প্রকৃতির কোল ঘেঁষে থাকা কবি

আজ ১৪ মার্চ। ১৯৭৬ সালের এই দিনে পল্লিকবি জসীম উদ্দীনের জীবনাবসান হয়। তার লেখনীতে পল্লী, প্রকৃতি ও পরিবেশ, সন্তান ও মাতা-পিতার সম্পর্ক, দারিদ্র্যক্লিষ্ট জননীর অসহায়ত্ব, মানুষের আশা-নিরাশার স্বপ্ন, বিরহ-বেদনা এবং মুক্তিযুদ্ধের অমোঘ চিত্র রূপায়িত হয়েছে।

এ কারণেই সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা অকৃত্রিম। ব্যক্তিস্বার্থে একজন অন্যজনকে স্নেহ, শ্রদ্ধা দেখাতে পারে, স্বার্থ উদ্ধারের পর সেই তা ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু মায়ের ভালোবাসা চিরন্তন। জসীম উদ্দীন তার ‘পল্লী জননী’ কবিতায় লিখেছেন- ‘পারে যদি বুকে যত স্নেহ আছে ঢেলে তারি সাথ।’

একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের সময় শেখ মুজিবকে নিয়ে জসীম উদ্দীন ‘বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক কবিতা রচনা করেন। বঙ্গবন্ধুকে বিসুভিয়াসের উত্তপ্ত লাভার সঙ্গে তুলনা করে লিখেছেন- ‘মুজিবুর রহমান/ওই নাম যেন বিসুভিয়াসের অগ্নি উগারী বান।’

মুক্তিযুদ্ধের আগে পূর্ব বাংলার কবিতায় ছিল বুর্জোয়া মানবতাবাদী এবং মার্কসবাদী ধারা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের অবরুদ্ধ নয় মাস বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিশীল কবিরা স্বদেশের মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে তাদের চেতনাকে শাণিত করেন।

বাঙালি কবির কাছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পরিচয় স্পষ্ট ছিল মুক্তিযুদ্ধের নামে- যে যুদ্ধ মুক্তি দেবে, স্বাধীনতার দীর্ঘ পোষিত ইচ্ছাকে বাস্তবতা দেবে।

গ্রামবাংলার সবুজ প্রকৃতি মানুষের সুখের স্বপ্নকে প্রতিনিয়ত ছায়া দান করছে। কিন্তু একাত্তরে পশ্চিমা নরঘাতকরা সুখ-স্বপ্নের বাগানে আগুন দিয়েছে, পুড়িয়ে দিয়েছে অবারিত প্রান্তর। পল্লীকবি জসীম উদ্দীন পাকিস্তানের ধ্বংস ও গণহত্যার কার্যকলাপকে বাঙময় করেছেন তার মুক্তিযোদ্ধা (১৯৭১), গীতারা চলিয়া যাবে (১৯৭১), গীতারা কোথায় যাবে (১৯৭১), গীতারা কোথায় গেল, দগ্ধ গ্রাম (১৯৭০) ইত্যাদি কবিতায়। শুধু মৃত্যুর বিভীষিকা নয়, মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ নারীর লাঞ্ছনা। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস পাকিস্তানি পশুরা অগণিত নারীকে লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত করেছে।

অবুঝ শিশুকেও ছাড় দেয়নি। কবি হায়েনাদের নির্মমতা প্রত্যক্ষ করার জন্য বিশ্ব বিবেককে আহ্বান করেছেন। ‘গীতারা কোথায় গেল’ কবিতায় তিনি লিখেছেন- ‘সেই কচি মেয়ে কোলে তুলে নিতে কোল যে জুড়িয়ে যেত/ কে মারিল তারে? মানুষ কি পারে নিষ্ঠুর হতে এত।’

তার কাব্যোপন্যাস ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ বিশ্বসাহিত্যে বিশিষ্ট স্থান দখল করেছে। এ কবিতায় মুসলমান চাষীর ছেলে সোজন নমুর মেয়ে দুলীর অপূর্ব প্রেমকাহিনীর পাশাপাশি সামন্ত যুগের জমিদারি প্রথার নিষ্ঠুরতার কথা বর্ণিত হয়েছে।

‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন গ্রামবাংলার সমাজ-সংস্কৃতির রূপ। পূর্ব বাংলার মানুষ তখন বিভেদ ভুলে সম্প্রীতিতে বসবাস করত। পল্লীকবির সচেতন লেখনীতেও তা উঠে এসেছে।

চেক কবি, ভাষাবিদ প্রফেসর ড. দুশন জ্বভিতেল কবি সম্পর্কে বলেছেন-‘জসীম উদ্দীনের বই যখনই পড়ি তখনই তাতে নতুন নতুন সৌন্দর্য আবিষ্কার করি।’ তিনি গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখ বুঝতে পারেন, তাদের আনন্দ-বেদনায় মুখরিত করতে জানেন। তাই পল্লীকবির রচনা বাঙালি জীবনমানসে অমর হয়ে থাকবে।

বলাই চন্দ্র দত্ত : শিক্ষক ও গবেষক

 

 

 

সূত্র: যুগান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ