ডাইনিং টেবিলকেই অফিস বানিয়ে ফেলতাম

ছোটবেলা কেমন ছিল?

আমার জন্ম কলকাতায়, ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৪১। ছয় ভাই, ছয় বোনের মধ্যে আমি অষ্টম। আব্বা ব্যারিস্টার খন্দকার আলী আফজাল প্রথমে কলকাতায় ব্রিটিশ সরকারের সচিব ছিলেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাকিস্তানের করাচিতে জাতীয় সংসদের সচিব হিসেবে কাজ করেন তিনি। দাদা খান বাহাদুর ফজলে রাব্বি ছিলেন মুর্শিদাবাদের দেওয়ান। করাচিতেই পড়াশোনা করেছি আমি। আব্বা নানা ধরনের সামাজিক শিক্ষা দিয়েছেন। ছোট থেকেই শিখিয়েছেন—মিথ্যা কথা বলবে না, অন্যকে সাহায্য করবে, সত্ভাবে চলবে, সবাই মিলেমিশে থাকবে। সেখানকার সেরা স্কুল-কলেজেই আমরা সব ভাই-বোন পড়ালেখা করেছি। খেলাধুলা আমার খুব ভালো লাগত। স্কুলে খেলতাম। বাসায়ও ভাইদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতাম। গাছে চড়তাম। বাইসাইকেল চালাতাম। আব্বা আমাকে গাড়ি চালানো শিখিয়েছেন।

পরিবারে অনুশাসন কেমন ছিল?

আব্বা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে খুব ভালোভাবে মিশতেন। আম্মা নিয়ম-কানুনের ব্যাপারে কড়া ছিলেন। আমরা ‘আউটবুক’ পড়তে পছন্দ করতাম। আম্মা বলতেন, ‘এখন তোমার পাঠ্য বই পড়ার সময়। এখন গল্পের বই পড়তে পারবে না।’ খাবার টেবিলে সবাইকে একসঙ্গে না পেলে আব্বা রাগ করতেন। যখনই বলা হতো টেবিলে খানা দেওয়া হয়েছে—সব্বাই পড়ালেখা, কাজ, খেলাধুলা বাদ দিয়ে চলে আসতাম, বিশেষ করে দুপুরের খাবার, বিকেলের চা-নাশতা, রাতের খাবারের সময়। মাগরিবের পর ভাই-বোন সবাইকে পড়তে বসতে হতো। তখন তো কোচিং ছিল না। যে ভাই বা বোন যে বিষয়ে ভালো, তার কাছে সেটা পড়তাম। ছুটির দিন আব্বা পড়া ধরতেন। ভাই-বোনদের মধ্যে যারা একেবারে ছোট, তখনো স্কুলে যায় না—আম্মা তাদের পড়াতেন। আব্বা আমাদের ক্লাসিক উপন্যাস কিনে দিতেন। আমরা সব ভাই-বোনও কিন্তু বইপড়ুয়া। ছুটির দিনে পড়তাম। বাসায় আমার ডাকনাম ছিল রোকি।

ভাই-বোনদের সঙ্গে বিশেষ কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?

আমার ঠিক বড় ভাইটি একটু দুষ্টু ছিলেন। পড়াশোনা শেষ হলে আমরা একসঙ্গে সাইকেল চালাতাম। আমাদের বাসায় বড় একটা বরইগাছ ছিল। আমরা ছাদ গিয়ে বরই পাড়তাম। একবার আমার ভাই আর আমি অনেক কষ্ট করে দেয়ালে চড়েছি, পেয়ারা পাড়ব বলে। সেখানে মৌমাছির বাসা ছিল, খেয়াল করিনি। যেই না পেয়ারা পাড়তে যাব, অমনি মৌমাছিগুলো আমাদের কামড়াতে শুরু করল। দেয়ালটি ছিল উঁচু। সেখান থেকে লাফ দিতেও পারছি না। তাই আমরা দুজনই চিল্লাচ্ছি। আম্মা এসে আমাদের নামিয়ে নিলেন। তারপর কী সব যেন লাগিয়ে দিলেন, ব্যথা কমানোর জন্য। খুব বকাও খেয়েছি তখন। কোনো কারণে আম্মা যখন আমাদের কোনো ভাই-বোনকে বকতেন, তখন অন্য ভাই-বোনেরা সেই ভাই বা বোনটির পক্ষ নিতাম। এ ছিল মমতার ব্যাপার। আমাদের বাসায় ফল খাওয়ার রেওয়াজ ছিল। খুব ফল আসত। ফলগুলো সব ভাই-বোনকে সমান ভাগ করে দেওয়া হতো। আমাদের স্কুল ছুটি হতো ৩টায়। সাড়ে ৩টায় বাসায় ফিরে দেখতাম, নিজের ভাগের ফলগুলো একটা প্লেটে রাখা আছে। বাড়িতে সব সময়ই দুটি গাভি থাকত। পাকিস্তানি গাভিগুলো প্রচুর দুধ দিত। রাতে মিষ্টি ও দুধ খেতে হতোই; কিন্তু এই রেওয়াজ আমার জন্য ছিল বড় সমস্যা। আম্মা আমাদের জোর করে খাওয়াতেন। বেয়ারাকে দাঁড় করিয়ে রাখতেন, খেয়েছি কি না—দেখার জন্য। আমি সুযোগ পেলেই বেয়ারাকে বলতাম, ‘তুমি ওখানে যাও, ওটা নিয়ে আসো।’ সেই ফাঁকে দুধ ফেলে দিতাম! স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে, করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক করি। এ সময়ে ব্যাংকে চাকরি নিই।

আপনি এদেশের প্রথম নারী ব্যাংক ম্যানেজার।

১৯৬২ সালে করাচিতে মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকে (বর্তমানে রূপালী ব্যাংক লিমিটেড) চাকরি নিই আমি। সে সময় মেয়েদের চাকরি করাকে খুব একটা ভালো চোখে দেখা হতো না; কিন্তু আব্বা খুব সমর্থন দিলেন। ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পর আমাকে ওখানকার ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকারসে পড়াশোনা করতে হতো। ব্যাংক ছুটি হলে সেখানে যেতাম। রাত ৮টায় শেষ হতো ক্লাস। তখন আব্বা এসে আমাকে নিয়ে যেতেন। আমার পারফরম্যান্স দেখে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আমাকে ঢাকায় বদলি করল। ১৯৬৪ সালের জুলাইয়ে আমি একাই ঢাকায় এলাম। আব্বা প্লেনে তুলে দিলেন। এখানে এসে প্রথমে যোগ দিলাম রমনা ব্রাঞ্চে। সেটিই ছিল এই ব্যাংকের তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের মেইন ব্রাঞ্চ। আমাকে ম্যানেজারের দায়িত্ব দিয়ে লেডিস ব্রাঞ্চ খোলা হলো। সেটিতে ম্যানেজার হিসেবে নতুন কর্মী নিয়োগ দেওয়া এবং তাঁদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করলাম। এর আগে তো মেয়েরা ব্যাংকে চাকরি অন্যান্য দেশেও খুব একটা করত না। ধারণা করা হতো, মেয়েরা কাজ বোঝে না, অঙ্কে খারাপ। ফলে বাংলাদেশের মেয়েরা ব্যাংকে কাজ করছে, টাকা গুনছে—এ বিষয়টি বেশ প্রচার পেল। পত্রপত্রিকায় খুব লেখালেখি হলো, চলচ্চিত্রেও দেখানো হলো।

তখনো তো বিয়ে করেননি?

এখানে কয়েক মাস কাজ করার পর বিয়ে করলাম। স্বামী আজিমুর রহমান। ডাকনাম হারুন। তিনি তখন সিলেটের একটি চা বাগানের ম্যানেজার ছিলেন। বিয়ের পর আমরা হানিমুনে গেলাম নেপালে। ফিরে ব্যাংকে যোগ দিলাম। তারপর ওনার সঙ্গে চা বাগানে গেলাম। আমাকে ঢাকায় দিয়ে যেতে এসে তিনি বললেন, ‘তুমি আমার সঙ্গে থেকে গেলে ভালো হতো!’ আমার উপায় ছিল না। কেননা, আব্বা আমাকে দায়িত্ববোধ শিখিয়েছেন। নিজের পেশার প্রতি আমার দায়বোধ আছে। আমাদের মধ্যে বোঝাপড়া বেশ ভালো ছিল। তখন শনি-রবিবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটি। ছুটির দিনগুলো আমরা ভাগাভাগি করে নিয়েছিলাম। এক সপ্তাহে তিনি ঢাকায় চলে আসতেন, আবার পরের সপ্তাহে আমি চলে যেতাম সিলেটে। এভাবে তিন মাস চলার পর তিনিই সিলেট ছেড়ে ঢাকায় নতুন চাকরি নিলেন। তার পর থেকেই আমরা ঢাকায় সংসার শুরু করলাম। পর পর দুটি সন্তান হলো আমাদের—এক মেয়ে, এক ছেলে। আমি যখন অফিসে যেতাম, বাচ্চার শরীর খারাপ হলে কাজে মন বসত না। এর আগে কোনো মহিলাকে তো দেখিনি বাচ্চা রেখে কাজ করছেন; ফলে আমার সামনে কোনো রোল মডেল ছিল না। একসময় আশঙ্কা হলো, ঠিকমতো সময় দিতে পারছি না বলে বাচ্চারা যদি বিপথগামী হয়ে যায়, তাহলে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারব না। তাই ১৯৬৭ সালে চাকরিটি ছেড়ে দিলাম। আমার মেয়ের বয়স তখন এক বছর ১০ মাস; আর ছেলেটা ৮-১০ মাস বয়সী। সন্তানরা একটু বড় হওয়ার পর ভাবলাম, চাকরি করলে ঘড়ি ধরে অফিসে যেতে হয়; কিন্তু ব্যবসা তো বাসায় বসেও করা সম্ভব। ১৯৮০ সালে ব্যবসা শুরু করলাম।

প্রথম পদক্ষেপ কী ছিল?

অনেক ভেবেচিন্তে আলুর ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কারণ বিদেশ থেকে কোনো কিছুর র-ম্যাটারিয়াল এনে সেটি প্রসেস করে ব্যবসা করতে গেলে ঝামেলা হয়। অনেক সময় চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে চালান আটকে যায়। তখন অনেক ম্যাটারিয়াল নষ্ট হয়ে যায়, অনেক ছোটাছুটি করতে হয়। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে আমার পক্ষে এসব করা সম্ভব ছিল না। তাই ধারে-কাছেই কিছু একটা করতে চেয়েছি। শিল্প ব্যাংকের কাছে গেলাম ঋণের জন্য—কোল্ড স্টোরেজ দেব। শিল্প ব্যাংক আমাকে দূরের কোথাও জায়গা দেখিয়ে দিল; কিন্তু আমি মুন্সীগঞ্জ বেছে নিলাম। ঋণ পাস হতে বেশ কিছুদিন সময় লাগল। আমার ব্যবসাটি আসলে তিন ধরনের—আলু নিজে কিনে ব্যবসা করি, কৃষকরা ভাড়ায় কিছু আলু সংরক্ষণ করেন, আবার আমিও কিছু বীজ সংরক্ষণ করি। ব্যাংকের চাকরি থেকে জমানো টাকা যোগ করে আমি জমি কিনতে গেলাম। আমার স্বামীও সঙ্গে গেলেন। সাত-আটটা জমি দেখে একটা পছন্দ করলাম। কারণ সেই জমিটি একটু উঁচু ছিল; ফলে বন্যায় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা কম। জমির মালিককে বলে এলাম, ‘সামনের মঙ্গলবার আমার অফিসে আসবেন। সেদিন বায়না করব।’ তিনি এলেন না। পরে আরেক দিন তাঁকে খবর দিয়ে আনলাম। বললাম, ‘এলেন না কেন? না কিনলে জমির কাগজপত্র তো ব্যাংকে জমা দিতে পারছি না।’ তাঁরা বললেন, ‘আমরা খবর পেয়েছি, স্যার (আমার স্বামী) তো বিদেশে।’ আমি অবাক হয়ে গেলাম, ‘স্যার বিদেশে তো কী হয়েছে? এটা তো আমার ব্যবসা।’ আমি তখন চেক লিখে বায়না সই করলাম।

ব্যবসা দাঁড় করালেন কিভাবে?

মুন্সীগঞ্জে আমি লঞ্চে যেতাম। প্রথম দিকে ঘন ঘনই যেতে হতো। ড্রাইভার, ম্যানেজার আর স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে যেতাম। লঞ্চ জার্নি খুব মজা লাগত। পানি দেখতে দেখতে নদী দিয়ে যাচ্ছি। অনেক লোক। কেউ চানাচুর বিক্রি করছে, কেউ বা মুড়ি। গ্রামে শিমুল ফুল ফুটে আছে। গ্রামে যেতে আমার স্বামীরও ভালো লাগত। এভাবে নিয়মিত আসা-যাওয়া করে কোল্ড স্টোরেজটি গড়ে তুললাম। গ্রামের মানুষের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব ভালো। কথার দাম রাখতাম। নানা রকম বিল ও পাওনা সময়মতো শোধ করতাম। এভাবে সুনাম বাড়তে থাকল। তখন তো মোবাইল ফোন ছিল না, তবু কঠোরভাবে মনিটরিং করতাম। এরই মধ্যে একসময় মুন্সীগঞ্জেরই আরেকটি কোল্ড স্টোরেজ থেকে জানানো হলো, তারা সেটি আমার কাছে বিক্রি করে দিতে চায়। সেটি ছিল বাংলাদেশ শিল্পঋণ সংস্থার মালিকানাধীন। এমডির সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি শর্ত দিলেন, সব টাকা একবারে দিতে হবে। বললাম, ‘এতগুলো টাকা একসঙ্গে দেওয়ার মতো অবস্থা আমার নেই। আপনি যদি আমাকে সুযোগ দেন, আমি এখান থেকে আয় করে পরিশোধ করব।’ তিনি রাজি হলেন না। কিছুদিন পর আমাকে ফোন দিয়ে ডাকলেন। গেলাম। দুই-তিন বছরের কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের শর্তে সেটি কিনে নিলাম। এরপর একেবারে নতুন করে সাজালাম। মেশিন বদলালাম। জেনারেটর লাগালাম। বাজারে এই কোল্ড স্টোরেজটির কাছে অনেক পাওনাদার ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে বসলাম। তাঁরা আগের মালিক নয়, বরং আমার কাছ থেকেই টাকা নিতে চাইলেন। কারো লাখ টাকা বাকি, কারো ৫০ হাজার। আস্তে আস্তে আমি সব পাওনা মিটিয়ে দিলাম।

পরিবার ও ব্যবসা কিভাবে সামলাতেন?

যখন ব্যবসা শুরু করি, আমার মেয়েটি তখন ১৫ বছরের, আর ছেলেটির বয়স ১৪। ওদের বোঝালাম, ‘আমাকে তিন বছর সময় দাও। এ সময় আমাকে সব সময় পাবে না। আমি বাসায় না থাকলেও তোমরা ঠিকমতো স্কুলে যাবে, হোমওয়ার্ক করবে, খাওয়াদাওয়া করবে। তিন বছর পর আমি আবার আগের মতোই তোমাদের সময় দেব।’ তার পরও বাসায় ফেরামাত্রই মেয়ে হয়তো বলত কাল তার অঙ্ক পরীক্ষা। তাকে অঙ্ক করাতে বসতাম। পাশাপাশি নিজের ব্যবসার কাজ করতাম। আবার ছেলের হয়তো পরীক্ষা আছে। প্রথম প্রথম তাকে অফিসে নিয়ে গিয়ে, পাশের রুমে বসিয়ে অঙ্ক করতে দিতাম। তখন অন্যরা বলত, ‘আপা, আপনি কি ওকে পানিশমেন্ট দিয়েছেন?’ আমি বলতাম, ‘না, ও ওখানে বসে পড়বে।’ আবার এমনও দিন গেছে, ছেলের ভীষণ জ্বর। তখন আমি ডাইনিং টেবিলকেই নিজের অফিস বানিয়ে ফেলতাম। ম্যানেজার আসতেন। ডাইনিং টেবিলে বসেই কাজ করছি, চেক সই করছি। তারপর বেডরুমে গিয়ে ছেলের মাথায় পানি ঢালছি। এভাবেই সামলিয়েছি সব কিছু।

বড় ধরনের ঝামেলাও নিশ্চয়ই পোহাতে হয়েছে?

মুন্সীগঞ্জ যাওয়ার পথে একবার খুব ঝড়ের মুখে পড়েছিলাম। লঞ্চটা একদিকে হেলে গিয়েছিল। যাত্রীদের মধ্যে ছোটাছুটি লেগে গেল। চালক খুব দক্ষতার সঙ্গে লঞ্চটি পাড়ে ভেড়াতে পেরেছিলেন। সেই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে এক-দেড় ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়েছিল আমাদের। আরেকবার তো চরে লঞ্চ আটকে গিয়েছিল। সময় বাঁচানোর জন্য মাঝেমধ্যে স্পিডবোটেও যেতাম। কাজ করতে গিয়ে ১৯৮৫ সালের দিকে একবার মাস্তানদের পাল্লায়ও পড়েছিলাম। ম্যানেজারকে তারা হুমকি দিয়েছিল, প্রতি বস্তা আলুতে ১০ টাকা করে চাঁদা দিতে হবে; তা না হলে কোল্ড স্টোরেজ ভেঙে দেওয়া হবে। তারা একটা কূটকৌশল করল। টাকা চাইল স্কুলের নামে। তাদের ভয়ে গ্রামবাসী খুব আতঙ্কে থাকত। ম্যানেজার ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আমাকে এসে খবর দিলেন। আমি বললাম, ‘তুমি জিডি করো।’ ম্যানেজার বললেন, ‘জিডি করলে ওরা আমার পুরো পরিবার মেরে ফেলবে।’ জিডি এন্ট্রি করে আমি খাদ্যমন্ত্রীর কাছে গেলাম। তিনি পুলিশের ডিআইজির সঙ্গে কথা বলতে বললেন। ওখান থেকে সোজা চলে গেলাম ডিআইজির কাছে। তিনি আমার সামনেই মুন্সীগঞ্জের পুলিশকে ফোন করলেন। কোল্ড স্টোরেজের নিরাপত্তা দিতে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের ১০-১২ জনের একটা টিম পাঠানো হলো। এরপর মাস্তানরা আরো খেপে গেল। আমাকে ফোন করে বলল, ‘আপনি পুলিশকে কেন খবর দিলেন?’ আমি বললাম, ‘দেখুন, এটা আমাদের শিক্ষা। অসুখ হলে ডাক্তারের কাছে যাব, বিপদ হলে পুলিশের কাছে।’ দুদিন পরে আবার ফোন দিয়ে বলল, ‘আপনার সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলতে আসব।’ বললাম, ‘আসুন।’ এলো আমার অফিসে। ইয়া লম্বা চুল! আমাকে বলল, ‘জানেন, আমি এ পর্যন্ত ২১৩ জনকে একাই মেরেছি।’ বললাম, ‘দেখুন, আমার মৃত্যু একবারই হবে। যদি আপনার হাতে লেখা থাকে, তাহলে হবে।’ এর কিছুদিন পর আবার ফোন করে বলল, ‘আপনি এলাকায় আসেন।’ গিয়ে দেখি স্কুলের মাঠে বাচ্চাকাচ্চা ও তাদের অভিভাবকদের বসিয়ে রাখা হয়েছে। এক পাশে মাস্তানদের গ্রুপটি। ওদের নেতা বলছে, ‘এই ম্যাডাম এখান থেকে কোটি কোটি টাকা নিয়ে যাবে, অথচ স্কুলকে একটা পয়সা দিতেও রাজি না।’ প্রথমে আমার স্বামী কথা বললেন; কিন্তু তাঁকে ওরা নাজেহাল করার চেষ্টা করল। তখন আমি বললাম, ‘এখানে আমি যখন থেকে ব্যবসা করছি, সব ভালো কাজের সঙ্গেই আছি। স্বেচ্ছায় অনেক কিছুতে টাকা দিয়েছি, সেটা ভালোর জন্যই; কিন্তু কেউ আমার কাছ থেকে জোর করে টাকা নিতে পারবে না।’ এই বলে আমরা চলে এলাম। এরপর ওরা দিন-রাত ফোনের পর ফোন করতে থাকল। বলল, ‘আচ্ছা পাঁচ লাখ টাকা দিলেই হবে। আচ্ছা তিন লাখ…আচ্ছা ১০ হাজার!’ আমি বললাম, ‘কিছুই দেব না।’ কেননা চাঁদা দিলে ওরা নিজেদের জয়ী ভাবত।

সংগঠক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

১৯৮২ সালে আমি মাইডাস ফিন্যান্সিং লিমিটেডে যোগ দিই। এটি নন-ব্যাংকিং ফিন্যানশিয়াল ইনস্টিটিউশন। ব্যাংক সাধারণত বড় ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা, বিশেষত নারীরা যেন ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পেতে পারে, মাইডাসে আমি সেটির পরীক্ষা করলাম। সফলও হলাম। এখন আমি মাইডাসের চেয়ারম্যান। তিন টার্ম ধরে আছি। ১৯৯৪ সালে মেয়েদের নিয়ে প্রথম একটা সংগঠন করি—উইমেন এন্টারপ্রেনারস অ্যাসোসিয়েশন (উই)। আমরা এখান থেকে মেয়েদের নানা রকম ট্রেনিং দিতাম। ১৯৯৬ সালে আরেকটি সংগঠন করলাম—ওয়াইজ (ওম্যান ইন স্মল এন্টারপ্রাইজিং)। ২০০৬ সালে করলাম বাংলাদেশ ফেডারেশন অন উইমেন এন্টারপ্রেনারস (বিএফডাব্লিউই)। এটির প্রেসিডেন্ট আমি। ‘উই’ বেশির ভাগ কাজ করেছে ঢাকার মধ্যেই। ‘বিএফডাব্লিউই’র কাজ ঢাকার বাইরে। কিছুদিন আগেও রাজশাহীতে কাজ করেছি। আমরা মনে করি, আমাদের ঢাকার বাইরে গিয়ে কাজ করা উচিত। আমরা, এই সংগঠনের সদস্যরা শপথ নিয়েছি, প্রত্যেকে পাঁচজন করে নারী উদ্যোক্তা তৈরি করব। যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের সাপোর্ট দেব। মাইডাস থেকেই আমি দেখে এসেছি, ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে নারীরা খুব ভালো। মানুষের জন্য কাজ করতেই কোল্ড স্টোরেজ ব্যবসার পাশাপাশি অন্যান্য ব্যবসা ও সংগঠনে জড়িয়েছি। প্রথমে কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হয়েছি। তারপর একাধিক মেয়াদে বাংলাদেশ এমপ্লয়ারস ফেডারেশনের (বিইএফ) প্রেসিডেন্ট ছিলাম। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিরও প্রেসিডেন্ট ছিলাম দুই মেয়াদে। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো চেম্বার। ২০১৪ সালে আমরা এ সংগঠনের ১১০ বছর উদ্যাপন করেছি। অতিথি হয়ে এসেছিলেন ড. এ পি জে আব্দুল কালাম (ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি)। এখন আমি ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের (আইসিসি) ভাইস প্রেসিডেন্ট। আরো নানা সংগঠনেই কাজ করছি। এখন সময় বেশি দিতে চাই উন্নয়নে। মেয়েরা আগের তুলনায় অনেক উন্নতি করছে—এটা দেখে ভালো লাগে।

কাজ করে আপনি কতটা তৃপ্ত?

আমি তো অনেক গ্রামে ঘুরেছি। দেখেছি মেয়েরা সাইকেল চালাচ্ছে, মোটরসাইকেল চালাচ্ছে, বিউটি পার্লার দিচ্ছে। এখন অনেক বাধা খুলে গেছে। যখন বাধা খুলে গেছে, তাঁরা অনেকেই জানেন না কিভাবে আগাবেন। অনেকে আবার আমাকে বলেন, ‘আপনাকে কিছু করতে হবে না। আপনি শুধু পাশে দাঁড়ান।’ আমি স্রেফ পাশে দাঁড়াই তাঁদের। আমি মনে করি মেয়েদের সাহায্য না করলে অপরাধ হবে। বড় অঙ্কের ঋণ নয়, মাত্র পাঁচ হাজার টাকা নিয়েও অনেকে জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারছে। দিনমজুর স্বামীকে সাহায্য করছে। ওদের বাচ্চারা স্কুলে যাচ্ছে। মেয়েটি সংসারও করছে, বাচ্চাও সামলাচ্ছে—এমন চিত্র আমি অনেক দেখেছি। তাদের সঙ্গে কাজ করতে গেলে মনটা এমনি ভালো হয়ে যায়।

আপনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন।

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে আমি চারটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলাম—শিশুবিষয়ক, মা ও শিশুবিষয়ক, শ্রম ও সংস্কৃতি। চার জায়গায়ই প্রচুর কাজ হতো। ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদের ভীষণ সমর্থন পেয়েছি। আমাদের টিমের সবাই একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করেছি। ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে ইশতিয়াক ভাইয়ের সঙ্গে হেলিকপ্টারে বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে ফাতেহা পাঠ করতে গিয়েছিলাম। এরপর ডিসি অফিসে বসে নির্বাচন নিয়ে কথা বললাম। ১০ জায়গার নাম উঠে এলো, যেখানে মেয়েদের ভোট দেওয়ার ওপর ফতোয়া জারি ছিল। আমরা ওখানে একটা গ্রুপ করলাম। মৌলভি, স্বামী, স্ত্রী…বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষকে ডাকা হলো। মৌলভিরা নারীদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আপনারা অবশ্যই ভোট দেবেন। এটা আপনাদের দায়িত্ব।’ তখন সবাই হাত তুলে শপথ নিয়েছিলেন। তাঁদের সচেতন করার দায়িত্বটি আমরা পালন করেছি। তখন নির্বাচনী প্রচারণায় শিশুদের ব্যবহার করা হতো। নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়ে এর বিরুদ্ধে নির্দেশ জারি করতে জানিয়েছিলাম আমরা। অন্যদিকে আমি যেহেতু শ্রম মন্ত্রণালয়ে কাজ করি, খেয়াল করলাম, বাংলাদেশের শ্রমিকদের সঙ্গে বিদেশে, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে খুবই খারাপ ব্যবহার করা হয়। ওদের খেয়াল রাখার জন্য, ওদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য দূতাবাসগুলোকে নির্দেশ দিয়েছিলাম। এ ছাড়া নির্বাচনের পর মে দিবসের এক অনুষ্ঠানে আমাকে মালিকপক্ষ থেকে বক্তৃৃতা দিতে হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এই মন্ত্রণালয়টির নাম ছিল ‘মিনিস্ট্রি অব লেবার অ্যান্ড ম্যান পাওয়ার’। আমি বললাম, যেহেতু নারীরাও প্রচুর কাজ করছে, তাই ‘ম্যান পাওয়ার’ শব্দটি থাকা উচিত নয়। প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে নোট নিলেন। মন্ত্রণালয়ের নাম পাল্টে রাখা হলো—‘মিনিস্ট্রি অব লেবার অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট’ (শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়)।

অনেক অভিজ্ঞতার মধ্যে গিয়ে জীবন সম্পর্কে আপনার উপলব্ধি কী?

অনেকেই বলে, ‘আমরা আপনার মতো হতে চাই।’ আমি বলি, ‘তোমরা হাঁটা শুরু করো।’ আমি ২০ বছর বয়স থেকে নিজের পথে হাঁটা শুরু করেছি। এখনো হাঁটছি। যখন শুরু করেছিলাম, আজকের অবস্থানে পৌঁছতে পারব কি না—সেই ভাবনা ছিল না। স্রেফ কাজ করে গেছি। আমি মনে করি, সত্ভাবে চলাটাই ভালো। কেউ যখন বলে, “আপনি আমাকে ১৫ বছর আগে ‘এই’ সাপোর্ট দিয়েছিলেন। এখন আমি ‘এই’ অবস্থায় পৌঁছতে পেরেছি।’’ তখন খুব ভালো লাগে। জীবনে অনেক সম্মান ও সম্মাননা পেয়েছি, অনেক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলিয়েছি। তবে যখন দেখি আমার মাধ্যমে অন্য কারো সামান্য হলেও উপকার হয়েছে—সেই আনন্দের পরিসীমা নেই।

(গুলশান, ঢাকা; ৩০ জানুয়ারি ২০১৯)

শ্রতলিখন : মাসুদ রানা আশিক

 

 

 

সূত্র: কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ