রোহিঙ্গা সংকট ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা

ঘুরে দাঁড়ানোর যাত্রাটা শুরু করতেই বাংলাদেশের কাঁধে চেপে বসেছে রোহিঙ্গা ইস্যুর মতো কঠিন ও জটিল এক সমস্যা, যা আমাদের এগিয়ে চলার পথে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন পথে এর সমাধান আমরা তা খুঁজে পাচ্ছি না। ২০০১-২০০৬ মেয়াদের এক সময়ে মনে হতো আমাদের বোধ হয় আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। দেশটা হয়তো আরেকটি আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের মতো ধর্মান্ধ উগ্রবাদী জঙ্গি সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, কৃষি, খাদ্য পরিস্থিতির ক্রমাবনতি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আন্ত রাষ্ট্রীয় সমস্যাগুলোর সমাধানের পথও রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছিল। সব কিছুতেই যেন একটা অচল ও স্থবির অবস্থা বিরাজ করছিল। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশাল আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নতুন সরকারের শুরু হওয়া নতুন যাত্রাটিও কিন্তু তখন মসৃণ ছিল না। পিলখানার কলঙ্কজনক হত্যাযজ্ঞই তার প্রমাণ। কিন্তু শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সাহস, দূরদৃষ্টি, বিচক্ষণতা এবং ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত পরিপক্ব কৌশলী নীতি বাংলাদেশের জন্য এগিয়ে যাওয়ার যাত্রাপথের দুয়ার খুলে দেয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী কর্তৃক বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের নীতি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জায়গায় নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটে। ১৯৪৭ সাল থেকে ঝুলে থাকা ছিটমহল বিনিময় সমস্যার অভূতপূর্ব সমাধান হয়ে যায়। অচিহ্নিত সীমান্ত যতখানি ছিল তারও চিহ্নিতকরণ চূড়ান্ত এবং স্থায়ী সমাধান হয়ে যায়। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সমুদ্র সীমানার মীমাংসা ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বাংলাদেশের জন্য বিশাল এক অর্জন বয়ে আনে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, তথ্য-প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সব সূচক ঊর্ধ্বমুখী।

বিশ্বের তিনটি দ্রুত অর্থনৈতিক বর্ধনশীল দেশের একটি বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকসহ বিশ্বের বড় বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। এত আশাবাদের পরও ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট ও তার পরবর্তী সময়ে আজ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে যা ঘটে চলেছে, তাতে অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করছে সব কিছু না জানি আবার কোনো মহাসংকটে পড়ে। এত দিনের অভিজ্ঞতাই বলে দেয়, রোহিঙ্গা সংকটকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। প্রথমে রাষ্ট্রের ভৌগোলিক নিরাপত্তার কথায় আসা যাক। কক্সবাজার হচ্ছে বাংলাদেশের লাইফ লাইন এবং স্ট্র্যাটেজিক্যালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড। টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায় স্থানীয় বাংলাদেশি নাগরিকের যে সংখ্যা তার থেকে প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি রোহিঙ্গা এখন সেখানে অবস্থান করছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের আগে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গারা সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করায় নিজেরাই একটা শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তাদের সহযোগিতা করে স্থানীয় কিছু দুর্বৃত্ত ক্ষমতাশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তি। মানবপাচার, মাদকপাচার এবং অস্ত্র চোরাচালানের মতো কড়কড়ে কাঁচা টাকা উপার্জনের পথে রোহিঙ্গাদের সহজে ব্যবহার করতে পারে বিধায় ওই সব ক্ষমতাশালী দুর্বৃত্ত রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেয়। এটা রাষ্ট্রের জন্য কত বড় ক্ষতিকর কাজ, সেটি ওই দুর্বৃত্তদের বোঝার মতো আক্কেল নেই, আর নয়তো জগেশঠের মতো টাকার বিনিময়ে দেশ বিক্রি হয়ে গেলেও সেটি তাদের ভ্রুক্ষেপে আসে না। আগের প্রায় চার লাখ এবং তার সঙ্গে ২০১৭ সালের পরে আসা আরো সাড়ে সাত লাখ—মোট সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গার মতো একটা বিস্ফোরণোন্মুখ জনসংখ্যা কক্সবাজারের মতো জায়গায় দীর্ঘদিন অবস্থান করলে সেটি আমাদের ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না, সে কথা কি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে।

বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের রশি টানাটানিতে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ক্ষমতা বিস্তারে কখন কী পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে কাজ করে তা সব সময় বুঝে ওঠা যায় না। আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের লেগেসির দিকে তাকালে কোনো কিছুকেই সন্দেহবাদের ঊর্ধ্বে রাখা যায় না। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের এ সময়ের পরম স্ট্র্যাটেজিক বন্ধু রাষ্ট্র চীনের ভূমিকা কেউ বুঝে উঠতে পারছে না। আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্ব অনেক হাঁকডাক করলেও এত বড় মানবতাবিরোধী অপরাধ করার পরও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে তেমন কোনো অবরোধ বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে না। আগামী ১০ বছর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ক্রুশিয়াল টাইম, সমৃদ্ধি অর্জনের এই সময়ে যদি এখন থেকে চার-পাঁচ বছরের মাথায় কয়েক লাখ রোহিঙ্গা কিশোর ও যুবকের একটি অংশও যদি ধর্মান্ধ উগ্র জঙ্গিবাদের খপ্পরে পড়ে, তাহলে তখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কতখানি হুমকির মধ্যে পড়তে পারে, সেটি সময় থাকতে ভাবা দরকার। কথায় আছে, সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান।

এখন মিয়ানমারের কথায় আসা যাক। অনেক উসকানি সত্ত্বেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অসীম ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের সব সামরিক শাসকের মতো মিয়ানমারের সামরিক গোষ্ঠীও নিজেদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য দেশের অভ্যন্তরে এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে এক ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি বজায় রাখতে চায়, যাতে দেশের জনগণকে জুজুর ভয় দেখিয়ে তারা দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকতে পারে। জনগণকে বলতে পারে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার জন্যই সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতায় থাকা ও শক্তিশালী করা দরকার। এ রকম দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, মিয়ানমার সহজে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে না। সুতরাং রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে যে রকম নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে আমরা পড়তে পারি, সেটি যাতে আমাদের অপার সম্ভাবনার অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে তার জন্য বহুমুখী তৎপরতা ও পদক্ষেপ সময় থাকতে গ্রহণ করা উচিত। যেমন—এক. দীর্ঘ মেয়াদে এত বিশালসংখ্যক বিদেশি নাগরিকের ভরণ-পোষণ, শিক্ষা, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসহ সব মানবিক চাহিদা পূরণ করা বাংলাদেশের একার পক্ষে তো সম্ভবই নয়, এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে যখন যা প্রয়োজন এমন বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থাপনায় চালিয়ে নেওয়া যাবে না। তাই ফিলিস্তিনে শরণার্থীদের জন্য যেমন জাতিসংঘ রিলিফ ওয়ার্ক এজেন্সি (UNRWA) স্থায়ীভাবে গঠন করা হয়েছে, তেমন একটা স্থায়ী আন্তর্জাতিক সংস্থা বা এজেন্সি গঠন করা উচিত, যাতে এই রোহিঙ্গাদের সব মানবিক দায়িত্ব ওই সংস্থা পালন করতে পারে।

দুই. কক্সবাজার থেকে এত বিশাল রোহিঙ্গা জনসংখ্যার চাপ কমানোর জন্য ভাষাণ চরের মতো দেশের অন্যান্য জেলায় আরো প্রয়োজনীয় সংখ্যক ক্যাম্প তৈরি করে দ্রুত সেসব স্থানে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেওয়া উচিত। দেশি-বিদেশি কিছু সুবিধাবাদী এনজিও এবং ধর্মীয় কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতর অপপ্রচার চালাচ্ছে, যাতে তারা অন্যত্র স্থাপিত নতুন ক্যাম্পে না যায়।

তিন. যত দিন পর্যন্ত নতুন ক্যাম্পে স্থানান্তর করা যাচ্ছে না, তত দিন বর্তমান ক্যাম্পগুলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনা একটা বিশেষ টাস্কফোর্সের আওতায় রাখা হলে নিরাপত্তাসহ অন্যান্য বিষয়ের ওপর একটা শঙ্কামুক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হতো। ১৩ এপ্রিল বহুল প্রচারিত একটি সহযোগী দৈনিকে সচিত্র প্রতিবেদনসহ প্রধান শিরোনাম ছিল—রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র গ্রুপ। খুনাখুনি, অপহরণ, গুম, লুটপাটসহ নানা জঘন্য অপরাধজনক ঘটনা লেগেই আছে। তারা নিজেরাই খুনাখুনির ঘটনা ঘটাচ্ছে এবং তাতে এ পর্যন্ত লাশ পড়েছে ৩০টি। জঙ্গি সংগঠন আল ইয়াকিন ও রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) নামের জঙ্গিদের তৎপরতার কথা ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। এগুলোর সবই জননিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য অশুভ সংবাদ। এসবের দমন ও নিয়ন্ত্রণের জন্যই ক্যাম্পগুলোর ওপর অধিকতর শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

চার. মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের স্থল, নৌ এবং উপকূলীয় সীমান্তের নিরাপত্তার ব্যবস্থাপনা আরো জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ মিয়ানমার থেকে সন্ত্রাসীসহ সব ধরনের অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। ইয়াবা, অস্ত্র চোরাচালান এবং মানবপাচার আমাদের অভ্যন্তরীণ জননিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি। স্থলভাগে এখনো যেখানে নেই, সেখানে বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি) স্থাপন এবং সীমান্তের সমান্তরাল পাকা সড়ক নির্মিত হলে অনুপ্রবেশ বন্ধ করা সহজ হবে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় গেটওয়ে সেন্ট মার্টিনস দ্বীপে সম্প্রতি আমাদের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি মোতায়েনের কাজটি অত্যন্ত সঠিক হয়েছে। কেন এত দিন সেখানে বিজিবি মোতায়েন ছিল না, সেটাই তো বুঝতে পারছি না। অন্যান্য সীমান্তের মতো সেন্ট মার্টিনসও আমাদের সীমান্তের ভূখণ্ড। সেখানে যথাযথভাবে আমাদের সীমান্ত বাহিনী থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। এটাকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা বা উপস্থাপন করার সুযোগ নেই। উপসংহারে এসে বলতে হয়, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি বিষফোঁড়াস্বরূপ। এটি যাতে আমাদের শরীরে পচন ধরাতে না পারে তার জন্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

লেখক : মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.),রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

 

 

সূত্র: কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ