প্রাচ্যের আদর্শ : উৎসের খোঁজ

প্রাচ্যের শিল্পকলার ইতিহাস, তত্ত্ব ও তথ্যের তল খুঁজতে গিয়ে খোঁজ পাই গত শতকের শুরুতে লেখা কাকুজো ওকাকুরা’র ইংরেজি ভাষায় লিখিত ‘দি আইডিয়াল অব দি ইস্ট’ বইটার। ১৯০৩ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত এ বই বাংলা অনুবাদে ‘প্রাচ্যের আদর্শ’ নামে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়।

জাপানের শিল্পকলার একনিষ্ঠ ছাত্র ও পরবর্তী সময়ে শিক্ষক ওকাকুরা নানা কারণে ভারতীয়দের কাছে একটি পরিচিত নাম। সেই সময়ে জাপান ও অন্যান্য দেশে প্রাচ্যের পুরাতত্ত্ব এবং কলা শিল্পের ক্ষেত্রে যে সব দিকপাল প-িত ও মনীষী জীবিত ছিলেন, তাদের মধ্যে কাকুজো ওকাকুরা সর্বশ্রেষ্ঠরূপে বিবেচিত হন। তিনি গত শতকের প্রথম দিকে প্রথমে স্বামী বিবেকানন্দ ও পরবর্তী সময়ে নিবেদিতা ও রবীন্দ্রনাথের সংস্পর্শে আসেন।

পাশ্চাত্য দেশের শিল্পকলার কাঠামো, ভঙ্গি, রসবোধ ইত্যাদি অন্তর্নিহিত কিছু বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে প্রাচ্যের শিল্পকলার যে তুলনামূলক পার্থক্য রয়েছে তাতে তিনি বুঝতে পারেন, তার দেশের শিল্পকলার মূলে রয়েছে ভারতের জীবন-দর্শন। তার সৌভাগ্য যে সেই জীবন-দর্শনের সেরা তিন ব্যাখ্যাতার সান্নিধ্যে তিনি আসেনÑ বিবেকানন্দ, নিবেদিতা ও রবীন্দ্রনাথ। যার ফলে সমগ্র প্রাচ্যকে এক অভিনব ঐক্য সূত্রে গাঁথা দেখতে পান। ওকাকুরার মতে স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষের দ্বারাই কেবল কলা শিল্পের উন্নতি সম্ভব। আমরা যাকে জাতীয়তাবোধ বলি, তা স্বাধীনতা প্রসূত আনন্দেরই অভিব্যক্তি ও তার বাস্তব পরিণতি। তাই হাজার বছরের পরাধীনতার নিপীড়নে আনন্দ ও সৌন্দর্যের রাজ্যে ভারতের যদি কোনো স্থান নাও থাকে তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। ওকাকুরা বলছেন যে, এদেশ অশোকের রাজত্বকালে ধর্ম বিষয়ে সমগ্র পূর্বদেশকে পরিচালনা করেছে। ‘আদর্শের লীলাভূমি’ শিরোনামের প্রথম প্রবন্ধেই ওকাকুরা বলেন-

‘হিমালয় পর্বতমালা দুটি মহান সভ্যতাকে বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন করেছে তাদের বিশিষ্ট ও সুস্পষ্ট করে তুলবার জন্যই। এই দুটি সভ্যতার একটি হলো কনফুসিয়াসের সাম্যবাদ সমন্বিত চৈনিক সভ্যতা। আর দ্বিতীয়টি হলো বেদের আত্মবিকাশমূলক ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী আদর্শ বিশিষ্ট ভারতীয় সভ্যতা। কিন্তু অনন্ত ও অখ-ের প্রতি এশিয়ার যে প্রেম-প্রীতি, তার সুবিস্তারকে এই তুষারমালার প্রাচীর ক্ষণিকের জন্যও ব্যাহত করতে পারেনি। এই প্রেম-প্রীতির সাধনাই প্রতিটি এশীয় জাতির সাধারণ উত্তরাধিকার। এই জন্যই এশিয়া সমস্ত মহান ও শ্রেষ্ঠ ধর্মের জনয়িত্রী হতে সক্ষম হয়েছে।’

এশিয়া যদি এক ও অখ- হয়, তাহলে এ কথাও সত্য যে সমগ্র এশীয় জাতিসমূহ একটা মৌল যোগসূত্রের বন্ধনে আবদ্ধ। শ্রেণিবিভাগের যুগে এসে আমরা ভুলে যাই যে, সভ্যতার বিভিন্ন রূপ ও প্রকাশ মোটামুটি কোনো একটা ভাবপ্রবাহের এক একটা স্বতন্ত্র ও উজ্জ্বল লহরী ছাড়া কিছুই না। দিল্লির ইতিহাস যদি মুসলমান সমাজের ওপরে তাতার আধিপত্যের কথাই স্পষ্ট করে তোলে, তাহলে বাগদাদের কাহিনীও অবশ্য স্মরণীয়। বাগদাদের মহান সারানেসীয় সংস্কৃতি সেমিটিক মানবগোষ্ঠীর শক্তি প্রসঙ্গে সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।

আর এই গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায় ভূমধ্যসাগরের উপকূলবাসী ফ্রাঙ্ক জাতির মধ্যে সেমিটিক মানব কর্তৃক চৈনিক ও পারসিক সংস্কৃতি ও শিল্পের প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে। আরব জাতির শৌর্য, পারস্যের কাব্যকবিতা, চীনের নীতিশাস্ত্র এবং ভারতীয় চিন্তাধারা সবই এশীয় মৈত্রী বন্ধনের প্রাচীন বাণী ও আদর্শ ঘোষণা করে। এই মৈত্রী বন্ধনের মাধ্যমেই একটা সমধর্মী জীবনাদর্শ গড়ে উঠেছিল। তবে এই জীবনদর্শন বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন ধারায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের খাতে প্রবাহিত হয়েছিল।

ওকাকুরা বলেন ‘পশ্চিম এশিয়া থেকে পূর্ব এশিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায় যে, বৌদ্ধধর্মীয় যে আদর্শবাদের মহাসমুদ্রে পূর্ব এশিয়ার সমুদয় চিন্তাধারার স্রোত গিয়ে মিলিত হয়েছে, তা কেবল গঙ্গানদীর (উত্তর ভারতীয়) পূত প্রবাহেই সুন্দর ও সমৃদ্ধ হয়নি। কারণ, তান্ত্রিক ধর্মাবলম্বী যে সব জাতি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, তারাও তাকে নানা শাখা পল্লবে বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ করে তুলেছিলেন। বৌদ্ধ ধর্ম-বিশ^াসের রতœ ভা-ারে এরা এনেছিলেন নব নব ভাবের প্রতীকরাজি, নতুনতর সংগঠন প্রণালী ও সাধন ভজনের নতুন পন্থা, নবীন ভাব ও প্রেরণা।’

তিনি ভারতীয় ভাস্কর্যে গ্রিসীয় প্রভাব ও চৈনিক শিল্পধারায় হেলেনিক (গ্রিক) মতবাদের অসম্ভব্যতা প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ সক্ষম হয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, ভারতীয় ললিতকলার সঙ্গে মুখ্যত চৈনিক রীতির সম্বন্ধ রয়েছে। এশীয় শিল্পধারার প্রবাহ গ্রিস দেশের (হিলাস) উপকূলেও যেমন তার তরঙ্গ চিহ্ন রেখেছে, তেমনি আবার আয়ারল্যন্ডের পশ্চিম সীমানায় ইট্্রুরিয়া, ফিনিসিয়া, মিসর, ভারতবর্ষ এবং চীন দেশেও আত্মবিস্তার করেছে।

ওকাকুরা লাওবাদ ও তাওবাদের মধ্যে যে পার্থক্য নির্ণয় করেছেন, তা ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে। লাওবাদ ও তাওবাদ হচ্ছে এশীয় চিন্তাধারার পারস্পরিক সমধর্মী মিলনসূত্র। তার ধারণা যে, প্রকৃত আদর্শবাদের জন্য জাপানকে নির্ভর করতে হয়েছিল ভারতবর্ষের ওপর।

তিনি বিশ্বাস করেন যে, জাপানের আত্মপ্রকাশের বিশেষ বিশেষ পর্যায়গুলো সর্বদাই ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার প্রবাহ ও তার গতিপ্রকৃতিকে অনুসরণ করেই বাস্তবায়িত হয়েছিল। উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপের শিল্পভাবনা যদি ইতালি ও খ্রিস্টধর্মের মহান বাণীর প্রভাব বিবর্জিত হতো, তা যেমন নিঃসন্দেহে এতখানি উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হতে পারত না, ঠিক তেমনি চীন ও জাপান যদি দক্ষিণ উপদ্বীপের (ভারতবর্ষ) উদ্দীপনাময় প্রভাব থেকে বঞ্চিত হতো, তাহলে এই দুটি দেশের শিল্পবৃত্তি অবশ্যই বলবীর্যহীন হয়ে পড়ত।তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার প্রবাহ কীভাবে বিভিন্ন জাতিকে আচ্ছন্ন ও অনুপ্রাণিত করেছে।

লেখক:গাজী তানজিয়া ,কথাসাহিত্যিক

 

 

 

সূত্র: দেশ রুপান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ