‘বাংলার সংসদে বইপত্র: খণ্ডচিত্র’

২৭ মার্চ ১৯৪৯ বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য নরেন্দ্র নাথ দাসগুপ্ত নোয়াখালী থেকে প্রকাশিত ‘দেশবরেণ্য’ পত্রিকার প্রকাশনা স্থগিত রাখার কারণ জানতে চান। এ পত্রিকায় নোয়াখালীর হিন্দুদের অভিযোগ প্রকাশিত হচ্ছিল।

স্বরাষ্ট্র বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এ কে ফজলুল হক প্রকাশনী স্থগিত রাখার কথা স্বীকার করেন। তাত্ক্ষণিকভাবে কোনো কারণ বলা না হলেও বারবার সতর্ক করে দেয়ার পরও ‘দেশবরেণ্য’ বিকৃত সংবাদ পরিবেশন করে আসছিল, যা সাম্প্রদায়িক শত্রুতা ও ঘৃণা ছড়াচ্ছিল। সরকার জনস্বার্থে সঠিক কাজটিই করেছে।

একই দিন চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘দেশপ্রিয়’ পত্রিকায় প্রকাশনা স্থগিত করার আদেশ নিয়ে প্রতুল চন্দ্র গাঙ্গুলী প্রশ্ন তোলেন। এই পত্রিকার প্রকাশক ও ছাপাখানার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় বলে এ কে ফজলুল হক জানান।

অখণ্ড বাংলার সংসদের পর্ব দুটি। ১৯৩৫-এর ইন্ডিয়া অ্যাক্টের আগে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল এবং পরে ১৯৪৭ পর্যন্ত বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি। উভয় পর্বে বাংলায় প্রকাশিত নিষিদ্ধকৃত বইপত্র আলোচনায় এসেছে। সাধারণভাবেও হাসপাতালে, কারাগারে বই আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে। বাংলার সংসদের কার্যবিবরণী সবই ইংরেজিতে, সংসদেও ইরেজিতেই বলতে হতো। মওলানা ভাসানীসহ দু-একজন জোর করেই বাংলা বলতেন। বাংলার সংসদে বইপত্রের আলোচনার কয়েকটি খণ্ডচিত্র তুলে ধরা হলো—

১৯২৭-এর ৪ জানুয়ারি শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ নিষিদ্ধ ঘোষিত হলো। সরকারি আদেশে যা বলা হয়, তার মর্মার্থ—১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৯-এর ধারার বিধান অনুযায়ী শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা বাংলা গ্রন্থ পথের দাবীর সকল কপি যেখানেই পাওয়া যায়, তা বাজেয়াপ্ত বলে গণ্য হবে।

পথের দাবীর প্রকাশক শ্রী উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং মুদ্রাকর কলকাতার ৫১ হ্যারিসন রোডের কটন প্রেসের মালিক সত্য কিঙ্কর বন্দোপাধ্যায়। ভারতীয় দণ্ডবিধি ১২৪-এ বর্ণিত রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে শাস্তিযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে এবং উসকানি দেয়া হয়েছে।

বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য মহারাজা ক্ষৌণীশ চন্দ্র রায় পথের দাবীর বাজেয়াপ্তকরণ অত্যন্ত যুক্তিসম্মত ও সুবিবেচনাপ্রসূত কাজ হয়েছে বলে লিখিতভাবে সরকারকে জানান। তার চিঠির সারাংশ—

১. আমি পথের দাবী পড়েছি আমাকে স্বীকার করতেই হবে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকের দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে ভীষণ রকম হতাশ করেছে।

২. এই বইয়ে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহের প্ররোচনা দিয়েছেন (খ) বিপ্লবী ভাবধারা প্রচার করেছেন (গ) শ্রমিক ধর্মঘটের ওকালতি করেছেন (ঘ) ইংরেজ ও খ্রিস্টবাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়েছেন (ঙ) বলশেভিবাবাদ প্রচার করেছেন (চ) সরকারের প্রতি ঘৃণা বর্ষণ করেছেন।

তার বই নিয়ে বাংলা সরকারের অ্যাডভোকেট জেনারেল যেসব সমালোচনা করেছেন, তা যথার্থ এবং পথের দাবীর বাজেয়াপ্তকরণ অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত হয়েছে। বইটি গঠনমূলক নয়, বরং সংকট সৃষ্টিকারী।

২৩ আগস্ট ১৯২৭ কাউন্সিল অধিবেশনে সদস্য হরেন্দ্রনাথ চৌধুরী স্বরাষ্ট্র (রাজনৈতিক) দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত সদস্যকে প্রশ্ন করেন (গভর্নর ও কয়েকজন সদস্য নিয়ে গভর্নর-ইন-কাউন্সিল, এ কালের মন্ত্রিসভা)—

ক. মাননীয় সদস্য বলবেন বি-৪ জানুয়ারি ১৯২৭ শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পথের দাবী বাজেয়াপ্ত করার আগে কারো আইনি মতামত নেয়া হয়েছে?

খ. যদি হয়ে থাকে, তাহলে কার অভিমত নেয়া হয়েছে?

গ. সরকারের অ্যাডভোকেট জেনারেলের অভিমত গ্রহণ করা হয়েছে কি?

ঘ. এর জবাব যদি নাবোধক হয়ে থাকে, তার কারণ কী?

গভর্নরের কাউন্সিল সদস্য মোবার্লে প্রথম প্রশ্নটির জবাবে হ্যাঁ বললেন। আর অন্য তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে সরকার ইচ্ছুক নয় বলে জানালেন।

দুদিন পর ২৫ আগস্ট সুভাষ চন্দ্র জিজ্ঞেস করলেন:

ক. কেন শ্রীযুক্ত শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পথের দাবী বাজেয়াপ্ত হয়েছে মাননীয় সদস্য বলবেন কি?

খ. সরকার কি এ আদেশ প্রত্যাহার করার কথা ভাবছে?

গ. যদি দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর নাবোধক হয়ে থাকে, তাহলে সরকার কি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোনো লেখক বোর্ডের মতামত গ্রহণে এ বইটি পাঠাবেন?

মোবার্লে বললেন, নিষিদ্ধ করার কারণ সরকার মনে করেছে এই বইয়ে রাষ্ট্রদ্রোহের উপাদান রয়েছে! সরকার এ আদেশ প্রত্যাহার করবে না এবং লেখকদের কোনো বোর্ডের মতামতও গ্রহণ করবে না।

১৯২৬-১৯৯৭ বর্ষের বাংলা সরকারের প্রশাসনিক প্রতিবেদনে বলা হয়, জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের তার আবেগপ্রবণ তিক্ত আক্রমণের লক্ষ্য ইউরোপীয় শক্তি ও এশিয়ার বিভিন্ন খ্রিস্টীয় মিশন।

৫ আগস্ট ১৯৩৮ কাউন্সিল অধিবেশনে বীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রশ্ন—

ক. বিহার সরকার যে পথের দাবীর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে বাংলা সরকার কি অবহিত?

খ. এই প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ হলে বাংলা সরকারও কি তা প্রত্যাহার করে নেবে?

গ. যদি প্রত্যাহার না করা হয়, তার কারণ কী?

স্বরাষ্ট্র দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত খাজা নাজিমউদ্দিন বললেন, বিহারের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার-সংক্রান্ত কোনো তথ্য তার কাছে নেই। সুতরাং পরের দুটো প্রশ্ন অবান্তর।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রশ্ন করলেন, বিহার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলে বাংলা সরকার কি তা করবে?

নাজিমউদ্দিন সরাসরি বলে দিলেন, না।

আবুল কাশেম ফজলুল হক যখন মুখ্যমন্ত্রী, ১ মার্চ ১৯৩৯ তারই আদেশে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

এই প্রত্যাহারের মাধ্যমে সরকার কিছুটা শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে, ১০ মার্চ নবশক্তি লিখেছে:

‘সাহিত্যে হেতুহীন রাজরোষের যথেচ্ছ প্রয়োগ শাসকের শুভবুদ্ধির চিহ্ন নহে, বরং আত্মিক দুর্বলতার পরিচায়ক। রাজরোষে আপতিত অন্যান্য গ্রন্থাদির উপর হইতেও সরকারী জুলুম অবিলম্বে উঠাইয়া লইতে আমরা বাংলার সরকারকে অনুরোধ জানাইতেছি।’

দেশবরেণ্য

২৭ মার্চ ১৯৪৯ বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য নরেন্দ্র নাথ দাসগুপ্ত নোয়াখালী থেকে প্রকাশিত ‘দেশবরেণ্য’ পত্রিকার প্রকাশনা স্থগিত রাখার কারণ জানতে চান। এ পত্রিকায় নোয়াখালীর হিন্দুদের অভিযোগ প্রকাশিত হচ্ছিল।

স্বরাষ্ট্র বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এ কে ফজলুল হক প্রকাশনী স্থগিত রাখার কথা স্বীকার করেন। তাত্ক্ষণিকভাবে কোনো কারণ বলা না হলেও বারবার সতর্ক করে দেয়ার পরও ‘দেশবরেণ্য’ বিকৃত সংবাদ পরিবেশন করে আসছিল, যা সাম্প্রদায়িক শত্রুতা ও ঘৃণা ছড়াচ্ছিল। সরকার জনস্বার্থে সঠিক কাজটিই করেছে।

একই দিন চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘দেশপ্রিয়’ পত্রিকায় প্রকাশনা স্থগিত করার আদেশ নিয়ে প্রতুল চন্দ্র গাঙ্গুলী প্রশ্ন তোলেন। এই পত্রিকার প্রকাশক ও ছাপাখানার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় বলে এ কে ফজলুল হক জানান।

মজদুর

২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩৭ শিবনাথ ব্যানার্জি স্বরাষ্ট্র দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সামনে সাপ্তাহিক ‘মজদুর’-সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি প্রশ্ন রাখেন:

ক. মন্ত্রী কি জানেন যে সাপ্তাহিক মজদুর শ্রমিকদের স্বার্থে নিবেদিত একটি পত্রিকা?

খ. এটি ট্রেড ইউনিয়ন বিষয় নিয়ে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত?

গ. ১০ জুলাই ১৯৩৬ বাংলা সরকার এ পত্রিকাকে ৫৫০ টাকা জমাদানের নির্দেশ দেয়?

ঘ. টাকা জমা না দেয়ায় পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়?

ঙ. যে নিবন্ধের জন্য সরকার রুষ্ট হয়, তাতে সভা করে নেতাজি সুভাষ বসুর মুক্তির জন্য শ্রমিকদের আহ্বান করা হয়?

চ. এটা কি সত্য সুভাষ বসু ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি? বাংলা ও বিহারের অনেক ট্রেড ইউনিয়নের তিনি প্রধান?

ছ. সরকার কি অবহিত যে শ্রমিকদের এ জার্নালের সম্পদ অত্যন্ত সীমিত?

জ. এই পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়ায় বাংলা শ্রমিকের বই পুরোপুরি রোধ করতে পারেনি?

প্রশ্নগুলোর উত্তরে মন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন বলেন:

ক. কেবল ঘোষিত শ্রমিক মুখপত্র।

খ. পত্রিকার বিষয়ে একাংশই কেবল ট্রেড ইউনিয়ন।

গ. হ্যাঁ, ৫০০ টাকা জামানত চাওয়া হয়েছে।

ঘ. এই আদেশের পর মজদুরের প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়।

ঙ. ইন্ডিয়ান প্রেস (ইমার্জেন্সি পাওয়ার) অ্যাক্ট ১৯৩১-এর বিধান পরিপন্থী বিষয় এতে প্রকাশিত হয়।

চ. সত্য

ছ. সত্য নয়।

জ. সত্য নয়।

শিবনাথ ব্যানার্জি আরো প্রশ্ন করলেন:

ক. জামানত প্রদানে ব্যর্থতার জন্য আরো কটি পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। সেগুলোর নাম কী?

মন্ত্রী আটটি সাময়িকীর নাম উল্লেখ করেছেন: কারখানা, চাষী-মজুর, সংকল্প, জঙ্গী মজদুর, গণনায়ক, মার্ক্স-পন্থী, মজদুর দুনিয়া, সাপ্তাহিক মজদুর।

খ. এটা কি সত্য শ্রীযুক্ত সুভাষ বসুকে নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া হয়েছে?

মন্ত্রীর জবাব, হ্যাঁ।

গ. এটা কি সত্যি প্রেস অ্যাক্টের আওতায় মজদুর কখনো সাজাপ্রাপ্ত হয়নি?

ঘ. সরকার কি মজদুর প্রকাশনা বাতিলের আদেশটি প্রত্যাহার করবে? যদি না করে, তার কারণ কী?

মন্ত্রী গ ও ঘ-এর জবাবে বললেন, সাজা না হলেও মজদুরকে আপত্তিকর সংবাদ পরিবেশনায় বহুবার সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে মজদুরের বিষয়টি আমার বিবেচনাধীন।

নলিনাক্ষ স্যান্যাল জানতে চাইলেন, কে সতর্ক করেছেন? কেমন করে সতর্ক করেছেন?

মন্ত্রী বললেন, সরকারের প্রেস অফিসার, সৌহার্দপূর্ণ সতর্কতা।

নলিনাক্ষ স্যান্যালও পাল্টা জিজ্ঞেস করলেন, যখনই সুভাষ চন্দ্র বসুর মুক্তির কথা বলা হয়েছে, তখনই প্রেস অফিসার সতর্ক করেছেন কিংবা জামানত প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন?

মন্ত্রী বললেন, তা সঠিক নয়।

অতুল কৃষ্ণ ঘোষ বললেন, নেতাজির গ্রেফতারকে নিন্দা জানানোয় মাসিক ‘প্রদীপ’কে বারবার সতর্ক করা হয়েছে। তিনি মন্ত্রীর কথা শুনে শুনে আশ্বস্ত হতে চাইলেন যে প্রেস অফিসার যেন গ্রামের স্কুল মাস্টারের মতো বারবার শাসিয়ে না যান।

মন্ত্রী বললেন, এ কথা অবান্তর।

বিষের বাঁশী

১১ আগস্ট ১৯৩০ মৌলবি মুহাম্মদ ফজলুল্লাহ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের মন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রাখলেন:

ক. কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিষের বাঁশী’ নামক কাব্যগ্রন্থটি কি নিষিদ্ধ করা হয়েছে?

খ. এটা কি সত্য এই গ্রন্থে নবীজীর জীবন ও মৃত্যু নিয়ে ‘ফাতেহা ইয়াজদহম’ নামে একটি ধর্মীয় কবিতা রয়েছে?

গ. এই কবিতাটি মুদ্রিত আকারে দেখতে মুসলমানরা খুব আগ্রহী, এটা কি মন্ত্রী জানেন?

ঘ. যদি তিন প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ বোধক হয়, তাহলে এই কবিতার কারণে নিষিদ্ধকরণের আদেশটি কি সরকার প্রত্যাহার করে নেবে?

জবাবে মন্ত্রী যা বললেন, তার সারাংশ হচ্ছে, বিষের বাঁশী সরকার নিষিদ্ধ করেছে। ফাতেহা ইয়াজদহম বিশুদ্ধ ধর্মীয় কবিতা নয়; এ কবিতার প্রশ্ন মুসলমানরা কী চায়, এ সম্পর্কে তার কাছে কোনো তথ্য নেই এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য সরকারের কাছে যথাযথভাবে আবেদন করলে, তা পরীক্ষা করে দেখা হবে।

জেলখানায় বইপত্র

৩ আগস্ট ১৯৩৮ বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য অতুল চন্দ্র ঘোষ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের মন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিনকে প্রশ্ন করলেন, যশোর জেলখানায় পড়ার মতো আদৌ বই আছে কি? যদি থেকে থাকে সংখ্যা কত? বই কেনার জন্য কারা প্রশাসনের হাতে কোনো বরাদ্দ নেই, এটা কি সত্য? কারাবন্দিরা যাতে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কিত থাকতে পারে, সেজন্য জেলা ও মহকুমা পর্যায়ের জেলখানায় বইপত্র এবং অন্তত একটি বাংলা সাময়িকীর জন্য অর্থ বরাদ্দের কথা কি সরকার বিবেচনা করবে?

মন্ত্রীর জবাব:

যশোর জেলখানায় বই কেনায় জন্য বার্ষিক ২৫ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণীর কারাবন্দিদের বইপত্র পড়তে দেয়া সরকার প্রয়োজন করে না। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কারাবন্দি সাপ্তাহিক পত্রিকা পেয়ে থাকেন। জেলা কারাগার এবং মহকুমার উপকারাগারে বইপত্রের জন্য বরাদ্দ রয়েছে।

যশোর জেলা কারাগারে বইপত্রের সংখ্যা ৪৬। বইগুলো হচ্ছে কৃত্তিবাসী রামায়ণ, মহাভারত, শ্রীমদ্ভাগবগীতা, ফতেমা জহুরা, আল ইসলাম, দরবেশ জীবনী, স্বামী বিবেকানন্দ, হজরত মোহাম্মদের জীবন চরিত, তরতিব নামাজ শিক্ষা, চিন্তা, বালক শ্রীকৃষ্ণ, একলব্য (দুই কপি), কোরআন ও হাদিসের আদর্শ বাণী (তিন কপি), বর্ণপরিচয়, ঠাকুরমার গল্প, কোরআন শরিফ (দ্বিতীয় খণ্ড), মহরম, আলাদিন, ময়নামতীর চর, রঙ্গিলা নায়ের মাঝি, হায়দর আলি, আলীবাবা (দুই কপি), তাই তাই (দুই কপি), পরীর দৃষ্টি, শিয়াল বন্ধু, সরল কৃষিকথা, কলার চাষ, তুলার চাষ, ইক্ষু চাষ, গুলজার, অনুরূপা দেবীর গ্রন্থাবলি (পাঁচ খণ্ড), দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গ্রন্থাবলি (দ্বিতীয় খণ্ড), কথামালা।

অতুল কৃষ্ণ ঘোষ স্পিকারকে উদ্দেশ করে বললেন, তিনি যখন জেলা পরিদর্শনে যান যশোর জেলে তিনি চার-পাঁচটি মাত্র বই দেখেছেন। তালিকায় যে সংখ্যা দেখানো হয়েছে, তা অবিশ্বাস্য।

খাজা নাজিমউদ্দিন তখন বললেন, তিনি এ বক্তব্যের বিরোধিতা করছেন না, তবে শিগগিরই এর তদন্ত করাবেন।

নিহারেন্দু দত্ত মজুমদার জিজ্ঞেস করলেন, যে সাপ্তাহিকী সরবরাহ করা হয়, তার নাম কী?

মন্ত্রী বললেন, এর জন্য নোটিস দিতে হবে।

অতুল কৃষ্ণ ঘোষ জিজ্ঞেস করলেন, ক’বছর ধরে বার্ষিক ২৫ টাকা বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে?

মন্ত্রী বললেন, সঠিক জানা নেই।

এইচসি মুখার্জি জিজ্ঞেস করলেন, কজন শিক্ষিত কয়েদির জন্য এ ৪৬টি বই?

মন্ত্রী বললেন, নোটিস চাই।

তৃতীয় শ্রেণীর কয়েদিদের জন্য বইপত্র নেই। নিহারেন্দু দত্ত মজুমদার জিজ্ঞেস করলেন, সরকার কি মনে করে তৃতীয় শ্রেণীর কয়েদিদের মধ্যে কোনো শিক্ষিতজন নেই?

মন্ত্রী বললেন, থাকতেও পারে।

তাহলে তারা বইপত্র পাবেন না কেন?

খাজা নাজিমউদ্দিন বললেন, বিধান অনুযায়ী তৃতীয় শ্রেণীর কয়েদিরা অশিক্ষিত।

নিহারেন্দু দত্ত মজুমদার জিজ্ঞেস করলেন, তৃতীয় শ্রেণীর কিন্তু শিক্ষিত, এমন কয়েদিদের বইপত্র থেকে বঞ্চিত রাখার কারণ কী?

মন্ত্রী যা বললেন, তার মর্মার্থ হচ্ছে, শিক্ষিত হলেও কারাবিধান অনুযায়ী তারা নিরক্ষর।

অতুল চন্দ্র কুমার জানতে চাইলেন, সত্যিই কি বছরে ২৫ টাকার বই কেনা হয়? সুরেন্দ্র নাথ বিশ্বাস বই বাছাইয়ের নীতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন।

মন্ত্রী বললেন, কয়েদিদের ভালো বই সরবরাহ করা হয়।

অতুল চন্দ্র বললেন, কলার চাষ, তুলার চাষ, ইক্ষু চাষও সরল কৃষিকথা—প্রতিটির দাম যে মাত্র ১ পয়সা, এটা কি মন্ত্রী জানেন? বিহারে তৃতীয় শ্রেণীর কয়েদিদের বই পড়তে দেয়া হয়। বাংলা কি তা অনুসরণ করতে পারে না?

মন্ত্রী বললেন, এ প্রশ্ন অবান্তর, এর বেশি তিনি কিছু বলতে পারবেন না।

হাসপাতালে বিবলিও থেরাপি

১ ডিসেম্বর ১৯৩২ বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য সুনীন্দ্র দেব রায় মহাশয় বললেন, রোগীর সুস্থতার জন্য তাদের দরকার বিবলিও থেরাপি বা বই পড়া। বইয়ের আবশ্যকতা সরকার অনুধাবন করে কিনা, তিনি জানতে চান।

তিনি স্থানীয় সরকার বিভাগের মন্ত্রী বিজয় প্রসাদ সিং রায়কে জিজ্ঞেস করেন, সরকারি হাসপাতালে বইয়ের সংখ্যা কত? বিভিন্ন হাসপাতালে লাইব্রেরি ও বইপত্রের জন্য প্রতি বছর গড়ে কত টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়? সেখানে কি লাইব্রেরিয়ান আছে?

মন্ত্রী বললেন, সরকারি হাসপাতালে কোনো লাইব্রেরি নেই। রোগী কিংবা ক্লাবকে দেয়া কিছু বই নার্সদের হেফাজতে থাকে। সরকার বিবলিও থেরাপির কথা বিবেচনা করছে না।

লেখক:এম এ মোমেন

 

 

 

সূত্র: বণিক র্বাতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ