বাংলাদেশের নৌকা

বাংলার ভূমিরূপ এ অঞ্চলকে যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তার সঙ্গে নদীপথ ও নৌকার সম্পর্ক সংস্কৃতির একেবারে উন্মেষ পর্ব থেকে। প্রাচীন কাল থেকে পর্যবেক্ষণ করতে গেলে দৃষ্টিগোচরে আসে বাংলার ভূগোল উত্তর ভারতের সঙ্গে সম্পৃক্তির বদলে তার চেয়ে ঢের বেশি দক্ষিণ-পূর্বাভিমুখী হয়েছে। তাই মূলত ভৌগোলিক বাধার কারণেই এ দেশের মানুষকে বাণিজ্য ও যাতায়াতের জন্য স্থলপথের তুলনায় নৌপথের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়েছে। মহাস্থানগড় থেকে শুরু করে উয়ারী বটেশ্বর, পাহাড়পুর, ময়নামতি, ভরত ভায়না, কোটালিপাড়া কিংবা পরবর্তীকালে হযরত জালাল সোনারগাঁ, খলিফাতাবাদ, বারোবাজার প্রভৃতি জনপদ গড়ে ওঠার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এ দেশে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নদ-নদীগুলোই।

স্বাধীন সুলতানি বাংলার বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত টাঁকশাল নগরীগুলো কোথায় গড়ে উঠেছিল এবং তার অবস্থানগত গুরুত্ব কেমন ছিল। এক্ষেত্রে সোনারগাঁ, সাতগাঁও, লখনৌতি, বঙ্গ, গিয়াসপুর, ফিরুজাবাদ, মুয়াজ্জমাবাদ, শহর-ই নও, ফতোয়াবাদ, রোটাসপুর, জান্নাতাবাদ, মাহমুদাবাদ কিংবা বারবকাবাদের মতো নগরগুলোর প্রত্যেকটিরই বিকাশ নদীতীরে। তখন যাতায়াতের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বাহন হিসেবে নৌকার গুরুত্ব নিয়ে তাই আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্তত ভৌগোলিক পরিবেশের প্রভাবেই নৌকা হয়ে উঠেছে বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য অনুসঙ্গ। সমৃদ্ধ নগর বিকাশ থেকে শুরু করে মানুষের দিনানুদৈনিক প্রয়োজন প্রতিক্ষেত্রে নৌকার গুরুত্ব নিয়ে তাই নতুন করে বলার অবকাশ নেই।

প্রাচীন ভারতীয় নানা তথ্যসূত্র, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ও বিদেশী বিবরণে যে সমৃদ্ধ নৌ-বাণিজ্যের তথ্য পাওয়া যায়, তা থেকে ধরে নেয়া যেতেই পারে, এ দেশের প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাণিজ্য যোগাযোগ ছিল দ্বিমুখী। তখন বিদেশ থেকে এ অঞ্চলের বন্দরগুলোয় যেমন নানা ধরনের নৌকার আগমন ঘটত, তেমনি এ অঞ্চলের বাণিজ্য নৌকাগুলো বিশ্বের নানা দেশে গমনও করেছে। প্রাচীন বাংলার চন্দ্রকেতুগড়, তাম্রলিপ্তি, উয়ারী বটেশ্বর প্রভৃতি প্রত্নস্থান থেকে এ ধরনের বাণিজ্যের প্রমাণ মিলেছে। যদিও খ্রিস্টীয় সাত শতক থেকে শুরু করে ১২ শতকের বাংলায় ব্যবসা-বাণিজ্য সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায়নি। তবে মনে করা হয়, তখন এ অঞ্চলে মুদ্রার প্রচলন কমে গিয়ে নৌ-বাণিজ্যে ভাটা পড়েছিল। তবে উয়ারী বটেশ্বর থেকে প্রাপ্ত ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রায় ছাপ হিসেবে দেখা মিলেছে বিশেষ ধরনের নৌকার। যাই হোক, বিশিষ্ট গবেষক মমতাজুর রহমান তরফদার তাঁর ‘বাংলার সামুদ্রিক বাণিজ্য ও যুগ বিভাগ সমস্যা’ শীর্ষক নিবন্ধে এ ধরনের নানা বিষয় নিয়ে উপযুক্ত বিশ্লেষণ করে গেছেন। তাঁর হিসাবে প্রাচীন যুগের নৌ-বাণিজ্য পরবর্তীকালে মুসলিম আমলে এসে পূর্ণতা পায়, যা এ দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পেরেছিল। এর প্রভাবেই ১৪-১৫ শতকে সাতগাঁও, সোনারগাঁ ও চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর বা সামুদ্রিক বন্দর গড়ে উঠে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তঃ ও বহির্বাণিজ্যকে ত্বরান্বিত করেছিল বলে তিনি মনে করেন।

সাত শতকের দিকে এ দেশে আসা চৈনিক পরিব্রাজক ইতসিংয়ের বর্ণনা অনুযায়ী আবদুল মমিন চৌধুরী তাঁর ‘প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি’ শীর্ষক গ্রন্থে লিখে গেছেন, ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে একটি নৌপথ কেদাহ (বর্তমান মালয়েশিয়ার পেনাং) থেকে বঙ্গোপসাগরের দিকে সোজা নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত প্রসারিত ছিল, যার একটি পথ উত্তর-পশ্চিমাভিমুখে অগ্রসর হতো তাম্রলিপ্তি পর্যন্ত। তখন তাম্রলিপ্তি বন্দর থেকে তিনটি সমুদ্রপথে নৌ-বাণিজ্য পরিচালিত হতো। এর একটি দক্ষিণ-পশ্চিমাভিমুখে কলিঙ্গ করমণ্ডল উপকূল ধরে শ্রীলংকা পার হয়ে পাশ্চাত্যের দিকে ধাবিত হয়েছিল। অন্যদিকে বাকি দুটি পথ ছিল প্রাচ্যাভিমুখী। সেখানে বঙ্গোপসাগরের পূর্ব উপকূল ধরে মালয় প্রণালির মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মূল ভূখণ্ড তথা সুদূর চীন পর্যন্ত বিস্তৃতি থাকার তথ্য মিলেছে। এ ধরনের নৌপথে বাণিজ্য বিকাশের জন্য একমাত্র জলযান হিসেবে বড় বড় নৌকার কথা উল্লেখ করেছেন প্রায় সব গবেষক। তবে অরুণ দাশগুপ্ত তাঁর ‘প্রাক-ইউরোপীয় যুগে বাংলার সামুদ্রিক বাণিজ্যের বৈশিষ্ট্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে উড়িশ্যা, মালদ্বীপ ও কালিকট থেকে কুইলন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পাশাপাশি আফ্রিকার উপকূল পর্যন্ত বাংলার বাণিজ্য বিস্তারের কথা উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে মোঙ্গল আক্রমণ ও ক্রুসেড-পরবর্তীকালে এশিয়া-ইউরোপের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যে পরিবর্তন এসেছিল, তার প্রভাব পড়ে বাংলার বাণিজ্যেও। খান সাহেব আবিদ আলী খান তাঁর গৌড় ও পাণ্ডুয়ার স্মৃতিতে লিখেছেন, জনবহুল পাণ্ডুয়া নগরের পতনের পর দেশের সব অঞ্চলের সঙ্গে নৌপথে যোগাযোগ রক্ষার সুবিধার জন্যই সম্ভবত গৌড়কে নতুন রাজধানীর জন্য বেছে নেয়া হয়েছিল। পরে একডালায় রাজধানী স্থানান্তর করা হলে গৌড় ও পাণ্ডুয়ার গুরুত্ব হ্রাস পায়নি এর অবস্থানের কারণে। তখন গঙ্গা নদী গৌড়ের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সেখান দিয়ে বড় বড় নৌকা নানা পণ্যদ্রব্য নিয়ে দূরবর্তী বিভিন্ন স্থান থেকে এ অঞ্চলে আসত। এ অঞ্চলের পূর্ব দিকে দ্বারবাসিনী ফটক ও ফুলওয়ারি ফটকের মধ্যে একটি বাঁধ তৈরি করে স্থানটিকে সুরক্ষিত করা হয়েছিল। তখন যেসব স্থানে নৌকা থেকে পণ্য নামানো হতো, প্রত্নতাত্ত্বিকরা তা চিহ্নিত করতে পেরেছেন।

রঙ্গনকান্তি জানা তার ‘নিম্নবঙ্গের জলযান নির্মাণশিল্পের ধারা’ নিবন্ধে নৌ-শিল্প তথা নদীগামী নৌকা নির্মাণের ক্ষেত্রে বাংলার বিশেষ দক্ষতার কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলোর সমর্থন মিলেছে প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন লিপি ও সংস্কৃত সাহিত্যে। তবে পাণ্ডুরাজার ঢিবি থেকে পোড়ামাটির নৌকা আবিষ্কার কিংবা উয়ারী বটেশ্বরে প্রাপ্ত ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রায় কয়েক শ্রেণীর নৌকার চিত্র প্রাপ্তি তার বর্ণনাকে আরো যুক্তিযুক্ত করেছে। অন্যদিকে চন্দ্রকেতুগড় থেকে পাওয়া বেশকিছু পোড়ামাটির সিলে নৌকার ছাপ রয়েছে। এসব পোড়ামাটির সিলে যে লিপি রয়েছে, তার পাঠোদ্ধারে দুই ধরনের নৌকার নাম মিলেছে। এর একটি ত্রপ্য বা ত্রপ্যক, অন্যটি জলধিসক্ল তথা জলধিশত্রু নামের নৌকা। খ্রিস্টীয় এক শতকে পেরিপ্লাসের বিবরণেও ‘ত্রপ্পগ’ নামের নৌকার উল্লেখ পাওয়া যায়। অন্যদিকে চন্দ্রকেতুগড় থেকে আবিষ্কৃত বেশকিছু তামা ও মিশ্র ধাতুর মুদ্রায়ও নৌকার ছাপ পাওয়া গেছে। তবে অশোক দত্ত তাঁর ‘Black and Red Ware Culyure in West Bengal’ শীর্ষক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, পাণ্ডুরাজার ঢিবি থেকে পাওয়া পোড়ামাটির নৌকার অনুকৃতিটি পূর্ব ভারতে সবচেয়ে প্রাচীন নৌকার প্রতিনিধিত্ব করছে। ডিঙ্গি-ডিঙ্গা-ডোঙ্গা প্রত্যেকটি শব্দই অস্ট্রিক ভাষার। এ থেকে ধরে নেয়া যায়, আদিকাল থেকে নানা ধরনের নৌকার সঙ্গে বাঙালির পরিচয় ছিল। অন্যদিকে চর্যাপদের নানা ত্রোস্তে রূপক হিসেবে নৌকা, নৌকার হাল, গুণ প্রভৃতির কথা তুলে ধরতে দেখা গেছে। নীহাররঞ্জন রায় তাঁর সুবিখ্যাত ‘বাঙালির ইতিহাস’ গ্রন্থে নানা ক্ষেত্রে নৌকার গুরুত্ব তুলে ধরতে এ অংশের কথা বাদ রাখেননি। অন্যদিকে খ্রিস্টীয় সাত শতকের দিকে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় রাত রাজাদের শাসন প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল পালদের সমান্তরালে। রাত রাজা শ্রীধারণ রাতের কৈলান তাম্রশাসন থেকে কুমিল্লার ময়নামতি অঞ্চলে প্রাচীন জনপদ বিকাশের বিস্তৃত তথ্য পাওয়া যায়। এ তাম্রশাসনে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে ওই সময় এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নৌকার ব্যাপক প্রভাব ছিল বলে জানা সম্ভব হয়েছে।

এদিকে খ্রিস্টীয় ১৫-১৭ শতকের মধ্যে রচিত বেশকিছু মঙ্গলকাব্যে বিভিন্ন নৌকার নাম, নির্মাণ পদ্ধতি ও কাঠের ব্যবহার নিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের নৌকার রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কেও বিস্তৃত বর্ণনা রয়েছে এসব মঙ্গলকাব্যে। মনসামঙ্গল কাব্যে চাঁদ সওদাগর ও চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে ধনপতি ও শ্রীমন্তের জলপথে বাণিজ্য যাত্রার যে কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন নৌকার নাম। বিশেষ করে মনসামঙ্গল কিংবা চণ্ডীমঙ্গলে নদী ও সমুদ্রপথে চলার উপযোগী দাঁড় টানা পণ্যবাহী নৌকা তথা ডিঙ্গার কথা বলা হয়েছে অনেকবার। ১৭ শতকের কবি মুকুন্দরাম তাঁর চণ্ডীমঙ্গলে সপ্তগ্রামে বাণিজ্য করতে আসা বণিকদের তালিকায় এক ধরনের জলযান ‘জঙ্গ’-এর কথা বলেছেন, যা আদতে বিশেষ ধরনের নৌকা। এ ‘জঙ্গ’ বলতে খুব সম্ভব চীনা নৌকা ‘জঙ্ক’ সম্পর্কে বলা হয়েছে। চীন থেকে এসব নৌকা মধ্যযুগে বাংলার বিভিন্ন বন্দরে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যাতায়াত করত বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা সম্ভব হয়েছে। সম্প্রতি আমাদের বাংলাদেশের জামালপুর কিংবা ময়মনসিংহে ভারী পণ্য পরিবহনে ‘ঝঙ্গ’ নামে যে নৌকার ব্যবহার দেখা যায়, জাতিতাত্ত্বিক সূত্র হিসেবে তার সঙ্গে এর তুলনা করা যেতেই পারে।

বাংলাদেশের পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের লোককবিদের বিভিন্ন কবিতায় চৌদ্দডিঙ্গা ও সপ্তডিঙ্গার উল্লেখ দেখা যায়। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত বিশেষ সংগীতানুষ্ঠানের নামও ছিল সপ্তডিঙ্গা। অন্যদিকে ১৫ শতকের বাঙালি কবি বিপ্রদাশ

পিপীলাইয়ের বর্ণনায় বিভিন্ন ধরনের নৌকার নাম উল্লেখ রয়েছে। সেখানে নরেশ্বর, সর্বজয়া, জগদ্দল, সুমঙ্গল, নবরত্ন, চিত্ররেখা, শশীমুখী প্রভৃতি নৌকার নাম পাওয়া যায়। একইভাবে চণ্ডীমঙ্গলের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর বর্ণনায় ধনপতির বাণিজ্য নৌবহরে মধুকর, দুর্গাবর, গুয়ারেখী, শঙ্খচূড়, মধুপাল কিংবা ছোটমুঠির মতো নৌকার নাম পাওয়া যায়। এখানে শ্রীমন্তের বাণিজ্যবহরে যথাক্রমে মধুকর, সিংহমুখী, গুয়ারেখী, রণজয়া, রণভীমা, সর্বধারা, হীরামুনী, চন্দ্রতারা ও নাটশালার নাম রয়েছে। কবি মুকুন্দরাম তাঁর কাব্যে নৌকা নির্মাণের মূল উপকরণ হিসেবে কাঁঠাল, পিয়াল, তাল, শাল, গাম্ভরি, তমাল, ডহু প্রভৃতি কাঠের কথা বলেছেন। অন্যদিকে চীনা রাষ্ট্রদূত মাহুয়ান এ দেশের নৌবন্দরগুলোয় নানা ধরনের নৌকা নোঙর করে রাখতে দেখেছেন। পাশাপাশি সমুদ্রগামী অনেক নৌকার নির্মাণকাজ তিনি দেখেছেন নানা সমুদ্রবন্দরে। তার বর্ণনা থেকে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম ছিল এসব নৌকা নির্মাণের কেন্দ্রস্থল।

১৫৮৬ সালে বাংলায় আসেন বিখ্যাত পর্যটক রালফ ফিচ। তিনি ‘পেরিকোস’ নামে বড় বড় নৌকার কথা তুলে ধরেছেন তাঁর বিবরণীতে। তার বর্ণিত এসব নৌকায় ২৪ থেকে ২৬টি দাঁড় থাকার কথা জানা যায়। অন্যদিকে ফ্রেডারিখের মতে, আলেকজান্দ্রিয়ায় নির্মিত জেটির চেয়ে বহির্বিশ্বে চট্টগ্রামে নির্মিত জাহাজের কদর বেশি ছিল। তাঁর বর্ণনা থেকে জানা যায়, এ দেশীয় ব্যবসায়ীরা ছোট নৌকায় করে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অস্থায়ী হাট থেকে নৌকা তথা জাহাজ তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ করতেন। ফলে জাহাজ তৈরির পাশাপাশি নৌকা নির্মাণের কাজও বেশ বিকাশ লাভ করেছিল এ সময়টাতে। তিনি বজরা ও পতউস তথা পতেলা নামের নৌকার কথা উল্লেখ করেছেন। এ বিশেষ ধরনের দাঁড়বাহী নৌকা এ অঞ্চলে বাণিজ্য বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে উল্লেখ করেছেন অনেক ইতিহাসবিদ।

টপোনিম তথা স্থাননাম এক অর্থে ইতিহাসের পদচিহ্ন বহন করে। বর্তমান বাংলাদেশের নানা স্থানের নাম এখনো অতীতের স্মৃতিচিহ্ন ধারণ করে আছে। বিশেষত বর্তমান বাংলাদেশের নানা অঞ্চলে নৌকা চলাচলের প্রামাণ্য উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে বিভিন্ন প্রত্নস্থানের নাম। যেমন মহাস্থানগড় জাহাজঘাটা, পাহাড়পুর জাহাজঘাটা, বারোবাজার, বাগেরহাটে খান জাহানের বসতবাড়ি-সংলগ্ন জাহাজঘাটা কিংবা নারায়ণগঞ্জের একটি এলাকার নামেই সরাসরি বন্দর হয়ে ওঠার কথা বলা যায়। এ ধরনের নামে পরিচিত কয়েকটি স্থান থেকে লোহার তৈরি নোঙরের পাশাপাশি নৌকার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার এ অঞ্চলে নৌকা চলাচলের তথ্য প্রমাণ করে।

এদিকে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে একটি হাতির দাঁতে তৈরি নৌকা দেখা যায়, যেটির নির্মাণকাল ১৯ শতক বলে মনে করছেন প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকরা। বিশেষত আইভরির মতো উপকরণে ঠিক এমন কোনো জিনিসেরই রেপ্লিকা তৈরি হওয়ার কথা, যার গুরুত্ব অনেক। অন্তত তখনকার দিনের পূর্ববঙ্গ ছিল মোগল সাম্রাজ্যের দূরতম প্রদেশ। আর সেখানে নদ-নদী পরিবেষ্টিত হওয়ার প্রাকৃতিক বৈরিতা স্থানীয় শাসক ও ভূস্বামীদের অপেক্ষাকৃত স্বাধীনভাবে এ অঞ্চল শাসনের সুযোগ করে দেয়। প্রতিষ্ঠিত মোগল শক্তিকে বিভিন্ন সময় স্থানীয় শাসকরা সামরিকভাবে পর্যুদস্ত করেছে শুধু নৌ-শক্তিতে দক্ষতার মাধ্যমেই। বাংলার এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে মোগলরা বাংলা সুরক্ষিত করতে এ অঞ্চলে এক শক্তিশালী নৌবহর গড়ে তুলেছিল। অন্তত শক্তিশালী নৌবহর গড়ে তোলার আগে মোগলদের পক্ষে বাংলার এ অঞ্চল অধিকার করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে মোগলরা বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোথাও নৌবহরের ওপর এতটা গুরুত্বারোপ করেনি। আমরা আবুল ফজলের বিখ্যাত ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থেও উল্লেখ করতে দেখি, ঢাকা ছিল নৌবহরের সদর ঘাঁটি। এখানে বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধ করার কাজে ব্যবহূত নৌকা নোঙর করা থাকত নিঃসন্দেহে। পাশাপাশি ‘মীর-ই-বহর’ নামের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার অধীনে ‘মীরবহরী’ নামে নৌ-দপ্তরও প্রতিষ্ঠা পায় মোগল আমলে। বিভিন্ন ধরনের নৌকায় সজ্জিত নৌবহরকে তখন বলা হতো ‘নওয়ারা’। এ সময় মোগল মীর বহরীর চারটি প্রধান শাখা ছিল; যারা জাহাজ তৈরি, সংগ্রহ ও সেগুলোর পরিচালনায় দক্ষ নাবিক, কারিগর ও পরিচালক নিয়োগের কাজ করত। এদিকে নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও নৌ-চলাচল সম্পর্কিত মাশুল ও কর আদায়ের দায়িত্বও বর্তেছিল তাদের ওপর।

বিভিন্ন সূত্র থেকে মোগল নৌবহরে ব্যবহূত নানা ধরনের নৌকা ও যুদ্ধজাহাজের নাম জানা গেছে। অন্তত ‘সলব’, ‘ঘ্রাব’, ‘জলবা’, ‘কোষা’, ‘খালু, ‘ধুম’, ‘জংগি’, ‘বালাম’, ‘পারেন্দা’, ‘বজরা’, ‘বাছারী’, ‘পাতেলা’, ‘পাতিল’, ‘বহর’, ‘রথগিরি’, ‘মহালগিরি’, ‘পাসওয়ার’, ‘খেলনা’ (অর্দ্ধ-কোষা), ‘কুন্দা’, ‘কাটারি’, ‘মানিকী’ প্রভৃতি বাংলার নৌকা শিল্পের অভূতপূর্ব উন্নয়নের চিহ্ন বহন করে। এদিকে পর্তুগিজ পর্যটক সেবাস্টিন মানরিক বাংলা ভ্রমণ শেষে বেশকিছু নৌকার নাম ও তাদের গাঠনিক বিবরণ দিয়ে গেছেন। সেবাস্টিন মানরিক উল্লিখিত এসব বিশেষ নৌকার মধ্যে রণতরী থেকে শুরু করে বাণিজ্যতরী সবই ছিল। এর বাইরে বিভিন্ন ধরনের নিত্যব্যবহারোপযোগী বাহনও ছিল তার বর্ণনায়। কোষা নামের হালকা যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি তিনি পোর্ক নামের বিশেষ দাঁড়বাহিত নৌকার কথাও তুলে ধরেছেন এখানে। এদিকে পতেলা নামে চ্যাপ্টা তলবিশিষ্ট এ ধরনের নৌকার কথাও পাওয়া যায় তার বর্ণনায়। ১৮ জোড়া দাঁড়ে চলা অপেক্ষাকৃত হালকা ধরনের নৌকা জেলিয়ার ব্যবহার ছিল যুদ্ধ ও বাণিজ্য উভয় ক্ষেত্রেই। সব মিলিয়ে নদীমাতৃক বাংলাদেশে যাতায়াত ও পরিবহনের পাশাপাশি যুদ্ধযাত্রার ক্ষেত্রেও নৌকার ভূমিকা ছিল বেশ। অন্য বিশেষ কোনো কারণ নয়, বরং এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও নদীকেন্দ্রিক মানববসতিই নৌকাকে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম অনুসঙ্গে পরিণত করেছে।

লেখক: মো. আদনান আরিফ সালিম, প্রত্নতত্ত্ব গবেষক ও অনুবাদক

 

 

 

সূত্র: বণিক র্বাতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ