রোহিঙ্গাদের বোঝা বিশ্বকেই নিতে হবে

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এ দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা জোরদার ও সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখতে ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে বব রেকে মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত নিয়োগ করেন। বব রে একাধারে কানাডার সাবেক রাজনীতিক ও আইনজীবী, মধ্যস্থতাকারী ও বক্তা হিসেবে সুপরিচিত। কানাডার এই বিশেষ দূত তাঁর দায়িত্বের অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির সরেজমিন পরিদর্শনসহ সরকার ও মানবিক সহায়তা প্রদানকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মেহেদী হাসান

রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি দেখতে আগেও বাংলাদেশে এসেছেন। এবার কি কোনো পরিবর্তন দেখছেন?

বব রে : আশ্রয়শিবিরগুলোর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বসবাসের পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো। এখানে অনেক জীবন আছে। ভুলে যাবেন না, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাহায্য-সহযোগিতা না পেলে তাদের বাঁচানো যেত না।

আমি মনে করি, রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি বেশ চ্যালেঞ্জিং। তবে এযাবৎ যে অগ্রগতি হয়েছে, সেগুলো অর্জনও খুব সহজ ছিল না। জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) মাধ্যমে এগিয়েছি। আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ ও স্বাধীন কাঠামো (ট্রিপলআইএম), মানবাধিকার পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের মাধ্যমেও এগোচ্ছি। এগুলো অগ্রগতির উদাহরণ।

তবে আমরা এখনো রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে পারিনি। এ ক্ষেত্রে বিশ্বের আরো করণীয় আছে। আর আমরা এখনো বড় রাজনৈতিক কোনো সমঝোতা করতে পারিনি।

কেন সম্ভব হলো না?

বব রে : মিয়ানমারের পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জের ধরনই এর কারণ। মিয়ানমারে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে রোহিঙ্গারাসহ অন্যরা ফিরে যেতে উৎসাহিত হবে। এখানে তাদের জাতিগত পরিচিতির স্বীকৃতি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয় আছে। এটি এখনো না হওয়ায় সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল হয়েই আছে। এখানে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ একেক দেশের একেক ধরনের স্বার্থ রয়েছে।

কানাডার?

বব রে : অবশ্যই আজকের বিশ্বে ভূরাজনৈতিক স্বার্থ আছে। তবে আমার সরকারের অবস্থানের কোনো বদল হয়নি। আমরা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পষ্ট। আমরা মনে করি, রোহিঙ্গাদের ওপর যে মাত্রায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তা ‘গণহত্যা’। জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনেও এমনটি উঠে এসেছে। তবে এ বিষয়টি আদালতকে বলতে হবে। মিয়ানমার সরকারও মুখে বলে যে তারা চায় রোহিঙ্গারা ফিরে যাক। কিন্তু আমরা তাদের ফেরার অনুকূল পরিবেশ দেখি না।

এখন যদি বাংলাদেশ কিছু রোহিঙ্গা অন্যত্র বা ভাসানচরের মতো জায়গায় স্থানান্তরের পরিকল্পনা করে, তবে সে ক্ষেত্রে আপনাদের অবস্থান কী হবে?

বব রে : আমরা বাংলাদেশ সরকারকে বলেছি, ওই জায়গাটা আমাদের দেখতে দিন। আমাদেরও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করুন। আমি জানি, জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ারের ওই জায়গাটি দেখার সুযোগ হয়েছে। জাতিসংঘের আরো কয়েকটি দলও হয়তো সেখানে যাবে। আমাকে সেখানে যেতে বলা হয়নি।

এটি শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘ বা কানাডার বলার বিষয় নয়। রোহিঙ্গাদের ওই জায়গা সম্পর্কে জানাতে হবে। আমি যে ছবি দেখেছি, তাতে সেখানকার অবকাঠামো ভালোই মনে হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাদের মানবিক সহায়তা দেওয়া সংস্থাগুলোর সেখানে কী ব্যবস্থা থাকবে? আমার মনে হয়, শুরুতে পরিকল্পনাটি নিয়ে সংশয় ছিল। এখন প্রশ্ন করা হচ্ছে, কিভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে? আমরা কি নিশ্চিত যে সেখানে রোহিঙ্গাদের পাঠালে ভালো হবে, এ ব্যাপারে আমরা তাদের উদ্বুদ্ধ করতে পারব? এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

আপনি কি এই পরিকল্পনার প্রশংসা করেন?

বব রে : সার্বিকভাবে এযাবৎ বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের জন্য যা করেছে তা চমকপ্রদ। এখন একে অন্তর্বর্তী পরিকল্পনায় রূপ দিতে যাওয়াটাই চ্যালেঞ্জ। একে শুধু একটি মানবিক সংকট হিসেবে দেখলে চলবে না, আমাদের ভাবতে হবে, এর পরবর্তী ধাপ কী?

আমি বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের এটি বলেছি। নিশ্চিতভাবে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, জীবিকা—এগুলোর ব্যাপারেও আমাদের ভাবতে হবে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের উদ্বেগ আছে। বাংলাদেশ বলেছে, রোহিঙ্গারা এখানে স্থায়ীভাবে বা দীর্ঘ মেয়াদে থাকবে—এমন ধারণা তারা দিতে চায় না। বাংলাদেশ চায়, মিয়ানমারই এগুলো করুক।

আমি এর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে বলেছি, এগুলো প্রত্যাবাসনের আগে অন্তর্বর্তী পরিকল্পনা। যখন লোকজন এ দেশে আছে, তখন তাদের শিক্ষার সুযোগ পাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।

গত বছর প্রত্যাশিত তহবিল পাওয়া যায়নি। কিভাবে এ ঘাটতি দূর করা যায়?

বব রে :  কারণেই আমি অন্তর্বর্তী পরিকল্পনার কথা বলছি। যেমন আপনারা বলতে পারেন, এ বছর রোহিঙ্গাদের শিক্ষার জন্য আমাদের এই পরিমাণ অর্থ দরকার। দাতারা পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চায়। যেমন—আপনারা যখন ব্যাংকে গিয়ে টাকা চান, তখন ব্যাংক আপনাদের কাছে পরিকল্পনা জানতে চায়। এ কারণেই যৌথ সাড়া দান পরিকল্পনা প্রয়োজন। এটি দাতা দেশ বা সংস্থা ও আশ্রয়দাতা দেশের যৌথ পরিকল্পনা।

আশ্রয়দাতা দেশের প্রতি আমরা সন্তুষ্ট। কিন্তু রোহিঙ্গাদের অনেকে পড়ালেখা, প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগের বিষয়ে জোর দিয়েছে। আমরা বাংলাদেশ সরকারকে বলেছি, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও আমরা এই ব্যবস্থা করতে চাই। শরণার্থীদের স্বার্থের পাশাপাশি স্থানীয়দের স্বার্থও আমাদের দেখতে হবে।

এটি করতে গিয়ে স্থানীয়দের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে না?

বব রে : আগে সেখানে লোক ছিল পাঁচ লাখ। এখন ১০ লাখেরও বেশি লোক। কানাডায় আমরা তিন কোটি ৬০ লাখ লোক। সেখানে যদি সাত কোটি ২০ লাখ লোক এক সপ্তাহে কানাডায় আশ্রয় চায়, তখন সেখানে কী প্রতিক্রিয়া হবে? অবশ্যই এটি কঠিন।

বিশ্ব বলছে না যে বাংলাদেশ একাই এ সমস্যা মোকাবেলা করুক। না, আমাদের এই বোঝার অংশ নিতে হবে। এ দেশের কাঁধে চেপে যাওয়া বোঝা আমাদের কাঁধেও নিতে হবে। তবে তাদের নিয়ে পরিকল্পনা যেমন শিক্ষা, কাজের সুযোগ—এগুলোর বিষয়েও আমাদের জানতে হবে।

তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নিয়েও বিদেশিরা আগ্রহী নয়?

বব রে : রোহিঙ্গাদের তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তরের বড় কোনো পরিকল্পনায় বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের সায় নেই। কারণ এর মাধ্যমে আসলে মিয়ানমারের দায়দায়িত্ব অন্যদের নেওয়া হবে। আমরা এটি বুঝি। তবে আমরা এখনো এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে রাজি আছি।

গত ১৭-১৮ মাসে আমরা মিয়ানমারে জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তেমন কোনো ভূমিকা দেখিনি।

বব রে : আমাদের এখনো অনেক কাজ করা বাকি। আমরা মিয়ানমারে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের জন্য প্রবেশাধিকার চাই। আমরা মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে কাজ করতে চাই। গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারের প্রতি সম্মান জানাতে হবে। তাদের কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। তাদের কথা শুনতে হবে। তবে অনেক সরকারের বক্তব্য হলো, তারা কী করবে না করবে সে ব্যাপারে কানাডা বা জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন পরামর্শ দিতে পারে না।

এই সংকটে চীনের ভূমিকাকে কিভাবে দেখছেন?

বব রে : আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে চীনের সামনে বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। আমাদের এটিও মনে রাখতে হবে যে চীন নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। তবে চীনের বিশেষ কোনো ভূমিকার কথা আমরা বলতে চাই না। কারণ রোহিঙ্গাদের নিয়ে চুক্তিটি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের। আমি মনে করি, সমাধান আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার আছে।

চীন ছাড়া অন্য কেউ সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে?

বব রে : আমার মনে হয়, জোট হিসেবে আসিয়ান এবং এর সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে। এ অঞ্চলের প্রভাবশালী দেশ হিসেবে ভারতকেও এই ইস্যুতে সম্পৃক্ত হতে হবে। মিয়ানমারে ভারতের জোরালো অর্থনৈতিক স্বার্থ আছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপীয় দেশগুলোও ভূমিকা রাখতে পারে। এটি একটি বৈশ্বিক বিষয়।

রোহিঙ্গা সংকটে আপনি আপনার দেশের ভূমিকা কতটা সফল বলে মূল্যায়ন করবেন? গত বছর অটোয়ার একটি মানবাধিকার সংগঠন এ ক্ষেত্রে কানাডাকে ‘সি’ গ্রেড দিয়েছে। মিয়ানমারে আপনাদের আদৌ কি কাজ করার কোনো সুযোগ বা প্রবেশাধিকার আছে?

বব রে : মিয়ানমারে অবশ্যই আমাদের প্রবেশাধিকার আছে। আমাদের কর্মকর্তারা সেখানে যান। তাঁরা মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছেন। আমরা এ ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হই। কারণ মিয়ানমারের সামনে আমাদের মনোভাব ও অবস্থান অত্যন্ত জোরালো।

আমরা সুস্পষ্টভাবে মানবাধিকার ইস্যুতে, গণহত্যা ইস্যুতে সাড়া দিয়েছি। আমরা অন্য দেশের চেয়ে বেশি মানবিক সহায়তা দিয়েছি। আমরা সংকট সমাধানে অন্যদের আহ্বায়ক হিসেবে কাজ করছি। আমরা আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। আমরাই একমাত্র দেশ নই, আরো অনেক দেশ আছে, যাদের এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া প্রয়োজন। আমার মনে হয় কানাডার ভূমিকা অত্যন্ত গঠনমূলক।

আপনারা কি মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে যেতে পেরেছেন?

বব রে : না কেউ পারেনি। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডাব্লিউএফপি) ও আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি (আইসিআরসি) ছাড়া সেখানে কারোরই যাওয়ার অনুমতি নেই। ডাব্লিউএফপি, আইসিআরসির সঙ্গে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। সেখানে ইইউ, রাশিয়া বা কারোরই প্রবেশাধিকার নেই। এটিই বড় সমস্যা। রাখাইন রাজ্যে যাওয়ার সুযোগ থাকলে আমরা দেখতে পেতাম যে সেখানে আসলে কী হচ্ছে।

এই সংকটের আদৌ সমাধান হবে কি?

বব রে : আমি আগেও বলেছি, মানবিক সংকটের রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন। আমরা শিক্ষাসহ অন্যান্য সুযোগ দিয়ে রোহিঙ্গাদের ভালোভাবে রাখতে পারি। কিন্তু সংকট সমাধানের জন্য মানবাধিকার এজেন্ডা, রোহিঙ্গাদের দাবি, মিয়ানমারের নাগরিকত্ব, চলাফেরার অধিকার দিতে হবে।

মিয়ানমারে রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আশ্রিত রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। শিক্ষার সুযোগ না পেলে তারা অপরাধে জড়াবে, মাদক ও মানবপাচারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। এটিই বাস্তবতা। এই সমস্যা কাল বা পরশু সমাধান হচ্ছে না। এটি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলবে। তাই এ বিষয়ে বাস্তবসম্মত হতে হবে। আমাদের জাতিসংঘে এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে এ ধরনের বোঝা বহন করা হয়।

এই সংকটের শেষ কোথায়? কত বছর লাগবে?

বব রে : সংকট শেষ হতে হলে মিয়ানমার সরকারের আগ্রহ প্রয়োজন। মিয়ানমারের লোকজন যাতে সম্মান ও অধিকার, বসবাসের সুযোগসহ তাদের দেশে ফিরে যেতে পারে, সে জন্য মিয়ানমার সরকারকে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে।

আমি বা আমাদের কেউই বলতে পারে না, কবে এই সংকট শেষ হবে। চীনও পারে না। আমাদের স্বীকার করতে হবে যে এটি বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ নয়, সারা বিশ্বের সবার চ্যালেঞ্জ। আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে। পাশাপাশি জবাবদিহিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতিও দেখাতে হবে।

মূল্যবান সময় দেওয়ায় আপনাকে ধন্যবাদ।

বব রে : আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

 

 

সূত্র: কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ