ভাষার জন্ম, ভাষার মৃত্যু

গ্রিক ইতিহাসবিদ হোরোডোটাস খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের মধ্যভাগে মিসর সফরে গিয়েছিলেন। মেম্ফিসের মন্দিরের পুরোহিতরা তাকে একটি অদ্ভুত গল্প শুনিয়েছিলেন। কাহিনীটা ছিল মিসরের এক ফ্যারো সামেটিকাসকে নিয়ে। সামেটিকাসের শাসনের আগে মিসরীয়রা ভাবত, তারাই দুনিয়ার প্রাচীনতম জাতি। কিন্তু সামেটিকাসের মনে খুঁতখুঁতানি ছিল, তিনি চেয়েছিলেন পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে। তাই তিনি পদক্ষেপ নেন মানুষের প্রথম ভাষা কোনটি তা নির্ণয় করতে। তিনি দুটি সমগোত্রীয় শিশুকে এক মেষপালকের হাতে তুলে দেন। মেষপালকের ওপর কঠোর নির্দেশ ছিল, সে যেন শিশু দুটির সামনে কোনো শব্দ উচ্চারণ না করে। তার ওপর দায়িত্ব ছিল শিশু দুটিকে কোনো নির্জন স্থানে রেখে আসার এবং নিয়মিত তাদের খাবার-পানি ও অন্যান্য দরকারি জিনিসপত্র সরবরাহ করার। ফ্যারোর ধারণা ছিল, শিশু দুটি প্রথম যে শব্দ উচ্চারণ করবে, সেটাই দুনিয়ার প্রথম ভাষা। আর সে ভাষায় জাতি দুনিয়ার প্রাচীনতম বলে বিবেচিত হবে। মেষপালক একদিন শুনতে পেল, একটি শিশু ‘বেকোস’ বলে চিত্কার করছে। ফ্রাইজিয়ান ভাষায় বেকোস অর্থ রুটি। এ থেকে সামেটিকাস এ উপসংহার টানেন যে ফ্রাইজিয়ান হচ্ছে দুনিয়ার প্রাচীনতম ভাষা। অবশ্য হেরোডোটাসের অর্ধশতক আগে মাইলেটাসের হেকাটিয়াসও মিসরে গিয়ে এ গল্প শুনেছিলেন।

দুনিয়ার প্রথম ভাষা ফ্রাইজিয়ান কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও দুনিয়ার প্রাচীন কিছু ভাষা সম্পর্কে ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়। বিধিবদ্ধ ভাষার আগমন অন্তত ১০ হাজার বছর আগে। প্রথম ভাষা কোনটি, তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। দুনিয়ার প্রাচীনতম দুটি ভাষার অস্তিত্ব পাওয়া যায় ভারতবর্ষে; একটি সংস্কৃত, অন্যটি তামিল। লিপির বয়স অনুসারে সংস্কৃত ভাষার আবির্ভাব খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার অব্দে। ভারতের কিছু গ্রামে এখনো সংস্কৃত ভাষা ব্যবহার হয়। তামিল ভাষার জন্ম ধরা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে। আবার অনেকে মনে করেন, এ ভাষা আরো পুরনো। তামিল ভাষা এখনো ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। গ্রিক ভাষার জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে, যা এখনো ইউরোপে বহুল ব্যবহূত। চীনা ভাষার অস্তিত্ব পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব ১২৫০ অব্দে, শাং রাজত্বে। এ ভাষা বর্তমানে চীনের কোটি কোটি মানুষ ব্যবহার করে। হিব্রু ভাষার বয়স ধরা হয় প্রায় পাঁচ হাজার বছর। ল্যাটিন ভাষার ব্যবহার শুরু হয় রোমান সাম্রাজ্যে। খ্রিস্টপূর্ব ৭৫ অব্দকে এ ভাষার ব্যবহার শুরুর বছর হিসেবে গণ্য করা হয়। সংস্কৃতের মতো লাতিনও অনেক ভাষার জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান ভাষা আরবির প্রথম লিখিত দলিল পাওয়া যায় ৫১২ খ্রিস্টাব্দে। তবে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো লিখিত ভাষা হচ্ছে সুমেরীয় ভাষা, যা কাদার ফলকে লেখা হতো এবং ইরাকে খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দে লিখিত ফলক পাওয়া গেছে। মিসরের হায়েরোগ্লিফিকের কথা সবারই জানা। চিত্র দিয়ে বাক্য তৈরি হতো এ ভাষায়। এ ভাষার অস্তিত্ব সুমেরিয়া ভাষার কাছাকাছি সময়েই।

প্রথম ভাষা যেটাই হোক না কেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভাষা সমীক্ষক এথনোলগের তথ্যমতে, দুনিয়ায় এখন জীবিত ভাষার সংখ্যা ৭ হাজার ৯৭। ইস্টার্ন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর ল্যাংগুয়েজ ইনফরমেশন অ্যান্ড টেকনোলজি’র গবেষণায় শনাক্ত করা হয়েছে ৫৭৩টি বিলুপ্ত ভাষা। অবশ্য এসব পরিসংখ্যান নিয়ে কেউ পূর্ণতার দাবি করেন না। কারণ ভাষায় অতল সাগরের তল খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। আর সম্ভবও হবে না, কারণ ভাষায় অনেক উপাদান তো কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। নতুন খোঁজ পাওয়া একটি ভাষা সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মতভাবে জানার আগেই সে ভাষায় শেষ বক্তাটি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন, এমন ঘটনাও ঘটেছে।

প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানের তথ্যমতে, আগামী ১০০ বছরে দুনিয়া থেকে অন্তত তিন হাজার ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সামার ইনস্টিটিউট অব লিংগুয়িস্টিকস’-এর তথ্যমতে, দুনিয়ায় ৫১টি এমন ভাষা আছে, যার সর্বশেষ একজন বক্তা জীবিত আছেন। ১০০ জনের কম জানে, এমন ভাষা আছে ৫০০টি। ১ হাজার জন বলতে পারে, এমন ভাষায় সংখ্যা ১ হাজার ৫০০। ১৯৯২ সালে এক খ্যাতনামা মার্কিন ভাষা গবেষক দুনিয়াকে চমকে দিয়ে জানিয়েছিলেন ২১০০ সালের মধ্যে দুনিয়ার ৯০ শতাংশ ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

ভিন্ন একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দুনিয়ার পাঁচটি অঞ্চল থেকে ভাষা বিলুপ্ত হচ্ছে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে। অঞ্চলগুলো হলো সাইবেরিয়ার পূর্বাঞ্চল, অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাংশ, দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যাঞ্চল, ওকলাহোমা ও দি ইউ. এস. প্যাসিফিক নর্থ-ইস্ট। গত ৫০০ বছরে দুনিয়া থেকে হারিয়ে গেছে অর্ধেক ভাষা এবং এখন ভাষা বিলুপ্তির গতি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

পেনসিলভানিয়া সোয়ার্থমোর কলেজের ভাষাতত্ত্বের শিক্ষক অধ্যাপক ডেভিড হ্যারিসনের মতে, ‘যখন একটি ভাষা হারিয়ে যায়, তখন বহু শতাব্দীজুড়ে প্রাণী, বৃক্ষ, গণিত ও সময় নিয়ে গড়ে ওঠা মানুষের জ্ঞান ও চিন্তা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’ হ্যারিসনের মতে, দুনিয়ার জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনেক অজানা তথ্য, আবিষ্কার লুকিয়ে আছে দুনিয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর ভাষায়। তাই তিনি মনে করেন ভাষাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে আমরা বহু শতক ধরে সঞ্চিত জ্ঞান ও আবিষ্কারকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছি। হ্যারিসন লাতিন আমেরিকার আদিবাসীদের নিয়ে সরেজমিন গবেষণা করে দেখেছেন, সেখানকার অনেক গোষ্ঠী ঔষধি গাছ ও প্রাণী সম্পর্কে তাদের অর্জিত জ্ঞান গোপন ভাষায় সংরক্ষণ করে রেখেছে এবং এ গোপন ভাষায় তারা বাইরের মানুষের সঙ্গে কথা বলে না।

লিভিং টাংস ইনস্টিটিউট ফর এনডেনজারড ল্যাংগুয়েজের গবেষক গ্রেগরি অ্যান্ডারসন বলেন, ‘ভাষা তখনই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ে, যখন একটি গোষ্ঠী বা জাতি সিদ্ধান্ত নেয় যে নিজস্ব ভাষা তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ মেক্সিকোর ইতিহাসবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক ও অ্যাজটেক ভাষা-সংস্কৃতি গবেষক মিগুয়েল লিওন-পোরটিল্লা তার হোয়েন আ ল্যাংগুয়েজ ডাইজ বা ‘যখন ভাষার মৃত্যু হয়’ শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন—

‘…যখন ভাষার মৃত্যু হয়,

স্বর্গীয় যা কিছু—

সূর্য, চাঁদ, তারা

মানুষের যা কিছু

চিন্তা, অনুভব, ভাবনারা

সব হারিয়ে যায়

আর প্রতিফলিত হয় না ভাষার আয়নায়…’

বর্তমানে দুনিয়ার জীবিত ভাষাগুলোর ৬ শতাংশ ভাষায় কথা বলে ৯৪ শতাংশ মানুষ। আর বাকি ৯৪ শতাংশ ভাষায় কথা বলে মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ। তাই অমূল্য সম্পদ নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। সঙ্গে বেড়েছে ভাষাকে সংরক্ষণের তাগিদ। হিব্রু ও আইনু ভাষা আবার পৃথিবীতে ফেরত এসেছে জীবন্ত হয়ে।

আজ দুনিয়ায় মানুষ যতগুলো ভাষায় কথা বলছে, গতকাল বলেছিল তার চেয়ে বেশিসংখ্যক ভাষায়। সামনের দিনে মানুষের ভাষার সংখ্যা আরো কমে যাবে। ভাষার গুরুত্ব বুঝতে একটি সহজ বিষয় মাথায় নেয়া যায়, বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠী তাদের অর্জিত জ্ঞানকে সংরক্ষণ করে রাখে। এ ভাষা হারিয়ে গেলে হারায় তাতে মানুষের স্মৃতি, জ্ঞান, অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার।

জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ভাষাবৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে ফেলেছে। বর্তমানে প্রচলিত ভাষার অর্ধেকই চলে গেছে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। এর ৯০ শতাংশই এ নতুন শতকের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এ তথ্য ইউনেস্কোর প্রতিবেদনের। প্রতিবেদনটি আরো জানাচ্ছে, প্রতি দুই সপ্তাহে একটি ভাষা ব্যবস্থা হারিয়ে যাচ্ছে। সুনামির পর অনেক জনপদ যেমন নিশ্চিহ্ন হয়েছে, তেমনি ভারতীয় উপমহাদেশের পাঁচটি ভাষা চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পৃথিবীর দক্ষিণ ভাগের ভাষাবৈচিত্র্যের আবাস মূলত আটটি দেশে: পাপুয়া নিউ গিনি, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, ব্রাজিল ও মেক্সিকো। মেক্সিকোর ওজাকা রাজ্যের আয়তন পর্তুগালের চেয়ে কম, এখানে ১৬টি নৃগোষ্ঠীর বসবাস। এ রাজ্যে যত ভাষা ব্যবহার হয়, তা পুরো ইউরোপ মহাদেশের চেয়ে বেশি। মেক্সিকোয় প্রায় ৬২টি ভাষা প্রচলিত। মেক্সিকোর ভাষাবিদ, কবি, ইতিহাসবিদ কার্লোস মন্তেমায়োর বলেন, ‘মেক্সিকোর এ ভাষাগুলো মোটেই উপভাষা নয়, বরং একেকটি পূর্ণাঙ্গ ভাষা। পুরেপেচা ভাষাটি গ্রিক কিংবা মায়া ভাষা ইতালিয়া ভাষার মতোই সম্পূর্ণ। উন্নততর ভাষা বলতে কিছু হয় না। সব ভাষারই ব্যাকরণ, পদবিন্যাস, শব্দভাণ্ডার আছে। আদিবাসীদের ভাষাকে উপভাষা হিসেবে বিবেচনা করাটা সাংস্কৃতিক বর্ণবাদ।’

মেক্সিকোর পরস্পরসংলগ্ন ১৫টি রাজ্যে নাহুয়াত (আধুনিক আজটেক) ভাষায় কথা বলে ২০ লাখ মানুষ। ক্যারিবিয়ান মেক্সিকোয় মায়াভাষী আছে ১০ লাখ। ইউরোপীয় আগ্রাসনকারীদের সাংস্কৃতিক জবরদস্তিতে এ অঞ্চলের ভাষা-সংস্কৃতি ৫০০ বছর ধরে নিপীড়িত হয়েছে। ইউরোপীয় আগ্রাসকরা স্থানীয়দের পবিত্র গ্রন্থগুলো প্রকাশ্যে পুড়িয়েছে, তাদের মাতৃভাষা বলা থেকে বিরত রাখতে চেয়েছে। এমনকি মাতৃভাষায় কথা বললে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার মতো আইনও ছিল। কিন্তু মেক্সিকোর স্থানীয় আদিবাসীরা চুপ থাকতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।

মেক্সিকোর উত্তরের মরুভূমিতে ভাষা যেন শুষ্ক বালির মতোই উড়ে যাচ্ছে। মেক্সিকোর চরম বিপদাপন্ন ২০টি ভাষার অর্ধেকই এ মরু অঞ্চলে। এসবের মধ্যে আছে আগুয়াকাতেকো। এটি মায়া ভাষার পরিবারের এক সদস্য। সহস্রাব্দ আগে এ ভাষা গুয়াতেমালা থেকে এখানে হাজির হয়েছিল। ২০০৫ সালে এ ভাষার ২২ জন সদস্য অবশিষ্ট ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর সীমান্তে অনেক ভাষাই বিলুপ্তির দিন গুনছে।

সপ্তদশ শতকে স্প্যানিশ রাজ এক আদমশুমারিতে ২৩ হাজার কুকাপস জনগোষ্ঠীকে শনাক্ত করেছিল। এ মানুষরা ছিল কলোরাডো নদীর ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো কলোরাডোর পানি দূষিত করলে এবং সরিয়ে নিলে কুকাপস জনগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা কমতে থাকে। বর্তমানে এ ভাষাগোষ্ঠীর মাত্র ৩০০-৪০০ জন মানুষ অবশিষ্ট আছে। এদের বসবাস অ্যারিজোনার ইউমাতে। অর্ধশত বয়স্ক সদস্য তাদের ভাষার রহস্যকে ধারণ করে আছেন।

সাত হাজার বছর ধরে কুকুপারা সি অব কর্টেজে প্রবাহিত নদীগুলোয় মাছ ধরেছে। এখন পরিবেশ প্রশাসন এলাকাটিকে সংরক্ষিত হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং ইন্ডিয়ানদের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে। তাই কাজের খোঁজে কুকুপা তরুণরা অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন এবং কাজের প্রয়োজনে তাদের ইংরেজি শিখতে হয়। আর এভাবে এ অভিবাসন তাদের ভাষাকে শুকিয়ে যেতে বাধ্য করেছে।

‘…যখন ভাষার মৃত্যু হয়,

তার প্রেমের শব্দমালা,

ব্যথা আর যত্নের স্বর,

এমনকি পুরানো গান,

পুরানো গল্প, ভাষণ, প্রার্থনা,

কেউ আর সেগুলো

পুনরায় বলতে পারবে না।’

 

আধুনিক পেশা গ্রহণ ও জীবনযাপনের কারণে আদিবাসী ইন্ডিয়ান তরুণরাও আর আগের মতো তাদের ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ নন। ফলে প্রৌঢ়দের মৃত্যুর মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে যাচ্ছে অনেক ভাষার টিকে থাকার সম্ভাবনা।

‘…যখন ভাষার মৃত্যু হয়,

তখন অনেকে মারা যায়,

এবং আরো অনেকে মৃত্যুর প্রতীক্ষায় দিন গুনে

আয়নাটা চিরকালের জন্য ভেঙে যায়

স্বরের ছায়াগুলো চিরকালের মতো

স্তব্ধ হয়ে যায়,

মানবসভ্যতা আরেকটু দরিদ্র হয়ে পড়ে

যখন একটি ভাষার মৃত্যু হয়।

[আজটেক ভাষায় মিগুয়েল লিওন পোরটিল্লোর কবিতা

ইংরেজি অনুবাদ: জন রস]

 

ভাষার মৃত্যু হলে মোটাদাগে চারটা ঘটনা ঘটে। প্রথমত, ভাষার মৃত্যু হলে মানুষের সংস্কৃতির জন্য তা বিরাট আঘাত হয়। ২০০৯ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিককে পরমা বসু বলেন, ‘একেকটি ভাষা হচ্ছে একেকটি চাবি, যেগুলো স্থানীয় ঔষধি জ্ঞান, বাস্তুতান্ত্রিক বিদ্যা, আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্যাটার্ন, আধ্যাত্মিক ভাবনা, শিল্প ও পৌরাণিক ইতিহাসের দ্বার খুলে দেয়।

দ্বিতীয়ত, কোনো ভাষা হারালে মানবের কোনো অংশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির স্মৃতি হারিয়ে যায়।

তৃতীয়ত, ভাষার মৃত্যু হলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার স্থানীয় অনেক সম্পদ হারিয়ে যাচ্ছে। গবেষকরা মনে করেন, আধুনিক যুগে ভাষা বিলুপ্ত হলে তার প্রতিক্রিয়া বেশ গভীর এবং অতীতের চেয়ে ভিন্নতর হয়। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে অল্প মানুষ ব্যবহার করে এমন অনেক ভাষায় চারপাশের পরিবেশ, গাছপালা ও প্রাণী নিয়ে অনেক তথ্য সঞ্চিত আছে। বিশেষত রোগ নিরাময়ের অনেক প্রাকৃতিক জ্ঞান ভাষার সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে। জলের জীববৈচিত্র্য ও জমির ব্যবস্থাপনা নিয়েও অনেক জরুরি জ্ঞান হারিয়ে যাচ্ছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, অনেক মানুষ তার মায়ের ভাষা হারিয়ে ফেলছে। এ বেদনার কোনো তুলনা হয় না।

পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলের বরফাবৃত পার্বত্য এলাকায় বাদেশি নামে একটি ভাষা আছে। এথনোলগ ভাষাটিকে বিলুপ্ত বলে ঘোষণা করেছিল। কিন্তু গত বছর বিবিসির একটি দল বাদেশি ভাষার তিনজন বাহককে খুঁজে বের করে। বিশিগ্রাম উপত্যকায় তিনজন বাদেশিভাষীকে খুঁজে পাওয়া যায়। এদের মধ্যে একজন ছিলেন রহিম গুল। তিনি বিবিসির দলটিকে জানান, এক প্রজন্ম আগেও পুরো একটি গ্রামে বাদেশি ভাষা ব্যবহার হতো। ‘কিন্তু একসময় আমাদের পুরুষরা আশপাশের গ্রামের মেয়েদের বিয়ে করা শুরু করে। এ মেয়েরা তোরালি ভাষায় কথা বলে। এদের সন্তানরা তাদের মায়ের ভাষাতেই কথা বলতে শুরু করে। ফলে আমাদের ভাষা মরে যায়।’ তোরালি ভাষা এ অঞ্চলে প্রভাবশালী, যদিও সে নিজেই পশতু ভাষার চাপে আছে। কিন্তু সে নিজে বাদেশি ভাষাকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে। মেক্সিকোর সেই আদিবাসীদের মতো এখানেও স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সমস্যা। কাজের জন্য তারা সোয়াত জেলায় চলে যায় এবং পশতু ভাষা ব্যবহার করতে শুরু করে। শুরু হয়ে যায় নিজ ভাষার ক্ষয়। নিজের ভাষা ব্যবহারের সুযোগ না পেয়ে বাদেশি ভাষার শেষ তিন উত্তরাধিকারও তাদের ভাষার অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছিলেন। রহিম গুল ও সাঈদ গুলের বয়স হচ্ছে, তার কয়েকদিন পর পরই দু-একটা করে শব্দ ভুলে যাচ্ছেন। রহিম গুলের তিন পুত্রের সবাই তোরালি ভাষায় কথা বলে। পাকিস্তানের বিপদাপন্ন ভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত সাগর জামান বাদেশি ভাষাকে রক্ষা করতে কাজ করছেন। ‘আমি তিনবার এ উপত্যকায় ভ্রমণ করেছি, কিন্তু স্থানীয়রা আমার সামনে এ ভাষায় কথা বলতে অনিচ্ছুক। আমি এবং আরো কয়েকজন ভাষাবিদ মিলে বাদেশি ভাষার কয়েকশ শব্দ সংগ্রহ করেছি, যা থেকে মনে হয় এটি ইন্দো-আর্য ভাষা পরিবারের সদস্য,’ সাগরের কথা। সেই তিনজনের সবাই হয়তো আজকে মারা যাননি। মানে বাদেশি হয়তো কাগজে-কলমে এখনো বিলুপ্ত হয়নি। কিন্তু আমরা জানি, ভাষাটি যেকোনো দিন দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে, আরো অনেক ভাষা যেভাবে বিদায় নিয়েছে। ভাষা বিলুপ্ত হলে বিদায় নেয়, সেই ভাষায় সংরক্ষিত বহু মানুষের স্মৃতি, আর স্মৃতি হারালে মানুষের থাকেই বা কী!

ভাষা যেমন মরে যায়, তেমনি বদলেও যায়। শুধু ফেসবুকের আবির্ভাবের পরই বাংলাদেশের নতুন সহস্রাব্দে জন্ম নেয়া প্রজন্মের নিত্যব্যবহারের ভাষা অনেক বদলে গেছে। দুনিয়ার যেকোনো ভাষাই মানুষের মাতৃভাষা। তবে কোনো শিশু তার মাতৃভাষাকে আজ যেভাবে পাবে, কয়েকশ বছর পর তার উত্তরসূরি সেভাবে পাবে না। ভাষা পরিবর্তনশীল, এটাই সত্য। এ পরিবর্তন ঘটে মূলত দুটি পদ্ধতিতে। ভাষা গঠিত হয় নানা ধরনের ধ্বনি এবং সেই ধ্বনিগুলো নিয়ে তৈরি শব্দের অভিধান থেকে। শিশুরা শুরুতেই নিজের মতো করে এ ধ্বনি, শব্দ ও তার প্রয়োগকে ব্যবহার করে নিজের একটি ব্যক্তিগত অভিধান তৈরি করে ফেলে। এভাবেই আমরা মাতৃভাষা ব্যবহার করতে শিখি এবং অন্যে কী বলছে সেটা বুঝতে শুরু করি। শিশুরা এতসব করে কোনো বইয়ের নিয়ম ছাড়াই; বাবা-মা, শিক্ষক বা অন্য কারো সক্রিয় সাহায্য ছাড়া। এটা একটি অসচেতন প্রক্রিয়া। এমনকি প্রাপ্তবয়স্করাও যখন নিত্যদিনের কাজে ভাষা ব্যবহার করছেন, সেটাও আধা সচেতনভাবেই। শিশুদের শেখাটা সজীব এবং তারা প্রত্যেকে অন্যের চেয়ে ভিন্ন হয়। এভাবে প্রত্যেকের ধ্বনি উচ্চারণ, শব্দের অভিধান, ব্যাকরণের নিয়ম হয়ে ওঠে মৌলিক; কারো সঙ্গে কারো মেলে না। তাই ভাষার মূল প্রবাহ বিন্দুতেই থাকে ভাষা বদলে যাওয়ার বীজ।

ভাষার নামের শক্তিশালী রাজনীতি আছে। ইংরেজি ভাষায় যারা কথা বলেন, তারা খুশি মনেই নিজেদের ভাষার নাম বলেন ইংরেজি। কিন্তু ইংল্যান্ড একটি ভূখণ্ডের নাম এবং এটি কোনো জাতিরাষ্ট্রও নয়। তাই বক্তারা ভাষার নাম ইংরেজি নিয়ে বিচ্ছিন্নতা বা কোনো আধিপত্য বোধ করেন না। কিন্তু সব ভাষার ক্ষেত্রে রাজনীতিটা এত সহজ নয়। ১৯৪০-এর দশক পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দ্বীপপুঞ্জে লিংগুয়া ফ্রাংকা ছিল ‘মালয়’। সবাই এ ভাষাকে মালয় নামেই ডাকত। কিন্তু ঝামেলা তৈরি হলো ইন্দোনেশিয়া স্বাধীন হওয়ার পর। মালয়া তখনও ব্রিটিশ শাসনাধীন। তাই মালয় ভাষার যে রূপটি ইন্দোনেশিয়া তাদের জাতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছিল, তার নাম হয় ইন্দোনেশিয়ান। সিংগাপুর ও ব্রুনাইতে ভাষাটির নাম এখনো মালয়। একসময়কার সোভিয়েত ইউনিয়ন সংখ্যালঘু ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল, সেগুলো বেশ ইতিবাচক ছিল। কিন্তু তার পরও কিছু বড় ঝামেলা রয়ে গিয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের কিছু অংশের মানুষ জার্মান ভাষায় কথা বলত। তাদের ভাষাকে সোভিয়েতের নিজস্ব ভাষার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। কারণ এটি আরেকটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভাষা। মোলডাভিয়ার ভাষাকে রোমানিয়া থেকে পৃথক করতে নাম দেয়া হয় মোলডাভিয়ান।

মিসরীয় ফ্যারোর মতো মোগল সম্রাট আকবরও ভাষা নিয়ে নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন। আকবর বেশ কয়েকটি শিশুকে এক বোবা পরিচারিকার অধীন ‘বোবা ঘর’-এ বড় করে তোলার নির্দেশ দেন। শিশুদের বয়স যখন চার বছর, তখন আকবর সেই বোবা ঘরে গিয়ে দেখতে পান শিশুরা নিজেদের মধ্যে ইশারা ভাষায় কথা বলছে। ভাষা নিয়ে শাসকদের এ কৌতূহল যুগে যুগেই ছিল। অষ্টাদশ শতকে ১৭৮৪ সালে রুশ সম্রাজ্ঞী ক্যাথরিন দ্য গ্রেট ভাষা নিয়ে একটি জরিপ করান। এ জরিপের মাধ্যমে দুনিয়ার বিভিন্ন ভাষা থেকে ২২৫টি সাধারণ শব্দকে খুঁজে বের করা হয়। এগুলো প্রকাশিত হয়েছিল দুই জার্মান ব্যাকরণ পণ্ডিত ইয়োহান ক্রিস্টফ আদেলুং ও ইয়োহান সেফেরিন ফাতেরের গ্রন্থ মিথরাডেটস ওডার অ্যালগেমাইন স্প্রাখকুন্দে। বইয়ের নাম মিথরাডেটস কেন হলো, তার একটি কারণ আছে। দুনিয়ায় প্রথম বহু ভাষাবিদ বলে যে মানুষটি খ্যাত হয়ে আছেন, তিনি রাজা মিথরাডেটস। তিনি ১৩৫ থেকে ৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ সময়কালে পন্টাস ও আর্মেনিয়ার মাইনরের শাসক ছিলেন।

মৃত ভাষাকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টাও আছে। ভাষা বিলুপ্তির যেমন রাজনীতি আছে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে ভাষাকে পুনরুদ্ধার করারও রাজনীতি আছে। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ওল্ড টেস্টামেন্টের বাণীকে সামনে রেখে। এই ধর্মীয় প্রেরণার গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান ওল্ড টেস্টামেন্টের ভাষা হিব্রু। ফিলিস্তিনের ভূমিতে জবরদখল করে গড়ে ওঠা আধুনিক ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার অনেক আগেই ইহুদি কবিরা হিব্রু ভাষায় কবিতা লিখতে শুরু করেন। এসব কবিতা কোনো পাঠক বিশ্লেষণ করলেই দেখবেন তাতে ছত্রে ছত্রে ফুটে আছে হিব্রু বাইবেলের সেই ‘প্রমিজড ল্যান্ড’-এ ফিরে যাওয়ার আকুতি। ১৮৮১ সালের ১৩ অক্টোবর ইহুদি সম্পাদক ও অভিধান সম্পাদক এলেজার বেন-ইয়েহুদা ও তার বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নেন, নিজেদের কথোপকথনে তারা শুধু হিব্রু ভাষা ব্যবহার করবেন। সেদিনই দুনিয়ায় হিব্রু ভাষার নবজন্মের শুরু, যে ভাষা খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের পর থেকে আর মানুষের মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহার হয়নি।

মিগুয়েল লিওন পোরটিল্লোর কবিতার অংশ দিয়েই এ লেখার ইতি টানা যাক—

‘…যখন ভাষার মৃত্যু হয়,

তখন সেই ভাষার দুনিয়ায় থাকা

সাগর ও নদী,

প্রাণী ও গাছপালার কথা

কেউ মনে রাখে না,

কেউ তাদের নাম আর

উচ্চারণ করে না,

তাদের যেন আর অস্তিত্ব নেই।’

লেখক:শানজিদ অর্ণব

 

 

সূত্র:বণিক র্বাতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ