নির্দেশকের উচিত প্রত্যেক অভিনেতাকে স্বাধীনতা দেওয়া

আতাউর রহমান। একুশে পদকজয়ী নাট্যব্যক্তিত্ব। একই সঙ্গে অভিনয় ও নির্দেশনার মাধ্যমে আমাদের মঞ্চ নাটককে প্রতিনিয়ত আলোকিত করে যাওয়া এই মানুষটির জীবন ও কর্মের গল্প শুনেছেন রুদ্র আরিফ।

শৈশব কেমন ছিল?

আমার জন্ম ১৮ জুন ১৯৪১, নোয়াখালী, নানাবাড়িতে। এলাকাটিকে এখন সোনাপুর বলা হয়। ঠিক গ্রাম নয়, শহরতলির মতো জায়গা। আমার মা জাহানারা বেগম, বাবা মাহবুবুর রহমান। বাবা কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে লেখাপড়া করেছেন। আমার নানাবাড়ি থেকে দাদাবাড়িতে যেতে ঘণ্টা দুয়েক লাগত। ট্রেনে সোনাইমুড়ি স্টেশনে নেমে তারপর হেঁটে যেতাম। দাদাবাড়ির সঙ্গে আমার যোগাযোগ নিবিড় ছিল না; বরং ছিল নানাবাড়ির সঙ্গে। এখানেই আমার পুরো মননটা তৈরি হয়েছে। খালারা, খালাতো ভাই-বোনরা সবাই শিল্পমনা, সাহিত্যমনা ছিলেন। ওখানকার গাছপালা, পুকুর, সাধারণ জীবন—এগুলোর মধ্যেই বড় হয়েছি। নানাবাড়িতে অনেক বইপত্র ছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের সঙ্গেও সেখানেই পরিচয়। নানা খুব ভোরে রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে গাইতে প্রাতঃক্রিয়া সারতে যেতেন। তখন তো টয়লেট ছিল না, জঙ্গলেই যেতে হতো। ওনার গানের খুব একটা সুর হতো না, তবু গাইতেন। আর আমার মা শিল্প, সাহিত্য ও পড়াশোনামনস্ক ছিলেন। খারাপ স্বাস্থ্যের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা খুব একটা করতে পারেননি। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়েছিলেন। বাবার সঙ্গে কলকাতায় যেসব সিনেমা দেখেছেন, আমাদের সেগুলোর গল্প শোনাতেন। মা-খালারা রবীন্দ্রনাথের ‘পূজারিণী’ কবিতাটি চৌকি খাটিয়ে পড়তেন। পড়তে পড়তে মা কেঁদে ফেলতেন। পরিবারে একমাত্র তিনিই আমাকে মারতে পারতেন। বাবা কখনো গায়ে হাত তোলেননি। একদম ছোটবেলায় জুল ভার্নের ‘টোয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’ বইটির বাংলা অনুবাদ পড়ে আমার চিন্তার জগত্ খুলে গিয়েছিল।

প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার শুরু চট্টগ্রামে?

আমার পড়াশোনার হাতেখড়ি মা-বাবার কাছেই। এরপর বাবার কর্মসূত্রে চট্টগ্রামে এসে, চিটাগাং কলেজিয়েট স্কুলে সরাসরি ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হলাম। খুবই নামকড়া স্কুল। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছিলেন স্কুলে আমার দুই বছরের সিনিয়র। অসাধারণ সব শিক্ষককে আমরা পেয়েছি। সব সময়ই বলি, জীবনে যা শিখেছি, সব ক্লাস টেন পর্যন্তই। বাবার ধারণা ছিল, আমি খুব ভালো ছাত্র হব। প্রথম দুই-তিন বছর ভালোই ছিলাম। তারপর আর পড়াশোনায় মন বসল না। উনি খুব আশাহত হলেন। তবু পড়াশোনা চলল। এরপর পড়েছি চিটাগাং কলেজে। বাবা তারপর চট্টগ্রাম থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় চলে এলে আমিও এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। আসলে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা আমার কখনোই ভালো লাগত না; বরং আড্ডা দিয়ে সময় কাটাতাম। আবদুল্লাহ আল-মামুন, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর আলী খান রনো, এ টি এম শামসুল হুদা, ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, কবি আসাদ চৌধুরী—এঁরা আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। আমাদের সেই সময়কার বন্ধুদের একটা সংগঠন আছে—‘পদক্ষেপ ৬৪’। আমরা এখনো যাঁরা বেঁচে আছি, সময় পেলে একসঙ্গে জড়ো হই, আড্ডা দিই।

নাটকে জড়ানোর মুহূর্ত…

ষাটের দশকে আইয়ুব খান যখন রবীন্দ্রচর্চা বন্ধ করে দিয়েছিলেন, সেই সময় আমরা নাটকের একটা ঝড় বইয়ে দিয়েছিলাম। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্রই ঢুকেছি। ‘ড্রামা সার্কেল’-এ আমি আর রনো ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করতাম। ‘তাসের দেশ’, ‘রক্তকরবী’ নাটকগুলো দেখতাম। আমি থাকতাম ঢাকা হলে (বর্তমানে শহীদুল্লাহ হল)। আবদুল্লাহ আল মামুন ছিলেন সেই হলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের কোনো একটি গল্প অবলম্বনে মামুনের নির্দেশনায় একটি নাটকে আমি আর কবি আসাদ চৌধুরী ছোট্ট দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। নাটকের নামটি এখন আর মনে নেই। এ ছাড়াও আরো কয়েকটি নাটকে অভিনয় করেছি। তবে অত সিরিয়াস ছিলাম না। ১৯৬৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে এমএসসি পাস করে বের হওয়ার পর মামুন তাঁর ‘শপথ’ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে আমাকে অভিনয় করালেন। তারপর আমি আশকার ইবনে শাইখের নাট্যচক্রে যোগ দিলাম। সেখানে সাঈদ আহমেদের সঙ্গে পরিচয় হলো। তিনি ইংরেজিতে লিখতেন। তাঁর ‘মাইল পোস্ট’ নাটকটি আমি অনুবাদ করলাম। আশকার ইবনে শাইখের ওখানে আমি, আবদুল জলিল, সৈয়দ আহসানউল্লাহ সিডনি—আমরা সবাই অভিনয় করেছি। অন্যদিকে মুনীর চৌধুরীকে ঘিরে আরেকটি চক্র ছিল, সেখানে রামেন্দু মজুমদারসহ আরো অনেকেই অভিনয় করতেন। পরে আদর্শের মিল ছিল না বলে আশকার ইবনে শাইখ আমাদের কাছ থেকে বিচ্যুত হলেন। এরপর বছর দুয়েক আমি ‘তাসের দেশ’-এ অভিনয় করলাম। বিশ্ববিদ্যালজীবনে যেহেতু ছাত্র ইউনিয়ন করতাম, ওদের কালচারাল ফ্রন্ট ‘সংস্কৃতি সংসদে’র হয়ে অভিনয় করলাম। কামাল লোহানীর ‘ক্রান্তি’ নাট্যদলের হয়েও অভিনয় করলাম। আমি তখন চাকরির পাশাপাশি অভিনয় করতাম। একসময় মনে হলো, অভিনয় করার আর দরকার নেই। চাকরি আর সংসারধর্ম করব। এমন সময় জিয়া হায়দারের সঙ্গে দেখা। উনি বললেন, ‘আপনি ছাত্রজীবনের নাটক করতেন। এখন করেন না কেন? চলুন, আমরা একটা দল করি।’ ধানমণ্ডিতে ফজলে লোহানীর বাসায় মিটিং হলো। আবদুল জলিল, সিডনি, আলী যাকের—এঁরাও ছিলেন। ১৯৬৮ সালের শেষ দিকে এভাবেই ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ প্রতিষ্ঠিত হলো। আমি প্রথম সাধারণ সম্পাদক। জিয়া হায়দার সভাপতি।

শুরুর দিকের কার্যক্রম কেমন ছিল?

মঞ্চনাটক করার মতো সময় করে উঠতে পারিনি বলে আমরা তখন রেডিও ও টেলিভিশনে নাটক করতাম। ইতিমধ্যে আমি জিয়া ভাইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে দুটি নাটকের অনুবাদ করলাম। জ্যঁ পল সার্ত্রের ‘নো এক্সিট’ প্রকাশ পেল ‘দ্বার রুদ্ধ’ নামে, নিকোলাই গোগলের ‘দ্য ম্যারেজে’র অনুবাদ ‘প্রজাপতি নিবন্ধ’। ১৯৬৯ ও ১৯৭০ সালে বই দুটি বাংলা একাডেমি প্রকাশ করল। স্বাধীনতার পর, ১৯৭২ নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রথম নাটক মঞ্চায়ন হলো আমারই নির্দেশনায়, মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’। ওয়াপদা মিলনায়তে তিনটি শো হয়েছিল। আলী যাকের অভিনয় করলেন। আলী যাকেরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও তাঁকে নিজেদের নাট্যদলে ভেড়ানোর ঘটনা মনে গেথে আছে। ইতিমধ্যে আমি আর আবুল হায়াত টেলিভিশনে ‘মুক্তধারা’ নাটকে অভিনয় করেছি। সদ্য স্বাধীন দেশে মুস্তাফা মনোয়ার বিরাট এক আয়োজন করলেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘মুক্তধারা’র মঞ্চায়ন করবেন। বিরাট বড় মঞ্চ, ৪০০ বাই ৪০০ ফুট। নাটকটিতে ফারাক্কার বাঁধ যখন ভাঙে, সেই দৃশ্যের সময় মন্টু ভাই (মুস্তাফা মনোয়ার) দমকল বাহিনীর পাঁচ-ছয়টি পাইপ ছেড়ে দিয়েছিলেন! সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মানুষে ভর্তি। আমরা প্রাণখুলে অভিনয় করলাম। নাটক শেষে আলী যাকেরের সঙ্গে আলাপ হলো। দেখি উনি ১০৩ ডিগ্রি জ্বরে কাঁপছেন। আমি বললাম, ‘আপনি জ্বর নিয়ে এলেন কেন?’ বললেন, ‘আপনারা এত কষ্ট করে নাটক করছেন, আমি দেখব না?’ সেই সময়ে নেতাজী সুভাষ দত্তের ভূমিকায় আলী যাকের এবং পুলিশ ইন্সপেক্টরের ভূমিকায় সুভাষ দত্ত ‘আরণ্যক’ নাট্যদলের ব্যানারে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে একটি নাটকে অভিনয় করছিলেন। আমি আলী যাকেরকে বললাম, ‘আপনি আমাদের দলে যোগ দেন না কেন?’ তিনি ইতিবাচক সাড়া দিলেন। এভাবে ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’তে তাঁকে পেলাম।

নিজেদের প্রস্তুত করার মুহূর্তগুলো কেমন ছিল?

আমাদের নাটকের আড্ডাটা বেশির ভাগ সময় আমার নয়তো আলী যাকেরের বাসায় হতো। সেখানে শিল্প-সাহিত্যের অনেকেই নিয়মিত আসতেন। মুহম্মদ খসরু, কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, বেলাল চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, চিত্রশিল্পী আবুল বারক আলভী আরো অনেকেই আসতেন। এমনও দিন গেছে, রাতের পর রাত জেগে আড্ডা দিয়েছি। কিভাবে নাটকে নতুন কোনো নিরীক্ষা করা যায়—এ নিয়ে আলাপ করেছি। কবি সুফিয়া কামালের বড় মেয়ে সুলতানা কামাল আমার সঙ্গে অভিনয় করেছেন। এক নাটকে তিনি আমার মা হয়েছিলেন। আমাদের মধ্যে তখন আমারই গাড়ি ছিল। রিহার্সাল শেষে আমি সবাইকে বাসায় পৌঁছে দিতাম।

অভিনেতা হিসেবে মঞ্চের বিশেষ কোনো স্মৃতি?

অভিনেতা হিসেবে মঞ্চে আমি খুব দুষ্টুমি করি, যেগুলো হয়তো উচিত না! সুযোগ পেলেই নানা রকম মিমিক করি। অবশ্য ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয়ের সময় এমনটা করা সুবিধা। যেমন—আসাদুজ্জামান নূরের নির্দেশনায় ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’তে আমি মোক্তারের চরিত্রে অভিনয় করতাম। মোক্তার খুবই কুিসত একটা লোক, সারাক্ষণ মদ খায়। আমি একপর্যায়ে পা এমনভাবে উঠাতাম, লোকজন হো হো করে হাসতেন। অতিমাত্রায় চার্লি চ্যাপলিন স্টাইলের মিমিক্রি আরকি। অশালীন অঙ্গভঙ্গিও ছিল। তখনকার দর্শকরা চরিত্রটি খুব পছন্দ করতেন। আমাদের সঙ্গে কাজীর চরিত্রে অভিনয় করতেন চলচ্চিত্রকার বাদল রহমান। অসাধারণ অভিনয় করতেন তিনি। বাদল মারা যাওয়ার পর ওই চরিত্রে ড. ইনামুল হক এলেন। আমার মধ্যে বরাবরই একটা ছেলেমানুষী ছিল। আমি যেহেতু মোক্তার, বিয়ের এক অনুষ্ঠান শেষে কাজী সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি। বিদায় নিতে কোলাকুলি করতে গেলাম। মোক্তারের মুখে তো মদের গন্ধ, কাজী সাহেব তাই ‘নাউজুবিল্লাহ’ বলে ছিটকে বেরিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু হঠাত্ কী খেয়াল হলো, আমি তো ইনামুল হককে আর ছাড়ি না! কিছুক্ষণ শূন্যে ঘুরিয়ে, আচমকাই তাঁকে ছেড়ে দিলাম। তিনি মঞ্চের ওপর চিত্পটাং হয়ে পড়লেন। শোর শেষে তিনি নূরের কাছে নালিশ করলেন, ‘আতাউর পাগল হয়ে গেছে, ওর সঙ্গে আমি আর অভিনয় করব না।’

এদিকে ১৯৭৫ সালে, ‘সত্ মানুষের খোঁজে’ নাটকের সময় আরেকটা বিপত্তি হয়েছিল। আমি, জামাল আর আলী যাকের—তিন অশরীরীর চরিত্রে অভিনয় করতাম। মহিলা সমিতির মঞ্চটা তখন একদম অন্ধকার করে দেওয়া হতো। আমরা তিনজন হাত ধরাধরি করে আন্দাজের ওপর মঞ্চে হাঁটাহাঁটি করতাম, তারপর মঞ্চের একদম সামনের দিকে, দর্শকের কাছাকাছি গিয়ে হাত ছেড়ে দিতাম। একটা শোতে দেখা গেল, আমরা তিনজন বাঁকা-ত্যাড়া হয়ে মঞ্চের তিনদিকে চলে গেছি। অন্ধকারে ঠিকঠাক আন্দাজ পাইনি। এখন কিভাবে ম্যানেজ করব? আমরা আড়মোড়া দিতে দিতে দর্শককে কিছু বুঝতে না দিয়ে বহু কষ্টে অবশেষে একসঙ্গে হতে পেরেছিলাম।

অন্যদিকে ১৯৮৩ সালে ‘নূরলদীনের সারা জীবন’ নাটকে অভিনয়ের সময় এক শোতে সহ-অভিনেত্রী সারা যাকের সংলাপ ভুলে গিয়ে মঞ্চেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন! আমি কোনো রকমে এটা-ওটা বলে তাঁকে কোলে করে ব্যাকস্টেজে নিয়ে এলাম।

নির্দেশক হিসেবে বিশেষ উপলব্ধি?

‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ দিয়ে শুরু করে অনেক নাটকই নির্দেশনা দিয়েছি, এখনো দিচ্ছি। এর মধ্যে রয়েছে ‘ভেঁপুতে বেহাগ’, ‘মাইল পোস্ট’, ‘সাজাহান’, ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘কবর দিয়ে দাও’, ‘আগল ভাঙার পালা’, ‘গ্যালিলিও’, ‘ঈর্ষা’, ‘হিম্মতি মা’, ‘রক্তকরবী’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তিনটি কাব্য নাটক নিয়ে ‘নাট্যত্রয়ী’, ‘ত্রয়লাস ও ক্রেসিদ’, ‘তাসের দেশ’, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘রুদ্র রবি ও জালিওয়ানালাবাগ’, ‘নারীগণ’, ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’, ‘হ্যামলেট’ প্রভৃতি। একসময় নির্দেশনাটা আমার কাছে খেলার মতো হয়ে গেল। এরপর থেকে আমাকে ভাবতে হয় না। এখন আমি দেখলেই বুঝে যাই, কোন নাটকটা কিভাবে করতে হবে, কোন অভিনেতাকে দিয়ে কিভাবে অভিনয়টা করাতে হবে। যখন টের পাই কোনো রিহার্সাল ঠিক জমছে না, তখন একটু দম নিয়ে ভাবি। আমি মনে করি প্রত্যেক অভিনেতারই নিজস্ব বাচনভঙ্গি রয়েছে। খালেদ খান একভাবে অভিনয় করতেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আরেকভাবে অভিনয় করেন। একজন নির্দেশকের উচিত প্রত্যেক অভিনেতাকে স্বাধীনতা দেওয়া। তাহলেই সেই অভিনেতা নিজের সেরাটা বের করে আনতে পারবেন। এটি কখনো রেজিমেন্টাল ওয়ার্ক হতে পারে না। এটি বেতের বাড়ি দেওয়ার কাজ হতে পারে না। যদিও অনেক নির্দেশকই বেতের বাড়ি তরিকায় বিশ্বাস করেন। কিন্তু আমি মনে করি, একজন অভিনেতার ভেতর নিজস্ব যে গুণটি রয়েছে, সেটি আমাকে বের করে আনার চেষ্টা করতে হবে। কাঁঠালের ভেতর থেকে কোয়া যেভাবে বের করে আনা হয়, ঠিক সেভাবে। আমি অভিনেতাদের বলি, ‘ডিরেকশন নিয়ে আমি ভাবব, আপনি চরিত্রটা নিয়ে ভাবুন।’ প্রয়োজনে তাঁদের বিভিন্ন বই পড়ার পরামর্শ দিই। আর তাঁদের ভঙ্গিমা দেখেই বুঝে ফেলি, কার কোথায় আড়ষ্টতা। এসব আড়ষ্টতা ভাঙার জন্য কতগুলো এক্সারসাইজ আছে। রাগি নির্দেশকের পক্ষে সেগুলো ভাঙানো সম্ভব না। নাটক নিয়ে, নাটকের কাজে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফিনল্যান্ড, রাশিয়া, ভেনিজুয়েলা, মিসর, সিরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, গ্রিস, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাপান, ভারত, থাইল্যান্ড, নেপাল, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, চীন, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়াসহ পৃথিবীর নানা দেশেই তো গিয়েছি। ইংল্যান্ডের থিয়েটার স্কুলে একবার আমি একটা এক্সারসাইজ করাতে দেখে চমকে গিয়েছিলাম। এক পা রাস্তায়, আরেক পা ফুটপাতে রেখে হেঁটে যাচ্ছেন অভিনেতা। লোকজন তাঁকে দেখে হয়তো পাগল ভাবছেন। কিন্তু এটা আসলে লজ্জা ভাঙানোর একটা দারুণ তরিকা।

আপনার নির্দেশিত কোনো একটি বিশেষ নাটকের কথা জানতে চাই।

আমার কাছে আনন্দ লাগে যখন ‘হ্যামলেট’ হাউসফুল হয়। শেকসপিয়ারের এই নাটকটি সৈয়দ শামসুল হক মৃত্যুর ১৫ দিন আগে অনুবাদ শেষ করে আমার হাতে দিয়ে গেছেন। যদিও এটি ডেনমার্কের রাজপুত্রের কাহিনি; কিন্তু শুরুই হচ্ছে জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগে একদিন’ কবিতাটির আবৃত্তি দিয়ে। ‘অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—/আরো এক বিপন্ন বিস্ময়/আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভেতরে/খেলা করে;/আমাদের ক্লান্ত করে;/ক্লান্ত ক্লান্ত করে’…। এরপর পর্দা ওঠে। তারপর একসময় রাজা যখন ‘অন্ধকার, অন্ধকার’ বলে চিত্কার করে, সেই দৃশ্যেও আমি জীবনানন্দের কবিতার কাছে ফিরে গিয়েছি। আসলে নির্দেশকের স্বাধীনতা নিয়ে, এটাকে যে ‘আমাদের হ্যামলেট’ করে তুলতে পেরেছি, এটাই আমার কাছে আনন্দের।

বিশেষ পছন্দের নাটক?

উইলিয়াম শেকসপিয়ারের ‘দ্য টেমপেস্ট’ আমার খুব পছন্দ। এই নাটকে প্রসপেরো চরিত্রটি জিন, ভূত…সব অপশক্তিতে শাসন করত। একপর্যায়ে জাহাজডুবি ও অন্যান্য ঘটনার পর, সে নিজের সব ক্ষমতাকে মুক্ত করে দিল। কেননা সে চূড়ান্ত লক্ষ্যের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এই যে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি—এ বিষয়টি আমার খুব অদ্ভুত লাগে।

আমাদের নাটক নিয়ে আপনার অভিমত?

যদিও আমরা নাটকের পরিধি কমিয়ে এনেছি, তবে আমাদের মঞ্চনাটকের অবস্থা খারাপ নয়। এখন যারা নতুন দল এসেছে, তারা ভালো করছে।

লেখালেখির চর্চা আপনি সব সময়ই করেছেন।

‘দ্বার রুদ্ধ’ ও ‘প্রজাপতি নিবন্ধে’র পর আসাদুজ্জামান নূরের সঙ্গে যৌথভাবে অনুবাদ করেছি ফেরেঙ্ক মলনারের নাটক ‘লিলিয়ম’। ১৯৭৯ সালে সেটি ‘ভেঁপুতে বেহাগ’ নামে ‘থিয়েটার’ সাময়িকীতে ছাপা হয়েছে। ১৯৯২ সালে আমার সম্পাদনায় প্রকাশ পেয়েছে নাট্যবিষয়ক নিবন্ধ গ্রন্থ ‘নাটক করতে হলে’। এ ছাড়া প্রবন্ধ ও সমালোচনামূলক গ্রন্থ ‘নাট্য প্রবন্ধ বিচিত্রা’, ‘পাদ প্রদীপের আলোয়’, ‘রবীন্দ্রনাথ, এই সময়ে’ প্রভৃতি বই লিখেছি। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন পত্রিকায় কলামও লিখছি। ২০১৬-এর বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে আমার কবিতার বই ‘মঞ্চসারথির কাব্যকথা’।

শিক্ষকতাও করেছেন।

খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়িয়েছি। থিয়েটার স্কুলে ক্লাস নিয়েছি ১৮ বছর। এ ছাড়া বাংলাদেশ গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট ও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেছি। এখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পরীক্ষকের দায়িত্ব পালন করছি। পড়াতে আমার ভালোই লাগে। তরুণদের নতুন নতুন ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়।

আপনার পরিবার?

ছয় ভাই দুই বোনের মধ্যে আমি সবার বড়। এরপর জাহিদুর রহমান, বিদেশে অবসর জীবন কাটাচ্ছে। ছাত্রজীবনে সে জগন্নাথ কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিল। এরপর একে একে খোরশেদ আরা (তানি), কানাডাপ্রবাসী কবি মেহরাব রহমান (সাজেদুর রহমান), অভিনেতা মুজিবুর রহমান দিলু, জোবায়েদা  আখতার, ফার্মাসিস্ট আবু নাইম সাইফুর রহমান এবং সাংবাদিক আবু নোমান মাহমুদুর রহমান। আমার স্ত্রী শাহিদা রহমান (নিনা) পর্যটন করপোরেশনে চাকরি করতেন। আমাদের মেয়ে নাট্যকর্মী শর্মিষ্ঠা রহমান ও ছেলে ইঞ্জিনিয়ার শাশ্বত রহমান।

অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।

অভিনয় ও নির্দেশনার জন্য অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছি। সব পুরস্কারই সমান আনন্দ ও উত্সাহ দেয়। তবে নিঃসন্দেহে একুশে পদকের মর্যাদা অনেক বেশি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিলেন।

আমার দুই ভাই দিলু ও মেহরাব ছিল মুক্তিযোদ্ধা। আমি তখন একটি বিদেশি কম্পানিতে চাকরি করতাম। অসুস্থ বাবা, এতগুলো ভাই-বোন রেখে যুদ্ধে যেতে পারিনি। ১৪ ডিসেম্বর ধানমণ্ডিতে অফিসের উদ্দেশে বের হয়ে দেখি রাস্তা সুনসান। কোথাও কেউ নেই। আচমকাই একটি জিপ সামনে পড়ল। একজন ক্যাপ্টেন বসা। পেছনে কয়েকজন কনস্টেবল। ক্যাপ্টেন বলল, ‘হু আর ইউ?’ আমি পরিচয় দিলাম। তখন যে কারফিউ চলছে, আমি বুঝিনি। ওরা আমাকে আচ্ছামতো পেটাল। মনে হলো মেরেই ফেলবে। আমি রাস্তার মধ্যে পড়ে গেলাম। তারপর তুলে নিয়ে যেতে থাকল। আমার পিঠাপিঠি ছোট ভাই জাহিদুর সেটি দেখতে পেয়ে সেন্ট্রাল রোডে, আমাদের বাসায় খবর দিল। বাসার সবাই ছুটে এলেন। বাবা উর্দু বলতে পারতেন। তিনি ক্যাপ্টেনের সঙ্গে তর্ক করলেন, মিনতিও করলেন। ক্যাপ্টেন কোনো কথা শুনতে নারাজ। আমার পরিবারের সবাই তখন দাঁড়িয়ে গেলেন জিপের সামনে। এরই মধ্যে মা জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় পড়ে গেলেন। তখন কী মনে করে ওরা আমাকে ছেড়ে দিল। পরে সেই ক্যাপ্টেন এসে আমাদের বাসায় বলেছিলেন, ‘আপনার ছেলেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিলাম, জানেন? ওকে আর কোনো দিনও খুঁজে পেতেন না!’

 

শ্রুত লিখন : মাসুদ রানা আশিক

(পুরানা পল্টন, ঢাকা; ২৭ মার্চ ২০১৯)

 

 

সূত্র: কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ