একুশে ও তার বিচিত্র অনুষঙ্গ

পাকিস্তানি আমলের পূর্ববঙ্গে সংগঠিত রূপে ভাষা আন্দোলনের প্রকাশ ১৯৪৮-এর মার্চ মাস থেকে। এর সর্বজনীন, ব্যাপক জনপ্রিয় প্রকাশ ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারিতে। প্রথম আন্দোলনটি ছিল সীমাবদ্ধ চরিত্রের, বিশেষ করে ঢাকা শহরে। মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের সঙ্গে আট দফা চুক্তিতে সে আন্দোলন স্থগিত করে তমদ্দুন মজলিস প্রভাবিত তৎকালীন সংগ্রাম পরিষদ। উদ্দেশ্য পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকা সফর নিরুপদ্রব করা।

এ সিদ্ধান্ত ছিল এক মারাত্মক ভুল। কারণ তুঙ্গ পর্যায়ের আন্দোলন একবার স্থগিত করলে এর প্রাণশক্তি, চালিকাশক্তি নষ্ট হয়ে আন্দোলন স্থবির হয়ে পড়ে। সহজে একে আর সচল করা যায় না। কথাটা বলেছিলেন মোহাম্মদ তোয়াহা, তাঁকে সমর্থন করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। কিন্তু সংগ্রাম কমিটির বাকি সদস্যরা তাঁদের আপত্তি মানেননি। ‘কায়েদে আজমের আগমন’ বলে কথা।

এ ভুলের ফলাফল নেতিবাচকই হয়েছিল, চার বছর সময় একুশের বিস্ফোরণ ঘটতে। ১৯৪৮-এর আন্দোলনের চরিত্র ছিল পিকেটিং ধরনের। যেমন ঢাকায় তেমনি কোনো কোনো শহরে। তবে যশোরের মতো দু-চারটি শহরে আটচল্লিশ বেগবান প্রতিবাদী স্রোতধারা তৈরি করেছিল। অন্যদিকে বেশ কিছুসংখ্যক শহরে ১৯৪৮-এর মার্চ কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারেনি। ঢাকায় তো আন্দোলন স্তব্ধ ১৫ মার্চ থেকে। শেখ সাহেবের (শেখ মুজিবুর রহমানের) চেষ্টা (১৬ মার্চ) ফলপ্রসূ হয়নি।

তমদ্দুন মজলিস তাদের এ ভুলের মাসুল গুনেছে। ঢাকায় একুশের (১৯৫২) আন্দোলনে তাদের কোনো প্রভাব ছিল না, নেতৃত্বে তো নয়ই। সীমাবদ্ধ এ আন্দোলন থেকে ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারিতে পৌঁছে একুশের যে আন্দোলন, তা নিজ গুণে সমগ্র প্রদেশে ছড়িয়ে গিয়েছিল। শহর থেকে গ্রামে এর বিস্তার। এক গ্রামের আন্দোলনে পাশের গ্রামের মানুষ এসে যোগ দিয়েছে।

কেন? মূল কারণ একটাই। ঢাকায় ছাত্র-জনতার সমাবেশে পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং কয়েকজন ছাত্র-অছাত্র হতাহত। এ খবর সারা প্রদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত দাবানল তৈরি করেছিল। হতবাক করে ফেলেছিল প্রশাসনকে। তাই চলছে পুলিশের চরম দমননীতি। মিছিলে-সভায়-সমাবেশে লাঠিচার্জ, টিয়ার শেল বর্ষণ, গ্রেপ্তার ইত্যাদি। কিন্তু দমাতে পারেনি প্রতিবাদী ছাত্র-জনতাকে।

দুই.

একুশের ভাষা আন্দোলন ছিল প্রকৃতপক্ষে মাত্র সাত দিনের—একুশে  ফেব্রুয়ারি থেকে আটাশে ফেব্রুয়ারি, বিশেষভাবে শহর ঢাকায়। যদিও ৫ মার্চ ঢাকায় হরতাল আহ্বান করা হয়েছিল, তা খুব একটা সফল হয়নি নানা কারণে। কিন্তু ঢাকার বাইরে অনেক শহরে মার্চের প্রথম সপ্তাহজুড়ে আন্দোলন অব্যাহত থেকেছে।

এ আন্দোলন ঢাকায় চারটি চরিত্র বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত ছিল। প্রথমত, ছাত্র যুবসমাজে এর স্বতঃস্ফূর্ততা। ছাত্রসমাজ (সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদে) মুসলিম লীগ নেতাদের উর্দু রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় প্রতিবাদে সরব হয়। আর একুশের মূল আন্দোলন শুরু প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের ঘোষণায় যে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুই হতে যাচ্ছে।’

এ ঘোষণায় ঢাকার ছাত্রসমাজে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া-সূচনায় রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা গৌণ। তার মধ্যে একপর্যায়ে আপসবাদিতার প্রকাশও ঘটেছে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক নেতাদের পিছুটানের বিপরীতে সাধারণ  ছাত্রসমাজের অটল-অনড় মনোভাব ও সক্রিয় তৎপরতা আন্দোলন নিশ্চিত করেছিল। নেতাদের চেয়ে সাধারণ ছাত্রদের প্রতিবাদী ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

এরপর যে ঘটনাটি একুশের আন্দোলনকে বেগবান ছাড়পত্র দিয়েছিল, তা হলো ঢাকা শহরে আরোপিত ১৪৪ ধারার নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনে ছাত্রসমাজের অনমনীয় মনোভাব। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতাদের ছিল আপসবাদী, সুবিধাবাদী মনোভাব। তাঁরা ছিলেন ১৪৪ ধারা ভাঙার বিরুদ্ধে। একই ভূমিকা সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের। কারণ তাদের সামনে ছিল নির্বাচনের রাঙা মুলা। তাই বলা হয়, ১৪৪ ধারা না ভাঙা হলে একুশে প্রকৃত একুশে হতো না।

তবে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঢাকায় পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিক্রিয়া। যে গুলিতে কয়েকজন ছাত্র-অছাত্র নিহত হয়। জ্বলে ওঠে আগুন। এবং তা প্রদেশজুড়ে। ভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে গুলিবর্ষণের সংবাদ যখনই যে শহরে বা গ্রামাঞ্চলে পৌঁছেছে, ঠিক তার পরদিন থেকেই শুরু হয়েছে ছাত্রসমাজের প্রবল প্রতিক্রিয়া-কর্মসূচি। ধর্মঘট, মিছিল, সভা-সমাবেশ।

তিন.

একুশের ভাষা আন্দোলনে পুলিশের গুলিবর্ষণ তাই একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। পুলিশ প্রশাসনের এই অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত এবং তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আন্দোলনের চরিত্রবদল ঘটায়। একদিকে ছাত্র যুবমহলে প্রবল সরকারবিরোধী প্রতিক্রিয়া এবং সেই সঙ্গে আন্দোলনের বিস্তার মহকুমা শহর, থানা ইউনিয়ন হয়ে গ্রাম পর্যায়ে।

বিস্ময়কর যে দূর প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুলছাত্ররা পর্যন্ত এ সংবাদের প্রতিক্রিয়ায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনের সূচনা ঘটায়, দল বেঁধে ক্লাস বর্জন করে রাস্তায় নেমে পড়ে—মুখে স্লোগান : ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘খুনি নুরুল আমিনের বিচার চাই’, ‘পুলিশের জুলুম চলবে না’ ইত্যাদি। আরো অবাক কাণ্ড যে স্কুলের নবম-দশম শ্রেণির রাজনীতিমনস্ক ছাত্ররা নিজ উদ্যোগে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠন করে আন্দোলন পরিচালনা করেছে। তাদের অনেকে এ জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শাস্তি পেয়েছে, কেউ কেউ স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। যারা বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারেনি তাদের ভবিষ্যৎ জীবন নষ্ট হয়েছে। বলা বাহুল্য, এরা নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা নিম্নবর্গীয় পরিবারের সন্তান। দেশব্যাপী উদাহরণ অনেক।

একুশের ভাষা আন্দোলনের বিস্তারিত বিচার-বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ চারটি মূল সূত্রের ওপর নির্ভর করে ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারি তথা একুশের ভাষা আন্দোলন ঐতিহাসিক তাৎপর্য অর্জন করেছে এবং পূর্ববঙ্গের গণতান্ত্রিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। সেই সঙ্গে এসেছে একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস পালন—ভোরে খালি পায়ে ছাত্রদের প্রভাতফেরি, কণ্ঠে একুশের গান, মিছিল ও জনসভা—সে এক মহতী অনুষ্ঠান, যা পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের খেয়ালখুশি মতো পরিবর্তিত হয়েছে, যা প্রায়শ যুক্তিসংগত ছিল না।

এ আনুষ্ঠানিকতা ঢাকা থেকে ছড়িয়ে গেছে প্রদেশের দূর শহরে, এমনকি গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাঙ্গন পর্যন্ত। তৈরি করেছে একুশের পবিত্র ঐতিহ্য, যা ক্রমেই হয়ে উঠেছে জাতীয় চরিত্রের। প্রেরণা জুগিয়েছে ভবিষ্যৎ আন্দোলনের, উদ্ভব ও বিকাশ ঘটিয়েছে ষাটের দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার। এ চেতনা সে সময় একপর্যায়ে ব্যাপক আবেগের সৃষ্টি করেছিল এবং তা শ্রেণি-নির্বিশেষে।

চার.

তবে একুশের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ অনুষঙ্গ শহীদ মিনার, যা আবারও বলি ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে তৈরি করা হয় শহীদদের স্মরণে। একুশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে বাইশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে প্রতিটি মিছিলে উচ্চারিত হতে থাকে নতুন স্লোগান : ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক’। সেই স্লোগান ছাত্রদের চেতনায় নতুন প্রেরণা জুগিয়েছে।

তাদের উদ্যোগে ঢাকা, রাজশাহী, নড়াইল প্রভৃতি শহরে ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে শহীদ স্মরণে তৈরি করা হয় ছোটখাটো শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। এর মধ্যে ঢাকায় মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে পরিকল্পিতভাবে নির্মিত শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক চরিত্রের। পরিপাটি করে নির্মিত এ স্থাপত্যটি পুলিশ ভেঙে ফেলে ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে হোস্টেল ঘেরাও করে।

এই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সময় ১৯৫২ থেকে পরবর্তী বছরগুলোতে পুলিশের সঙ্গে বাদ-প্রতিবাদে দেশের শহরে-গ্রামে গড়ে উঠেছে শহীদ মিনার—প্রতিবাদ ও আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে এবং তা ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে। মিনার প্রধানত গড়া হয়েছে শিক্ষায়তন প্রাঙ্গণে। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি রাতের অন্ধকারে সেগুলো ভেঙেছে, ছাত্ররা আবার তা গড়েছে অনুরূপ ভাষিক আবেগে।

ভাষা আন্দোলন, বিশেষভাবে ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন অর্থাৎ একুশে এভাবে জাতীয় জীবনে ইতিহাস রচনা করেছে। সে ইতিহাস প্রতিবাদের, আন্দোলনের জন্য প্রেরণার। সে ইতিহাস বরাবর এস্টাবলিশমেন্টবিরোধী চরিত্রের। এর বড় দুটি অনুষঙ্গ শহীদ দিবস (একুশে ফেব্রুয়ারি) এবং শহীদ মিনার। এদের চরিত্র একাধারে সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক। তাই এবং ইতিহাস বিচারে তা কালজয়ী মহিমায় ভাস্বর। এতগুলো দশক পরও একুশে নানা ঘাত-প্রতিঘাত সত্ত্বেও তার বলিষ্ঠ সত্তা অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছে।

১৯৪৭-এর আগস্টে ভারত বিভাগ-বঙ্গ বিভাগের পর পূর্ববঙ্গ, পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ—এই ধারাবাহিকতায় ভাষা আন্দোলন তথা একুশের উদ্ভব, বিকাশ ও স্থিতি। এর অবশেষ খ্যাতি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে, যা এসেছে ইউনেসকোর কল্যাণে। আমরা এসব স্মৃতি ও গৌরব কতটা ধরে রাখতে পেরেছি এবং পারি—সেটাই বড় বিবেচ্য বিষয়।

লেখক :আহমদ রফিক,কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

 

 

 

সূত্র:কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ