বাংলার বারো গান

হাজার বছরের ঐতিহ্য ধারণকারী বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সমৃদ্ধ শাখা লোকসংগীত। ঐতিহাসিক কাল থেকেই বাঙালি সংগীতপ্রিয় জাতি। বাস্তবে এ দেশের মানুষ যখন থেকে বাংলা ভাষা পেয়েছে, তখন থেকেই লোকসংগীতের চল। ১১০০ বছর আগে রচিত ‘চর্যাপদ’ ছিল বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন, ভাষাও ছিল আদি বাংলা। চর্যাগুলো যে গানের আঙ্গিকে ও ভাষায় লিপিবদ্ধ, তা প্রতিটি চর্যাপদের শীর্ষে রাগ-রাগিণীর উচ্চারণে মূর্ত হয়েছে। বিভিন্ন হিসাব করে দেখা গেছে, এরূপ রাগ-রাগিণীর মোট সংখ্যা ১৯, যার মধ্যে দু-চারটি লোকসংগীতের সুর হতে পারে, যেমন— দেশাখ, গউড়া, শাবরী, বঙ্গাল প্রভৃতি। আনুমানিক তেরো শতকে রচিত হলায়ুধ মিশ্রের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সেক শুভোদয়া’ গ্রন্থে ‘ভাটিয়ালী রাগেণ গীয়তে’ বলে একটি ছড়াধর্মী সংগীতের কথা বলা হয়েছে। নন্দিত এ সংগীতটি নদীর ঘাটে স্নান শেষে গৃহে ফেরার পথে দুজন ডাইনি গেয়েছিল। এর ফলেই কয়েকটি চরণ এরূপ হয়েছিল বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

অন্যদিকে প্রাচীন ও মধ্যযুগের মৌখিক ধারার লোকসাহিত্য ও লোকসংগীতের প্রকৃত চিত্র কী ছিল, তা আজ আর জানার সুযোগ নেই, কেননা সেগুলোর লিখিত রূপ সংরক্ষিত হয়নি। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা-৭’ থেকে দেখা যাচ্ছে, ১৯ শতকের আগে লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না। এখানে ডাক ও খনার বচনগুলো লোকসাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন বলে গণ্য করা হয়, কিন্তু কত প্রাচীন, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। স্মৃতি ও শ্রুতিনির্ভর এসব রচনার ভাষায় প্রাচীনতাও রক্ষিত হয়নি। এগুলোকেও সংগীতের আদি ও অকৃত্রিম উত্স বলে দাবি করেছেন কেউ কেউ। যদিও লোকসংগীতের প্রাচীন নমুনা উদ্ধার করা যায়নি, তবে কীর্তন, সারি, জারি, ভাটিয়ালি, বারমাসী, ঝুমুর, ব্রত প্রভৃতি গানের নাম মধ্যযুগের একাধিক কাব্যে পাওয়া গেছে। মঙ্গলকাব্যের বারমাসীর বিষয় ও ফর্ম সরাসরি লৌকিক বারমাসী থেকেই গৃহীত। নদী ও নৌকার সঙ্গে জড়িত মাঝি-মাল্লার গান সারি ও ভাটিয়ালি প্রাচীন হওয়া স্বাভাবিক। চর্যাপদে, কৃষ্ণকথায়, মনসামঙ্গলে, দেহতত্ত্বের গানে নদী ও নৌকার প্রসঙ্গ নানাভাবে এসেছে। তারা যে দাঁড় বাইতে বাইতে সারি গায়, তা সহজেই বোঝা যায়। কল্পকথার ভাবালেখ্যে চাঁদ সওদাগর চৌদ্দ ডিঙ্গার এক বিশাল বহর নিয়ে বাণিজ্যের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন। নৌকার শ্রমজীবী গাবরদের এ সারিগান নিঃসন্দেহে লোকসংগীত ছিল।

বিভিন্ন সূত্র পর্যালোচনা করতে গেলে দেখা যায়, ভাটিয়ালি সুরের কথা চর্যাপদে, সেক শুভোদয়ায়, শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে, ইউসুফ-জোলেখায় আছে। সমকালের লোক-প্রচলিত ভাটিয়ালি গান থেকে এ সুর আহূত হয়ে থাকতে পারে। বৈষ্ণব সমাজে কীর্তন ধর্মসাধনার অঙ্গ ছিল, এখনো আছে। চৈতন্যদেব লৌকিক কীর্তনকে ‘নগরকীর্তনে’ ও ‘নামসংকীর্তনে’ রূপান্তর করে কৌলীন্য দান করেন। মনসার মাহাত্ম্য নিয়ে রচিত ‘অষ্টক গান’, ‘রয়ানি গান’, ‘মনসার ভাসান’ প্রভৃতি মনসাপূজা প্রবর্তিত হওয়ার পর প্রচার লাভ করে। পূর্ববঙ্গে মনসাপূজার প্রভাব বেশি। জারিগান শিয়া সম্প্রদায়ের আগমন এবং প্রভাব বিস্তারের পর এ দেশে প্রচলিত হয়। এভাবে ধর্ম, সমাজ, ইতিহাস, ঐতিহ্যের আলোকে এ ধরনের গানের বিকাশ ঘটেছে, যার শ্রেণীকরণের ক্ষেত্রেও এটাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করতে হয়। বিশেষত লোকসংগীতের শ্রেণীকরণ সহজ বিষয় নয়। পণ্ডিতরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রেণীভাগ করেছেন। কোনো কোনো পণ্ডিত আঞ্চলিক ও সর্বাঞ্চলীয়, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক, সাধারণ ও তত্ত্বপ্রধান, তালযুক্ত ও তালহীন, সংস্কারাগত ও সংস্কারনিরপেক্ষ— এমন স্থূলভাবে ভাগ করে নানা উপবিভাগ করেছেন। আশুতোষ ভট্টাচার্য আঞ্চলিক, ব্যবহারিক, আনুষ্ঠানিক, কর্ম ও প্রেম এ পাঁচটি ভাগ করেন বাংলাদেশের গানগুলোকে। অন্যদিকে আশরাফ সিদ্দিকী আঞ্চলিক, ব্যবহারিক, হাস্যমূলক, কর্ম, প্রেম ও বারমাসী— এ ছয়টি ভাগ করেন। তবে অঞ্চল, উপলক্ষ ও বিষয়ভিত্তিক এমন মিশ্র রীতির বিভাজন যুক্তিসঙ্গত নয়। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা-৭’-এর বর্ণনা থেকে লোকসংগীতের বিষয়ভিত্তিক একটি শ্রেণীকরণ নিম্নরূপে করা যায়—

১. ধর্মতত্ত্বভক্তিআচার ও সংস্কারঅষ্টক গান, কীর্তন, গাজন, জাগ গান, জারি গান, ধামাইল গান, ধুয়া গান, নৈলার গান, বাউল গান, বিচার গান, ভাটিয়ালি গান, মনসা ভাসান বা রয়ানি গান, মর্সিয়া গান, মাইজভাণ্ডারি গান, মারফতি গান, মুর্শিদি গান, হুদমার গীত, উরি বা হোলির গান।

২. প্রেম ও বিনোদনআলকাপ গান, গোসা গান, ঘাটু গান, বারমাসী, বারাষে, বিচ্ছেদি গান, ভাওয়াইয়া, সারি গান।

৩. কর্ম ও শ্রমক্ষেত নিড়ানির গান, ধান ও পাট কাটার গান, ধান ভানার গীত, হাতি খেদানোর গান।

৪. পেশা ও বৃত্তিখেমটা গান, পটুয়া সংগীত, পালকিওয়ালার গান, ফেরিওয়ালার গান, বেদে বা সাপুড়ের গান, বাওয়ালির গান, পুতুলনাচের গান।

৫. হাস্যকৌতুকগম্ভীরা গান, চটকা গান, হাবু গান।

৬. মিশ্র ভাববিষয়কবিগান, নাটুয়া গান, মেয়েলি গীত।

বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির উত্স হিসেবে বিখ্যাত হয়েছে বারোটির মতো গান। এগুলোকে বাংলার বারো গান শিরোনামে বর্ণনা করা যেতে পারে।  বাংলাদেশে আঞ্চলিক ও সর্বাঞ্চলীয় উভয় প্রকার লোকসংগীত আছে। পরিসংখ্যান নিলে দেখা যায় যে, সর্বাঞ্চলীয় অপেক্ষা আঞ্চলিক লোকসংগীতের সংখ্যা বেশি। লোকসংগীতের উত্সমূলে এর প্রধান কারণ নিহিত আছে। বাংলাদেশে সাধারণভাবে হিন্দু ও মুসলমান দুটি বৃহত্ সম্প্রদায় বাস করলেও বিশ্বাস ও সংস্কার, পেশা ও বৃত্তি, পালা-পার্বণ ইত্যাদি ভেদে বহু উপসম্প্রদায়ের অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। যেমন— খুলনায় মতুয়া সম্প্রদায়, কুষ্টিয়ায় বাউল সম্প্রদায়, রংপুরে রাজবংশী সম্প্রদায়, বিভিন্ন অঞ্চলের বেদে সম্প্রদায়, ফকির সম্প্রদায়, জেলে সম্প্রদায় ইত্যাদি। পূর্বে পটচিত্র, পালকিবাহন, পুতুলনাচ ইত্যাদি পেশার শ্রমজীবী মানুষ ছিল; ‘পটুয়া সংগীত’, ‘পাল্কির গান’, ‘পুতুল নাচের গান’ এসব পেশার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হিসেব করতে গেলে দেখা যায় বর্তমানে খুলনা জেলায় বাওয়ালিয়া শ্রেণীর শ্রমজীবী মানুষ আছে; তারা সুন্দরবনে কাঠ, গোলপাতা ইত্যাদি সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের নিজস্ব গান ‘বাওয়ালিয়া গান’ বলেই পরিচিত। অনুরূপভাবে ধর্মীয় উত্সব ও পালা-পার্বণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় গান-গীতের চর্চা হয়ে থাকে। আঞ্চলিক ভাষা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংগীতাঞ্চল নির্ধারণে ভূমিকা পালন করে।

ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, গম্ভীরা গানের আঞ্চলিক ভাষার তথা উপভাষার বন্ধন এমনই প্রবল যে, এগুলো আপন ভাষাঞ্চলের বৃত্ত ভেঙে বাইরে যেতে পারেনি। রংপুরের কোচদের নিজস্ব ভাষা ভাওয়াইয়ার পদ বা পদগুচ্ছ, স্বর, ছন্দ নির্মাণ করেছে; অন্য অঞ্চলের উপভাষা এর স্থলে প্রতিস্থাপন করা যায় না। অনুরূপভাবে গম্ভীরা গানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্থানীয় ভাষার, ভাটিয়ালি গানে ভাটি অঞ্চলের উপভাষার বিকল্প নেই। এজন্য গানগুলো উদ্ভবের পর উত্স-ভূমির সীমানা ছেড়ে অন্যত্র বিস্তার লাভ করেনি। প্রাকৃতিক পরিবেশও অনেক গানের ভাব, ভাষা, সুর, লয়, ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। নদীর স্রোতে নৌকা ভাসিয়ে দিয়ে মাঝি-মাল্লা ভাটিয়ালি গান গায়; এ গানের ভাবে বিরহ-বেদনার বিষণ্নতা এবং সুরে ধীর লয় ও দীর্ঘ টানের সকরুণ আস্তরণ প্রভাব বিস্তার করে। সারি গানে এর বিপরীত চিত্র আছে, কেননা সারি গান কর্মের সাথে সম্পৃক্ত, বৈঠার টানের সঙ্গে গানের লয় ও ছন্দ আন্দোলিত হয়। দিনাজপুরের তরাই অঞ্চলের মহিষের পিঠে চড়ে মৈষাল যখন মহিষ চরায় ও গান গায়, তখন তার গানে বন্ধুর প্রান্তর ও নিস্তব্ধ প্রকৃতি প্রভাব ফেলে। সমুদ্রের উপকূলে উত্তাল তরঙ্গ ভেঙে যখন মাঝি সাম্পান চালায় ও গান গায়, তখন তার গানের সুরে তরঙ্গের দোলায়িত ছন্দ উচ্ছলিত হয়। সুতরাং গানের ভাব, ভাষা, সুর ও ছন্দের ওপর প্রকৃতি-পরিবেশের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। এর মধ্যে থেকে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচিত বারোটি গান হচ্ছে—

কীর্তন : হিন্দু সমাজের, বিশেষ করে বৈষ্ণব সমপ্রদায়ের জনপ্রিয় ভক্তিমূলক ধর্মীয় সংগীত কীর্তন। পুরুষরাই এ গানে অংশগ্রহণ করে। সারা দিন সংসারের কাজকর্ম করে কাটে। সন্ধ্যার পর চারদিকে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ও নীরবতা নেমে আসে। গ্রামের কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষ কোন বাড়ির চালার নিচের বারান্দায় গোল হয়ে বসে কীর্তন শুরু করে। একজন শ্রীখোল বা মাদল বাজায়, দু-একজন জুড়ি করতাল বাজায়। পরম ভক্তিভরে তারা একের পর এক গান গেয়ে চলে; গান ও বাদ্যের সুর গ্রাম-মাঠ ছাড়িয়ে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। ‘হরিবোল হরিবোল’ গাইতে গাইতে কীর্তনীয়ারা ভক্তিভাবে বিভোর হয়ে এক অনাস্বাদিতপূর্ব আনন্দলোকে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে প্রচলিত কীর্তন গান পরিবেশনার এটাই চিরায়িত রীতি-পদ্ধতি।

জারি গান: জারি গান দলীয় সংগীত। প্রায় ১০-১২ জনের একটি দল গঠিত হয়। দলনেতার নাম সর্দার বা সরকার। তার হাতে থাকে গানের পাণ্ডুলিপি যা আগে থেকে রচনা করা হয়। অন্যরা ‘দোহার’ (<ধ্রুবকার, সং) নামে পরিচিত। মহররম উপলক্ষে কারবালার মর্মন্তুদ কাহিনী নিয়ে যেসব করুণ ও বীর রসের গান করা হয়, সেসবকে জারি গান বলা হয়। দোহাররা ঝাণ্ডি হাতে নিয়ে চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে নাচে ও ঝাণ্ডিতে আওয়াজ তোলে। প্রত্যেকের হাতে দুটি করে ঝাণ্ডি থাকে। ঝাণ্ডি তলা বাঁশের তৈরি এক প্রকার লৌকিক বাদ্যযন্ত্র, প্রায় দেড়-দু ফুট লম্বা হয়। বাঁশের এক প্রান্ত ধরার জন্য অপরিবর্তিত রেখে অপর প্রান্ত খিল খিল করে কেটে চেছে-মুছে পরিষ্কার করা হয়। দুটি ঝাণ্ডিকে পরস্পরের প্রতি আঘাত করলে ঝনঝন ধ্বনি ওঠে। ঝাণ্ডি চালাতে হয় একটা বিশেষ নিয়মে। চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে নিজ হাতের ঝাণ্ডি দুটিতে মৃদু

আঘাত করতে হয়; দ্বিতীয় বারে বাম হাতের ঝাণ্ডি দ্বারা ডান পাশের জনের ডান হাতের ঝাণ্ডিতে আঘাত করতে হয়; তৃতীয় বারে আবার নিজের ঝাণ্ডিতে আঘাত করে ডান হাতের ঝাণ্ডি দ্বারা বামপাশের বাম হাতের ঝাণ্ডিতে আঘাত করতে হয়। এভাবে একত্রে একই সঙ্গে আঘাত করলে ঝনঝন শব্দ হয়। এ ধ্বনি গানের সুর ও তাল রক্ষার কাজ করে। সরকার চক্রের বাইরে থেকে গান শুরু করে। সাধারণত বন্দনা দিয়ে আসর শুরু হয়।

ধামাইল গান: ধামাইল (<ধামালী) প্রাচীন ধারার লোকসংগীত। পণ্ডিতগণ মনে করেন যে, বড়ু চণ্ডীদাস ধামালী ও ঝুমুর গানের আঙ্গিক থেকে প্রেরণা লাভ করে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ রচনা করেন। রঙ্গ-কৌতুক অর্থে খোদ শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে ধামালী শব্দের ব্যবহার আছে। ষোল শতকে দৌলত উজির বাহরাম খানের ‘লায়লীমজনু’ কাব্যে নাচ-গান অর্থে ‘ধামাল’ শব্দের ব্যবহার আছে: ‘‘বালেমু সুবদনী/দোহঁ মিলি নিরজনি/খেলত রঙ্গে ধামাল।’’ সতেরো শতকে কাজী দৌলত ‘সতীময়না লোর-চন্দ্রানী’ কাব্যে একই অর্থে ‘ধামারী’ শব্দের ব্যবহার করেছেন: ‘‘খেলায় বঁধুর সনে প্রেমের ধামারী।’’ এসব উক্তি ধামালী গান-নাচের জনপ্রিয়তাকে সূচিত করে। ধামালী রাধাকৃষ্ণবিষয়ক আদিরসাত্মক গান। উত্তরবঙ্গে ঘটনার বর্ণনা, পাত্রপাত্রীর আলাপচারিতা, উক্তি-প্রত্যুক্তি সংবলিত লৌকিক ধারার ধামালী গান আজও প্রচলিত আছে।

মারফতি গান: মারফতি গান সুফিবাদ-আশ্রিত ভক্তিমূলক গান। আল্লাহর প্রতি প্রেম-ভক্তি নিবেদন করে মরমিপন্থী সাধকেরা এই গান করে থাকেন। তাঁদের সাধন-সংগীত ধর্মচর্চার অঙ্গ রূপেই বিবেচিত হয়। তাঁরা আল্লাহকে নানা প্রতীকের ভাষায় অভিহিত করেন, যেমন— দয়াল, মনুরায়, সোনার ময়না বা সোনার পাখি ইত্যাদি। মারফতি আরবি ‘মারিফত’ শব্দজাত; অর্থ— মাধ্যম, যার মাধ্যমে আদান-প্রদান করা হয়। এর অপর অর্থ অধ্যাত্ম জ্ঞান, গুপ্ত জ্ঞান। ইসলামে মরমি ভাবধারার অধ্যাত্ম সাধনার কথা আছে। এখানে দয়াল মুর্শিদের স্থান আছে। মুর্শিদি গানে ভক্তের আকুতি গুরুর কাছেই, মারফতি গানে ভক্তের আবেদন নিয়ে বদন সরাসরি আল্লাহর কাছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন জেলায় মারফতি গানের চর্চা আছে। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘লোকসাহিত্য-সংকলনে’ (২০শ খণ্ড) জেলাভিত্তিক ১৭০টি মারফতি গান সংকলিত হয়েছে।

জেলাগুলো হলো কুষ্টিয়া, যশোর, পাবনা, ফরিদপুর, রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম। বিষয়ভিত্তিক শ্রেণী বিভাগ করলে স্রষ্টার গুণকীর্তন, রসুলের প্রশস্তি, মুর্শিদ তত্ত্ব, সৃষ্টি তত্ত্ব, আত্ম তত্ত্ব, পরকাল চিন্তা ইত্যাদি মারফতি গানের সন্ধান পাওয়া যায়। সাধক যখন নিজেই গায়, তখন প্রধান বাদ্যযন্ত্র একতারা বা সারিন্দা। এখন আসরে পরিবেশনায় হারমোনিয়াম, দোতারা, সারিন্দা, খোল, জুড়ি বা মন্দিরার ব্যবহার হয়। এর জন্য বাদকের সাহায্য নিতে হয়। মারফতি গানের সুরে বেদনা ও কান্না আছে।

মুর্শিদি গানসুফি মতবাদে মুর্শিদ বা গুরুর স্থান অতি উচ্চে প্রতিষ্ঠিত। তিনি সাগরেদ বা ভক্তকে আধ্যাত্মিক পথের সন্ধান দেন। তাঁর কাছে দীক্ষা নিয়ে অধ্যাত্ম সাধনা করতে হয়। সাধনমার্গে এমন জটিল ক্রিয়াকর্ম আছে, যা অনুশীলনে গুরুর নির্দেশ আবশ্যক হয়। উপরন্তু এরূপ ধর্মবিশ্বাসে অনেক সাংকেতিক শব্দ আছে, যার ব্যাখ্যা একমাত্র গুরুই দিতে পারেন। ভক্তের চোখে যিনি মুর্শিদ, তিনিই ‘মওলা’ বা পরমেশ্বর। মুর্শিদকে পেলে খোদাকে পাওয়া যায় বলে তারা বিশ্বাস করে। মুর্শিদি ভক্তিভাবের গান। বাংলাদেশে মুসলিম বিজয়ের পর ইসলাম প্রচারে পীর-দরবেশগণ মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। চট্টগ্রামকে ‘বার আউলিয়া’র দেশ বলা হয়। চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি, সিলেটের শাহ জালাল, ঢাকার বাবা আদম শহিদ, সোনারগাঁওয়ের আবু তাওয়ামা, বাগেরহাটের খানজাহান আলী, মহাস্থানগড়ের শাহ সুলতান মাহি সওয়ার, নেত্রকোনার শাহ মোহাম্মদ সুলতান রুমী, শাহজাদপুরের মখদুম শাহদৌলা প্রমুখ পীর-দরবেশ মুসলিম বিজয়ের কিছু আগে-পরে বাংলাদেশে ইসলাম ও সুফি মতবাদ প্রচার করেন। এ গানে স্বীয় মুর্শিদের প্রতি নিঃশর্ত ভক্তি নিবেদন এবং তাঁর মাহাত্ম্য কীর্তন, গুণগান ও চরণাশ্রয় কামনা করা হয়। মোহ, মায়া ও দুঃখ-যন্ত্রণাপূর্ণ এই জগত্-সংসার অনিত্য— অজ্ঞ ও অধম ভক্ত ভব-বন্ধন থেকে মুক্তি চায়। আরবি ‘এরশাদ’ শব্দজাত মুর্শিদের অর্থ অধ্যাত্ম গুরু। এরশাদ শব্দের অর্থ ‘নির্দেশ’। যিনি অধ্যাত্ম সাধন পথের নির্দেশ দেন, তিনিই মুর্শিদ। সুতরাং অধ্যাত্ম সাধনার নির্দেশমূলক গানই মুর্শিদি গান। ইসলামের সুফি ভাবধারার সঙ্গে পীর বা মুর্শিদ তত্ত্বের সম্পর্ক আছে।  মুর্শিদকে ইহকাল ও পরকালের ত্রাণকর্তা ও মুক্তিদাতা মনে করা হয়।

ভাওয়াইয়া গানভাওয়াইয়া গানের মূল উত্সভূমি বাংলাদেশের রংপুর এবং পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার; কৃষিজীবী রাজবংশী সমপ্রদায় এর স্রষ্টা। ভাওয়াইয়া গানের ভাব, ভাষা ও সুরের সঙ্গে এই অঞ্চলের প্রকৃতি-পরিবেশ ও জনগোষ্ঠীর নিবিড় সম্পর্ক আছে। বিশেষত প্রকৃতি-পরিবেশ ও লোকভাষার বন্ধনটি অবিচ্ছেদ্য। নরনারীর পার্থিব প্রেম ভাওয়াইয়া গানের মৌলিক বিষয়। বিশেষ করে যুবক-যুবতীর প্রেমার্তি, মিলনাকাঙ্ক্ষা, বিরহ-বেদনা ইত্যাদি ভাব অবলম্বন করে অধিকাংশ ভাওয়াইয়া গান রচিত হয়েছে। কোনো কোনো গানে আধ্যাত্মিকতার রূপক থাকতে পারে।  ভাওয়াইয়া উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক গান। আব্বাসউদদীন (১৯০১-৫৯) তাঁর সুরেলা ও দরদি কণ্ঠে এ গান গেয়ে প্রম সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং একে জনপ্রিয় করে তোলেন।  পল্লীর যুবতী নারীর প্রেম গানের বিষয় হলেও এর রচয়িতা পুরুষ, গায়কও পুরুষ। তারা নানা পেশার সঙ্গে জড়িত। নামহীনা যুবতীর প্রেমিক কোন গাড়িয়াল, রাখাল, মৈষাল, মাহুত, নাইয়া, বানিয়া, বৈদ, বাউদিয়া, চেংড়া বন্ধু, বিদেশী বন্ধু অথবা প্রবাসী স্বামী। আবার প্রতীক হিসেবে কানাই, বগা, বাবুই, কোকিল, ভ্রমর ইত্যাদির চিত্রও আছে। যৌবন ভারাক্রান্ত রমণী এদের নিকট প্রেম নিবেদন করতে চায়, এদের তাছ থেকে প্রেম পেতে চায়। ভাওয়াইয়া গানে এ প্রেমের অকপট স্বীকৃতি ও নিরাভরণ প্রকাশ আছে। ভাওয়াইয়া গানে বিরহ ভাব ও করুণ রসের প্রাধান্য। এর কারণে এ গানের আকর্ষণও বেশি। ভাওয়াইয়া গানের সুরের মাদকতা একে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ভাওয়াইয়া টানা সুরের গান, গাওয়ার সময় শিল্পীর গলা ভেঙে ভেঙে গায়। বিশেষত সুরের মধ্যে ‘হ’ ধ্বনির সূক্ষ্ম উচ্চারণ অন্য কোনো গানে নেই।

ক্ষেত নিড়ানির গান: ধান বা পাটের চারা ঈষত্ বড় হলে ক্ষেতের আগাছাগুলো তুলে ফেলে চারার গোড়ার মাটি আলগা করা হয়; একেই ‘নিড়ানি দেওয়া’ বলে। এ কাজে ক্ষেতমজুর নিয়োগ করা হয়। ময়মনসিংহে এদের ‘গাঁতার কামলা’ বলে। যারা দলবদ্ধ হয়ে কাজ করে, তাদের ‘গাঁতা’র কামলা বলে। ‘ক্ষেত নিড়ানির গান’ সাধারণভাবে ‘সারি গান’ নামেও পরিচিত। ক্ষেতে সারিবদ্ধভাবে বসে কাজ করে— এই অর্থে সারি গান নামকরণ হতে পারে।

ধান ভানার গীত: গৃহস্থালি কাজের মধ্যে ধান ভানা অন্যতম। টাঙ্গাইলে একে ‘বারা ভানা’ বলে। কৃষক-বধূরাই এ কাজের সঙ্গে জড়িত। তারা ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে ধান ভানে আর গীত গেয়ে শ্রম লাঘব করে থাকে। বিশেষত বিয়ে উপলক্ষে ‘আইবুড়োর চাল’ তৈরি করার সময় ধান ভানা গীতের মহড়া অধিক হয়। এ সময় মেয়েরা গীত গেয়ে আমোদ-প্রমোদে মেতে ওঠে—

আমরা ধান ভানি রে ঢেঁকিতে পার দিয়া,

ঢেঁকি নাচে আমরা নাচি হেলিয়া দুলিয়া

আমরা ধান ভানি রে-

রাখালিয়া গান: একদিন বাংলার গৃহস্থ ঘরে গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু এবং পুকুর ভরা মাছ ছিল। বড় গৃহস্থের ঘরে আট-দশখানা পর্যন্ত লাঙল এবং সে অনুপাতে গরু থাকত। তারা দুগ্ধের জন্য গাভীও পুষত। গরু-বাছুর চরাবার জন্য রাখাল-বালক রাখত। সকালবেলায় সে গরুর পাল নিয়ে মাঠে যায়। সে হাতে লাঠি ও কোমরে একটি বাঁশিও গুঁজে নেয়। সে সারাদিন গরু চরায়; দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ, বিস্তর অবসর তার। একাকিত্ব ও অবসন্ন মন নিয়ে সে এক সময়, হয়তো অলস দুপুরে, গাছের ছায়ায় বসে বাঁশিতে ফুঁ দেয় আর গলা ছেড়ে গান ধরে:

পূবাল হাওয়া যায় রে বইয়া ঝিরি ঝিরি ঝির

উড়াল দিছে সল্লী পংখী ধরলা নদীর তীর।

প্রাণ মোর উড়য়্যা যায় রে

ঝাউ নাচে, কাউন নাচে, আর নাচে বন

তারে সাথে নাচিয়া ফেরে উদাস করা মন।

প্রাণ মোর উড়য়্যা যায় রে (উত্তরবঙ্গ)

[বাংলাদেশের লোকসংগীত পরিচিতি, পৃ. ১৪৭]

গম্ভীরা গান: বৃহত্তর রাজশাহী জেলার চাঁপাইনবাবগঞ্জে বর্তমানে প্রচলিত। গম্ভীরা গানের বিষয়বস্তুতে ধর্মের স্থান নেই; তা সম্পূর্ণ সেকুলার ও বিনোদনমূলক লোকসংগীত। এটি দলীয় সংগীত, তবে মুখ্য ভূমিকা পালন করে ‘নানা’ ও ‘নাতি’ নাম-ভূমিকায় দুজন শিল্পী। তাদের সঙ্গে ধুয়া গেয়ে ৪-৫ জন দোহার এবং বাদ্য বাজিয়ে অনুরূপ সংখ্যক বাদক সাহায্য করে। হারমোনিয়াম, ঢোল, দোতারা, বাঁশি, খঞ্জনী এবং করতাল গম্ভীরা গানের সুর ও তাল সংগত করে। নানা ও নাতি লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরে, পায়ে ঘুঙুর বেঁধে ও মাথায় ‘মাথাল’ দিয়ে আসরে প্রবেশ করে। আসরের শুরুতে বাদকগণ কিছুক্ষণ সূচনাত্মক বাদ্য বাজায়। প্রমে মধ্য বয়সী ‘নাতি’ প্রবেশ করে একক গান ও নাচ প্রদর্শন করে। এরপর ‘নানা’ প্রবেশ করলে উভয়ের মধ্যে পারিবারিক বিষয় নিয়ে লঘু হাস্যরসাত্মক আলাপ হয়। এরই এক ফাঁকে তারা মূল বিষয়ের সূচনা করে। দেশের চলমান সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি আলোচনায় স্থান পায়। প্রস্তাবিত বিষয়ের সূচনা, বিস্তার, পরিণতি- এরূপ ধারাক্রমে সংলাপ ও গানের মাধ্যমে পরিবেশনা এগিয়ে চলে। আলাপচারিতার সময় গদ্য এবং গানের সময় পদ্য ব্যবহূত হয়। আদিতে গম্ভীরা ছিল ধর্মীয় উত্সব; শিবপূজা উপলক্ষে পৌরাণিক শিবের পারিবারিক ঘটনা অবলম্বনে গান, নাচ, অভিনয় অনুষ্ঠিত হতো, নাম ছিল ‘আদ্যের গম্ভীরা’। পশ্চিমবঙ্গের মালদহ ছিল এর মূল কেন্দ্র। প্রধানত দেবদেবী, ভূত-প্রেত, পশুপাখির মুখোশ পরে গম্ভীরা নাচ-গান হতো; হিন্দুরা এতে অংশগ্রহণ করত। এখানে শিব ছিলেন একজন সাধারণ কৃষিজীবী ও সংসারী মানুষের প্রতীক। মালদহে এখনো এর চর্চা আছে। তবে বাংলাদেশে প্রচলিত গম্ভীরার রীতি নানাভাবে বদলে গেছে সময়ের আবর্তে।

লেখক:ফালাক আল শাবির

 

 

 

সূত্র: বণিক র্বাতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ