শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে পরিবর্তন

ঢাকা নগরীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উত্থান, অবক্ষয় এবং পুনরুজ্জীবনের যুগপৎ আবর্তনের মধ্য দিয়েই ঢাকার শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উত্থান-পতনের ধারায় তাত্পর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে বলেই মনে হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ করলে দেখা যায়, বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও স্থানিক কারণেও স্থানীয় শিল্প-বাণিজ্যে এ ধরনের পরিবর্তনে তারতম্য ঘটেছে।

মোগল শাসনামলেই ঢাকা এক উল্লেখযোগ্য জনপদ হিসেবে মনোযোগের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তবে এরও আগে থেকে এ জনপদের গুরুত্ব ছিল। ‘রাজতরঙ্গিনী’র ইতিহাসকার ঢাকাকে রাজ্যের অগ্রবর্তী চৌকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এলাহাবাদের স্তম্ভে সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের (খ্রিস্টীয় ৪ শতক) উত্কীর্ণ এক লিপিতে ঢাকা ‘ঢাভাকা’ নামে লেখা রয়েছে। ওই লিপি থেকে বোঝা যায়, ঢাকা তখন গুপ্ত সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্ত হিসেবে গণ্য ছিল।

ঢাকায় প্রাক-মোগল আমলের ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে দুটি মসজিদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। একটি নগরের প্রাণকেন্দ্রে, অন্যটি উপকণ্ঠ মীরপুরে। জোওয়াও দ্য বারোজ ঢাকার তাত্পর্যের স্বীকৃতি দিয়ে তিনি ১৫৫০ সালে তার অঙ্কিত এই অঞ্চলের মানচিত্রে ঢাকাকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

এরও আগের ইতিহাসে ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা উল্লেখ আছে। তবে এসব বিবরণ অনেকটা বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত। এতে বিশদ বিবরণ তেমন কিছু পাওয়া যায় না। বঙ্গের অংশ হিসেবে ধরে নেয়া যায়, ঢাকাতেও একই মুদ্রা ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। এই অঞ্চলের অন্যান্য স্থানের মতো ৩ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে টাঁকশালে তৈরি ধাতব মুদ্রা পণ্য বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে প্রবর্তিত হয়। তবে এর আগে পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে ব্যবসা ও বাণিজ্যিক লেনদেন পরিচালিত হতো। ৩ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে এসে আমরা দেখি যে, ছাপাঙ্কিত মুদ্রাও পণ্য বিনিময়ে ব্যবহার শুরু হয়েছে। মহাস্থান গড় ও অতিসাম্প্রতিক কালে ওয়ারী-বটেশ্বরে খনন থেকে প্রাপ্ত নিদর্শন থেকে জানা যায়, বঙ্গের তথা ঢাকার বেশ গোড়ার দিকের ইতিহাস-কাল থেকেই মুদ্রা অর্থনীতির প্রচলন হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৩ শতকের গোড়ার থেকেই যে কড়ি দিয়ে পণ্য বিনিময় হতো এমন ধারণা পোষণ করা যায়।

গুপ্ত সাম্রাজ্যের আমলে, বিশেষ করে ৫ খ্রিস্টীয় শতক কিংবা ৬ শতকের গোড়ার দিকে বঙ্গের কয়েকটি অঞ্চলে গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রা প্রচলিত ছিল। এ অঞ্চলগুলো তখন গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসনাধীন ছিল। সে সময়কার ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটাই জটিল হতে থাকে। কেননা, মুদ্রা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে থাকে; অন্যদিকে ৭৫০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টীয় শতকের এই কাল পরিক্রমায় বঙ্গদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও লেনদেন বাড়তে থাকে। ১২ শতকে পাহাড়পুর ও ময়নামতীতে বাগদাদের খলিফা হারুন-উর-রশিদ (৮ শতক) ও খলিফা মুসতাঈন বিল্লাহর স্বর্ণমুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। তা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়, বাংলার সঙ্গে আরবের ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্পর্ক শুধু ছিল না, বরং এই দুই দূরবর্তী অঞ্চলের মধ্যকার লেনদেনে মাঝখানে অবস্থিত ঢাকারও একটি ভূমিকা ছিল।

মধ্য যুগ:

মোগল-পূর্ব মধ্যযুগে ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের বিবর্তনের ধারাটি আবর্তিত হয় গোটা বঙ্গদেশের অবস্থা ও পরিবেশ প্রভাবী বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে। দশম শতকে ঢাকা যখন মুসলিম সংস্পর্শে আসতে শুরু করেছে, সেই যুগসন্ধির সময়টায় ঢাকার তাত্পর্যপূর্ণ উৎপাদিত পণ্যই ছিল কার্পাস বয়ন ও বস্ত্র। ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির বঙ্গদেশ জয়ের (১২০৪ খ্রি.) পর ঢাকার বস্ত্র বয়ন, উৎপাদন ও রফতানির ক্ষেত্রে নাটকীয় ও তাত্পর্যপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়। ১৩ শতকের ইতালীয় পর্যটক ও অভিযাত্রী মার্কো পোলোর বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি, বাংলাদেশে উৎপাদিত বস্ত্রপণ্য, সেকালে প্রধান রফতানি পণ্য ছিল। আরব ভূপর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৪৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলার এ অঞ্চল পরিদর্শন করেন। তিনি বাংলার মসলিন বস্ত্রের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। ওই সময়ে তুলা উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র এলাকাগুলো ঢাকার চারপাশে অবস্থিত ছিল।

ঠিক এই সময়ে বঙ্গে, বিশেষ করে ঢাকায় ও তার উপকণ্ঠ এলাকাগুলোয় কিছু উদ্যমী উদ্যোক্তার আবির্ভাব ঘটে। এই উদ্যোক্তা শ্রেণী প্রধানত হস্তশিল্প, বস্ত্রবয়ন, দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন ও অলঙ্কার নির্মাণ শিল্পে নিয়োজিত ছিল। তারা যেসব পণ্য তৈরি করতেন, তা অতি উচ্চমানের কারিগরি নৈপুণ্য সমৃদ্ধ হতো।

প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকাশিল্পবাণিজ্যে প্রভাব

মোগল শাসকরা বঙ্গের সুবে বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় (১৬০৮ খ্রি.) স্থানান্তরের পর এই নগরের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব নতুন করে তাত্পর্যপূর্ণ হয়ে ওঠায় নগরীর শিল্প-বাণিজ্যেরও প্রসার ঘটে। আর অচিরেই ঢাকা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও শিল্পপ্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এই গোটা আমলে, বিশেষ করে ঢাকা ও সাধারণভাবে কার্যত গোটা বাংলার অর্থনেতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির নিরবচ্ছিন্ন উন্নতি ঘটে।

মোগল আমলে ঢাকা যেমন ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র, তেমনি এই নগর শিল্পনগর হিসেবেই সবিশেষ সমৃদ্ধি লাভ করে। ঢাকার মধ্যবর্তী সংযোগ স্থল হিসেবে অবস্থান এবং এখানে সম্রাটের একটি শুল্ক আদায় কেন্দ্র বা শাহ বন্দর স্থাপিত হওয়ায় প্রচুর বিদেশী সওদাগর ও বণিকের ঢাকায় আগমন ঘটতে থাকে। তাদের মধ্যে যেমন বিদেশীরা ছিলেন, তেমনি ভারতীয় অন্যান্য অঞ্চলের ব্যবসায়ীরাও ছিলেন। প্রাদেশিক রাজধানী, শুল্ক ও রাজস্ব আদায় কেন্দ্র হওয়ায় ঢাকায় বড় বড় ব্যাংকার বা তখনকার আমলে কথিত শ্রফদেরও ঢাকায় আগমন ঘটে। তারা রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ছিলেন, সেনাবাহিনীকে বেতন প্রদানের দায়িত্ব পালন করতেন এবং গোটা দেশে হুন্ডি বা লেটার অব ক্রেডিটের লেনদেন তথা ব্যাংকিং পরিচালনা করতেন। এছাড়া তাদের কাজ ছিল মুদ্রা বিনিময় করা বা বদলে দেয়া, বীমা করা এবং কখনো কখনোবা তাদের নিজস্ব এখতিয়ারে বাণিজ্য পরিচালনা করা। এসব কাজ সাধারণ পর্যায়ে পরিচালনা করতেন স্থানীয় পোদ্দার ও মহাজনরা। এই মহাজনরা আসলে ছিলেন ছোটখাটো ব্যাংকার। এছাড়া মুদ্রা বদলে দেয়া বা বিনিময় কাজে যারা নিয়োজিত ছিলেন, যারা ‘দাদন’ বা টাকা ধার দিতেন, তারাও ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতেন।

ফরাসি পর্যটক ও চিকিৎসক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ের ছিলেন খোদ ভারতে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের চিকিৎসক (১৬৫৯-১৬৬৬)। তিনি বাংলার বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন, প্রদেশটি দক্ষিণ এশিয়ায় মোগল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে উর্বর রাজ্য। তিনি বাংলার ঐশ্বর্য ও সম্পদকে ‘অতুলনীয়’ বলেও উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, বাংলার মাটির চেয়ে অন্য কোনো অঞ্চলের মাটি এত উর্বর ছিল না। এমনকি, তার মতে, বঙ্গদেশ মিসরের চেয়েও উর্বর। মিসরের মতো বঙ্গদেশেও ধান ও গম প্রচুর পরিমাণে উত্পন্ন হতো আর মিসরে তখন যে ফসলটি উত্পন্ন হতো না, সেই কার্পাস তুলা জন্মাত এই বঙ্গদেশে। রেশম ও নীলের চাষও হতো এ দেশে। বার্নিয়ের আরো লিখেছেন, বঙ্গে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত চাল রফতানি হতো দক্ষিণ ভারত, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপে। তার সাক্ষ্যপ্রমাণ অনুযায়ী, ১৭ শতকে পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে চিনি কেবল দক্ষিণ ভারতেই নয় বরং আরব, মেসোপটেমিয়া ও পারস্যে রফতানি হতো। এছাড়া বার্নিয়ের লিখেছেন, বাংলায় এত বেশি প্রকার ও বৈচিত্র্যময় কার্পাস ও রেশমি বস্ত্র উৎপাদিত হতো যে, বাংলাকে বস্ত্রের একচেটিয়া কেন্দ্র বা ‘ভাণ্ডার’ বললেও অত্যুক্তি হতো না। বার্নিয়েরের মতে, বঙ্গদেশ কেবল গোটা দক্ষিণ এশিয়ার (ভারত) জন্যই বস্ত্রের প্রধান কেন্দ্রের উৎস ছিল না, গোটা ইউরোপের বস্ত্রের জোগানও যেত বঙ্গদেশ থেকে। মিহি কার্পাস ও রেশমি বস্ত্র উৎপাদনে বঙ্গদেশ ছিল তুলনাহীন। সে আমলে শোরা, মরিচ, আফিম, মোম ও মাখনেরও প্রধান উৎস ছিল বঙ্গদেশ।

তাভার্নিয়ের হলেন বাংলা ও ভারতবর্ষে আগত আরেক ফরাসি পর্যটক। তিনি ১৬৪০ থেকে ১৬৬৭ সাল অবধি এ দেশ সফর করেন। তিনি বাংলাদেশে চিনির প্রাচুর্য সম্পর্কে লিখেছেন। এই বাংলা থেকে গোলকুণ্ডা ও কর্ণাটক রাজ্যে চিনি সরবরাহ হতো। মূল্যবান পণ্যসামগ্রীর প্রশ্নে তার মন্তব্য হলো, আমার বাংলা ছাড়া আর বিশ্বে এমন কোনো দেশ জানা নেই, যে দেশ এত বৈচিত্র্য ও সম্পদময়; যে জন্য বিদেশীরা বাণিজ্য করতে ভিড় জমাত ওই দেশটিতেই। এখানে চিনি তো ছিলই, আরো ছিল কার্পাস (মসলিন) ও রেশম বস্ত্রের বিপুল সমাহার। এগুলো কেবল গোটা ভারতে সরবরাহ করা হতো না, আশপাশের রাজ্য ও খোদ ইউরোপেও রফতানি করা হতো। আর ঠিক এ কারণেই পর্তুগিজ, মেস্টিকস ও অন্য খ্রিস্টানরা বিপুল সংখ্যায় বাংলা এসে হাজির হয়।

বিদেশী পর্যটকদের দেয়া বিবরণ ও সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে দেখা যায়, তুলা, বস্ত্র, চাল ও অন্যান্য রফতানি সামগ্রী ছিল বঙ্গদেশের প্রধান উত্পন্ন ও রফতানি দ্রব্য। তুলা ও বস্ত্র বয়নের অধিকতর তাত্পর্যপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর অবস্থান ছিল ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায়।

ঢাকায় বিদেশী বাণিজ্য কুঠিপ্রারম্ভকাল

বার্নিয়ের ও তাভার্নিয়ের— উভয়েই বিদেশী বণিক ও ব্যবসায়ীদের জন্য আকর্ষণ হিসেবে বাংলার প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তারা আরো নানা জাতি ও জাতীয়তার ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের বাংলায় বিপুল হারে আগমনের কথা জানিয়েছেন। এখানে কৌতূহলের সঙ্গে লক্ষ করার বিষয় এই যে, ১৬৯৯ সালে ঢাকায় ইংরেজ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছিল। এগুলোর অবস্থান ছিল তখনকার ঢাকার উপকণ্ঠ এলাকা তেজগাঁওয়ে। কিন্তু ফরাসিরা ইংরেজদের আগে ঢাকায় তথা বঙ্গদেশে এলেও তারা ইংরেজদের অনুসরণ করে ১৭২৬ সালে ঢাকায় বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে। ১৭৪০ সালে ঢাকার মোগল নায়েব-ই-নাজিম নওয়াজিশ মোহাম্মদ খান ফরাসিদেরকে ঢাকায় একটি ‘গঞ্জ’ বা ‘বাজার’ প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেন। একই সময়ে ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের এজেন্সি ঢাকার তেজগাঁওয়ে স্থাপন করে। পরে ১৮ শতকের মধ্যভাগে তারা ওখান থেকে বর্তমান মিটফোর্ড এলাকার নিজস্ব ভবনে তাদের এজেন্সি স্থানান্তর করে। ওই স্থানে এখন অবস্থিত রয়েছে মিটফোর্ড মেডিকেল হাসপাতাল। আর তাদের ওই বাণিজ্য কুঠির নাম ছিল ‘কুঠি ওলন্দাজ’। পতুর্গিজরাও বাংলার সঙ্গে বাণিজ্যে যোগ দেয়। তারা ১৭৭০ সালে বাংলাবাজারের ‘সাঙাততলা’ নামক স্থানে কুঠি স্থাপন করে। তবে ঢাকায় তাদের বাণিজ্য তত বিস্তৃত হতে পারেনি।

ঢাকার বাণিজ্যিক উত্থানপতন  পুনর্জাগরণের যোগসূত্রঢাকার মসলিন বা মলমল কাপড়

ঢাকার শিল্প সমৃদ্ধি, গৌরব এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উন্নতির সঙ্গে ঢাকার বিশ্বখ্যাত পণ্য মসলিনের উত্থান-পতনের কাহিনীও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় মোগল শাসনের শেষদিন পর্যন্ত, এমনকি তার পরেও বেশ কিছুকাল ঢাকার এই মিহি বস্ত্রটি ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হতো। সৈয়দ মুহাম্মদ তৈফুর তার ‘গ্লিম্পসেস অব ওল্ড ঢাকা’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘সোনারগাঁও বন্দর খ্যাতি অর্জন করে ঢাকার এই মসলিন বা মলমল বস্ত্রের জন্যই। এই বন্দর দিয়েই সভ্য বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মসলিন জাহাজে করে রফতানি হতো। এছাড়াও এখান থেকে শোরা ও সোহাগা বিপুল পরিমাণে রফতানি করা হতো। সমৃদ্ধ সোনারগাঁও মধ্যপ্রাচ্য ও দূরপ্রাচ্যের মুসলিমদের জন্য এক বিখ্যাত বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে বিরাজমান ছিল।’

তিনি আরো লিখেছেন, ‘ঢাকার মসলিন শিল্পে উত্পত্তির ইতিহাস সুপ্রাচীন। এ রকম দাবি করা হয়ে থাকে যে মসলিন মিসরের ফারাও বা ফেরাউনদের মমির বহিরাবরণ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এই মসলিন বস্ত্র বাণিজ্যিক বিতরণকে কেন্দ্র করে এশিয়ায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ শহর গড়ে ওঠে। এর একটি ইরাকের মসুল এবং আরেকটি ভারতের মাদ্রাজের মসুলিপত্তম। এ দুটি শহরের নামকরণের মূলে রয়েছে মসলিন। সাধারণ মসলিন এবং নানা প্রকারের মিশ্র রেশমি বস্ত্র, তসর ও তুলা পারস্য, ইথিওপিয়া, মিসর, তুরস্ক, ইতালি, দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের প্রোভেন্স এবং স্পেনে রফতানির জন্য ঢাকায় উৎপাদন করা হতো। এর ফলে ঢাকায় বিপুলসংখ্যক লোকের কর্মসংস্থান হতো। এখানে তাই উল্লেখের দাবি রাখে যে, ঢাকায় মসলিন শিল্পে দুর্দিন নেমে আসায় ঢাকা নগরীর জনসংখ্যা ১৮০০ সালের ২ লাখ থেকে ১৮৩৮ সালে মাত্র ৬৮ হাজার নেমে আসে।’

তিনি আরো উল্লেখ করেন, এমনকি ভারত উপমহাদেশের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের গোড়ার দিকেও মসলিনের গুরুত্ব বজায় ছিল। তার বর্ণনা অনুযায়ী, ‘১৬৬৬ সালে প্রথমবারের মতো মসলিন ব্রিটেনে আমদানি করা হয় এবং ব্রিটেনের বাজারে মসলিন দেখা যেতে শুরু করে। ধারণা করা হয়, উপমহাদেশে ব্রিটিশ আধিপত্য স্থাপনের দীর্ঘকাল কাটার পরও ১৭৮৭ সালে ঢাকা থেকে বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশে ৫০ লাখ রুপির মসলিন রফতানি করা হয়। তবে ১৮১৭ সালে এসে মসলিন ব্রিটেনের বাজার থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। ১৮১৩ সাল অবধি ঢাকার সুতিবস্ত্র ব্রিটেনে তৈরি কার্পাস বস্ত্রের তুলনায় ৬০ বা ৭০ শতাংশ কম দরে বিক্রি হতো। এ কারণে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বাংলার সুতি পণ্যের ওপর ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। যার সরলার্থ দাঁড়ায় বাংলার এ শিল্পের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ। ১৮৪০ সালে জেমস টেলর লিখেছেন, এমনকি আজকের এই যুগে বস্ত্র বুননের কৌশলকলা অসাধারণ নিটোল হয়ে উঠলেও মসলিন তার পরও স্বচ্ছতা, সৌন্দর্য, বুনটের অনবদ্য সূক্ষ্মতা ও পারিপাট্যে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তাদের সবচেয়ে সুন্দর বস্ত্রকেও হার মানায়। ১৮৫১ সালের দিকেও ঢাকার মসলিনের কিছু নমুনা যখন লন্ডনের প্রদর্শনীতে রাখা হয়, তখন গোটা ব্রিটিশ-সংবাদপত্র জগৎ একবাক্যে মসলিনের প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত হয়।’

ঢাকার অবক্ষয়  বস্ত্র শিল্পের দুর্যোগ

উনিশ শতকের গোড়ায় ও মধ্যভাগে ঢাকার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব কমে যাওয়ায় ঢাকার বস্ত্র শিল্পে ক্রমেই ধস নামে। গ্রেট ব্রিটেন থেকে আধুনিক মিলে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে তৈরি বস্ত্র ও পণ্য আমদানি হতে থাকার ফলে ঢাকার সুতি বস্ত্র তথা বয়ন শিল্পে সেটি এক বড় আঘাত হয়ে দেখা দেয়। ইতিহাসবিদ শরীফ উদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেছেন, ঔপনিবেশিক সরকারি প্রতিষ্ঠান শুল্ক, লবণ ও আফিম বোর্ড পরিস্থিতির মূল্যায়নের পর যে চাপে পড়ে এই মসলিন তথা বস্ত্র শিল্প ধ্বংসের পথে চলেছিল, সেই অর্থনৈতিক চাপ কমানোর জন্য নগর ও পরিবহন কর কমানোর পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে।

ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পে অবক্ষয় ও পতন নেমে এলেও আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র এবং অভ্যন্তরীণ নৌবন্দর হিসেবে নগরের গুরুত্ব অপরিবর্তিত থাকে। ঢাকা অঞ্চল সমৃদ্ধ হলেও সে সম্পদের আহরণ পর্যাপ্ত ছিল না। তবু ঢাকার ভেতরের অঞ্চল ও পরিপার্শ্ব, চারদিকের অঞ্চলের এলাকাগুলো তাদের নিজ নিজ পশ্চাদভূমি এলাকার সমৃদ্ধ ফসলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে থাকে। টেলর বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে ঢাকার আঞ্চলিক গুরুত্বের বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছেন ১৮৬০ সালে তৈরি এ অঞ্চলের একটি আমদানি-রফতানি তালিকার মাঝে। তার মতে, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ ছিল সন্নিহিত জেলাগুলোর উত্পন্ন দ্রব্যদির জন্য এক দ্রুত বর্ধনশীল বাজার। এ বিষয়ে তিনি যে বিশদ বিবরণ দিয়েছেন, তাতে ঢাকার গুরুত্বের বিষয়টি পুনরুক্ত হয়েছে। আর সেই সঙ্গে আলোকপাত ঘটেছে ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নগরীর ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের ধারাবিন্যাসের ওপর। তার লেখায় আরো জানা যায়, ‘খাদ্যশস্য ও তৈলবীজ আমদানি করা হতো সিলেট, ময়মনসিংহ ও আজকের কুমিল্লা তথা সাবেক ত্রিপুরা থেকে। আর লবণ আমদানি করা হতো চট্টগ্রাম, দক্ষিণ শাহবাজপুর (ভোলা) ও ভুলুয়া (নোয়াখালী) থেকে ঢাকার আড়তে। তারপর এই সব পণ্য চলে যেত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। তবে ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যে একদা সুতিপণ্যের যে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, তেমন আধিপত্য অবশ্য অন্য কোনো পণ্যেই আর ছিল না।’

ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পে যে মন্দা ১৮৫০-এর দশক অবধি বজায় থাকে; তার মাঝেও যে ঢাকার শিল্প-বাণিজ্য ভাগ্য ফেরার, পুনরুদ্ধারের ও বিকাশের যে উত্সাহব্যঞ্জক প্রবণতা ছিল, সেটাও বোঝা যাচ্ছিল। দেশের ভেতরে পণ্যের ওপর পরিবহন তথা পণ্য চলাচলের ওপর কর ও শহর শুল্ক ১৮৩৬ সালে বিলুপ্ত করার মতো তাত্পর্যপূর্ণ নীতিগত ব্যবস্থা ঢাকার শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের একরকম পুনর্জাগরণ ঘটার উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। ১৮৪০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ৬৮ হাজারে উন্নীত হয়। ফলে বাংলার এই অঞ্চলে ঢাকা অপেক্ষাকৃত জনবহুল নগরীর আকার নিতে থাকে। পসরাধারী ফেরিওয়ালা ব্যবসায়ী আর পণ্য বিক্রেতারা নগরীর জনসংখ্যা স্ফীত করে তোলে। আর নগরে কাজের সন্ধানে আসা কর্মজীবী ও ফসল বিক্রি করতে আসা চাষী নগরের স্থায়ী বাসিন্দাদের মাঝে মিশে যাওয়ায় ঢাকার বাণিজ্যিক তাত্পর্য আরো বেড়ে যায়। চকবাজার ঢাকার প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র, সেই মোগল আমল থেকেই। চকবাজার ছাড়াও আরো ব্যস্ত বাজারঘাট গড়ে ওঠে নগরীর বাংলাবাজার, নওয়াবপুর, ইসলামপুর ও উর্দুবাজার এলাকায়। ‘শত শত পাইকার, খুচরো পণ্য বিক্রেতা ও ছোট দোকানদারদের দোকান ও গোলা (গুদাম) ছিল। আর সেসব ব্যবসায়ীর এ ধরনের কোনো স্থায়ী স্থাপনা ছিল না তারা নদী (বুড়িগঙ্গা) ঘাট অভিমুখী সড়কের দুই ধারে খোলা আকাশের নিচে পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে।’ চারদিকের গ্রামগুলো থেকে গ্রামবাসীরা নগরে তাদের ফসল চাল, ডাল, তেল, ঘি, সবজি ও মাছ বিক্রি করতে নিয়ে আসে। তারা সাধারণত তাদের এসব পণ্যের বিনিময়ে লবণ, মসলা, কাপড় ও এ ধরনের অন্যান্য পণ্য নিয়ে ঘরে ফিরত। নগরবাসী ও মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারকদের জন্য দুধের জোগান আসত মীরপুর এলাকা থেকে। সেখানে গোয়ালারা ঢাকা থেকে দৈনিক যাওয়া-আসা করে গ্রামবাসীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দুধ সংগ্রহ করত।

ইংরেজ, গ্রিক, আর্মেনীয় ও ফরাসি, সরকারি কর্মকর্তা, নীলকর, ব্যবসায়ী, এজেন্ট ও তাদের পরিবার মিলে বেশ একটা বড় আকারের জনসমাজ গড়ে ওঠে ঢাকা ও ঢাকার আশপাশে এবং উপকণ্ঠ এলাকায়। এ রকম আর্থসামাজিক পটভূমিতে এখানে ব্যবসায়ীরা ইউরোপীয় পণ্যসামগ্রী আমদানি শুরু করেন। ১৮৫৭ সালে ‘জি এম শিরকোর অ্যান্ড সন্স’ নামে একটি দোকান প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দোকানকে ‘ইউরোপীয় পণ্যের আগার’ বলা যায়। এই দোকানে নানা ধরনের ইউরোপীয় পণ্য, যেমন— মদ, স্পিরিট, সিগার (চুরুট), শূকরের মাংস (হ্যাম/বেকন), কেবিন বিস্কিট, লজেন্স, মোমবাতি, পেটেন্ট ল্যাম্প ও সলতে, পড়ার বাতি, জুতা, পুতুল, খেলনা, কাটলারি সরঞ্জাম, মধু, সাবান, নির্যাস, শেভিং সাবান, ফ্যান্সি নোটপেপার, মনোহারি নানা দ্রব্যসামগ্রী, সসপ্যান, ফ্রাইপ্যান, ট্রাভেল ব্যাগ, গোসল করার তোয়ালে, বাথরুমের আয়না, ছাতা, বেড়ানোর ফ্যান্সি ছড়ি, বারুদ ও নানা রকমের কার্তুজ ইত্যাদি পাওয়া যেত। ভারতীয় বণিক যেমন, রূপচাঁদ দে অ্যান্ড কোম্পানি, গঙ্গাচরণ দাস অ্যান্ড কোম্পানি, ডস কোং ইত্যাদি বিখ্যাত দোকানও ১৮৬০-এর দশকে যথাক্রমে পাটুয়াটুলি, বাবুবাজার ও নলগোলায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগে ১৮৭০-এর দশকে এসব দোকানের অনুসরণে বাবুবাজারে এন.কে. চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড কোম্পানির দোকান স্থাপন করা হয়। ইউরোপীয় নানা পণ্য যেমন— জুতা, শিশুদের পোশাক-পরিচ্ছদ, বোতাম, মোজা, সুগন্ধি, পেটেন্ট ওষুধপত্র এবং ছাতা ছাড়াও এসব দোকানে দেশে তৈরি নানা পণ্যসামগ্রীও বিক্রি হতো।

ইউরোপীয় পণ্যের ব্যবসা ঢাকার জন্য নতুন বিত্তের উৎস হয়ে ওঠে। এসব পণ্য লেনদেন খাতে বহু ব্যবসায়ী প্রচুর মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হন। এসব ফ্যাশন সামগ্রী হাতের নাগালে আসায়, এই বিষয়টিও ঢাকা নগরীর আভিজাত্য ও মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়। ঢাকা পূর্ব বাংলায় স্বদেশী-বিদেশী সব ধরনের পণ্যের প্রধান সংগ্রহশালা হয়ে ওঠে। বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ার্সের লে. কর্নেল সি.জে.সি ডেভিডসন তার লেখা ডায়েরিতে ১৮৪০ সালে উল্লেখ করেন, ‘ঢাকায় নাম করার মতো মাত্র তিনটি পণ্য উৎপাদিত হয়। এক. বেহালা, দুই. শাঁখার অলঙ্কার, তিন. মূর্তি। এই সময়ে শাঁখা থেকে তৈরি আংটি ও বালা ঢাকার তৈরি প্রধান পণ্য এবং অন্যতম রফতানি পণ্যও হয়ে ওঠে।’

ঢাকার কারিগররা এ সময়ে সোনা-রুপার সূক্ষ্ম তারের কাজের বালার জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। নগরীতে এই সময়ে ৩০০ স্বর্ণকার ও রৌপ্যকার কারিগরের নিবাস ছিল। ঢাকায় তখন কিছু শিং ও হাতির দাঁতের খোদাই কাজও হতো। সাবান তৈরি হতো। কাগজ উৎপাদিত হতো আর নৌকা নির্মাণের একটা শিল্প মোগল আমলের গোড়া থেকেই ছিল।

সূক্ষ্ম নকশি সীবনকর্মও করা হতো ভারতীয় রাজরাজড়াদের দরবারে ব্যবহারের জন্য। এ বিষয়ে টেলর এক পরিপূর্ণ বিবরণ দিয়েছেন। এটি ছিল সচরাচর প্রচলিত বিলাসী হস্তশিল্প। এসব কাজ হতো বহু পারিবারিক গৃহে ও চুক্তির ভিত্তিতে। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ের মহাজনরা নানা ডিজাইনের ছাপ দেয়া কাপড় ও নকশি করা রেশমি কাপড় সরবরাহ করতেন আর সেসবের ওপর অলঙ্করণের কাজ করতেন মুসলিম মহিলারা। আর এ কাজে যে সুতা ব্যবহার করা হতো, তা তৈরি করতেন হিন্দু তাঁতিরা। তারা তৈরি করতেন সূক্ষ্ম সুতা। সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণের জন্য সাধারণ মানের প্রচুর কাপড় তৈরি হতো। তবে তত্কালীন ঢাকার কমিশনার জন ডানবার তার প্রতিবেদনে ঢাকার এই বস্ত্রশিল্পকে রক্ষা করার উপায় সম্পর্কে লিখেছেন:

‘ঢাকায় এই যে সাধারণ লোকের জন্য সাধারণ মানের বস্ত্র তৈরি হতো। তার জন্য ব্যবহূত হতো পুরোপুরি ইংল্যান্ড থেকে আমদানি করা সুতা। আর এ সুতায় তৈরি পণ্য একটা আঞ্চলিক পর্যায়ের বাজার এলাকায় বিক্রি হতো। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও বাংলার নিজস্ব বস্ত্র পণ্যের বাজার পড়ে যায়। কেননা ব্রিটেনের তৈরি সুতা দিয়ে টানাপড়েনে উৎপাদিত কাপড় খাঁটি চেহারার পরিবর্তে মিশ্র চেহারা নেয়। আর সিলেট তথা আসাম থেকে রেশম বস্ত্র হিসেবে ঢাকায় আসতে থাকে মুগা ও তসর শ্রেণীর গরদ বা রেশমি বস্ত্র। এমনি করে শেষাবধি ঢাকার বস্ত্র কারখানাগুলো মোটা কাপড়ের বিলিবণ্টন কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে থাকে। আর এসব বোনা মোটা সুতি বস্ত্র আসতে থাকে ফরিদপুর, ত্রিপুরা ও নোয়াখালী জেলা থেকে।’

গ্রেটব্রিটেন থেকে আমদানি করা কাপড় সাধারণভাবে বঙ্গদেশের ও বিশেষ করে ঢাকার বয়ন শিল্পের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে ওঠে। তার পরও ঢাকার বয়ন শিল্প তার একটা ক্ষীণ অস্তিত্ব রক্ষা করে চলতে থাকে। ব্রিটেন থেকে আমদানিকৃত সস্তা তন্তু দেশজ সুতা কারখানাগুলো রুগ্ণ থেকে রুগ্ণতর করে তোলে। অথচ এই শিল্পে এর আগে বিপুল লোকের কর্মসংস্থান হতো।

চামড়া শিল্প

সুতা ও বস্ত্রশিল্পের ক্ষেত্রে একসময় অবক্ষয় শুরু হলেও ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের আরেকটি ক্ষেত্রে ক্রমোন্নতি ঘটতে থাকে এবং একপর্যায়ে জোরালো প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়। বলা বাহুল্য, এটি হলো চামড়া শিল্প- গরু, মহিস ও ছাগ চামড়ার প্রক্রিয়াজাত শিল্প। ঢাকার আর্মেনীয়, ইরানি ও কাশ্মিরী মুসলমান ব্যবসায়ীরা ১৮ শতকের শেষ নাগাদ এই ব্যবসায়ে প্রবেশ করেন। এ শিল্পের সূচনা হয় দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বরিশালে। তবে অচিরেই এই শিল্পের কেন্দ্র ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। ঢাকা চামড়া ব্যবসায়ে এক তাত্পর্যপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে ওঠে। চামড়া প্রধানত রফতানি হতো ব্রিটেনে। ১৯ শতকের প্রথম ভাগে যেসব ব্যবসায়ী চামড়ার ব্যবসায়ে আত্মনিয়োগ করেন, তারা বিপুল বিত্তের অধিকারী হন এবং এই ব্যবসা-বণিজ্যের লক্ষণীয় প্রবৃদ্ধি ঘটে। এই ব্যবসায়ে অধিকতর বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাদের নাম আগে করতে হয়, তাদের মধ্যে রয়েছেন খাজা আলীমুল্লাহ। তিনি নওয়াব আবদুল গণির পিতা। এই ব্যবসা থেকে খাজা আলীমুল্লাহ কোটি কোটি রুপি উপার্জন করতেন বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। অধ্যাপক শরীফ উদ্দিন আহমেদ লিখেছেন, ‘কাঁচা চামড়া কেনা ও সেই কাঁচা চামড়ার মোটামুটি ধরনের কিওরিং বা পরিশোধন থেকে এক পর্যায়ে ট্যানারি স্থাপিত হয় এবং হস্তশিল্প হিসেবে জুতা তৈরির কারখানা স্থাপিত হয়। এগুলো এই শিল্পের বিকাশের ক্ষেত্রে ছোটখাটো ধাপ বটে, তবে এ শিল্প আর একটু এগোতে পারলেই ঢাকা ইংল্যান্ডের লিসেস্টারের মতো উন্নতিশীল চর্মশিল্প হিসেবে দাঁড়িয়ে যেতে পারত। কিন্তু পরিস্থিতি এ রকম একটা অনুকূল দিকে না গড়িয়ে, যারা ঢাকার তথা আজকের বাংলাদেশের এককালে চামড়া শিল্পের পথিকৃৎ, তারা মুনাফার মোটা টাকা পকেটস্থ করার পর তাদের সেই বিত্ত চর্মশিল্পের আরো উন্নতি ও অগ্রগতিতে বিনিয়োগ না করে জমিদারি কেনায় বিনিয়োগ করলেন বা অন্যান্য সম্পত্তির মালিক হলেন সমাজে নাম কেনা এবং আয়টাও সুনিশ্চিত করার জন্য। ১৮৫০ সাল নাগাদ যারা এ দেশে চামড়া শিল্পে পথিকৃৎ হিসেবে কাজ করেন সেই আর্মেনীয়, ইরানি ও কাশ্মীরিরা তাদের সনাতন চামড়া ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে প্রবল ক্ষমতাধর জমিদার হিসেবে আবির্ভূত হন।’

পাট শিল্পের উত্থান

ঢাকার বাণিজ্যিক পুনরুত্থানে পাটের গুরুত্ব অতীব তাত্পর্যপূর্ণ। প্রাকৃতিক আঁশ হিসেবে অতি প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় পাটের চাষ ছিল। গ্রামবাসীরা সুতলি ও দড়ি তৈরি, ছালা, বস্তা, নৌকার পাল ও অনেক ক্ষেত্রে বিছানা পাতার কাজে ব্যবহারের জন্যও পাটের চাষ করত। ১৭৯৫ সাল নাগাদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পাটের ব্যবহারের সুবিধা ও ভবিষ্যৎ বুঝতে পারে। তবে পাট প্রথম দিকটায় রাশিয়ার চিকন আঁশের শনের প্রবল প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে আর গোড়ার দিকে বাণিজ্যিকভাবে তেমন লাভজনক হয়ে উঠতেও পারেনি। তবু ১৮২৮ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো ৫০০ মণ (আট মেট্রিক টন) পাট ডান্ডিতে রফতানি করা হয়। ১৮৩৮ সালের দিকে নেদারল্যান্ডস সরকার কফি ব্যাগ তৈরির জন্য পাট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। এই কফি পাটের ব্যাগে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল তত্কালীন ওলন্দাজ উপনিবেশ ডাচ পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে। এতে ওই সিদ্ধান্তটি বাংলার পাটের বাণিজ্যিক সম্ভাবনার জন্য বিপুল উত্সাহের কারণ হয়। এর আগে আমরা উল্লেখ করেছি, ক্রাইমিয়া যুদ্ধের কারণে ইউরোপে, বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপে রুশ শনের রফতানি বন্ধ হয়ে যায়। এতে ইউরোপে পাটের ব্যবহারের সম্ভাবনা আরো বেড়ে যায়। এসব ঘটনাপ্রবাহ ঢাকাকেন্দ্রিক পাট বাণিজ্যের ওপর এক ইতিবাচক প্রভাব ফেলে ও এর সূচনা হয় ১৮৫৩ সাল থেকে। ব্রিটেনে বর্ধিত পরিমাণে পাট সরবরাহের কেন্দ্র বা উৎস হয়ে ওঠে এই ঢাকা ও সন্নিকটস্থ নারায়ণগঞ্জ। কলকাতার আশপাশে আধুনিক পাটকল প্রতিষ্ঠার পর পাটচাষের ব্যাপারে ব্যাপক উত্সাহের সঞ্চার হয়। পূর্ববঙ্গের চাষীরা আরো বেশি করে জমিতে পাট ফলাতে শুরু করেন। চাল ও অন্যান্য খাদ্যশস্যের উৎপাদন তাতে কিছুটা হলেও হ্রাস পায়। আর এরই ফল হিসেবে ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর ও ত্রিপুরা (কুমিল্লা) প্রভৃতি এলাকা পাট উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত হয়।

একই সঙ্গে পাট ও পাটপণ্য জাহাজ বা স্টিমারযোগে রফতানিকারক একটি শ্রেণী গড়ে ওঠে। এদের মধ্যে যেমন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ছিলেন, তেমনি কলকাতার পাটকলগুলোর বেশকিছু দালালও ছিলেন। ঢাকায় তারা জেঁকে ব্যবসা করতে থাকেন। যে পরিমাণ পাটের চালান পাঠানো হতো ও পাটের দাম যেভাবে বেড়ে যায়, তা রীতিমতো লক্ষ করার মতো। ঢাকা এই বর্ধিত সমৃদ্ধি ও বিত্ত থেকে লাভবান হয়।

১৮৭৭ সালে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট কালেক্টর এক হিসাবে দেখান যে, জেলায় ৪৩ হাজার ৬৩৬ মেট্রিক টন পাট উৎপাদিত হয়েছে। পাটের দাম উঠেছে মণপ্রতি ৩ টাকা ৭ আনায়। এর মধ্যে চাষীরা পাটের নিট দাম পেয়েছেন মণপ্রতি ৩ টাকা আর বাদবাকি ভাগাভাগি হয়েছে ব্যবসায়ী ও দালালদের মধ্যে। ম্যাজিস্ট্রেট তার পরও জানিয়েছেন, পাট থেকে যে আয় পাওয়া গেছে, তা জেলার মোট খাজনা শোধ করার জন্য পর্যাপ্ত তো বটেই এর পরও উদ্বৃত্ত থেকে যায় ৮ লাখ থেকে ১৩ লাখ রুপি। তিনি আরো উল্লেখ করেন, কৃষি খাতে এই সমৃদ্ধি আসায় গোটা পূর্ববঙ্গে উন্নত মানের খাদ্যদ্রব্য, কাপড়, ধাতব তৈজসপত্র ও গহনার চাহিদা বেড়ে যায়। ঢাকার ব্যবসায়ী ও কারিগররা এই বর্ধিত চাহিদা মেটানোর জন্য অচিরেই কাজ করতে শুরু করে দেন।

রেলওয়ে ও স্টিমার সার্ভিসের যে অবকাঠামো তখনই বর্তমান ছিল, সেটি পূর্ববঙ্গের বাণিজ্যিক রাজধানী ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্য দ্রুত বর্ধিত হওয়ার ব্যাপারে খুবই সহায়ক হয়। এছাড়া এই সময়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে নির্মাণ এবং নারায়ণগঞ্জ পাট, চাল, তেলবীজ ও চা রফতানির জন্য বিকল্প বন্দর হিসেবে কার্যকর হয়ে ওঠে।

এর আগে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকা অঞ্চলে যান্ত্রিক নৌপরিবহন, রেল পরিবহন ও টেলিগ্রাফ ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে ঢাকার সঙ্গে এর সন্নিহিত অঞ্চল, যেমন— নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহের এবং অন্যান্য দূরবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে আরো কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব উন্নতির কারণে ১৮৭০ সাল থেকে ঢাকা নগরীর বাণিজ্যিক ও শিল্পায়নের তাত্পর্য পুনরুজ্জীবনের বেলায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এই বিষয়ে ১৮৭৪ সালে এলাহাবাদ থেকে প্রকাশিত পত্রিকা পাইওনিয়ার এক প্রতিবেদনে ভাইসরয় লর্ড নর্থব্রুকের এক স্বাগত ভাষণ প্রকাশ করা হয়। তিনি তাতে বলেন, ঢাকার কেবল একটা গৌরবময় অতীতই নেই, বরং নগরীটি এখন শিক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন ও বাণিজ্যের উত্কর্ষতার কারণে পূর্ববঙ্গের বাণিজ্যিক রাজধানী বলা যায়।

এই আমলে নগরীর ব্যবসা-বাণিজ্য বেড়ে যায়। ১৮৭৬-৭৭ সাল নাগাদ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে বাণিজ্যিক লেনদেন মোট ৩ কোটি ৬৭ লাখ রুপি হয়েছে বলে রেকর্ড রয়েছে। এর তুলনায় চট্টগ্রাম ও মুর্শিদাবাদের বাণিজ্যিক লেনদেন রুপির হিসাবে ছিল যথাক্রমে ৭ লাখ ৭০ হাজার ও ১৭ লাখ ৬০ হাজার রুপি।

এই বাণিজ্যের একটা মোটা অংশ সম্পাদিত হয় কলকাতার সঙ্গে। কলকাতা বন্দরনগরীতে পূর্ববঙ্গ তথা ঢাকা থেকে পণ্য যায় মোট ৩০ লাখ ২০ হাজার রুপির। এই লেনদেন ঘটে ১৮৭৮-৭৯ মেয়াদে। অন্যদিকে রাজধানী কলকাতা নগরী থেকে ঢাকা তথা পূর্ববঙ্গে আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০ লাখ ৮০ হাজার রুপিতে। পরে যে অংকের কথা আমরা উল্লেখ করলাম, তাতে ঢাকার গুরুত্বের একটা পরিষ্কার আভাস পাওয়া যায়। কেননা, এ ধরনের লেনদেনই প্রমাণ করে ঢাকা ওই সময়ে গোটা প্রায় পূর্ববঙ্গ অঞ্চলের জন্য আমদানি পণ্য বিতরণকেন্দ্র ছিল। কেননা, আমদানি করা বহু পণ্যই আবার অন্যত্র চালান হিসেবে চলে যেত। বঙ্গের ওই সময়ের স্যানিটারি কমিশনার একজন তীক্ষ পর্যবেক্ষক হিসেবে ১৮৭৭ সালে এই মর্মে মন্তব্য করেন যে, পাটের ব্যবসা সাম্প্রতিককালে ঢাকা নগরীর ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে। এতে ঢাকা হয়ে উঠেছে পূর্ববঙ্গের বর্ধিষ্ণু, ব্যস্ত ও বাণিজ্যিক শহর তো বটেই গোটা পূর্ববঙ্গে সব ব্যবসায়ের কেন্দ্র। পাটের ব্যবসায় পূর্ববঙ্গে যে সমৃদ্ধি নিয়ে আসে, সে কারণে যুগপৎ এই অঞ্চলে ভোগ্যপণ্যের চাহিদাও বেড়ে যায়। ঢাকার ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা তা সামাল দিতে দ্রুত তত্পর হয়ে ওঠেন।

ঢাকার প্রায় সব ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ও বণ্টন করতে থাকেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। আর এই ব্যবসায়ের নিম্ন প্রান্তদেশে ছিল পড়শী জেলাগুলোর খুচরা ব্যবসায়ীদের অবস্থান, যারা ঢাকা নগরীতে আসতেন তাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য কেনাকাটা করতে আর তারপর তারা সেই পণ্য গোটা পূর্ববঙ্গের নানা স্থানে বিলিবণ্টন করে বিক্রি করতেন। বাণিজ্যের মূল শক্তি দেশের পল্লী জনপদে থাকলেও সেই কারণেই আবার খোদ ঢাকা নগরীর ভেতরে অর্থনৈতিক নবায়ন ঘটে।

অধ্যাপক শরীফ উদ্দিন আহমেদ তার বিশ্লেষণধর্মী লেখায় আরো বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় ব্যবসায়ী, সওদাগর, ব্যাংকার ও অর্থসংস্থানকারীরা ঢাকা থেকে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে চলে যাওয়ার পর আঠারো ও উনিশ শতকের গোড়ার দিকে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বণিকদের জন্য নগরীর বাণিজ্যকর্ম নিজেদের হাতে তুলে নেয়ার একটা সুযোগ আসে। অবশ্য আর্মানি, গ্রিক, কাশ্মিরী, পাঞ্জাবি ও ভারতের উত্তরাঞ্চলের মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী, যারা ঢাকায় বসতি স্থাপন করেছিলেন, তারা ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যেতেই থাকেন। আর স্থানীয় ব্যবসায়ী সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল হিন্দুরা। তারা ১৮৮০-র দশক নাগাদ দোকানদারি, পাইকারি ব্যবসা, আড়তদারি ও খুচরো ব্যবসায়ী চাল, তেল ও তেলবীজের মতো পণ্যের ব্যবসায়ে প্রধান ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। কেবল তাই নয়, এই হিন্দুদের মধ্য থেকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সুদে টাকা ধার দেয়া মহাজনের ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হয়। তারা মুদ্রার ব্যবসা, দালালির ব্যবসা ও ছোটখাটো ব্যবসাতেই অংশ নিতে থাকেন। উনিশ শতকের শেষার্ধে ঢাকায় প্রধানত হিন্দু ব্যবসায়ী শ্রেণীর উত্থান ও সম্প্রসারণ ঘটে। ক্রাইমিয়া যুদ্ধের পর এই হিন্দু ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যিক তত্পরতায় আসেন প্রধানত হিন্দুদের তিনটি বর্ণের লোকের মধ্য থেকে। তারা ছিলেন সুবর্ণবণিক, সাহা ও বসাক, যারা ধীরে ধীরে ঢাকার বাণিজ্য ও অর্থসংস্থান ব্যবসায়ে তাদের আধিপত্য সম্প্রসারণ করেন।

টেলরের মতে, ঢাকায় কেবল চার বা পাঁচটি মুসলিম ব্যবসায়ী পরিবার ছিল আর ছিল সমানসংখ্যক খ্রিস্টান ব্যবসায়ী পরিবার। প্রফেসর আহমেদ উল্লেখ করেছেন, টেলর হয়তোবা সঠিক তথ্য পাননি। হেনরি ওয়াল্টার্সের বিবরণ থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট; কেননা তিনি বলছেন, ঢাকা নগরে ১২৬টি মুসলিম ব্যবসায়ী পরিবার রয়েছে। তাছাড়া, ১ হাজার ৮০টি মুসলিম দোকানি পরিবারও রয়েছে। এমন কোনো কারণ নেই যে, মাত্র ১০ বছরেরও কম সময়ে ১২৬টি মুসলিম পরিবারের সংখ্যা পাঁচটিতে নেমে আসবে। তবু এ কথা সত্যি, এই সময়ের শুরুতে বড় মুসলিম ব্যবসায়ীদের সংখ্যা একবারেই মুষ্টিমেয় ছিল।

কাজেই আমরা যে ছবি দেখছি ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের, তাতে মুসলমানরা যে গৌণ ভূমিকায় ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ঢাকার বাণিজ্যে ‘কুট্টিদের’ একটা তাত্পর্যপূর্ণ অবস্থান ছিল বলা যায়। তারা উনিশ শতকের শেষ নাগাদ চালের খুচরা ব্যবসায়ে কার্যত একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। অধ্যাপক শরীফ উদ্দিন আহমেদ আরো লিখেছেন, ‘তাদের প্রভাব ও ক্ষমতা এতই বেশি ছিল যে, তারা সহজেই চাল গুদামজাত করে বা মজুদ করে চালের দাম বাড়িয়ে দিতে বা চালের সংকট সৃষ্টি করতে পারত। এই কুট্টিরা নিয়মিতভাবে দেশে চালের ফলন কম হলে, শস্যহানি ঘটলে বা চালের অভাবের আশঙ্কা দেখা দিলে লাভবান হতো।’

দেশী শিল্প  ব্যবসাবাণিজ্যে পরিবর্তন

ঢাকার বাজারে ইউরোপীয় পণ্যসামগ্রীর ক্রমবর্ধিষ্ণু প্রাধান্য সত্ত্বেও দেশী শিল্প ও বাণিজ্যিক পণ্যসামগ্রীও তাদের বাজারগত অবস্থান বহাল রাখে। ঢাকার স্থানীয় পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাজার পাওয়ার দাবিদার ছিল শঙ্খের তৈরি নানা পণ্য, শিং ও হাতির দাঁতের খোদাই করা দ্রব্যসামগ্রী, স্বর্ণ ও রৌপ্য অলঙ্কার ইত্যাদি।

শাঁখা শিল্প হিন্দু সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যগত ও একচ্ছত্র পেশা ও ব্যবসা। উনিশ শতকের শেষার্ধে এই শিল্প পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে এবং এসব পণ্য রফতানিও হয়। যেসব শিল্পী শাঁখার তৈরি আংটি ও বালা তৈরি করতেন, তাদেরকে শাঁখারি বলা হতো। ‘শঙ্খ’ শব্দটি তৎসম ও শাঁখা তদ্ভব শব্দ। এ শাঁখা শিল্প শাঁখারিদের একচেটিয়া শিল্প ও ব্যবসা। এই শাঁখারিরা কার্যত পূর্ব বাংলায় বহিরাগত। তাদেরকে কোনো অভিজাত হিন্দু জমিদার বা রাজন্য মাদ্রাজের বা শ্রীলংকার নিকটবর্তী উপকূলীয় অঞ্চল থেকে বর্তমান শাঁখারিবাজারে বসতি স্থাপন করান। এখনো তাদের অনেক পরিবার সেখানেই বসবাস করছে এবং কালক্রমে তারা বাঙালি হিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিবাহিত হিন্দু রমণী যাদের স্বামী বেঁচে আছেন বা এয়োতি, তারাই শাঁখার বালা পরিধান করে থাকেন। এটা তাদের বৈবাহিক পরিচয়কে তুলে ধরে। এই শ্রেণীর গ্রাহকদের শাঁখাপণ্যের চাহিদা অপরিবর্তিত থাকে। এতে ঢাকার এই শাঁখা শিল্প অন্যান্য শিল্পের প্রতিযোগিতার চাপের মুখেও টিকে আছে। তবে এই প্রতিযোগিতার কারণে শাঁখা শিল্পে একমাত্র বালা তৈরিই টিকে রযেছে। অন্যান্য অলঙ্কারজাতীয় শাঁখাদ্রব্যের চাহিদা একসময় পড়ে যায়। পাট শিল্পের উত্থানের জন্য বাংলার অর্থনীতি সমৃদ্ধতর হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আরো দামি অলঙ্কার, যেমন স্বর্ণ ও রুপার অলঙ্কারের চাহিদা বেড়ে যায়।

এতে ঢাকা নগরীতে স্বর্ণের ব্যবসা বাড়ে। কদর বাড়ে স্বর্ণকার ও রৌপ্যকারদের। ঢাকার শিল্পী-কারিগররা সোনা ও রুপার বিদ্রি বা তারের কাজ করা বালা তৈরি করতে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। নগরীতে এ ধরনের সূক্ষ্ম অলঙ্কার শিল্পীর সংখ্যা এ সময়ে ৩০০ ছাড়িয়ে যায়। শিং ও হাতির দাঁতের কিছু খোদাই শিল্পও গড়ে ওঠে। সাবান ও কাগজ তৈরি শুরু হয় আর মোগল শাসনামলজুড়ে নৌকা নির্মাণ শিল্প ঢাকার অন্যতম প্রধান শিল্প হিসেবে উন্নতি লাভ করতে থাকে।

ঢাকার বাণিজ্য  শিল্পক্ষেত্রে পরিবর্তন১৯৪৭১৯৭১

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-এর মাঝের সময়টি ঢাকা নগরীর বাণিজ্য ও শিল্প জীবনের বিবর্তনের এক তাত্পর্যপূর্ণ অধ্যায়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান এবং ১৯৪৭-এ উপমহাদেশ ভাগের পরবর্তীকালে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

ঢাকা পূর্ববঙ্গে (পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানের) রাজধানীতে পরিণত হয়। ঢাকা আবার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে তার গুরুত্ব ফিরে পায়। তার ফল হিসেবে নগরীর বাণিজ্যিক ও শিল্প সম্ভাবনার দিগন্তে এক সুবিশাল পরিবর্তন ঘটে আর তাত্পর্যপূর্ণ নানা উন্নতি সাধিত হয়।

এবারের দেশভাগের কারণে হিন্দুরা, বিশেষ করে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা ব্যাপক হারে পূর্ববঙ্গ ছেড়ে ভারতে চলে যান। পক্ষান্তরে বাঙালি ও অবাঙালি মোহাজের মুসলিমরা ভারত থেকে পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। এতে দেশের জনবিন্যাসে বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়গত যে ভারসাম্যটি ছিল, তাতে বড় রকমের পরিবর্তন সাধিত হয়। ঢাকা নগরও জনমিতি হিসেবে মুসলিমপ্রদান হয়ে ওঠে। জনসংখ্যা, রাজনীতি ও ব্যবসায়ের নেতৃত্বে হিন্দু প্রাধান্যর যে সময়টি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের বৈশিষ্ট্য ছিল, তার অবসান ঘটে। মোগল আমলে ঢাকা মুসলিমপ্রধান ও আধিপত্যময় ছিল। দেশভাগ ঢাকাকে মোগল আমলের সে অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। পরিবর্তনের চাকা ঘুরে আসাটা পূর্ণতা লাভ করে।

পাকিস্তানের ২৪ বছরে ঢাকার নগর জীবনে তাত্পর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। নগরীর জনসংখ্যা বহুগুণে বেড়ে যায়। বদলায় জনবিন্যাসও। অবাঙালি মুসলিমরা ব্যাপক হারে আসতে থাকায় ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ভারতের বিহার ও উত্তর ভারতের অন্যান্য মুসলিম সংখ্যালঘিষ্ঠ প্রদেশ থেকে মুসলমানরা আসতে থাকেন। এছাড়া পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চল থেকেও প্রশাসক, সামরিক বাহিনীর সদস্য, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ইত্যাদি শ্রেণীর লোকও ঢাকায় আসে তাদের নিজ পেশা ও ব্যবসায়িক কাজে। তবে এ পর্বেও অবাঙালি মুসলিম ব্যবসায়ীদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি ছিল অকল্পনীয়।

পাকিস্তানঢাকার বাণিজ্য  শিল্পক্ষেত্রে পরিবর্তন

নগরীর বাণিজ্য ও শিল্পের প্রাণপ্রবাহের তাত্পর্যপূর্ণ পরিবর্তনের নানা দিক পাকিস্তানের সবচেয়ে জনবহুল রাজধানী ঢাকায় প্রতিফলিত হয়। ১৯৫৬ সালে মর্গেন্ডু তার রচনায় এই অভিমত প্রকাশ করেন যে, পাকিস্তান কোনো জাতি তো নয়ই, এটাকে কোনো রাষ্ট্র বলাও খুবই কঠিন। দেশটি বিচিত্র। এর অংশ দুটি। এই দুই অংশ একে অন্য থেকে হাজার  মাইলেরও বেশি ব্যবধানে অবস্থিত। মাঝখানে রয়েছে পাকিস্তানের জন্য এক প্রতিকূল ভূখণ্ড। এর শতকরা ৫৫ জন মানুষের বাস তুলনামূলকভাবে আয়তনে অনেক ছোট পূর্বাঞ্চলে (৫৬ হাজার বর্গমাইল) আর বাকি লোকের বাস পশ্চিম অংশে, যে অঞ্চলটির আয়তন ৩ লাখ ৯৮ হাজার ২৭৩ বর্গমাইল অর্থাৎ পূর্বাঞ্চলের চেয়ে আয়তনে অনেক বড়। পশ্চিম পাকিস্তানে গম ও তুলা ফসল উৎপাদিত হয়। চালও উত্পন্ন হয়। তবে এই চালের অধিকাংশ দেশের বাইরে রফতানি করা হয়। কেননা, গমই পশ্চিম অংশের মানুষের প্রধান খাদ্য। অন্যদিকে পূর্ববঙ্গের প্রধান ফসল হলো চাল। চাল এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান খাদ্য। আরো উত্পন্ন হয় পাট ও চা। পাট পাকিস্তানের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী ফসল।

পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে তাত্পর্যপূর্ণ নৃতাত্ত্বিক সাংস্কৃতিক পার্থক্য রয়েছে, যদিও ধর্ম এক। ‘পশ্চিম পাকিস্তান’ বলে পরিচিত অংশটি নিকটপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার একটা সম্প্রসারণ বলা যায়। আর এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সন্ধান পাওয়া যায় নিকট প্রাচ্য সভ্যতায়। এই অঞ্চলের চারটি প্রদেশের লোকেরা ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলে। তবে উর্দুতে কথা বলতে সাধারণত তাদের আপত্তি নেই। এই উর্দু আসলে হিন্দুস্তানি ভাষার একটা শাখা বিশেষ। এটাকে পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ লোক যোগাযোগের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও এটা পাকিস্তানের চাপিয়ে দেয়া রাষ্ট্রভাষাও।

অন্যদিকে বাঙালিরা তাদের অঞ্চলকে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভৌগোলিকভাবে নিবিড় বলে মনে করে। দেশভাগের পরে রাষ্ট্রগত না হলেও সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিকভাবে সন্নিহিত বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের সঙ্গে আত্মিক ও ঐতিহাসিকভাবে সম্পর্কিত। তারা তাদের এই ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গৌরব করে। পাকিস্তানের অবাঙালি আধিপত্যশীল শাসক গোষ্ঠী রাষ্ট্রের একমাত্র ভাষা হিসেবে তাদের ওপর উর্দুকে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেও বাঙালিরা এর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাই বলা যায়, ১৯৪৭ সালের পাকিস্তানের নিজের মধ্যেই তার ধ্বংসের বীজ নিহিত ছিল। এটাকে আমরা প্রায় হেগেলের সংলাপ হিসেবেই ধরে নিতে পারি।

পাকিস্তানের অবাঙালি অভিজাত শাসকবর্গ, যাদের বৃহৎ অংশ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক এবং যারা প্রধানত পাঞ্জাবি। তারা পাকিস্তানি রাষ্ট্র কাঠামোর জন্য একটা ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা তৈরি করার চেষ্টা করে। এভাবে পশ্চিম পাকিস্তান কার্যত হয়ে পড়ে মূল মাতৃভূমি, আর পূর্ববঙ্গ তার উপনিবেশে পর্যবসিত হয়। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল করাচিতে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত। তারপর সে রাজধানী পশ্চিম পাকিস্তানেরই রাওয়ালপিণ্ডি-ইসলামাবাদে স্থানান্তরিত হয়। তিনটি সশস্ত্র বাহিনীর সদর দপ্তর, আর্থিক রাজধানী করাচি (যেখানে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও মূলধন বাজার রয়েছে বরাবরই) এসব কিছুই অবস্থিত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা দেশের আমলাতন্ত্র ও প্রতিরক্ষা বিভাগে যেমন আধিপত্যশীল ছিল, তেমনি বাণিজ্য ও শিল্পে তারাই ছিল প্রধান ও অগ্রগণ্য। পূর্ববঙ্গের একমাত্র শক্তির উৎস ছিল তার বিপুল জনসংখ্যা। যদি পাকিস্তানে কোনো সত্যিকারের ফেডারেল রাষ্ট্র ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হয়তো তার বিপুল জনসমষ্টি অর্থবহ হতে পারত। কিন্তু বাস্তবে যা দেখা যায়, পাকিস্তান একটা ফেডারেশন কেবল কল্পনাতেই সম্ভব, আশাও করা যায়। কিন্তু কখনো তা বাস্তবতায় পরিণত হবে এমন সম্ভাবনা ছিল না। পাকিস্তানের গোড়ার দিকের ‘পার্লামেন্টরি আমলে’ (১৯৪৭ থেকে অক্টোবর ১৯৫৮ পর্যন্ত) কার্যকরী কোনো সংবিধানের অভাবে অবাঙালি আধিপত্যশীল শাসনই মুখ্য হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি সামরিক একনায়কতন্ত্র দেশ শাসন করে। ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬৯-এর মার্চ অবধি পূর্ব বাংলাকে চরমভাবে উপেক্ষা করে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব সেনা সমর্থনপুষ্ট পশ্চিম পাকিস্তানি সিভিলিয়ান শাসক অভিজাতবর্গ দিয়ে দেশ পরিচালনা করেন। পাকিস্তানের তৃতীয় ও অন্তিম পর্যায়ের ইতিহাসে (মার্চ ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১) দেশ শাসিত হয় ‘ইয়াহিয়া খান’ নামক আরেক জন সামরিক একনায়কের হাতে। তিন দেশ পরিচালনা করেন একই শাসক অভিজাতবর্গের প্রতিনিধি হিসেবে।

পূর্ববঙ্গের ওপর এই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আধিপত্যের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলে এ দেশের ওপর নিদারুণ অর্থনৈতিক শোষণও। ১৯৬৯-৭০ নাগাদ পশ্চিম পাকিস্তানে মাথাপিছু আয় পূর্ব বাংলার তুলনায় ৬১ শতাংশ বেশি ছিল। পূর্ব পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় সরকারের সর্বোচ্চ মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১৯৬৫-৬৬ থেকে ১৯৭০ মেয়াদে ৩৬ শতাংশ। বেসরকারি খাতে পূর্বাঞ্চলে বিনিয়োগের অংশ দাঁড়ায় ২৫ শতাংশেরও কম। এছাড়া পূর্বাঞ্চল থেকে পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলে নিট সম্পদ স্থানান্তরের পরিমাণ সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ১৯৪৮-৪৯ থেকে ১৯৬৮-৬৯ মেয়াদে আনুমানিক ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। পূর্বাঞ্চলের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার আকারে এই সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে সরানো হয় পশ্চিমাঞ্চলের আমদানির চাহিদা পূরণের নামে ও পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নের ক্ষেত্রে অর্থ জোগানোর জন্য।

পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈষম্যের অন্যতম প্রধান প্রভাবটি দৃশ্যমান হয় পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুত অর্থনৈতিক পশ্চাত্পদতায় ঢাকার বয়নশিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অবনতির মাঝে।

তবে পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থানরত কায়েমি স্বার্থ পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করা সত্ত্বেও এবং একই কারণে পূর্ব পাকিস্তান অর্থনৈতিক উন্নয়নে দৃষ্টিগ্রাহ্য বৈষম্য দেখা দেয়ার পরও দেশের পূর্বাঞ্চল কিছুটা অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করে। ১৯৪৭ সালে ভারতবিভাগ এবং পূর্ববঙ্গ প্রদেশের ‘পূর্ব পাকিস্তান’ হিসেবে পুনর্গঠনের ফলে সেটা পূর্বাঞ্চলের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটা তাত্পর্যপূর্ণ উদ্দীপকের কাজ করে। ঢাকা নতুন প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে প্রাণবন্ত অর্থনৈতিক নবায়ন ও কর্মচাঞ্চল্য প্রত্যক্ষ করে। ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পক্ষেত্রটি যথেষ্ট উত্সাহিত হয়। এই নগরীর সঙ্গে সমুদ্রবন্দর শহর চট্টগ্রাম এবং অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা যথেষ্ট উন্নতি ঘটে।

ঢাকায় আর্থিক ও ব্যাংকিং তত্পরতারও পুনরুজ্জীবন ঘটে। ১৯৪৭ সাল থেকে ৬০-এর  দশকের শেষ নাগাদ ১৩টি স্থানীয় ব্যাংক, পাঁচটি বিদেশী ব্যাংক ও চারটি বীমা কোম্পানি তাদের কর্মক্ষেত্র ঢাকায় পরিচালনা এবং সম্প্রসারণ করে। অনেক সরকারি দপ্তর, যাদের অনেকগুলোই ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কিত, ঢাকায় খোলা হয়। বেশ কয়েকটি বিপণীকেন্দ্র (যেমন— ঢাকার নিউমার্কেট ও গুলশান শপিং কমপ্লেক্স) ও খাদ্যশস্যের বাজার খোলা হয়। এছাড়া ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পুরনো ব্যবসাকেন্দ্রগুলো তো ছিলই। দেশের বড় বড় আমদানিকারকও ঢাকায় তাদের সদর দপ্তর না খুললেও অন্তত শাখা অফিস খোলে। [ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি প্রকাশিত ঢাকার বাণিজ্যিক ইতিহাস বই থেকে নেয়া]

লেখকমীজানূর রহমান শেলী,সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

 

 

সূত্র: বণিক র্বাতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ