বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-সংকট ও সম্ভাবনা

একটি আশঙ্কাজনক তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে এ নিবন্ধের সূত্রপাত করছি। তথ্যটি হচ্ছে, বর্তমানে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য মাত্র ১২৭টি প্রেক্ষাগৃহ চালু রয়েছে।

১৯৫৬ সালের আগস্টে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলাদেশের প্রথম সবাক পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা কাহিনীচিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ থেকে শুরু করে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ফাগুন হাওয়ায়’ ও ‘রাত্রির যাত্রী’ পর্যন্ত ৬২ বছরেও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পকে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প-সংস্কৃতি-অর্থনীতি ও নান্দনিক ক্ষেত্রে আজও স্বনির্ভর হতে পারেনি। এর রয়েছে নানান কারণ। উল্লেখযোগ্য হলো : পুঁজির সংকট, সিনেমা হলের সংকট, গল্প বা বিষয়বস্তুর সংকট, সৃজনশীল ও রুচিশীল নির্মাতার সংকট, দেশপ্রেমের অভাব, বিভিন্ন প্রযুক্তিগত বিনোদনমাধ্যমের প্রাচুর্য ও সহজলভ্যতা (টিভি চ্যানেল, ক্যাবল টিভি, ইন্টারনেট, ইউটিউব, টুইটার, ফেসবুক, ডিভিডি, নিউ মিডিয়া), দর্শক মানসে অতিরিক্ত বিনোদনলিপ্সা ইত্যাদি। অথচ আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখব সেই ঔপনিবেশিক আমলেও (ব্রিটিশ ও পাকিস্তান) এ চলচ্চিত্র মাধ্যমটি এ দেশের দর্শকসমাজ আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছিল।

আমরা জানি, এ দেশে প্রথম চলচ্চিত্র দেখানো হয় সেই ১৮৯৮ সালে। তখন এটি ছিল ‘বিদেশি বিনোদনের পণ্য’। হৃদয়গ্রাহী ও আকর্ষণীয় মাধ্যম বিধায় দর্শক-সমাজ প্রযুক্তিনির্ভর চলচ্চিত্রের মধ্যে স্বপ্নের দেশকে খুঁজে পেয়েছিল। তখন এখানকার সিনেমা হলগুলোয় চলত আমেরিকা, ইউরোপ, মুম্বাই, কলকাতা ও মাদ্রাজের ছবি।

১৯৪৭-উত্তর স্বাধীন পাকিস্তানের পশ্চিম অংশে অর্থাৎ লাহোর-করাচিতে চলচ্চিত্র-শিল্প গড়ে উঠলেও পূর্ববাংলায় ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত চলচ্চিত্র নির্মাণের কোনো স্টুডিও ছিল না। আবদুল জব্বার খান উৎসাহী নাট্যকার-পরিচালক-অভিনেতা ছিলেন। তিনি অবাঙালি চিত্র ব্যবসায়ীদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে পূর্ব বাংলায় ফিল্ম স্টুডিও ছাড়াই ‘মুখ ও মুখোশ’ নির্মাণ করে বাংলা চলচ্চিত্রের অগ্রযাত্রায় স্বীয় অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। ১৯৫৭ সালে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক এফডিসি প্রতিষ্ঠার পর ’৫৯ সাল থেকে এখানকার সহায়তা নিয়ে নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্র মুক্তি পেতে থাকে। কিন্তু তখনো এখানকার নবীন চলচ্চিত্রকে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করতে হতো ইউরোপ, আমেরিকা, মুম্বাই, কলকাতা, মাদ্রাজ, লাহোর, করাচির তারকাবহুল বিনোদন ও জৌলুসপূর্ণ ছবির সঙ্গে। আমাদের নবীন চিত্রশিল্পের অগ্রযাত্রা পথে নির্মিত ‘মাটির পাহাড়’, ‘আকাশ আর মাটি’, ‘কখনো আসেনি’, ‘কাচের দেয়াল’, ‘যে নদী মরুপথে’ বাণিজ্যিকভাবে ব্যর্থ হলো। তখন প্রযোজক-নির্মাতারা অস্তিত্ব রক্ষার জন্য উর্দু ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। এহতেশামের ‘চান্দা’ (১৯৬২) এ ব্যাপারে পথ প্রদর্শন করে। তখন অর্থের মোহে পড়ে বাঙালি প্রযোজক-পরিচালক-শিল্পী-কুশলীরা উর্দু ভাষার ছবির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন। এমনকি আবদুল জব্বার খান, জহির রায়হানও উর্দু ভাষায় ছবি নির্মাণ করেন অস্তিত্ব রক্ষার জন্য।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটান সালাহউদ্দীন বাংলা ভাষায় লোকগাথাভিত্তিক ‘রূপবান’ (১৯৬৫) বানিয়ে। রূপবান ছায়াছবিটি সুপারহিট হলে লোকগাথা ছবির জোয়ার আসে। তবে ঢাকার চিত্রজগৎ আবার নতুন সংকটের সম্মুখীন হয়। চলচ্চিত্রের পর্দা ভরে ওঠে দৈত্যদানব-জিন-পরী নিয়ে। চিত্রজগৎ তখন অস্বিত্ব রক্ষার জন্য জনগণভিত্তিক রাজনীতি ও সমাজকল্যাণ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দেয়। দেশের গণতান্ত্রিক চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে প্রযোজক-নির্মাতারা নির্মাণ করেন কয়েকটি ছবি। যেমন খান আতার ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ (১৯৬৭), জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০), ফখরুল আনামের ‘জয় বাংলা’ (১৯৭০)। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, শুধু অর্থ নয়, ভালো জীবনধর্মী ছবিও জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এসব ছবি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। এসব চলচ্চিত্র ছিল অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নান্দনিক প্রচেষ্টা।

২.

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টায় দেশের চলচ্চিত্রশিল্প নতুন ভাবনা, প্রত্যাশা ও সুযোগ সৃষ্টি করে। চলচ্চিত্রের তখন অস্তিত্বের জন্য নতুন লড়াই করতে হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে। বিরাজমান বিনোদন বিষয়নির্ভর চলচ্চিত্রে যোগ হয় নতুন বিষয় মুক্তিযুদ্ধ। নির্মিত হয় ‘ওরা ১১ জন’, ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘ধীরে বহে মেঘনা’, ‘সংগ্রাম,’, ‘রক্তাক্ত বাংলা’। কিন্তু অচিরেই দেখা গেল নতুন সংকট : একশ্রেণির বেনিয়া প্রযোজক-নির্মাতা নকল, অশ্লীল ও মারপিট-সর্বস্ব চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতার হত্যা ও সামরিক শাসন আমলে চলচ্চিত্রের পর্দা থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্মারক নির্মূল করে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে দেশীয় জীবন-সমাজ-সংস্কৃতির উপাদানও হয় উপেক্ষিত। চলচ্চিত্র নতুন করে অস্তিত্বের সংকটে পড়ে। সেই সঙ্গে যোগ হয় ভিসিআর নামক নতুন প্রযুক্তি ও আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের প্রচেষ্টা চলে কিছু তরুণের স্বল্পদৈর্ঘ্য ও বিকল্পধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে। সরকারও উদ্যোগী হয়। অনুদানপ্রথা পুনরায় চালু হয়।

একুশ শতকের শুরুতেই চলচ্চিত্র প্রযুক্তিগত সংকটের সম্মুখীন হয় নানাভাবে। টিভি নেটওয়ার্কের বিস্তার, সিনেমা হলের বিলুপ্তি, পুঁজির অভাব, নতুন চিন্তা-চেতনা-সৃজনশীলতার অভাব, একশ্রেণির চিত্র ব্যবসায়ীর দেশপ্রেমহীনতা চলচ্চিত্রশিল্পের সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করে। প্রযুক্তির কল্যাণে যেমন মোবাইল-ফেসবুক-ইন্টারনেট-টিভিতে দেশি-বিদেশি চলচ্চিত্র দেখা যায়, প্রেক্ষাগৃহে যেতে হয় না, মোবাইল ফোনে নির্মিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিত্রও নির্মাণ সম্ভব হয়েছে। ফলে মূলধারার চলচ্চিত্রকে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে।

এ লড়াইয়ে টিকতে হলে সরকারি সহায়তায় নতুন ভাবনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আমরা আশাবাদী সরকারি অনুদান, পুরস্কার, ফিল্ম ইনস্টিটিউট ও আর্কাইভের প্রতিষ্ঠা-উন্নয়ন এবং তরুণ প্রজন্মের নির্মাতা-কুশলীদের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আবার জেগে উঠবে।

লেখক :অনুপম হায়াৎ.চলচ্চিত্র গবেষক।

 

 

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ