পরিবেশ রক্ষায় সরকারকে আরও সাহসী হতে হবে

সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা সমন্বয় করা। আমাদের পরিবেশ রক্ষায় যথেষ্ট আইন রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রধান কাজ আইনগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা। তবে পরিবেশ রক্ষার কাজটি শুধু পরিবেশ অধিদপ্তরের একার নয়। সরকারের অন্য সংস্থাগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু আমরা দেখি পরিবেশ অধিদপ্তর অনেক বেশি প্রকল্পনির্ভর। তারা এত দিন উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়ননির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। ফলে পরিবেশ রক্ষা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে তাদের যে তদারকির ভূমিকা নেওয়ার কথা, সেখানে ঘাটতি রয়েছে। এর ফলাফল আমরা দেখি, দূষণের বিভিন্ন বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে।

যেমন রাজধানীর বায়ুদূষণ, নদী রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর প্রকল্পভিত্তিক অনেক উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের কোনো সুফল আমরা দেখিনি। আর প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সুরক্ষার ওই কাজগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এসব কাজ টেকসই হয়নি। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে পারে, নিজেদের কারিগরিভাবে সক্ষম জনবল তৈরি করতে পারে, দূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো জনবলকাঠামো গড়ে তুলতে পারে, তাহলে দূষণ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়া সম্ভব।

অন্যদিকে দেশের পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শত্রু, অর্থাৎ দূষণকারীরা বেশ ক্ষমতাবান। দূষণকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার মতো ক্ষমতা পরিবেশ অধিদপ্তরের নেই। এর বাইরে গিয়েও অনেক সময় আমরা দেখেছি পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট বিভাগ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু ওই দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে চলে যাওয়ার পর সেই কার্যক্রম থমকে গেছে। তাই পরিবেশ অধিদপ্তরকে কার্যকর করতে হলে তাদের শক্তিশালী করতে হবে। আর সর্বোপরি তাদের সাহসী হতে হবে।

বন রক্ষার ক্ষেত্রেও আমরা একই ঘটনা দেখতে পাই। বন অধিদপ্তরের কাজ দেশের বনভূমি রক্ষা করা। কিন্তু তারা অনেক বেশি রাজস্ব আদায়ে মনোযোগী। এটা তাদের কাজ না। বরং রাজস্ব আদায়নির্ভর মানসিকতা বন রক্ষার ক্ষেত্রে বড় বাধা। আর বন অধিদপ্তর সব সময় বন রক্ষাকে নিজেদের একক দায়িত্ব হিসেবে দেখেছে। এটা ঠিক নয়। স্থানীয় জনগণকে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে না পারলে বন রক্ষা হবে না। এ ছাড়া বনের জমি অন্য খাতে চলে যাওয়া নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বন অধিদপ্তরের আপত্তি এ ক্ষেত্রে ধোপে টিকছে না। এ ছাড়া জোর করে ও অবৈধভাবে বন দখলের বিষয় তো রয়েছেই।

ফলে পরিবেশ ও বন রক্ষা করতে হলে অবশ্যই সরকারি সংস্থাগুলোর দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করতে হবে। তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। নয়তো অন্যদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার নৈতিক অধিকার তাদের থাকবে না। ২০১১ সালে দেশের সংবিধানের ১৮(ক) ধারায় বনভূমি, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে সবুজ অর্থনীতির দিকে যাত্রার কথাও বলা হয়েছে। আশা করব, সরকারি সংস্থাগুলো রাষ্ট্রের ওই দায়িত্ব ও অঙ্গীকার সঠিকভাবে পালন করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ