শুধু নির্বাচনই যথেষ্ট নয়

আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমদ সম্প্রতি ‘আগে সংস্কার চাই, পরে নির্বাচন’ শিরোনামে একটি উপসম্পাদকীয় লিখেছেন (প্রথম আলো, ১৯ জানুয়ারি ২০১৮)। তিনি নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার আমূল সংস্কারের প্রস্তাব করেছেন। আমরাও মনে করি, নির্বাচনের পরিপূর্ণ সুফল পেতে হলে নির্বাচনের আগেই আমাদের স্থানীয় সরকারব্যবস্থার কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী সংস্কার আবশ্যক, যাতে এসব প্রতিষ্ঠান যুগোপযোগী ও কার্যকর হতে পারে।

আমাদের দেশে দুই ধরনের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা বিদ্যমান—গ্রামীণ ও নগর স্থানীয় সরকার। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ গ্রামীণ স্থানীয় সরকারের অন্তর্ভুক্ত। আর পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নিয়ে নগর স্থানীয় সরকার। ঔপনিবেশিক আমল থেকেই স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তোলার পেছনে আকাঙ্ক্ষা ছিল মূলত ‘স্বশাসন’ প্রতিষ্ঠা। সে লক্ষ্যে বেঙ্গল সেলফ গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট, ১৮৮৫ প্রণীত হয়। স্বশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ‘গ্রাসরুট ডেমোক্রেসি’ বা তৃণমূলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক পরিসরের বিস্তার ঘটে।

আমাদের ভবিষ্যৎ অগ্রগতির জন্য স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব অপরিসীম। দারিদ্র্য নির্মূল আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার এবং এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে অনেক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। তবে এতে পরিপূর্ণ সফলতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন হবে একটি কার্যকর স্থানীয় সরকারব্যবস্থা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়: ‘দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য যে ধরনের উন্নয়ন-চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা দরকার, তার সামর্থ্য বা সদিচ্ছা কোনোটাই এই আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের নেই…আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নয়, একমাত্র বিকেন্দ্রীকৃত রাষ্ট্রব্যবস্থাই দারিদ্র্য দূরীকরণের কর্মসূচি দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন ও তাতে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে এবং এটা করার জন্য দক্ষ প্রতিনিধিত্বশীল একটি স্থানীয় সরকার-কাঠামো গড়ে তুলতে হবে…আমি এখানে যে স্থানীয় সরকারের কথা বলছি, তা হবে স্থানীয় পর্যায়ে সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চালিকা শক্তি’ ও ‘স্বশাসিত’ (দারিদ্র্য দূরীকরণ: কিছু চিন্তাভাবনা, আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৫)। স্থানীয় সরকারব্যবস্থার উদ্দেশ্য স্থানীয় নেতৃত্বে স্থানীয় সমস্যার স্থানীয়ভাবে সমাধান করা, কারণ, সমস্যা যেখানে, সমাধানও সেখানেই। এ ছাড়া শহরে প্রাপ্ত সব প্রয়োজনীয় সেবা গ্রামে পৌঁছানোর বর্তমান সরকারের যে অগ্রাধিকার, তা বাস্তবায়নের অন্যতম মাধ্যমও হতে হবে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা।

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে আমরা অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছি। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন বর্তমানে আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার; এর জন্য এসডিজির স্থানীয়করণ তথা স্থানীয় নেতৃত্ব, স্থানীয় উদ্যোগ ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতায়ন আবশ্যক। এর জন্যও প্রয়োজন হবে একটি বিকেন্দ্রীকৃত ও প্রয়োজনীয় সম্পদপ্রাপ্ত স্থানীয় সরকারব্যবস্থা। প্রসঙ্গত, ‘কমিউনিটি চালিত’ একটি উন্নয়ন–কৌশল ব্যবহার করে এবং ‘দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট’-এর সহায়তায় বাগেরহাটের বেতাগা ইউনিয়নের মতো সারা দেশে আরও বেশ কিছু ইউনিয়ন পরিষদ জনগণকে সংগঠিত করে, সরকারি সেবাগুলো কাজে লাগিয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় অংশীদারত্ব গড়ে তুলে এসডিজি অর্জনে ইতিমধ্যেই অনেক দৃশ্যমান সফলতা প্রদর্শন করেছে।

অনেক সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্যও প্রয়োজন মানুষকে সংগঠিত করা এবং তাদের মানসিকতা ও অভ্যাসে পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। সামাজিক পুঁজি গড়ে তোলার এ কাজ অতি সহজেই করা যায় তৃণমূলের স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে কার্যকর ও তাদের একদল স্বেচ্ছাব্রতী সহযোগী সৃষ্টির মাধ্যমে। এমনকি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলেও সব প্রতিষ্ঠান, বিশেষত সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহির মুখোমুখি করা দরকার। এ লক্ষ্যে তৃণমূলের স্থানীয় সরকারকে ওয়ার্ড সভার মাধ্যমে জনগণের মুখোমুখি করা সম্ভব। সর্বস্তরে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন রোধের জন্য যে সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠা দরকার, তা তৃণমূল পর্যায় থেকেই শুরু হয়ে ওপরের দিকে বিস্তৃত হতে পারে।

তোফায়েলের মতো আমরাও মনে করি, গ্রামীণ স্থানীয় সরকারব্যবস্থার জন্য একটি সমন্বিত আইন প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে শওকত আলীর নেতৃত্বে ২০০৭ সালে গঠিত ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গতিশীল ও শক্তিশালীকরণ কমিটি’—বর্তমান লেখক যার একজন সদস্য ছিলেন—এমন একটি সমন্বিত আইনের সুপারিশ করেছিল। সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি; সেটি এখনো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। আইনের সংস্কার আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অনেক স্থানীয় সরকার আইন অত্যন্ত পশ্চাৎপদ এবং এগুলোর আধুনিকায়ন জরুরি। উদাহরণস্বরূপ সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ভাষায় বর্তমান জেলা পরিষদ আইন একটি ‘অথর্ব’ আইন।

 

সংস্কারের সম্ভাব্য ক্ষেত্রসমূহ

স্তরবিন্যাস: বর্তমানে গ্রামীণ স্থানীয় সরকারের তিনটি স্তর। জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো জনগণের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে অনেক সেবাই এখন মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এ অবস্থায় স্থানীয় সরকারের বিদ্যমান সব স্তরের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। স্তরবিন্যাসের সময় স্মরণ করা প্রয়োজন, স্থানীয় সরকারব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো প্রশাসনের একাংশে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা।

নির্বাচনব্যবস্থা: বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা এবং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানরা  স্থানীয় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। একইভাবে নির্বাচিত হন পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং কাউন্সিলররা। পক্ষান্তরে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। তাই সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনপদ্ধতিতে সামঞ্জস্য আনা গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই অবশ্য অন্যান্য স্তরেও পরোক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে। পরোক্ষ নির্বাচনের অনেক যৌক্তিকতা থাকলেও এমন নির্বাচনব্যবস্থায় চেয়ারম্যান ও মেয়র নির্বাচনে টাকার খেলা শুরু হতে বাধ্য, যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল গত জেলা পরিষদ নির্বাচনে। এ ছাড়া দলীয় মনোনয়নে স্থানীয় নির্বাচন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মানের অবনতি ঘটায় এবং বিস্তার ঘটায় মনোনয়ন–বাণিজ্য ও সহিংসতার। তাই আমরা দলীয়ভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিপক্ষে, যা নিয়ে বর্তমান লেখক বহুদিন থেকেই সোচ্চার।

সাংসদদের ভূমিকা: বিদ্যমান উপজেলা আইনে সাংসদদের উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা এবং উপদেষ্টার পরামর্শ মানা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে বিচারপতি খায়রুল হক ও বিচারপতি ফজলে কবীর আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বনাম বাংলাদেশ মামলায় [১৬ বিটিএল (এইসসিডি) ২০০৮] সাংসদদের স্থানীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত হওয়াকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেন। এ ছাড়া স্থানীয় উন্নয়নে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে অতীতে অনেক সাংসদ অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত কাজে যুক্ত হয়েছেন। এ ছাড়া তাঁদের সংসদমুখী করার মাধ্যমেই যেকোনো মূল্যে সাংসদ হওয়ার যে অশুভ প্রতিযোগিতা, তা বহুলাংশে রোধ করা সম্ভব হবে। তাই সংবিধান ও আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সাংসদদের জরুরি ভিত্তিতে বিযুক্ত করতে হবে।

সংরক্ষিত আসন: উপজেলা ও জেলা পরিষদের সংরক্ষিত আসনে নির্বাচনপদ্ধতি অন্য তিনটি স্তর থেকে ভিন্ন, তাই এগুলোয় সংগতি আনা জরুরি। আরও জরুরি সংরক্ষণ–পদ্ধতিকে অর্থবহ করা, যাতে নারীর সত্যিকারের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয়। এ ক্ষেত্রে ভারতীয় পঞ্চায়েতের ‘ঘূর্ণমান পদ্ধতি’ অনেক বেশি যুগোপযোগী, যাতে নারীর মোট প্রতিনিধিত্ব সংরক্ষণ হার থেকে অনেক বেশি হয় এবং অনেক বেশি যোগ্য নারী নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পান।

ক্ষমতা, জনবল ও সম্পদ প্রদান: আমাদের সাংবিধানিক আকাঙ্ক্ষার সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হলে একটি বলিষ্ঠ বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে, যাতে অধিক ক্ষমতা, জনবল ও সম্পদ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে হস্তান্তর করা যায়। আরও নিশ্চিত করতে হবে এগুলোর সত্যিকারের স্বায়ত্তশাসন। তাহলেই উন্নয়ন ঊর্ধ্বমুখী হবে এবং আমাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

আমরা আশা করি, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে সরকার একটি কমিটি/কমিশন গঠন করবে। কমিটি/কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে আমাদের স্থানীয় সরকারব্যবস্থার সংস্কারের উদ্যোগ নেবে এবং পুরো ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস করবে। তাহলেই আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আরও গভীরতা লাভ করবে এবং আমরা দ্রুত সামনে এগোব। একই সঙ্গে স্বশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে। তাই আমরা ইতিমধ্যে ঘোষিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের তফসিল বাতিল করে পুরো স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই।

ড. বদিউল আলম মজুমদার সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)–এর সম্পাদক

 

 

 

সূত্র : প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ