমান পানি পান করেছে। মুসলমানদের অংশগ্রহণ ও সৌভ্রাতৃত্ব হিন্দুদের এ উৎসবকে আরো অর্থবহ করে তুলেছে। সম্মিলিত সমাবেশ মাইলস আরডিংকে আতংকিত ও লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। গভর্নর কিচলু ও সত্য পালকে পাঞ্জাব থেকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নেন এবং গান্ধীর পাঞ্জাবে প্রবেশের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ৯ এপ্রিল রাতে অমৃতসরে দুই নেতার আদেশ পৌঁছে।

এ সংবাদে বিদ্যুত্স্পৃষ্টের মতো শহর জেগে ওঠে। বিভিন্ন স্থানে জমায়েত হয়ে তাদের নেতা দুজন কী অবস্থায় আছেন জানানোর দাবি পেশ করে।

অমৃতসর রেলওয়ে ক্যারেজ ওভারব্রিজে ব্রিটিশ অশ্বারোহী সৈনিক ও ভারতীয়দের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, জনতা জমায়েত হলে গুলিবর্ষণ করা হয়। তিন-চারজন নিহত ও আহত হয়।

ক্ষুব্ধ জনতা মৃত ও জখমিদের নিয়ে ফুট ওভারব্রিজের দিকে এগিয়ে যায়। কেউ কেউ হল বাজারের দিকেও যায়। এ সময় ডেপুটি কমিশনার এসে হাজির হন, শান্তিপূর্ণভাবে এখান থেকে সরে যাওয়ার জন্য তিনি যে অনুরোধ করেন, জনতা তা প্রত্যাখ্যান করে। তার ওপর লাঠি ও পাথর ছুড়ে মারে। এ গোলযোগে জনতার মধ্যস্থলে ছিল বারের দুজন আইনজীবী—গুর্দিয়াল সিং সালারিয়া ও মকবুল মাহমুদ। তারা একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষকে গোলাগুলি থেকে নিবৃত্ত করতে এবং জনতাকে শান্ত করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু সৈন্যদের ওপর অবিরাম ইট-পাথর বর্ষণ চলতে থাকে। গুলিতে ২০ জন নিহত হয় এবং আহতের সংখ্যাও অনেক। দুজন আইনজীবী কোনোভাবে বেঁচে যান। রাস্তা হয়ে ওঠে হত্যাযজ্ঞের বধ্যভূমি। জখমের গোঙানির মধ্যেই মরণাপন্ন একজন বিক্ষোভকারী বলে ওঠেন, ‘হিন্দু-মুসলমান কি জয়।’

গোলাগুলি, হত্যাযজ্ঞের খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার ক্ষুব্ধ জনতা তাদের নেতা কিচলু ও সত্য পালের কথা ভুলে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করতে নেমে পড়ে। নেতৃত্ববর্জিত জনতা উন্মুক্ত অবস্থায় প্রতিশোধের নেশায় মেতে ওঠে। তারা ন্যাশনাল ব্যাংক লুটপাট করে, ব্যাংকের ইউরোপীয় ম্যানেজার ও অ্যাকাউন্ট্যান্টকে হত্যা করে, গুদামের গার্ড রবিনসনকে পিটিয়ে হত্যা করে। অ্যালায়েন্স ব্যাংক আক্রমণ করলে ম্যানেজার টমসন তার রিভলবার থেকে গুলি করেন, জনতা তাকে ধরে ফেলে এবং মুগুর মেরে হত্যা করে। ব্যাংকের আসবাবে আগুন ধরিয়ে সেই আগুনে তাকে পোড়ায়। রেগো ব্রিজে সার্জেন্ট রাওল্যান্ডের মাথার খুলি ফাটিয়ে দেয়। টাউন হল, পোস্ট অফিস ও শিন হল জ্বালিয়ে দেয়, ভাগতানওয়ালা রেলওয়ে স্টেশনের একাংশেও আগুন ধরিয়ে দেয়।

বিক্ষোভকারীরা মহিলা হাসপাতালের দিকে সেখানকার ভারপ্রাপ্ত ডাক্তার ইসাবেল মেরি ইয়াসডনের সন্ধানে ছোটে। কেউ তাদের বলেছে যে গুলিতে আহতদের নিয়ে ইসাবেল ঠাট্টা করেছেন এবং বলেছেন, তাদের যা প্রাপ্য তা-ই পেয়েছে। হাসপাতালের স্টাফরা ইসাবেলকে জনতার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখেন।

মিশনারি শিক্ষিকা মার্সেলা শেরউড ১৫ বছর ধরে অমৃতসরে আছেন, তিনি রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি পাঁচটি স্কুলের ছুটি ঘোষণা করতে যাচ্ছিলেন, যাতে ৩০০ ভারতীয় শিক্ষার্থী এ পরিস্থিতিতে বাড়ি চলে যেতে পারে। তিনি স্কুলগুলোর তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। জনতা তাকে তাড়া করলে তিনি দ্রুতবেগে তার পরিচিত রাস্তায় চলে আসেন, এখানে সবাই তাকে চেনে। কিন্তু জনতা তাকে ধরে ফেলে আঘাত করে এবং মাটিতে ছুড়ে ফেলে, তাকে মৃত মনে করে একসময় তারা চলে যায়। পরে কয়েকজন হিন্দু দোকানদার তাকে উঠিয়ে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যান। জনতা কোনোভাবে জেনে যায় যে তিনি বেঁচে আছেন, তারা দরজায় আঘাত করে এবং তাকে হস্তান্তরের দাবি জানায়। একজন বর্ষীয়ান সাহসী নারী ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে শপথ নিয়ে বলেন যে মিস শেরউড এ বাড়িতে নেই।

অন্ধকার ঘনিয়ে এলে গরুর গাড়িতে কম্বলের স্তূপে লুকিয়ে তাকে তার বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়। খুব ভোরে তাকে গোবিন্দগড় দুর্গে নিরাপদ স্থানে তাকে সরিয়ে নেয়া হয়।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ার তার সদর দপ্তর জলন্ধিরে বিস্তারিত অবগত হন এবং সতর্কতা অবলম্বন করেন। তিনি ৩০০ সৈন্যের একটি দল অমৃতসরে পাঠান। ১১ এপ্রিল তাকেই অমৃতসর যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। তিনি সকাল ৯টায় যখন শহরে প্রবেশ করেন, রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে আছে ধ্বংসাবশেষ, কোনো কোনো ভবনে তখনো আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে।

ডায়ার জরুরি বৈঠক ডাকলেন, ডেপুটি কমিশনার ও পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট হাজির হলেন। একটি দলিল তৈরি করে অনুলিপি শহরের নেতৃত্বস্থানীয় নাগরিকদের দেয়া হলো। এ লিখিত সর্তকবার্তায় বলা হলো, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার করতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ারের কাছে অমৃতসর হস্তান্তর করা হয়েছে।

১২ এপ্রিল তিনি সারিবদ্ধ সৈন্যদল নিয়ে শহরের ভেতর দিয়ে মার্চ করলেন। শহরের অন্য এক প্রান্তে তখন জনতাকে বলা হচ্ছিল যে পরের দিন জালিয়ানওয়ালাবাগে একটি সভা হবে এবং ডক্টর কিচলু ও ডক্টর সত্য পালকে মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত হরতাল অব্যাহত থাকবে।

রোববার ১৩ এপ্রিল বৈশাখীর দিন অমৃতসরের সব রাস্তা দিয়ে স্বর্ণমন্দিরের তীর্থযাত্রীরা প্রবেশ করছে। ডায়ার তার ক্ষমতা আরেকবার দেখানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। সকালে সারিবদ্ধ সৈন্যরা শহরে মার্চ করে এগোল, তাদের পেছনে সেনাবাহিনীর সশস্ত্র গাড়ি ও ডায়ারের কার। একটি গাড়িতে ঢোল শহরত্কারী ও নগর ঘোষক। ঘোষণাপত্র পাঠ করা হচ্ছিল। ১৯টি দফার শেষ ঘোষণাটি ছিল, কোনো মিছিল, চার বা ততোধিক ব্যক্তির কোনো সমাবেশকে বেআইনি সমাবেশ বলে বিবেচনা করা হবে এবং প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করা হবে।

এখানকার সদর দপ্তরে বসে ডায়ার জানলেন, বিক্ষোভকারীরা জালিয়ানওয়ালাবাগে সমবেত হচ্ছে। তিনি রাইফেলধারী ৫০ জন ও খুকরিধারী ৪০ জনকে নিয়ে মার্চ করে ঘটনাস্থলে পৌঁছলেন। জালিয়ানওয়ালাবাগে দেয়ালঘেরা এলাকার ভেতরের দিকে উঁচু জায়গায় তার বাহিনী অবস্থান নিতেই তিনি গুলি করার নির্দেশ দিলেন।

তার এ ট্রুপ যখন জালিয়ানওয়ালাবাগ থেকে বেরিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে ফিরে যায়, পেছনে রেখে যায় রক্তাক্ত নিষ্প্রাণ রণক্ষেত্র। তার সৈন্যরা জনতার ওপর ১ হাজার ৬৫০ রাউন্ড গুলি ছুড়েছে। চারদিকে মরদেহ কিংবা মৃত্যুপথযাত্রী। সৈন্যরা ফিরে গেছে, এটা সম্পূর্ণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কেউই বন্ধু কিংবা স্বজনের খোঁজে জালিয়ানওয়ালাবাগ যাওয়ার সাহস করে উঠতে পারিনি।

নেমে এল অন্ধকার। রক্তের ঘ্রাণে রাস্তার সব কুকুর জমায়েত হলো, সারা রাত ধরে চলল মানুষের মাংসের ভোজ। ডায়ারের জারি করা কারফিউর এমনই আতংক, রাত ৮টার পর এক পা নড়ার সাহসও কেউ দেখায়নি।

পরদিন একটি প্রতিনিধি দল মরদেহ সমাহিত কিংবা দাহ করার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করতে ডায়ারের কাছে যায়। তিনি সদয় অনুমতি দিলেন। গরুর গাড়িতে রাখা শবের পেছনে দীর্ঘ মিছিল। শেষকৃত্যের স্বাভাবিক বিধিবিধান অগ্রাহ্য করা হলো। চার-পাঁচটি করে মরদেহ একেকটি চিতায় তোলা হলো। মৃতের সংখ্যা কত, কেউ গুনে দেখেনি। প্রায় চার মাস পর সরকার ঘোষণা করল মৃতের সংখ্যা ৩৭৯ আর আহত ১৯২ জন। বেসরকারি সূত্র অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে। প্রকৃত সংখ্যা কারো জানা নেই।

১৫ এপ্রিল অমৃতসর ও লাহোর জেলায় সামরিক আইন জারি করা হয়। এর কার্যকারিতা ৩০ মার্চ থেকে দেখানো হয়, যাতে সামরিক আইনে ডক্টর কিচলু ও ডক্টর সত্য পালের বিচার করা যায়।

এরপর অমৃতসরে অদ্ভুত কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চালু করা হলো।

কোনো ইউরোপীয়র পাশ দিয়ে যদি কোনো ভারতীয় যায়, তবে অবশ্যই ইউরোপীয়কে সালাম দিতে হবে, এর ব্যত্যয় ঘটলে অপরাধীকে চাবকানো শুরু করা হবে।

ভারতীয়দের রেলগাড়িতে চড়া কার্যত বন্ধই হয়ে যায়, তৃতীয় শ্রেণী ও ইন্টারক্লাসের সব টিকিট প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

পাশাপাশি দুজনের বেশি হাঁটা অনুমোদিত হয়, বেশি হলেই শান্তি। অমৃতসরে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়।

কড়াকড়ি কারফিউ বলবৎ রাখা হয়।

১৯ এপ্রিল ডায়ার মিস শেরউডকে দেখতে গেলেন। যে রাস্তায় মিস শেরউড আক্রান্ত হয়েছেন, সে রাস্তার দুপাশে ‘হুইপিং ট্রায়াঙ্গেল’ স্থাপন করা হলো। তিনি ডিক্রি জারি করলেন, এ রাস্তায় যারা আসা-যাওয়া করবে, তাদের চার হাত-পায়ের ওপর ভর দিয়ে তা করতে হবে। এ হামাগুড়ির আদেশ অমান্য করলে চাবকানো হবে। হামাগুড়ি দিয়ে চলার আদেশ ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত বলবৎ রাখা হয়।

অমৃতসর ও লাহোরে কারফিউ ১৫ এপ্রিল থেকে, তা সম্প্রসারিত করা হলো। ১৬ তারিখে গুজরানওয়ালা, ১৯ তারিখে গুজরাট এবং ২৪ তারিখে লায়লপুরে কারফিউ বলবৎ হলো।

জনসমক্ষে চাবকানো লাহোরে নিত্যকার ব্যাপার হয়ে উঠল। ৮০০ টোঙ্গা আটকানো হলো, সামরিক আইন প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত ২০০ টোঙ্গা সরকারের কাছেই রয়ে গেল। ভারতীয় মালিকানাধীন সব গাড়ি সরকার নিয়ে নিল। দ্য ট্রিবিউন পত্রিকার ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ছিলেন বলে হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মনোহর লাল গ্রেফতার হলেন। পত্রিকার সম্পাদক শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক কালীনাথ রায় গ্রেফতার হলেন, তিনি রাষ্ট্রদ্রোহ ও উসকানিমূলক লেখার জন্য অপরাধী সাব্যস্ত হলেন। দ্য ট্রিবিউনের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়া হলো।

কলেজের দেয়ালে টানানো নোটিস ছিঁড়ে ফেলায় এসডি কলেজের ছাত্র ও শিক্ষক মিলে ৫০০ জন গ্রেফতার হলেন। গ্রীষ্মের দুপুরে মাথায় বেডিং নিয়ে তাদের তিন মাইল হাঁটিয়ে দুর্গে নিয়ে বন্দি করে রাখা হলো। আর কখনো কেউ নোটিস ছিঁড়বে না, এ অঙ্গীকারনামা লিখে কলেজের প্রিন্সিপাল তাদের ছাড়িয়ে আনলেন।

দয়াল সিং কলেজ, মেডিকেল কলেজ ও ডিএভি কলেজের শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে চারদিন ১৭ মাইল হেঁটে গিয়ে হাজিরা দিয়ে আসতে হতো। কলেজ থেকে ছাত্রদের বের করে দেয়ার জন্য অধ্যক্ষকে নির্দিষ্ট কোটা দেয়া হলো। কাসুর জেলায় সাদা মানুষদের সালাম না দেয়ায় ভারতীয়দের বেত্রাঘাত করা হলো, চাবকানো হলো, নাকে খত দেয়ানো হলো। চাবকানোর জন্য প্রত্যেক স্কুলের জ্যেষ্ঠ ছয়জনকে বাছাই করে নিয়ে গেল।

গুজরানওয়ালায় শিখ স্কুলের ওপর বোমাবর্ষণ করা হলো। শহরের কাছের একটি গ্রামে মেশিনগান চালানো হলো।

গুরুত্বপূর্ণ মামলার জন্য মার্শাল ল কমিশন করা হলো। লাহোরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলা অমৃতসরের নেতাদের নিয়ে। আসামিদের মধ্যে ডক্টর কিচলুর মতো ধনাঢ্য ব্যক্তি যেমন আছেন, তেমনি বিয়েতে গীত শোনানো দরিদ্র মানুষও আছে। ডক্টর কিচলু ও ডক্টর সত্য পালের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হলো।

ভারতের সঙ্গে তিক্ততা ঘোচাতে লন্ডনও উদগ্রীব হয়ে উঠল। রাজা পঞ্চম জর্জ ক্ষমার ষোষণা দিয়ে লিখলেন, ‘আমি আমার ভাইসরয়কে জানাচ্ছি, আমার নামে ও আমার পক্ষে জননিরাপত্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হলে রাজনৈতিক অপরাধীদের যেন সাধারণ ক্ষমা মঞ্জুর করা হয়।’ কিচলু, সত্য পালসহ আরো অনেক নেতা ছাড়া পেলেন।

পাঞ্চাবে কী ঘটেছে তা নিয়ে মন্টাগু (এডউইন স্যামুয়েল মন্টাগু, ১৯১৭ থেকে ১৯১২ পর্যন্ত সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া) হাউজ অব কমন্সে চাপের মধ্যে ছিলেন। তিনি চেমসফোর্ডের (ভাইসরয়) কাছে প্রকৃত সত্য প্রতিবেদন চাইলেন। আতংকিত চেমসফোর্ড মন্টাগুকে সতর্ক করে দিয়ে বললেন, ভারতীয় চরমপন্থীরাও বিস্তারিত প্রতিবেদনের দাবি জানিয়েছে, যা প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ প্রশাসনের ভাবমূর্তি নষ্ট করবে এবং লেফটেন্যান্ট গভর্নরের সুনাম কলুষিত করবে। কিন্তু মন্টাগুর চাপাচাপিতে হোয়াইট হলের সুপারিশে ১৯১৯-এর নভেম্বরে স্কটল্যান্ডের সিনেটর অব দ্য কলেজ অব জাস্টিস লউ-হান্টারের নেতৃত্বে ‘ডিজঅর্ডার ইনকোয়ারি কমিশন’ গঠিত হলো। মোট আট সদস্যের পাঁচজন ব্রিটিশ, তিনজন ভারতীয়। পাঞ্জাবের নেতাদের মুক্তি না দিলে কংগ্রেস কমিটি প্রত্যাখ্যান করবে বলে জানিয়ে দেয়। ১২ নভেম্বর নেতারা ছাড়া পান, কিন্তু তারা কমিটির কাছে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করেন।

হান্টার কমিটি সর্বসম্মত প্রতিবেদন দাখিল করতে ব্যর্থ হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের প্রতিবেদনে সই করেন ব্রিটিশ সদস্যরা, ভারতীয়রাও সংখ্যালঘু সদস্যের প্রতিবেদন দেন, ১৯২০-এর মে মাসে বৃহৎ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এটা পাঞ্জাবে ব্রিটিশ শাসনের ওপর বিশাল আঘাত। প্রতিবেদনে সংযুক্ত ফটোগ্রাফ জানিয়ানওয়ালাবাগ নির্মমতার সাক্ষ্য দেয়। প্রতিবেদনে লেফটেন্যান্ট গভর্নর থেকে শুরু করে পাঞ্জাবে কর্মরত বহুসংখ্যক ব্রিটিশ কর্মকর্তার চাকরিচ্যুতির সুপারিশ করা হয়। উভয় দলই মনে করে, কোনো রকম সতর্কবার্তা না দিয়ে ডায়ার গুলি শেষ না হওয়া পর্যন্ত গুলিবর্ষণ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

ব্রিটেনে যুদ্ধবিষয়ক সেক্রেটারি অব স্টেট উইনস্টন চার্চিল হাউজ অব কমন্সে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ারের সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুতির ঘোষণা দেন। ভয়ংকর স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে অনেকদিন শয্যাশায়ী থেকে ডায়ার ২৩ জুলাই, ১৯২৭ মৃত্যুবরণ করেন।

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাযজ্ঞের পর আহতদের উদ্ধারকারীদের একজন এতিম কিশোর উধম সিং এ নির্মমতার প্রতিশোধ নেয়ার অঙ্গীকার করেন। তার এ অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে ২১ বছর লাগে। ১৩ মার্চ, ১৯৪০ লন্ডনের ক্যাক্সটন হলের এক সভায় তিনি পিস্তল থেকে ছয়টি গুলি করেন। দুটি বুলেট অতিথিদের একজনকে আঘাত করে। যে মানুষটি তাত্ক্ষণিকভাবে নিহত হন, তিনি স্যার মাইকেল ও’ডয়ার, পাঞ্জাবের তখনকার লেফটেন্যান্ট গভর্নর।

১৯১৯-এর গ্রীষ্মে অমৃতসরের রক্তাক্ত থিয়েটারের শেষ অধ্যায়টি মঞ্চস্থ হলো লন্ডনে, ক্যাক্সটন হলে।

লেখক:যশোবন্ত সিং

 

 

 

সূত্র: বণিক বার্তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ