শেকসপীয়রের নাটক ও তার নায়িকারা

উইলিয়াম শেকসপীয়রের (১৫৬৪-১৬১৬) অনেক গুণের মধ্যে একটি হল সেটি যেটিকে কবি-সমালোচক কোলরিজ বলেছেন ‘কাব্যিক বিশ্বাস’ সৃষ্টির ক্ষমতা। যারা সাহিত্য সৃষ্টি করেন তারা অবশ্যই মিথ্যা কথা বলেন, সে তো জানা সত্য; কিন্তু লেখকের ক্ষমতা থাকে পাঠককে অল্প সময়ের জন্য হলেও নিজের অবিশ্বাসকে স্বেচ্ছায় স্থগিত করতে বাধ্য করার।

নাট্যকার শেকসপীয়র সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি কাহিনীর উদ্ভাবক নন; যেখানে ভালো গল্পের আভাস দেখেছেন সেখানেই হানা দিয়েছেন, অন্যের লেখা নাটক, প্রচলিত লোককাহিনী, লিপিবদ্ধ ইতিহাস, প্রাচীন সাহিত্য কোনো উৎসই বাদ রাখেননি, নাটকের জন্য কাহিনীর কাঠামো খুঁজতে গিয়ে।

কিন্তু এটাও সত্য যে, কাঠামোটিই শুধু নিয়েছেন, অনেক সময় তাকেও দিয়েছেন বদলে, আর ভেতরের প্রাণ, নাটককে যা প্রাণবন্ত রাখে, সেটা সম্পূর্ণই শেকসপীয়রের নিজস্ব, স্ব-আয়োজিত।

তারপরও সত্য হল এই যে, এই নাট্যকার যে অমন বিশ্বনন্দিত ও সর্বজনীন বলে স্বীকৃত তার কারণ নাটকের উপাখ্যান নয়।

কারণ হচ্ছে নাটকের ভেতরকার চরিত্র। চরিত্রই প্রধান। চরিত্রই বদলে দিয়েছে কাহিনীর কাঠামো। অনেক সময় পাঠক কিংবা দর্শক হিসেবে ঘটনা আমাদের মনে থাকে না, মনে থাকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত, ঘটনার দ্বারা প্রভাবিত, ঘটনার সৃষ্টিকারী মানুষগুলোকে। এই মানুষগুলো একই সঙ্গে নাট্যকারের সমসাময়িক এবং কালোত্তীর্ণ, অর্থাৎ যেমন তারা সেকালের তেমনি তারা চিরকালের।

নাটকের ক্ষেত্রে শেকসপীয়রের ছিল সেই অসামান্য শক্তি, যেটিকে কোলরিজের মতো আরেকজন রোমান্টিক কবি, জন কীটস, চিহ্নিত করেছেন নেগেটিভ ক্যাপেবিলিটি হিসেবে। অন্যভাবে বলতে গেলে, এ হচ্ছে একজন শিল্পীর পক্ষে নৈর্ব্যক্তিক হওয়ার ক্ষমতা।

এ ক্ষমতা যে শিল্পীর থাকে তিনি নিজের ব্যক্তিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না, নিজের গণ্ডি অতিক্রম করে এক হয়ে যান তারই উদ্ভাবিত চরিত্রের সঙ্গে। তখন তিনি আর তার নিজের নন, তিনি তারই হাতে তৈরি সব চরিত্রের। বিশেষভাবে কোনো একজনের নন। নির্বিশেষরূপে সবার। যেমন পুরুষের তেমনি মেয়েদের। নায়কের যেমন তেমনি আবার দুর্বৃত্তের।

কিন্তু তবু শেকসপীয়র তো একজন ব্যক্তিও। এ ব্যক্তিটি বাস করছেন একটি নির্দিষ্ট সময়ে, অবস্থান ছিল তার একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীতে। ব্যক্তিগতভাবে সুখ-দুঃখের নানা অভিজ্ঞতা তার হয়েছে। তিনি প্রেমেও পড়েছেন।

একজন মহিলা তাকে অত্যন্ত জ্বালাতন করেছেন এমন সত্য ভাষণ প্রেমকে উপজীব্য করে লেখা তার সনেটগুলোয় পাওয়া যায়। এই মহিলাকে তিনি কৃষ্ণকায় বলে উল্লেখ করেছেন। আবার এ প্রেমিকার সৌন্দর্যের প্রশংসা করতেও শেকসপীয়র কার্পণ্য করেননি। প্রেমিকাটি আকর্ষক, রহস্যময় ও ধ্বংসাত্মক, একাধারে।

এটি ব্যক্তি শেকসপীয়রের নিজস্ব অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা যে নৈর্ব্যক্তিক নাট্যকারের আঁকা মেয়েদের চরিত্রে প্রতিফলিত হয়নি তা বলা যাবে না। সেখানেও এমন মেয়ে আছে যে ধ্বংস করে।

যেমন ‘এন্টনিও অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা’র ক্লিওপেট্রা এবং ‘ট্রয়লাস অ্যান্ড ক্রেসিডা’র ক্রেসিডা। আবার এমনও চরিত্র পাওয়া যাবে যারা সর্বস্বত্যাগিনী, যেমন ‘কিং লীয়রে’র কনিষ্ঠ কন্যা কর্ডেলিয়া, ওথেলো-পত্নী ডেসডিমোনা, হ্যামলেট নাটকে বিপন্না ওফেলিয়া। কিন্তু এদের আত্মত্যাগ করার ক্ষমতা এদের নিজেদের জন্য সুখ বয়ে আনেনি এবং এদের আপনজনকেও স্বস্তি দেয়নি।

বরং যেমন নিজেন জন্য তেমনি ভালোবাসার জনের জন্যও ধ্বংস নিয়ে এসেছে, পথ দেখিয়ে। একই বক্তব্য যুবক রোমিও এবং অল্পবয়সী অতি আন্তরিক জুলিয়েট সম্পর্কেও সত্য। সত্য তা লেডি ম্যাকবেথ সম্পর্কেও। ওই মহিলা যদি অত অনুগত না হতেন তার স্বামীর, অনুক্ষণ অমনভাবে চিন্তা না করতেন স্বামীর উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থকরণ-বিষয়ে, তাহলে নিজেও বাঁচতেন, বাঁচতেন তার স্বামীও।

মেয়েরা একটা শক্তি। এই শক্তি দাম্পত্য সুখের ভিত তৈরি করতে পারে, যেমনটা আমরা দেখতে পাই শেকসপীয়রের কমেডিতে। ট্র্যাজেডিতে যা ধ্বংসাত্মক, সেই শক্তি কমেডিতে সৃজননিমগ্ন। কিন্তু যাই করুক, সৃষ্টিতে কিংবা ধ্বংসে মেয়েরা রহস্যময়ই রয়ে যায়। পুরুষ থেকে তারা ভিন্ন। তারা আকর্ষণীয়।

কিন্তু কার জন্য? পুরুষের জন্য এবং পুরুষের দৃষ্টিতে। দৃষ্টিটা যে পুরুষের এটা মানতেই হবে। মেনে নিয়ে তারপর অন্যসব বিবেচনা। নৈর্ব্যক্তিকতা, নিরপেক্ষতা ইত্যাদিরও একটা সীমা আছে বৈকি, নিতান্ত মানবিক একটি সীমা।

শেকসপীয়র অসামান্য প্রতিভাবান ছিলেন অবশ্যই, কিন্তু অশরীরী ছিলেন না। ঔপন্যাসিক ভার্জিনিয়া উলফ বলেছেন শেকসপীয়রের একজন বোন ছিল, নাম তার জুডিথ।

এ মেয়েটিও ছিল ভাইয়ের মতো প্রতিভাবান। ভাইয়ের মতোই সেও বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল। কেননা সে বিয়ে করে নিজেকে নিঃশেষ করতে সম্মত হয়নি। কিন্তু সে নাট্যকার হয়নি, অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে এবং সেই দুঃখে আত্মহত্যা করেছে।

না-পালালেও সে নাট্যকার হতো না। ঘর গৃহস্থালি তাকে শেষ করে দিত। ঘর গৃহস্থালির ধ্বংসাত্মক ভূমিকার কথা লেনিন বলেছেন।

বিপ্লবের পরে, ১৯১৯ সালে নারী-শ্রমিকদের এক সম্মেলনে লেনিন বলেছিলেন, ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ঘরকন্না সবচেয়ে অনুৎপাদক, সবচেয়ে বর্বর, সবচেয়ে হাড়ভাঙা শ্রম; যা মেয়েরা করে থাকে। এই মেহনত অতিশয় তুচ্ছ, তার মধ্যে এমন কিছু নেই যা মেয়েদের বিকাশে এতটুকু সাহায্য করে।’

ওই প্রসঙ্গেই লেনিন বলেছিলেন যে, নারীর ‘অবদমনের কারণ অর্থনৈতিক বটে, কিন্তু অর্থনৈতিক সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করলেও মেয়েরা মুক্ত হবে না যতদিন না তারা ঘরকন্নার দায়িত্বভার থেকে মুক্ত হন।’ যদি সমান প্রতিভার একজন বোন থাকতেন শেকসপীয়রের এবং যদি তিনি নাটক লিখতেন তাহলে কিছুটা হলেও নারী-চরিত্রের ভিন্নরূপ আমরা পেতাম হয়তো।

কিন্তু কতটা ভিন্ন তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল, কেননা নারীকে অবদমিত রাখার ব্যবস্থাটির পরিবর্তন হওয়ার দরুন যদি শেকসপীয়র-ভগ্নি নাট্যকারও হতেন, পুরোপুরি গৃহবধূ না হয়ে, তবু নারী-অধস্তনতার আদর্শবাদ তো রয়েই যেত, থাকত।

ঐতিহ্যের যে টান, তার ভেতর থেকেই নারীকে দেখতেন তিনি, বাধ্য হতেন দেখতে। ঐতিহ্যের বাইরে যেতে কতটা যে পারতেন কে জানে। কঠিন হতো যাওয়াটা। কেবল ঐতিহ্য নয়, ভার বহন করতে হতো তাকে আদর্শেরও। কাঁধ থেকে আদর্শের বোঝাটা ফেলে দেয়া সোজা কাজ নয়।

শেকসপীয়রের সময়ে ইংল্যান্ডে মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠেছে মাত্র, তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বলতে কিছু ছিল না, সমাজে তারা প্রধান নয়। সংস্কৃতিতেও তারা প্রান্তবর্তী। শেকসপীয়র নিজে উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোক। তিনি পেশাজীবী একজন।

এই পেশাজীবী নাট্যকার একজন অভিনেতাও ছিলেন, পরে গ্লোব থিয়েটারের মালিকের অন্যতম হয়েছেন বলে শোনা যায়। কিন্তু মধ্যবিত্ত তখন নাটক দেখে না। নাটক দেখে বিত্তবান মানুষ ও সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষ তার নিজের জীবন কাহিনী নিজের জীবনে বিস্তর দেখে, প্রতিদিনই দেখতে পায়, নাট্যালয়ে গিয়ে ওই কাহিনীর পুনরাভিনয় দেখতে চায় না, তারা বরং চায় বিত্তবানদের জগৎটাকে দেখে আনন্দ পেতে। আর বিত্তবান যারা তারা কি আর নিচের দিকে তাকাবে, নাটকীয় ঘটনার খোঁজে?

নিজেদের দিকে তাকালেও তাকাতে চাইতে পারে, কিন্তু তারা পছন্দ করবে তাদের চেয়েও সম্ভ্রান্ত যারা, কিংবা যারা দূরবর্তী নগরের বা অতীত ইতিহাসের, সেসব মানুষদের কাণ্ডকারখানা দেখতে।

সে জন্য লক্ষ্য করা যাবে যে, শেকসপীয়রের নাটকে মধ্যবিত্ত নেই, গরিব মানুষ আছে যৎসামান্য। নাটকে সবটাই অভিজাতদের কাজকর্ম, তাদের জীবনযাপনের অনুলিখন, কখনও গম্ভীর, কখনও কৌতুকপূর্ণ। অভিজাতদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সমস্যা, আকর্ষণ-বিকর্ষণই সেখানে প্রধান হয়ে আছে।

শেকসপীয়রের দৃষ্টিভঙ্গিটাও অভিজাতধর্মী। তার নাটকের সর্বজনীনতা ওই ভিত্তির ওপরই গড়ে উঠেছে; তবে ভিত্তিতে আটকে থাকেননি তিনি। গাছ যেমন আটকে থাকে না, মাটির ওপর দাঁড়ায় ঠিকই, কিন্তু উঠে যায় আকাশের দিকে, ওঠে বলেই সে বৃক্ষ, নইলে হতো গুল্মলতা শেকস্্পীয়রও ঠিক সেই রকমেরই।

শেকসপীয়র পুরুষ মানুষ। পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিটাও কার্যকর, অসামান্য শেকসপীয়রের ক্ষেত্রেও। যে-জন্য মেয়েরা অধস্তনেই রয়ে গেছে। এই যে শেকসপীয়রের নায়িকাদের নিয়ে আলাদা করে লেখার উদ্যোগ, সেটার মধ্যেও মেয়েদের তুলনামূলক অধস্তনতার সত্যের স্বীকৃতি আছে। এই সত্য একটি বাস্তবতা।

সেকালে মেয়েদের স্থান দ্বিতীয়ই ছিল। এখনও যে তা বদলে গেছে তা নয়। প্রথম হয়নি; সমান যে হয়েছে তাও নয়। তবে মেয়েদের অবস্থান নিয়ে এখন যেসব প্রশ্ন উঠছে, মেয়েরা নিজেরাই তুলছে, তখন তা অস্পষ্ট অনুভূতি হতে পারে কারও কারও হৃদয়ে, কিন্তু ধ্বনি হয়ে ওঠেনি, বাক্সময় হতে সময় লেগেছে প্রায় তিন চারশ বছর। শেকসপীয়রের নায়িকাদের নিয়ে ছোট বই লেখা যায়, নায়কদের নিয়ে ছোট বই লেখা কঠিন, সে বই অনেক বড় হতে বাধ্য। কারণ ওইটেই, পুরুষদের ওই আধিপত্য।

তার কমেডিতে মেয়েরাই প্রধান, অনেক ক’টিতেই। কিন্তু সে-প্রাধান্য সাময়িক এবং তা জীবনে মেয়েদের কর্তৃত্বের স্মারক নয় মোটেই। অধিকাংশ মেয়েরই লক্ষ্য অভিন্ন। বিয়ে করা। যাত্রা তাদের স্বামীগৃহ অভিমুখে।

স্বামীই গৃহ, অনেক ক্ষেত্রে। ইজাবেলা সন্ন্যাসিনী হবে ঠিক করেছে, মঠের চৌকাঠ পেরিয়েই জানতে চেয়েছে সন্ন্যাসের আইনকানুন কতটা শক্ত এবং আরও শক্ত নয় দেখে যেন কিছুটা অসন্তুষ্টই হয়েছে সে। সেই ইজাবেলা কী করল শেষ পর্যন্ত? না, ভিয়েনার ডিউক যেই মাত্র বলেছে, তুমি কি আমার স্ত্রী হবে, অমনি সঙ্গে সঙ্গে, নত মস্তকে রাজি সে; এতটা সম্মত যে মুখে কোনো রা নেই।

আমরা এও স্মরণ করতে পারি যে, শেকসপীয়রের কালে দর্শকদের ভেতর মেয়েদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। তাছাড়া এও তো জানি আমরা যে, মঞ্চে তখনও মেয়েরা পা দিতে পারেনি।

নারী চরিত্র ছিল, কিন্তু নারী অভিনেতা ছিল না। পুরুষরাই অভিনয় করত মেয়েদের ভূমিকায়। যে-জন্য মেয়েদের সংখ্যা বেশি করায় বাস্তবিক একটা অসুবিধা ছিল; আর সুবিধা হতো তাদের ছদ্মবেশ ধরিয়ে দিতে পারলে, শেকসপীয়র কখনও কখনও এই সুবিধা নিয়েছেন বৈকি, রজালিন্ড, পোর্শিয়া, ভায়োলা- এরা ছদ্মবেশ নিয়েছে, ইজাবেলা পরেছে সন্ন্যাসীর পোশাক।

শেকসপীয়রের নাটকে সব মেয়ে একরকম নয়; একরকম হলে তাদের বৈশিষ্ট্য কমে যেত, অভাব ঘটত বৈচিত্র্যের এবং নাট্যকার হিসেবেও শেকসপীয়র অতবড় হতেন না। নায়িকাদের মধ্যে যেমন রয়েছে ওফেলিয়ার মতো দুর্বল মানুষ, তেমনি আবার আছে ডেসডিমোনার মতো পিতৃআজ্ঞা অবজ্ঞাকারী কন্যা।

কেউ জুলিয়েটের মতো ঐকান্তিক, কেউ ক্রেসিডার মতো পক্ষ পরিবর্তনকারী। রজালিন্ড বিদগ্ধ, ক্যাথরিনা ঝগড়াটে। লেডি ম্যাকবেথ অত্যন্ত বুদ্ধিমতী, গাট্রুডের মতো সরল নয়। মিরান্ডা প্রায় কিছুই জানে না, বিয়েত্রিচ অনেক কিছু জানে।

কিন্তু ঐক্য আছে, যার কথা আগেই উল্লেখ করেছি। তারা পুরুষের প্রাধান্য মেনে নেয়, মেনে নিয়ে বিয়ে করে, কিংবা করতে চায়, আর যারা ওই কাজটি করে ফেলেছে ইতিমধ্যেই, তারা স্বামীর অনুগামী হয়ে চরিতার্থতা খোঁজে। হোক সে স্ত্রী লেডি ম্যাকবেথের মতো উচ্চাভিলাষী, কিংবা ডেসডিমোনার মতো রোমান্টিক। প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবাহ তখনও সর্বজনমান্য। কমেডির পরিসমাপ্তি তাই শুভ বিবাহের ঘণ্টাধ্বনিতে।

উজ্জ্বল যে মেয়েরা পুরুষদের ম্লান করে দেয় তারাও প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবাহ সম্পর্কে যে সংশয় ব্যক্ত করবে তেমনটা ঘটে না। তেমন ঘটনা পরবর্তী কালের। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ পর্বে তা সম্ভব হয়েছে।

শেকসপীয়রের কালে মেয়েরা বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন তোলে না, সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে দেখা যাচ্ছে যে, কেউ কেউ জিজ্ঞাসা তুলে ধরছে। যেমন মিলামেন্ট, কনগ্রেভের ‘দি ওয়ে অব দি ওয়ার্ল্ড’-এর বুদ্ধিমতী নায়িকা। বিবাহের পূর্বে ভাবী স্বামীকে সে কয়েকটি শর্ত দেয় এবং এমনও আশঙ্কা ব্যক্ত করে যে, বিয়ের পরে সে আর স্বাধীন থাকবে না, স্ত্রীতে অবনমিত হবে।

কিন্তু ওই মিলামেন্টও বিয়েই যে একটি মেয়ের জীবনের চরম লক্ষ্য নয় এমন কথা বলে না। বলতে পারে না। এই রকমের কথা শোনার জন্য মঞ্চে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও আড়াইশ বছর। ইবসেনের নোরাই প্রথম প্রশ্নটা তুলল, তাও ইংল্যান্ডে নয়, নরওয়েতে এবং অনেক পরে, ঊনবিংশর শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে।

শেকসপীয়রের নায়িকারা সবাই বিয়ের ব্যাপারে উৎসাহী। তরুণী রজালিন্ডও মোটেই সুখে নেই, পিতা রয়েছে বনবাসে, সে এখন একা, হয়তো একাকিত্বের দরুণ পিতার কথা নয় শুধু ভবিষ্যৎ সন্তানের পিতা সম্পর্কেও ভাবছে। অথবা মিরান্ডার ব্যাপারটা দেখা যাক। দ্বীপের মানুষ সে।

পুরুষ বলতে পিতাকেই দেখেছে, আর দেখেছে আধা-পুরুষ আধা-মৎস্য ক্যালিবানকে। তার মা নেই। বিবাহ কি জিনিস তার জানার কথা নয়। প্রেম সম্পর্কে শোনেনি কখনও কারও কাছে। মিরান্ডার কোন সখী নেই, জনমানুষহীন ওই দ্বীপ।

কিন্তু তাকেও দেখি প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে গেছে ফার্ডিন্যান্ডের। সহনুভূতি জানাচ্ছে অপরিচিত ওই যুবকের কষ্ট দেখে, পিতার আদেশ লঙ্ঘনে প্ররোচিত করছে তাকে। সন্ন্যাসিনী হতে প্রস্তুত ইজাবেলার খুবই বিতৃষ্ণা পুরুষদের সম্পর্কে, কিন্তু সে খুবই রাজি বিয়েতে। যোগ্য পাত্র পেলে।

আরেক নায়িকা অলিভিয়া ঘোষণা দিয়েছে যে, এতই পীড়িত সে পিতা ও ভ্রাতৃবিয়োগে যে কারও প্রতি দৃকপাত করার মানসিকতা তার নেই। সাত বছর সে ঘরের বাইরে যাবে না। তাকাবে না কোন পুরুষ মানুষের দিকে। সেই একই অলিভিয়া কিন্তু আর কারও দিকে তাকাচ্ছে না এখন, ভায়োলার দেখা পেয়ে; যে-মেয়েটিকে সে পুরুষ মনে করেছে, বেচারার ছদ্মবেশের কারণে। ওফেলিয়া হ্যামলেটকে পাবে আশা করেছিল, স্বামী হিসেবে।

কিন্তু স্বামী হিসেবে নয়, হ্যামলেটকে সে পেল পিতৃহন্তা হিসেবে। পেয়ে শেষে আত্মহত্যা করল মেয়েটি। হেলেনা ও হারমিয়া দুই বাল্যসখী, গলায় গলায় ভাব; কিন্তু এখন তারা পরিণত হয়েছে নিষ্ঠুরতম শত্রুতে, প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বামী পাওয়ার ব্যাপারে।

জুলিয়েট প্রাণ দিল, রোমিওকে বিয়ে করতে চেয়ে। পোর্শিয়া খুবই হতাশ হতো বিয়ে করার মতো স্বামী না-পেলে। ইহুদি জেসিকা পালিয়ে এসেছে পিতৃগৃহ ত্যাগ করে, বিধর্মী প্রেমিকের হাত ধরে।

ডেসডিমোনাও কুল ত্যাগ করেছে, বিয়ে করেছে ভিনদেশি এক কালো পুরুষকে, ওথেলোকে; যে কিনা তার পিতার বন্ধু। বাক্সময়ী ক্যাথরিনাকে দেখে মনে হয়েছিল এ-মেয়ে আর যাই করুক কিছুতেই বিয়ে করবে না। কিন্তু এক সময়ে পোষ মেনে নিল, পেট্রুশিওর হাতে পড়ে।

ক্রেসিডা ত্যাগ করেছে ট্রয়লাসকে, ত্যাগ করেছে বলা যাবে না, গ্রহণ করেছে ডায়োমেডিজকে। এটা সত্য। কিন্তু এই যে গ্রহণ এটা সে করেছে বাস্তব অবস্থার চাপে। চাপটা আসলে পুরুষদের। মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় অধিক বাস্তববাদী। সেই বাস্তববাদিতার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ক্রেসিডার তথাকথিত নির্লজ্জতা।

নির্লজ্জ তাকে হতেই হয়, না-হয়ে উপায় থাকে না। পরিবেশ ও পরিস্থিতি হাত ধরে শিক্ষা দেয়, বলে কল্পনাবিলাস তোমাদের সাজে না, ওটা পুরুষদের অধিকার। সে জন্য তরুণী রজালিন্ডরা কবিতা লেখে না, তরুণ অরল্যান্ডোরা লেখে। লিখে গাছের ডালে টাঙিয়ে দেয়। তাদের কোন সংকোচ নেই। সংকোচহীনতাই ভূষণ, তাদের জন্য।

বিয়ের পর মেয়েরা স্বামীর সম্পত্তি হয়ে যায়। জুলিয়াস সিজার ও মার্কাস ব্রুটাশ বন্ধু ছিলেন পরস্পরের, রাজনৈতিক কারণে এখন শত্রুতে পরিণত, কিন্তু তাদের স্ত্রী কালপার্নিয়া ও পোর্শিয়া- সমানভাবে উদ্বিগ্ন, নিজ নিজ স্বামীর মঙ্গল কামনায়। একজনের মঙ্গল হলে অপরজনের অমঙ্গল হতে বাধ্য, পরিস্থিতি এমনই বৈরী।

সেটা অন্য ব্যাপার; উভয় স্ত্রী যে আপন আপন স্বামীর কথা ভেবে কাতর হবেন এটাই স্বভাবিক। করিওলেনাসের মা সন্তানের কথা সর্বদাই ভাবেন, কিন্তু কোরিওলেনাসের স্ত্রী যেভাবে ভাবে সেরকম করে নয়। লেডি ম্যাকবেথের বুদ্ধি, বিবেচনা, কল্পনা কোনো কিছুতেই অন্যকারও প্রসঙ্গ নেই, স্বামীর প্রসঙ্গ ছাড়া। ডেসডিমোনাও যায় না।

লেডি ম্যাকবেথের তুলনায় বরং অধিক পরিমাণে স্বামী-অন্তঃপ্রাণ তার। কিন্তু রাজা ম্যাকবেথ কী করলেন? স্ত্রী মারা গেছে শুনে বললেন, সে আরও পরে মারা গেলেই ভালো করত। অর্থৎ স্ত্রী সুখ-দুঃখ-পীড়ার কথাটা ভাবছেন না, ভাবছেন শুধু নিজেরটা। অবকাশ নেই ভাববার। আর ডেসডিমোনার স্বামী ওথেলো? সেই হতভাগ্য তো নিজের হাতেই হত্যা করলেন তার প্রিয়তমা ডেসডিমোনাকে।

অন্য স্বামীরা অবশ্য এতটা করে না। তারা সুখ শান্তিতে আছে, মনে হয়। কিন্তু তাদের চিত্তেও অবিশ্বাসের মৃদু-মন্দ দংশন থাকে।

সবাই ওথেলো নয়, অত বড় নয়, কিন্তু ক্লিষ্ট যে হয় না এমন বলা যাবে না। বিশেষ করে স্ত্রীটি যদি হয় সুন্দরী। স্বামী সন্দেহ করে স্ত্রী এদিক-সেদিক তাকাবে। হয়তো, কে জানে, সুযোগ পেলে আসক্ত হয়ে পড়বে পর-পুরুষের। ভঙ্গ করবে বিশ্বাস। স্বামীর মাথায় অদৃশ্য শিং গজাবে, স্ত্রী যে অধীনা নয় সে সত্যের স্মারকচিহ্ন হিসেবে।

দেখবে সবাই। হাসবে মুখ টিপে, পরীদের রাজা অবরণ অবশ্য শরীরী মানুষ নয়, অদৃশ্যলোকের অধিবাসী, কিন্তু স্ত্রী টিটানিয়াকে যেভাবে সে শাস্তি দেয়, বাধ্য করে তাকে প্রেমে পড়তে এক গাধার, সে কাজ বায়বীয় নয়, নিতান্তই মনুষ্যসুলভ বটে।

লেখক:সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

 

 

 

সূত্র: যুগান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ