উদাসীনতায় ব্যবস্থা বদলাবে না

৩০ জানুয়ারি একটি দৈনিকে দেশের কারাগারগুলোর চিত্র ফুটে উঠেছে কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। কারা অভ্যন্তরে দিন কাটে যেভাবে; আসামি জানে না মামলা কিসের; কারাবন্দিদের জবানিতে জেল জীবন; এক প্রবাসী নারীর জেল অভিজ্ঞতা; গারদে খাবার ছাড়া বন্দিদের দিন; কারাফটকে যে চিত্র নিত্যদিনের- এই শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা এক কথায় যেমন অমানবিক, তেমনি প্রশ্নবোধকও বটে। অতীতেও পত্রিকার প্রতিবেদনে দেখেছি, বন্দি আধিক্যে অমানবিক এক পরিবেশ বিরাজ করছে কারাগারগুলোতে। নানারকম অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার খবরও সচেতন মানুষমাত্রই জানা। তবে ভুক্তভোগীদের এসব ব্যাপারে যে তিক্ত অভিজ্ঞতার চিত্র ফুটে উঠেছে ওই প্রতিবেদনগুলোতে, তাতে এও বলতে হয়, উন্নত দেশে কারাগারকে সংশোধনাগার বলা হলেও আমরা এ থেকে এখনও অনেক দূরেই রয়ে গেছি। অসাধু কর্মকর্তা, কারারক্ষীদের নানারকম অনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবরও ইতিপূর্বে পত্রপত্রিকায় কম প্রকাশিত হয়নি।

আমাদের দেশের কারাগারগুলোতে সাধারণ বন্দিরা কোন অবস্থায় বসবাস করে থাকেন, এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে মাঝেমধ্যে খবর প্রকাশিত-প্রচারিত হয়। এছাড়া কারাগার থেকে ফেরত আসা অনেকের মাধ্যমেই কারাবন্দিদের কারাবাস চিত্রও পাওয়া যায়। বন্দিদের আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমেও তথ্যগুলো কারাগারের বাইরে এসে থাকে। ৩০ জানুয়ারি ওই দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। এসব বিষয়ে আরও গভীরে দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। দেখা যাবে রাষ্ট্র, কারাগার ও সমাজে বিদ্যমান নানারকম অসঙ্গতির চিত্র।

রাষ্ট্রের মতো কারাগারও একটি অনপনেয় দ্বন্দ্বের মুখচ্ছবি। দ্বন্দ্বটা রাষ্ট্রের সঙ্গে অপরাধের। অপরাধমাত্রই একটি কার্য বটে; কিন্তু কার্য তো ঘটে না কারণ না থাকলে। রাষ্ট্রের পক্ষে তাই দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়ার কথা উভয়ের সঙ্গেই- যেমন কার্যের সঙ্গে, তেমনি কারণের। রাষ্ট্র বলে, সমাজে অপরাধ থাকবে না, সব অপরাধ নির্মূল করা হবে। তার অর্থ নিশ্চয়ই এই যে, কার্য থাকবে না, কারণও থাকবে না। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে দেখা যায়, রাষ্ট্র ব্যস্ত শুধু অপরাধের ঘটনা নিয়ে। অপরাধীদের ধরে আনে, শাস্তি দেয়। জেলে ফেলে রাখে। কিন্তু পেছনের কারণটা দেখে না কিংবা দেখতে চায় না। বরঞ্চ বলা যাবে, রাষ্ট্রের কর্তারা কেউ কেউ অপরাধ দেখলে দুঃখিত না হয়ে খুশিই হয়। একাংশ তো অবশ্যই। সেই অংশ, যে অংশ

অপরাধ নিবারণের সঙ্গে যুক্ত। স্বার্থ বড়ই কঠিন নিয়ামক। বিবেকহীন।

অপরাধের শাস্তি দাও, অপরাধীকে করুণা করো, এই বাণী ধর্মগ্রন্থে আছে। সমাজেও প্রতিনিয়ত পাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে ব্যবস্থা ভিন্ন রকম। সমাজে মানুষ অপরাধীকেই ধরে এবং পারলে মারে। রাষ্ট্রও ওই একই কাজ করে। ধরে শাস্তি দেয়। কারাগারে পাঠায়। প্রশ্ন থেকে যায়, অপরাধ ও অপরাধীকে কি আলাদা করা সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব বৈকি। অপরাধ ও অপরাধীর সম্পর্কটা নর্তক ও নৃত্যের মতো সম্পর্ক নয়, অপরাধীর পেছনে কার্যকারণ অনুসন্ধান করলে অপরাধের কারণ দেখা যাবে এবং অপরাধের শাস্তি দেওয়া বলতে যা বোঝায়, তা আসলে ওই কারণকে নির্মূল করা ছাড়া অন্য কিছু নয়। দেখার কাজটা সহজে হয় না। প্রধান অন্তরায় আগ্রহের অভাব। অপরাধীকে পাকড়াও করা যে সহজ তা নয়; কিন্তু অপরাধের কারণ অনুসন্ধান এবং তার নির্মূলকরণ অবশ্যই কঠিনতর। অপরাধী দেখলে সমাজ তাই চিৎকার করে, রাষ্ট্রও তাই করে, পারলে ধরে আনে। যদিও সবসময় নয়। ওদিকে অপরাধের ক্ষেত্রটা কিন্তু রয়েই যায়। সেখানে নতুন নতুন অপরাধ ও অপরাধীর জন্ম হয়। উপচে পড়ে কারাগার। মান নেমে যায় কারা ব্যবস্থাপনায়। কারাবন্দিরা জর্জরিত হতে থাকে।

দ্বন্দ্বের মীমাংসা হয় না। জয় হয় না রাষ্ট্রের। দূর হয় না অপরাধ। রাষ্ট্রের জন্য সেটা বড় রকমের ব্যর্থতা। কেননা রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ অপরাধ দমনে। তার অস্তিত্বের প্রধান শর্তগুলোর একটি হচ্ছে ওই দমন। নাগরিকদের নিরাপত্তা দেবে, তারা যাতে নিশ্চিন্তে থাকতে পারে তার ব্যবস্থা করবে। এটা রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু রাষ্ট্র সেটা পারছে না করতে। ব্যর্থতা নয়, বলতে হয়, এ হচ্ছে অপরাধ। রাষ্ট্র অপরাধী হয়ে পড়ে নাগরিকদের কাছে। কেননা অপরাধ তো কমছেই না, বরঞ্চ কেবলি বাড়ছে। যে রাষ্ট্রে যত বেশি অপরাধ, সে রাষ্ট্রে তত বেশি অপরাধী।

সমাজে আমরা পাপ-পুণ্যের কথা শুনি। সেটা ভিন্ন ব্যাপার। পাপ-পুণ্য ব্যক্তিগত। অপরাধ বিষয়টা কিন্তু সামাজিক। পাপ করলে শাস্তি ঈশ্বর দেবেন কিংবা ব্যক্তি নিজেই দেবে নিজেকে, পীড়িত হবে বিবেকের কশাঘাতে। কিন্তু অপরাধের শাস্তির জন্য ঈশ্বর কিংবা ব্যক্তিগত বিবেকের ওপর নির্ভর করা যায় না; সেখানে সমাজকে এবং সমাজের কর্তৃপক্ষ যে রাষ্ট্র তাকে ডাকতে হয়। কিন্তু রাষ্ট্র পারে না। অনেক সময়ই ব্যর্থ হয় উপযুক্তরূপে সাড়া দিতে। যার দরুন ব্যক্তি নিজেই যেতে চায় এগিয়ে, সুবিচার পাবে না মনে করে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে। মানুষ অপরাধ কেন করে, সে প্রশ্নের দিকেও তো তাকাতে হবে, নইলে অপরাধ নির্মূল করা যাবে কী করে? মানুষকে দেবতা বলা অন্যায়। মানুষের মধ্যে একটি ইতর প্রাণী আছে। সেই প্রাণীটি বড়ই স্বার্থপর, যে অন্যেরটা ছিনিয়ে নিতে চায়, হিংসা করে, কাতর হয় ঈর্ষার। পীড়ন করে দুর্বলকে। অপরাধের বীজ রয়েছে ওই স্বভাবের ভেতরেই। সেটা ঠিক। কিন্তু ঠিক এটাও যে, মানুষের মধ্যে মহত্ত্বও রয়েছে। সেই মহত্ত্বকে বিকশিত করার জন্যই সমাজ। পরিবারই প্রথমে দায়িত্ব নেয়; কিন্তু পরিবার সমাজেরই অংশ, সমাজ দ্বারাই সে নিয়ন্ত্রিত। আর রাষ্ট্রের হাতে রয়েছে আইন, আছে আইন প্রয়াগের ব্যবস্থা। সমাজ যদি মানুষকে মানুষ করে না তোলে, তবে সে অপরাধী, রাষ্ট্রও অপরাধী সেই সঙ্গে। সমাজে যদি অন্যায় থাকে এবং অন্যায়ের যদি শাস্তি না হয়, তাহলে মানুষের মানুষ হওয়া কঠিন হয়। সহজ হয় অপরাধী হওয়া। দোষীদের জেলখানায় পাঠানো হবে, এটাই নিয়ম। তিনটি যুক্তি থাকে এই কাজের পেছনে। শাস্তি, নিবারণ ও সংশোধন। দুষ্ট ব্যক্তিটি অপরাধ করেছে, ধরা পড়েছে, প্রমাণ হয়েছে, সাজা পেয়েছে, এখন সে থাকবে কারাগারে। যারা তাকে আটকে রাখছে, তাদের মধ্যে একটা প্রতিহিংসাপরায়ণতা যে কাজ করে না, তা নয়। করে। তারা নিজেদের উন্নত মনে করেন। আশা করেন শাস্তি দেওয়ার ফলে অপরাধ কমবে। যে ব্যক্তি শাস্তি পেয়েছে, সে আর ওই পথে যাবে না। ভয়ে। অন্যরা দেখে শিখবে। অপরাধ করা থেকে দূরে থাকবে। আশা থাকে সংশোধনেরও। কয়েদি যখন ছাড়া পাবে, তখন সে বেরিয়ে আসবে উন্নত মানুষ হিসেবে।

বাস্তব ক্ষেত্রে এই ঘটনা ঘটে সবচেয়ে কম। জেলখানা সংশোধনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে না। বরঞ্চ উল্টো দায়িত্ব পালন করে। কয়েদির গায়ে এমন দুরপনেয় ছাপ মেরে দেয় যে, সে যখন বেরিয়ে আসে, তখন উন্নত নয়, অবনত হয়েই বের হয়। সমাজে সে সম্মান পাবে আশা করে না। কেউ তাকে বিশ্বাস করতে চায় না। কাজ দেয় না। ফলে ক্ষিপ্ত হয়ে আবার সে অপরাধ করে। আবার জেলে যায়। আর নিবারণ? কারাভোগীর সংখ্যা তো কেবল বাড়ছেই, তাতে তো প্রমাণিত হচ্ছে না যে, দণ্ড পেয়ে কয়েদি ভীত হচ্ছে কিংবা অন্যরা অপরাধ করতে ভয় পাচ্ছে। সমস্যাটা এই যে, বিদ্যমান ব্যবস্থায় অন্য সবকিছুর মতো আইনের শাসনও যেন পণ্যে পরিণত হয়েছে। বড় অপরাধী ধরা পড়ে না। ধরা পড়লেও ছাড়া পেয়ে যায়। টাকার জোরে। ঘুষ দেয়। নামিদামি উকিল রাখে।

জেলখানায় গেলেও ধনী অপরাধী ভালো থাকে গরিব অপরাধীর তুলনায়। আর ধনী অপরাধীরাই হচ্ছে বড় অপরাধী; বড় বড় মাপের অপরাধী। অন্যের সম্পদ অপহরণ করা অপরাধ। ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা অপরের টাকা। সেই টাকা যারা মেরে দিচ্ছে, তাদের শাস্তি হয়েছে বলে কেউ শোনেনি। বরঞ্চ লোকে দেখেছে, তারাই দাপটে চলে। অভিজ্ঞতা সাক্ষ্য দেয়, রাষ্ট্রক্ষমতা অপহরণ যেন অপরাধ নয়, অপরাধ পকেট মারা- এই যদি হয় রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি, তাহলে কে কার বিচার করে, শাস্তি দেয়!

কারা সংস্কার যতই করা হোক, কারাগার কারাগারই থাকবে, ওপরে তুললেও নিচে নেমে যাবে। ঘুষ, দুর্নীতি, বরাদ্দ, অপহরণ, স্থানাভাব- এসব সহজেই ঘটতে থাকবে। কারা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়, কারা কমিশন গঠিত হয়। কিন্তু কারাগার যেখানে ও যে অবস্থায় থাকার, সেখানেই থাকে। ওঠাতে চাইলেও ওঠানো যায় না। শাস্তি তো দিতেই হবে এবং শাস্তি দিতে হলে জেলে পাঠানো ছাড়া উপায় কী? যত বেশি পাঠাবেন, ততই অবনতি হবে কারাবন্দিদের অবস্থার। রাষ্ট্রের জন্য নিশ্চয়ই আরও বড় বড় কাজ রয়ে গেছে। যে রাজনীতিকরা একসময় জেল খেটেছেন, বাইরে এসে তারাও জেলখানার দুরবস্থার বিষয়টা ভুলে যান। সেটাই স্বাভাবিক। কেননা তাদের জন্য আরও জরুরি কাজ রয়ে গেছে। ক্ষমতা দখল করা, পারলে বিরোধীদের জেলে পাঠানো- এসব সোজা কাজ নয়। এই বিষয়গুলো যেন তাদের

অত্যন্ত ব্যস্ত রাখে।

কারা সংস্কার জরুরি, আরও জরুরি সমাজ সংস্কার। সংস্কারে যে কাজ হবে তাও নয়, প্রয়োজন হচ্ছে সমাজ বিপল্গব। অর্থাৎ সেই রকম সমাজ প্রতিষ্ঠার, যেখানে অন্যায় থাকবে না, বৈষম্যের অভাব ঘটবে এবং মানুষ তার মনুষ্যত্বকে বিকশিত করে উচ্চতর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে। শত্রুতা থাকবে না, থাকবে মৈত্রী। নির্মূল হবে অপরাধের কারণ। সমাজের এই পরিবর্তনের জন্য আবশ্যক হবে রাষ্ট্রের চরিত্রে পরিবর্তন আনা। অপরাধীদের বিষয়ে সব সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। টলস্টয় খুবই ব্যথা পেয়েছিলেন লন্ডন শহরে আসামিদের প্রতি পথচারীদের আচরণ দেখে। তিনি দেখলেন, লোকে পারলে মারে, ঢিল ছুড়তে চায়, শাস্তি দিতে আগ্রহী। রুশ দেশে তিনি দেখেছেন ভিন্ন ব্যাপার। সেখানে অপরাধী দেখলে লোকে করুণা করে, বিষণ্ণ হয়, ভাবে- ওই বিপথগামীরা শাস্তির নয়, সহানুভূতির পাত্র। এসব পার্থক্য নানা ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কারণেই ঘটে। যেমন আমরা। আমরা অপরাধী দেখলে মারতেও যাই না, চোখের পানিও ফেলি না। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা মোটামুটি উদাসীনতার। কারণ রয়েছে।

কারাগারে বন্দিরা কেমন আছে, সে বিষয়েও উদাসীনতা আমাদের। উদাসীনতায় ব্যবস্থা বদলাবে না। আমরা প্রত্যেকেই কারাগারে আছি, বন্দিত্বের নানা যন্ত্রণায় ছটফট করছি- এই বোধ উদাসীনতাকে বৃদ্ধি করছে। কিন্তু তাতে সমাজ বদলাবে না; রাষ্ট্র যেমন আছে, তেমনি থাকবে কিংবা আরও খারাপ হবে এবং বন্দিরা বন্দিই রয়ে যাবে- যেমন জেলখানায়, তেমনি জেলের বাইরে।

ভ্রম সংশোধন

১২ ফেব্রুয়ারি সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগে ড. মইনুল ইসলামের ‘ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন জরুরি’ শিরোনামের লেখাটিতে ‘রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক এবং অগ্রণী ব্যাংকের সঙ্গে অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে একীভূত করলে তেমন নেতিবাচক অভিঘাতের সৃষ্টি হবে বলে মনে হয় না’- এই বাক্যে অনবধানবশত রূপালী ব্যাংক ছাপা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে লেখক অন্যান্য ব্যাংকের সঙ্গে সোনালী, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংক একীভূত করার কথা বলেছেন। এই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত। -বি.স.

লেখক:সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী,শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্নেষক

 

 

 

সূত্র: সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ