হারানো আত্মজীবনী ও বঙ্গবন্ধুর কাছে চিঠি

আপনি সুস্থ থেকে আরও বহুকাল বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির সেবা করুন-ঈশ্বরের কাছে এই প্রার্থনা। আপনার সঙ্গে আমার কখনো চাক্ষুষ পরিচয় হয়নি, কিন্তু সামান্য সাহিত্যসেবী হিসেবে হয়তো আমার নাম আপনার কাছে একেবারে অপরিচিত নাও হতে পারে-সেই ভরসাতেই এ শুভেচ্ছালিপি পাঠাতে সাহসী হয়েছি।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওইদিনই আমি উপসচিবের পদমর্যাদায় তাঁর সহকারী প্রেস সচিব নিযুক্ত হই। সহকারী প্রেস সচিবের যাবতীয় দায়িত্ব পালনের সঙ্গে আমার ওপর একটি বিশেষ দায়িত্ব অর্পিত হয়। তা হলো- বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর অনুলিখন। ১৫ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের সকালে (বর্তমানে ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ) বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, ‘তুমি সবসময় আমার সঙ্গে থাকবা। আমার আত্মজীবনী লেখবা। আমি যদি সময় দিবার না পারি, তাও জোর কইরা লেখাইবা।’ স্থির হলো, দুপুরে খাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু যখন বিশ্রাম করবেন, তখন আমি টেপরেকর্ডারে তাঁর আত্মকথন তুলে নেব। প্রেস সচিব আবদুল তোয়াব খান প্রায় ৩০০ পাতার একটি বাঁধানো খাতা দিলেন। ফুলস্কেপ সাইজে টাইপ করা বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর প্রাথমিক খসড়া। শুনলাম আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ও আবদুল তোয়াব খান এ কাজটা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর বাল্যকাল থেকে ১৯৫৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত আত্মজীবনী লেখা হয়ে গেছে। আমাকে পরবর্তী সময়ের জীবনী অংশ অনুলিখনের কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে আমার বই ‘বঙ্গভবনে পাঁচ বছর’-এ যা লেখা আছে তা কিছুটা তুলে ধরছি :

‘আত্মজীবনীর কাজটা আমার পছন্দ হলেও এ কাজ সহজসাধ্য নয়। নানা কারণে দুপুরবেলা তাঁর সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না। কয়েকদিন ডিকটেশন নেওয়ার পর তিনি বেঁকে বসলেন। বললেন, তোমার জন্য বিশ্রাম পর্যন্ত নিবার পারি না।

বললাম স্যার, আপনিই তো বলেছেন, জোর করে লেখাতে। আপনার বিশ্রামের সময় বিরক্ত করতে আমারও খারাপ লাগে। আপনি আমাকে অন্য কোনো সময় দেন।

আমার সময় কই?

কিন্তু এ কাজটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি বললাম, আইয়ুবের মার্শাল ল, আপনার ৬ দফা আন্দোলন, আগরতলা মামলা, ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানের জেলে আপনার বন্দী দিনগুলো- কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লেখার বাকি আছে। এসব কখন লেখা হবে?

লেখব, লেখব। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করলেন, “সব কাজ আমি গুছাইয়া আনছি। দেশের কাজ, ফ্যামিলির কাজ- সব শ্যাষ কইরা আনলাম। তোমার আত্মজীবনী লেখার কাজও পইড়া থাকব না।”

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নিহত হওয়ার পর তাঁর আত্মজীবনীর পাণ্ডুলিপিটি উদ্ধারই ছিল আমার ধ্যানজ্ঞান। ১৪ আগস্ট আমি আমার টেবিলের ড্রয়ারে সেটা তালাবদ্ধ করে রেখে আসি। ভেবেছিলাম পরদিন অফিসে গিয়ে সেটা নিয়ে কাজ করব। পাণ্ডুলিপি কেন যে আমি অফিসে রেখে এসেছিলাম, এ কথা ভেবে মনের কষ্ট বাড়তে থাকল। ফলে সেটি উদ্ধারের জন্য জীবন বাজি রেখে ১৭ আগস্ট গণভবনে যাই। সেখানে আর্মির এক মেজর ও অন্যদের দৃষ্টির সামনে ড্রয়ার থেকে পাণ্ডুলিপিটি বের না করার সিদ্ধান্ত নেই। কারণ পাণ্ডলিপি দেখলে তারা সেটি নষ্ট করার আশঙ্কা ছিল। আমারও জীবন সংশয় হতে পারত। পরবর্তীকালে বিভিন্ন স্থানে পাণ্ডুলিপির খোঁজ করেছি। দেশ ও জাতির জন্য এটা যে কত বড় সম্পদ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পাণ্ডুলিপিটি উদ্ধারের জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত সফলকাম হইনি।

১৪ বছর পরে ১৯৮৯ সালে আমি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে কর্মরত অবস্থায় খবর পেলাম প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নতুন গণভবন পরিদর্শনে এসে সেখানকার যাবতীয় নথি ও বইপত্র পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। নতুন গণভবনের দুটি কক্ষে বঙ্গবন্ধুর সচিবালয়ের সব নথিপত্র তাঁর হত্যার পর রাখা হয়েছিল। সহসা মনে হলো, বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীটি যদি ঐসব নথিপত্রের মধ্যে পাওয়া যায়! গণভবনে উপস্থিত হয়ে দেখলাম একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে চেয়ারম্যান করে নথিপত্র পোড়ানোর কমিটি করা হয়েছে। আমার একটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি ১৪ আগস্টে অফিসে ছিল বলাতে তারা আমাকে তা খুঁজতে দিতে রাজি হন এবং এ কথাও বলেন যে, এখানকার কোনো কাগজপত্র বাইরে নেওয়া যাবে না, সব পোড়ানো হবে বলে প্রেসিডেন্ট এরশাদ নির্দেশ দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট কেন এমন নির্দেশ দিলেন তা আমার কাছে রহস্যাবৃত। তবে নথিপত্র পোড়ানোর কমিটি দুপুরে লাঞ্চের বিরতিতে গেলে আমি কিছু গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র কাউকে না বলে তুলে নিয়ে আসি। এসব নথিপত্র মূলত বঙ্গবন্ধুর জীবনী লেখার উপাদান ও জাদুঘরে সংরক্ষণযোগ্য। তবে দুঃখের বিষয়, সেদিন এবং পরবর্তীকালে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করতে পারিনি। আমি সেদিন নতুন গণভবন থেকে যেসব কাগজপত্র তুলে এনেছিলাম তার মধ্যে একটি চিঠিপত্রের বান্ডিল ছিল। এসব চিঠিপত্র বঙ্গবন্ধুর কাছে লেখা বলে আমার কাছে তা তখন তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। পরে চিঠিগুলো পড়তে গিয়ে তাতে বেশ কিছু বিশিষ্টজনের চিঠি দেখতে পাই। এদের মধ্যে সাহিত্যিক মনোজ বসু ও সাহিত্যিক গজেন্দ্র কুমার মিত্র উল্লেখযোগ্য। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে চিঠি দুটি প্রকাশ করছি। উল্লেখ্য, গজেন্দ্র কুমার মিত্রের চিঠি বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে প্রেরিত।

মনোজ বসুর চিঠিখানি নিম্নরূপ :

১০, মার্চ, ১৯৭৫

পরমপ্রিয় বঙ্গবন্ধু,

অনন্য চরিত্র আপনি-ঐতিহাসিক পুরুষ। ১৯ ফেব্রুয়ারি আপনার কাছে বলে ছবি তোলা হল। ফনী মজুমদার মশায়ও ছিলেন। আপনি নির্দেশ দিলেন, ফোটোর কপি (আপনার অটোগ্রাফসহ) ফনী-দা’র কাছে পৌঁছে দেবার জন্য। তাহলে আমি পেতে পারব। ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ছেড়েছি। তার পূর্বক্ষণ অবধি ফনী দা’কে এবং আপনার একান্ত সচিব মসিউর রহমান সাহেবকে ফোন করেছি। পৌঁছে দেবেন, তাঁরাও ভরসা দিলেন। কলকাতায় এসেও বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে ঐ দু-জনকে চিঠি পাঠিয়েছি।

দেশের সমগ্র দায়িত্ব আপনি একক স্কন্ধে তুলে নিয়েছেন, তবু কিন্তু নগণ্য জিনিসটাও আপনি ভোলেন না। আপনা অবধি তাই দরবার নিয়ে হাজির। ১৯ ফেব্রুয়ারি আপনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, আজও তা কার্যকর হয়নি। ফোটোগ্রাফ বাংলাদেশ মিশনে পাঠালেই আমি পেয়ে যাব।

‘দ্বিতীয়-বিপ্লব’ বিজয়ী হোক, মহানায়ক আপনি সুদীর্ঘজীবী হন।

মনোজ বসু

এবার গজেন্দ্র কুমার মিত্রের চিঠি উদ্ধৃত করছি :

গজেন্দ্র কুমার মিত্র

পি ২১, বেনী ব্যানার্জী এভিনিউ

কলিকাতা-৩১

১৭.৩.৭৫

জনাব মুজিবর রহমান

অশেষগুণালয়েষু

সবিনয় নিবেদন,

আপনার শুভ আবির্ভাব দিবসে আন্তরিক প্রীতি, শুভেচ্ছা নিবেদন ক’রে আপনার কীর্তি-উজ্জ্বল দীর্ঘায়ু কামনা করছি। আপনি সুস্থ থেকে আরও বহুকাল বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা ও বাঙ্গালী জাতির সেবা করুন-ঈশ্বরের কাছে এই প্রার্থনা।

আপনার সঙ্গে আমার কখনও চাক্ষুষ পরিচয় হয়নি, কিন্তু সামান্য সাহিত্যসেবী হিসাবে হয়ত আমার নাম আপনার কাছে একেবারে অপরিচিত নাও হতে পারে-সেই ভরসাতেই এ শুভেচ্ছালিপি পাঠাতে সাহসী হয়েছি।

কয়েক কোটি বাংলা ভাষাভাষীর মুক্তির জন্য আপনি যা করেছেন, দুঃখ কষ্ট মৃত্যুভয় উপেক্ষা ক’রে যে অসম সাহস দেখিয়েছেন- এখনও দুর্ভাগ্য ও দুর্বুদ্ধির পঙ্ককুণ্ড থেকে তাদের টেনে তোলার জন্য যে অক্লান্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন-তার জন্য সমগ্র বঙ্গ ভাষাভাষী সমাজ আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ।

আমার নমস্কার, আন্তরিক প্রীতি ও অভিনন্দন গ্রহণ করুন।

বিনত

গজেন্দ্র কুমার মিত্র

লেখক :মাহবুব তালুকদার,নির্বাচন কমিশনার।

 

 

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ