ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি ও সংকটের মাত্রা

ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি বোধ করি এই মুহূর্তে বিশ্ব রাজনীতিতে অন্যতম আলোচিত বিষয়। দক্ষিণ আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ এই দেশটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের আগ্রাসনের সম্মুখীন। সেখানে এখন দু’জন প্রেসিডেন্ট। নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় আছেন ২০১৩ সালের পর থেকে। ভেনিজুয়েলার বহুল আলোচিত প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের মৃত্যুর পর (২০১৩) মাদুরো সে দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজনীতির দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ২০১৮ সালে সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনে মাদুরো ‘বিজয়ী’ হলেও তা ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দেয়। জানুয়ারিতে (২০১৯) মাদুরো প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলে কার্যত দেশটি রাজনৈতিকভাবে দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায়। মাদুরোকে চ্যালেঞ্জ করে জাতীয় সংসদের স্পিকার জুয়ান গুইদো নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। সেই থেকে দেশটিতে এক ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একদিকে রয়েছে মাদুরো ও তার দল ‘ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনিজুয়েলা’ (পিএসইউভি), অন্যদিকে জুয়ান গুইদো ও তার নেতৃত্বাধীন ‘ডেমোক্রেটিক ইউনিটি রাউন্ডটেনিল’ (এসইউডি)সহ বেশ কয়েকটি বিরোধী দল। কিন্তু সংকটের মাত্রাটা বৃদ্ধি পেয়েছে যখন যুক্তরাষ্ট্র জুয়ান গুইদোকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। একই সঙ্গে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, হল্যান্ড, পর্তুগাল ও স্পেনও যুক্তরাষ্ট্রের পথ অনুসরণ করে। অন্যদিকে রাশিয়া, চীন, এমনকি তুরস্ক সমর্থন করছে মাদুরো সরকারকে।

ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি এখন কোনদিকে যায়, বলা মুশকিল। মাদুরো সরকারকে উৎখাতে ভেনিজুয়েলায় সম্ভাব্য একটি মার্কিনি আগ্রাসন কিংবা সেনাবাহিনী কর্তৃক সামরিক অভ্যুত্থানের কথাও কোনো কোনো মহলে আলোচিত হচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত সেনাবাহিনী মাদুরো সরকারকে সমর্থন করে যাচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের উদ্যোগ নিতে পারে। একটি ‘সামরিক অপশন’-এর সম্ভাবনা রয়েছে বলে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত করেছেন। কোনো কোনো সংবাদপত্রে এমন আভাসও দেওয়া হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র হন্ডুরাসে অবস্থিত সটো কানো (Soto Cano) বিমান ঘাঁটি, গুয়ানতানামো বের নৌবাহিনী ঘাঁটি এবং পুর্টো রিকোতে অবস্থিত ফোর্ট বুকানান ((Fort Buchanan) বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করে ভেনিজুয়েলায় সামরিক আগ্রাসন চালাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ও মেরিন সেনারা এসব অঞ্চলে নিয়োজিত।

প্রশ্ন হচ্ছে, ভেনিজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি হলো কেন? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা জানেন, ভেনিজুয়েলায় প্রয়াত হুগো শাভেজের শাসনামল (১৯৯৯-২০১৩) থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনিজুয়েলার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। হুগো শাভেজ তার শাসনামলে কিউবা তথা রাশিয়ার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। তিনি যে রাজনীতি ধারণ করতেন, যা কোনো কোনো বিশ্নেষক Chavism হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, তা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থি। Chavism-এর ধারণা অনেকটা সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ, বামপন্থি পপুলিজম, দেশাত্মবোধ, বলিভারিয়ানিজম, ফেমিনিজম এবং ক্যারিবিয়ান ও লাতিন আমেরিকার ইন্টিগ্রেশনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। হুগো শাভেজ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ছিলেন। তেলসম্পদকে হুগো শাভেজ ব্যবহার করেছিলেন তার এই মতাদর্শ সারা ক্যারিবীয় ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে ছড়িয়ে দিতে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে যখন সমাজতন্ত্রের পতন ঘটল (১৯৯১), তখন শাভেজ তার সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ নতুন করে উপস্থাপন করেছিলেন। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের দেশগুলোতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কিউবা একটি বড় অবদান রেখে আসছিল। আর এর ব্যয়ভার বহন করত ভেনিজুয়েলা। সস্তায় অথবা বিনামূল্যে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে ভেনিজুয়েলা ক্যারিবীয় অঞ্চলে তার প্রভাব বৃদ্ধি করেছিল। মাদুরো সেই নীতি এখনও চালিয়ে আসছেন। এখনও কিউবার ডাক্তার ও শিক্ষকরা ক্যারিবীয় অঞ্চলে কাজ করেন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ভেনিজুয়েলার সেই তেলের রমরমা ব্যবসা এখন আর নেই। তারপরও ভেনিজুয়েলাকে নিয়ে ভয় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়াতে ভেনিজুয়েলায় একটি প্রো-ওয়েস্টার্ন তথা যুক্তরাষ্ট্রের একজন বন্ধু দরকার। তাই সুযোগ বুঝে জুয়ান গুইদোকে সামনে নিয়ে আসা ও তাকে দিয়ে একটি পাল্টা সরকার গঠন করে সেই সরকারকে সমর্থন করতে দ্বিধাবোধ করেনি যুক্তরাষ্ট্র।

অনেকেই এটা জানেন, ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদের দিকে মার্কিনি তেল সংস্থাগুলোর আগ্রহ দীর্ঘদিনের। ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদ তারা নিজেদের কব্জায় নিতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের মতে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেলের রিজার্ভ রয়েছে ভেনিজুয়েলায়। এর পরিমাণ ৩,০০,৮৭৮ মিলিয়ন ব্যারেল (২০১৭ সালের পরিসংখ্যান)। পরের রিজার্ভ রয়েছে সৌদি আরবে ২,৬৬,৪৫৫ মিলিয়ন ব্যারেল। ফলে এই তেল যে একটি ফ্যাক্টর, তা আর কাউকে বলে দিতে হয় না। মাদুরো নিজেও স্বীকার করেছেন, ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদ জব্দ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। হুগো শাভেজের আমলে ভেনিজুয়েলা একটি ধনী দেশে পরিণত হয়েছিল। রাজধানী কারাকাসে তেলসম্পদের বদৌলতে অনেক হাইরাইজ ভবন তৈরি করা হয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল, বিনিয়োগকারীরা আসবে। কিন্তু সেসব ভবন এখন খালি। কোনো বিনিয়োগকারী নেই। অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। মুদ্রাস্ম্ফীতি সেখানে চরমে। ২০১৬ সালের হিসাবে মুদ্রাস্ম্ফীতির পরিমাণ ছিল ৮০০ ভাগ। আর আইএমএফের মতে, ২০১৯ সালে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ১০০ ভাগ (১০ মিলিয়ন)। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সেখানে পাওয়া যায় না। এসব জিনিসপত্রের দাম ২০১৮ সালে বেড়েছে ১৩,৭০,০০০ ভাগ। আইএমএফ ভেনিজুয়েলার এই পরিস্থিতিকে ১৯২৩ সালে জার্মানি আর ২০০০ সালের জিম্বাবুয়ের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেছে (রয়টার্স প্রতিবেদন, ৯ অক্টোবর ২০১৮)। ফলে সঙ্গত কারণেই মানুষের হতাশা আছে সেখানে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ভেনিজুয়েলার মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে পার্শ্ববর্তী দেশে যাচ্ছে। কোনো কোনো যুবতী-কিশোরী মেয়ে তাদের লম্বা চুল বিক্রি করছে জীবিকা নির্বাহের জন্য। অবিশ্বাস্য হলেও এটা সত্য ঘটনা। খাদ্য ঘাটতি সেখানে রয়েছে। মাদুরোর অতি বাম নীতি বা Chavism ভেনিজুয়েলার সাধারণ মানুষের নূ্যনতম চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। এখানে যে ব্যর্থতা রয়েছে, তা সমাধান করতে পারেননি মাদুরো। তাই ডানপন্থি সংগঠনগুলো এর সুযোগ নিয়েছে। কিন্তু মাদুরোকে উৎখাত কিংবা সেখানে একটি প্রো-ওয়েস্টার্ন সামরিক অভ্যুত্থান কি কোনো সমাধান এনে দেবে?

ট্রাম্প প্রশাসন ভেনিজুয়েলায় একটি ‘সামরিক আগ্রাসন’ চালানোর কথা বললেও তা শেষ পর্যন্ত কতটুকু তিনি কার্যকর করবেন- এটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এমনিতেই অভ্যন্তরীণভাবে তিনি নানা সমস্যার সম্মুখীন। মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণে তিনি কংগ্রেসের কাছে কয়েক বিলিয়ন ডলার চেয়েছিলেন। কংগ্রেস তা দেয়নি। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার ‘জড়িত’ থাকা (হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইল হ্যাক করার ঘটনা) ও সে ব্যাপারে তার সংশ্নিষ্টতা নিয়ে তদন্ত হচ্ছে। এ থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ভেনিজুয়েলায় ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর নির্দেশ দিতে পারেন ট্রাম্প। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এই ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর নীতি যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন বেশ কয়েক বছর ধরে অনুসরণ করে আসছে। ইরাকে সাদ্দাম হোসেন আর লিবিয়ায় গাদ্দাফির উৎখাতের পেছনে এই ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর নীতি কাজ করেছিল। আবার সিরিয়াতে তা কাজ করেনি।

সিরিয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়ার জড়িয়ে যাওয়া ও আসাদ সরকারকে সমর্থন করায় এই ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর নীতি সেখানে কাজ করেনি। ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রেও এমনটি হতে পারে। কেননা রাশিয়া, এমনকি চীনও মাদুরোর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি সেখানে সামরিক আগ্রাসন চালায়, তা হিতে বিপরীত হতে পারে। এটা শুধু নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনাই করবে না, বরং পুরো লাতিন আমেরিকায় একটি মার্কিনবিরোধী শক্তিশালী জনমতের জন্ম দিতে পারে। আবার এটাও সত্য, দক্ষিণ আমেরিকা তথা লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের একটি কালো ইতিহাস রয়েছে। অনেক দেশেই যুক্তরাষ্ট্র সেসব দেশের সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেখানকার নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটিয়েছে। আর্জেন্টিনা (১৯৭৬ সালের কুদেতা, ইসাবেলা পেরেজের বিরুদ্ধে জেনারেল ভিদেলা কর্তৃক উৎখাত), ব্রাজিলে (সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নেতা গাউলাটকে সেনাবাহিনী কর্তৃক উৎখাত), চিলি (১৯৭৩ সালে সেনাবাহিনী প্রধান পিনোচে কর্তৃক জনপ্রিয় নেতা আলেন্দের উৎখাত), কোস্টারিকা, এল-সালভাদর, গুয়েতেমালা, নিকারাগুয়া, পানামা, প্যারাগুয়ে, পেরু, উরুগুয়ের দৃষ্টান্ত আমরা দিতে পারি।

উল্লিখিত প্রতিটি ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে সেখানকার নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে। এখন এই ‘তত্ত্ব’ ভেনিজুয়েলায় প্রয়োগ করে কতটুকু সফলতা পাওয়া যাবে, সেটি একটি প্রশ্ন। কেননা, ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনী এখনও মাদুরোকে সমর্থন করে যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে মাদুরো ‘আরেকজন হুগো শাভেজ’ হতে পারেননি। অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। এক ধরনের একনায়কতান্ত্রিক শাসন তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন। দেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণিও তার পাশে নেই এবং প্রচণ্ড রকম পশ্চিমা বিরোধিতার (সম্পদ জব্দ করা, তেল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা) মুখে তিনি আছেন। তার টিকে থাকা সত্যিকার অর্থেই কঠিন। মাদুরো আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন ও একটি সংলাপের কথা বলছেন বটে; কিন্তু জট খুলছে না। স্পষ্টতই ভেনিজুয়েলার রাজনীতি একটি বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

লেখক:তারেক শামসুর রেহমান,অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক,ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র

 

 

 

সূত্র: সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ