‘সংরক্ষণ করে কোনো ভাষাই টিকিয়ে রাখা যায় না’

আদিবাসীদের ৩৪টি ভাষার মধ্যে কয়টিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব? টিকিয়ে রাখতে হলে কী কী করা দরকার?এক সাক্ষাৎকারে এসব নিয়েই কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সৌরভ সিকদার৷

আদিবাসীদের কতগুলো ভাষা?

ড. সৌরভ সিকদার : গত তিন বছর, বিশেষ করে ২০১৫ ও ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনষ্টিটিউটের পক্ষ থেকে আমরা একটা জরিপ করি৷ ওই জরিপে আমি নিজে প্রধান উপদেষ্টা ও প্রধান গবেষক ছিলাম৷ সেটা করতে গিয়ে আমরা বাংলাসহ ৪১টি ভাষা পেয়েছি৷ বাংলা বাদ দিয়ে যে ৪০টি ভাষা, তার মধ্যে ৩৪টি আদিবাসী ভাষা হিসেবে আমরা পেয়েছি৷ বিহারী বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কিছু ভাষা আছে৷ সেগুলো এর মধ্যে আসেনি৷ শুধু আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ৩৪টি৷

বাংলাদেশে এখন আদিবাসীর সংখ্যা কত?

ড. সৌরভ সিকদার : এই সংখ্যাটা সুনির্দিষ্ট করে বলা যাবে না৷ ২০১১ সালের যে জনগণনা জরিপ ছিল, তাতে উল্লেখ ছিল ১৭ লাখ৷ কিন্তু আমরা বিভিন্ন গবেষণা ও বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বলতে পারি, এই সংখ্যাটা ২৮ থেকে ৩০ লাখ৷

সব আদিবাসীর কী আলাদা আলাদা ভাষা?

ড. সৌরভ সিকদার : না, সবার আলাদা আলাদা ভাষা না৷ এখানে দুই রকম বিষয় আছে৷ একই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আলাদা ভাষার প্রচলন আছে৷ যেমন ধরেন, সিলেটে মনিপুরীরা৷ তাঁদের জাতি এক, ধর্ম এক, সবই এক৷ কিন্তু তাঁদের মধ্যে দু’টি ভাষার প্রচলন আছে৷ সেই দু’টি ভাষা একেবারেই ভিন্ন৷ দেখেন, আদিবাসী ফোরাম ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ যে প্রজ্ঞাপন আছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ৪৯ থেকে ৫০টি আদিবাসী গোষ্ঠী আছে৷ কিন্তু তাঁদের ভাষা কিন্তু ৩৪টি৷ তার মানে, আদিবাসীদের গোষ্ঠী বেশি, ভাষার সংখ্যা কম৷ সিলেটের চা বাগানে যদি দেখেন, সেখানে ২১টি আদিবাসী গোষ্ঠী আছে৷ তাঁদের ভাষা কিন্তু একটা- পাদরী৷

তাঁদের ভাষার ভিন্নতা কেমন?

ড. সৌরভ সিকদার : প্রত্যেকটা ভাষারই একটা সংগঠন আছে, একটা বাইরের দিক থেকে, আরেকটা ভেতরের দিক থেকে৷ সহজেই দেখেন, বাংলা ভাষাই কিন্তু একেক এলাকায় উপ-ভাষী বৈচিত্র্য রয়েছে৷ যেমন সিলেটের, চট্টগ্রামের বা নোয়াখালীতে একই বাংলা ভাষা, কিন্তু তাঁরা ভিন্নভাবে কথা বলেন৷ আদিবাসীদের মধ্যেও এমনটা আছে৷ এগুলো নিয়ে যথেষ্ট কাজ হয়নি৷ সার্বিকভাবে আমরা যদি ধরি, আদিবাসীদের যতগুলো ভাষা আছে, সবগুলোই সমৃদ্ধ ভাষা৷ সব ভাষার নিজস্ব বর্ণ নেই, কিছু ভাষার আছে৷ ২০০২ বা ২০০৩ সালে আমি যখন আদিবাসীদের ভাষা নিয়ে পিএইচডি করি, তখন মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, আগে অনেকগুলো ভাষা ছিল, এখন অনেক ভাষাই হারিয়ে গেছে৷

তাঁদের ভাষায় বর্ণের মিল কেমন?

ড. সৌরভ সিকদার : আদিবাসীদের ভাষায় যে বর্ণ বা অক্ষর আছে, সেখানে কিছু সমস্যা বিদ্যমান৷ এখানে সবার লিপি নেই৷ যেমন চাকমা, মারমা বা মনিপুরী ভাষার নিজস্ব লিপি আছে৷ আর অধিকাংশই খ্রীষ্টধর্মের প্রভাবের কারণে রোমান হরফ ব্যবহার করেছে৷ যেমন, খাসিয়া বা গারোরা রোমান হরফ ব্যবহার করে৷ অতি সম্প্রতি ত্রিপুরাদের নিজস্ব ভাষায় বই বের করছে সরকার৷ সেখানেও রোমান হরফ ব্যবহার করা হচ্ছে৷ পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেকগুলো গোষ্ঠী রোমান হরফ ব্যবহার করে৷ আবার দেখেন, চাক ও ব্রো কমিউনিটি নিজস্ব লিপি তৈরি করে নিয়েছে৷ আবার পাদরীরা বাংলা হরফ গ্রহণ করেছে৷

ভাষা কি আদিবসীদের আলাদা করেছে? নাকি আচরণ?

ড. সৌরভ সিকদার : আসলে মানব জনগোষ্ঠী তার নিজস্ব নৃতাত্বিক পরিচয়ে বেড়ে উঠে৷ সেই হিসেবে বাঙালি যেমন একটা নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠী, আবার গারো বা সাওতাঁলরাও কিন্তু একটা নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠী৷ তাঁরা তাঁদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট নিয়ে আলাদাভাবে বেড়ে উঠছে৷ যেমন ধরেন, একজন বাঙালির আকৃতি মাঝারি, চুল খাড়াও না বাঁকাও না৷ গায়ের উজ্জ্বল রঙ ফর্সাও না, আবার নিগ্রোদের মতো কালোও না৷ কিন্তু একজন চাকমার দেখা যাচ্ছে চোখ ছোট, চুল খাড়া এবং গায়ের রঙ ফর্সা৷ এটা হলো নৃতাত্বিক পরিচয়৷ ভাষা হলো সাংস্কৃতিক একটা উপাদান৷ সবকিছু মিলিয়েই একটা জাতি থেকে আরেকটা জাতি পৃথক৷

আদিবাসী ভাষায় যে বই আছে সেটা কী পর্যাপ্ত?

ড. সৌরভ সিকদার : এখানে দু’টি বিষয়৷ বেসরকারি উদ্যোগে অনেক আগে থেকেই আদিবাসীদের মাতৃভাষায় বইপুস্তক ছিল সীমিত আকারে৷ সরকার ২০১০ সালে যে এডুকেশন পলিসি করেছে, সেখানে বলা হয়েছে, আদিবাসীদের জন্য মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে৷ ৫টি আদিবাসীর ভাষায় প্রাথমিক পর্যায়ে তিনটি বই করা হয়েছে৷ আসলে ৬টি ভাষায় এটা করার কথা ছিল৷ কিন্তু লিপি বিতর্কের কারণে তিনটি বই করা যায়নি৷ আসলে রোমান হরফ নেবে, নাকি বাংলা হরফ নেবে, সে বিষয়ে সাঁওতালিদের মধ্যে সিদ্ধান্ত না হওয়ায় এটা করা যায়নি৷ তবে কিছু কাজ এখনো করা যায়নি৷ যেমন শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বা ওইসব ভাষা জানা শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া৷

ভাষার ক্ষেত্রে আদিবাসীরা কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন?

ড. সৌরভ সিকদার : ভাষার ক্ষেত্রে তাঁদের অনেক ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়৷ তাঁরা যখন ঘর থেকে বের হন, তখন তাঁদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, অর্থাৎ বাংলা ভাষাভাষীদের মুখোমুখি হতে হয়৷ সে কারণে তাঁদের বাংলা জানতে হয়৷ বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সাঁওতালী বা চাকমা ভাষা শেখে না৷ ওই সাঁওতালী বা চাকমাকে শিখতে হয় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভাষা৷ দেখেন, একজন শিশু প্রথমেই স্কুলে গিয়ে পাচ্ছে ভিন্ন ভাষার বই, ভিন্ন ভাষার শিক্ষক বা ভিন্নভাষী পরিবেশ৷ এটা কিন্তু একটা শিশু শারীরিক ও মানসিক বিকাশে একটা বাধা৷ আদিবাসীদের মধ্যে যাঁরা একটু বেশি, তাঁদের দু’টি ভাষা জানলেই হয়৷ যেমন ধরেন, চাকমা৷ তাঁদের চাকমা আর বাংলা ভাষা জানলেই হয়৷ কিন্তু যাঁরা আরো ক্ষুদ্র, যেমন ম্রো, তাঁদের কিন্তু অনেকগুলো ভাষা জানতে হয়৷ যেমন, তাঁরা ঘর থেকে বের হলেই একজন চাকমার মুখোমুখি হন৷ ফলে তাঁদের চাকমা ভাষা জানতে হয়৷ এরপর বাংলা তো আছেই৷ আবার উচ্চ পর্যায়ে পড়াশোনা করতে গেলে ইংরেজি জানতে হয়৷ এ কারণে তাঁদের অনেকগুলো ভাষা জানতে হয়৷ তাঁদের ভাষার গুরুত্ব না থাকায় তাঁদের এক ধরনের ভাষার চাপে থাকতে হয়৷

আদিবাসীদের ভাষা সংরক্ষণ করতে সরকার কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে?

ড. সৌরভ সিকদার : কোনো ভাষাই সংরক্ষণ করে টিকিয়ে রাখা যায় না৷ ভাষার ব্যবহারের জায়গা সম্প্রসারিত করতে হয়৷ আর্কাইভে ব্যাকরণ বা অভিধান রাখা যেতে পারে৷ তাতে ভাষা টিকবে না৷ প্রকৃতপক্ষে ভাষার ব্যবহার বাড়াতে হবে৷ এর মধ্যে একটি কাজ হলো, এসব ভাষার নতুন প্রজন্মকে তাঁর ভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে৷ যাঁদের হরফ নেই, তাঁদের হরফের ব্যবস্থা করতে হবে৷ এই ভাষাকে ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগের সুযোগ দিতে হবে৷ এই ভাষা নিয়ে প্রচার মাধ্যমেও বিভিন্ন রকম অনুষ্ঠান হতে পারে৷ ভাষার মুল জিনিসটা হলো এর ব্যবহার মূল্য বাড়াতে হবে৷ আমরা যদি বাংলা ভাষার ব্যবহার-মূল্য বাড়াতে না পারি, তাহলে এক সময় এই ভাষাও দুর্বল হয়ে যাবে৷

 

 

 

সূত্র:ডয়চে ভেলে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ