দায় নিজের কাছে, সমাজের কাছে, নাকি সাহিত্যের কাছে?

মামুন হুসাইনের জন্ম ১৯৬২ সালে কুষ্টিয়া জেলা সদরে। একাধারে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক ও কথাসাহিত্যিক। ২০১৭ সালে কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। ২০০৪ সালে পেয়েছেন কাগজ সাহিত্য পুরস্কার। ‘নিক্রপলিস’ উপন্যাসের জন্য ২০১১ সালে পেয়েছেন ‘বাঙলার পাঠশালা— আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পুরস্কার’। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে। ‘শান্ত সন্ত্রাসের চাঁদমারি’, ‘মানুষের মুত্যু হলে’, ‘কয়েকজন সামান্য মানুষ’, ‘বালকবেলার কৌশল’, ‘নিরুদ্দেশ প্রকল্পের প্রতিভা’, ‘নিক্রপলিস’, ‘হাসপাতাল বঙ্গানুবাদ’ ইত্যাদি।সাক্ষাৎকার গ্রহণ: অনুপম হাসান

আপনার গল্পের কথা উঠলেই সিরিয়াসধর্মিতার প্রসঙ্গটি অনিবার্যভাবে সামনে আসে আমাদের। এক্ষেত্রে আরো দুটো প্রসঙ্গ আমাদের জানা আছে—জনপ্রিয় ও মূলধারা; আমাদের কথা হচ্ছে, আপনার গল্পের গায়ে প্রকাশের পর থেকেই সিরিয়াসধর্মিতার একটা লেবেল সেঁটে গেল কিংবা ব্র্যান্ডেড হওয়ার বিশেষ কোনো কারণ আদৌ কি আছে বলে মনে করেন? অথবা আপনি নিজে কি বিশ্বাস করেন, সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে এ রকম একটা ধারা-বিভাজন প্রয়োজনীয় ব্যাপার?

মামুন হুসাইন: লেখা সিরিয়াস হচ্ছে, লেখা জনপ্রিয় হচ্ছে, লেখকের ব্র্যান্ডিং হচ্ছে, লেখার অভিমুখ মূলধারার দিকে প্রবাহিত করছি—এ রকম ভাবনায় কোনো লেখক বুঁদ হয়ে থাকেন কিনা আমার ধারণা নেই। লেখা কি আদৌ কোনো ওপরভাসা চাতুরী? লেখক নিশ্চয়ই পঠিত হতে চান; এখন বড় মানুষের মতো ছোট মুখে—লেখা একটি কাজ, লেখা একটি দায়, লেখায় দূষিত রক্ত বিশুদ্ধ হয়, ক্যাথারসিস হয়…এতসব আপ্তবাক্য না আওড়ে বলতে পারি, আমাদের বেঁচে থাকার, আমার নিজের বেঁচে থাকার যে অভিজ্ঞতা, তা সামান্য অন্যকে পাইয়ে দিতে চাই, অথবা আমি আমার মতো বেঁচে থাকার গল্পটিই কেবল বলতে চেয়েছি। লেখার গায়ে যে নামাবলি অঙ্কিত হয়, এটি প্রকাশনা ইন্ডাস্ট্রির এবং জ্ঞানময়-ক্রিটিকদের প্রিয় খেলাধুলা। লেখা জনপ্রিয় হয়েও গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টিশীল কর্মে রূপান্তরিত হতে পারে, অথবা আপনাদের ভাষায় ‘সিরিয়াস’ তকমা নিয়েও ক্লিশে ও বাতিল দুষ্কম্ম হয়ে সদা বিরাজমান হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ লেখা আপনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, আক্রান্ত করে এবং হীরকদ্যুতির মতো একটি ভিশন আনে।

এখন সাহিত্য বিচার তো আমি করি না। গদ্য-পদ্য-উপন্যাস ইত্যাদির বাইরে কত বিচিত্র পদের লেখা আছে, কত বিচিত্র এর বার্গীকরণ, সব আমিও ওয়াকিবহাল নই। কিন্তু সবাই জানেন—অধুনা সাহিত্য বিচার শেখানোর স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, সর্বোপরি নানা লিটারেরি থিওরি বিদ্যমান। এদের একটি নির্দিষ্ট গজকাঠি থাকে, না চাইলেও এ মাপযন্ত্রে আপনি প্রতিস্থাপিত হন এবং যেকোনো ‘তত্ত্ব’র যন্তর-মন্তরে আপনি বশীভূত হতে বাধ্য। সাহিত্য ‘বিচার’ অর্থ—তাহলে কি বলব কাঠগড়ায় দাঁড়ানো? লেখার এ অংশটুকু মার্কস মহোদয়ের, এ শরীর রুশি, এ হাত ইয়ুংয়ের, এ আঙুলগুলো ফ্রয়েডের, এ হেঁটে যাওয়া কুহকী বাস্তববাদ, এ স্বর জাদুবাস্তববাদ, এ চাহনি ধ্রুপদী, এ অংশ রাজনৈতিক, কিংবা লেখাটি একই সঙ্গে স্বপ্ন, সংগীত ও কবিতাময়, কিংবা এ সংগীতের ভাষায় এ গায়কী, এ গমক উত্তরাধুনিক, ইত্যাদি ইত্যাদি! একবার এক ডাচ নিজের ভাষা নিয়ে ঠাট্টায় মেতেছিলেন—ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলি ল্যাটিনে, প্রেমিকার সঙ্গে ফরাসি ভাষায় আর কেবল আমার ঘোড়ার সঙ্গে কথা হয় ডাচে। এ প্রেক্ষিত মাথায় রেখে তোমাকে জিজ্ঞেস করি—সাহিত্যের প্রধান কাজ যদি সংযুক্তি, তবে বিভাজন বলছি কেন? (যদিওবা বিযুক্তিও এক প্রকার সংযুক্তি)—আমার সামান্য বিবেচনায় দায়িত্বশীল ক্রিটিক, তথা অগ্রসর পাঠক ও সাহিত্যের বিচারকমণ্ডলী লেখক-পাঠকের সেতুবন্ধ তৈরিতে সার্বিক সহায়তা দিতে পারেন; যে বিবিধ স্বর লুকানো আছে, দুই বাক্যের মধ্যস্থানে তাকে আলাদা চিহ্নিত করতে পারেন, যে মিড় আমার কানে লাগে না, তা আমার সামনে মেলে ধরেন…কত রকমের সুর-যন্ত্র, আলাদা আলাদা বুঝতে পারি না, তিনি খুলে দেখান—এটি বেহালা, এটি পিয়ানো, এটি হার্মোনিয়াম, এটি সারেঙ্গি, এটি মৃদঙ্গ, আর এ গম্ভীর, অনেক গভীর থেকে উঠে আসা স্বরটি হলো সরোদ।

চিকিৎসাবিদ্যা  গল্প

চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেছেন, সমাজে সাইকিয়াট্রির ডাক্তার হিসেবে ভালো পসারও আছে আপনার, তার পরও গল্পের সঙ্গে এমন গাঁটছড়া গড়ে ওঠার রহস্যটা কোথায়? এ রকম একটা প্রশ্ন আপনার সম্পর্কে পাঠকের থাকেই, এটা অনেকেই ঠিক ব্যাখ্যা করে উঠতে ব্যর্থ হন। আমার বিশ্বাস, চিকিৎসাশাস্ত্র ও আপনার গল্প লেখার মধ্যে কোথাও একটা সমান্তরাল দায়বোধ আছে—বিষয়টি যদি কার্যকারণসহ পাঠকের সামনে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করেন।

মামুন হুসাইন: একাত্তরের পর আমাদের অনেক উচ্চনম্বরপ্রাপ্ত ছাত্র সোভিয়েতে ও পূর্ব ইউরোপে মেডিকেল শাস্ত্র অধ্যয়ন করতে যান। তাঁরা তলস্তয়-গোর্কি-চেখভ পড়েছেন, মূলশাস্ত্রের পাশাপাশি—এ সংবাদ আমি জেনেছিলাম মেডিকেল কলেজের শেষ বছরে। চেখভ, নিশ্চয়ই স্মরণে আছে, তিনি ছিলেন চিকিৎসক—ওঁর একটি সুবিখ্যাত উক্তি আছে: মেডিসিন হলো আইনগত স্ত্রী, আর সাহিত্য তার বান্ধবী। তথ্য-জালিকায় প্রবেশ করলে ‘চিকিৎসক ও সাহিত্যচর্চা’ নিয়ে বিস্তর গল্পগাছা জোগাড় করা সম্ভব। আমাদের কালে বেশ কজন খ্যাতিমান চিকিৎসক পুরস্কৃত লেখক; অগ্রজদের মধ্যে আহমদ রফিকের নাম করা যায়, যিনি এখনো সক্রিয়। কিছুদিন আগে কবি ভূমেন্দ্র গুহ মৃত্যুবরণ করেছেন। অতীতকাল থেকে শুরু করে, হালের অলিভার স্যাকস, কিংবা খালেদ হোসাইনি পর্যন্ত এ তালিকা দীর্ঘ করা যায়। এরই মধ্যে কিছু চিকিৎসক হয়ে গেছেন চিরকালের লেখক—যেমন কিটস, আর্থার কোনান ডয়েল, চেখভ, মম, ল্যুসুন, ব্রেখট, উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস, মিখাইল বুলগাকভ ইত্যাদি।

পাশাপাশি অন্যভাবে দেখা যায়—সাহিত্য-সংস্কৃতির যে গুরুত্বপূর্ণ বাহন ‘ভাষা’, সে সম্পর্কে মৌলিক ভাবনা আছে লাকার লেখাপত্রে। আবার আমাদের পুরাণ, চেতন-অবচেতনের ছায়া, আর্কিটাইপ, আমাদের ট্রমা, আমাদের বন্ধুত্ব, আমাদের সম্পর্ক ইত্যাদি মিলিয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সাইকিয়াট্রির মনিষীরাই প্রকাশ করেছেন। ফলে এ বিদ্যার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে আমার কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হয়নি, হয়তো তোমাদের মনের মতো অবিরত সরল-সুমিষ্ট লেখাপত্র তৈরি করতে পারিনি, কিন্তু এ বিদ্যার নির্যাস আমার নিঃসঙ্গতা আড়াল করে, আমাকে রক্ষা করে, আমাকে আত্মমগ্ন করে এবং আমার ওপর বর্ষিত তাবৎ অপমান-অসম্মান যজ্ঞকে ক্ষমা করার শক্তি জোগায়। এ প্রসঙ্গে শেষ কথাটি বলতে চাই: চিকিৎসক, আইনজীবী, ইঞ্জিনিয়ার, থানার দারোগা ইত্যাদি মানুষ ‘লেখক’ হলে আমরা যেমন সংস্কারবশত আঁতকে উঠি—এমনটি সব দেশে নয়; আমার সাহেব বন্ধুদের মুখে শুনেছি, দু-একটি প্রতিষ্ঠানের নাম স্মরণ আছে—কলম্বিয়া, স্ট্যানফোর্ড ইত্যাদি মেডিকেল স্কুলে বরং চিকিৎসকদের লিখতে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। রয়টার্স ২০০৬-এর অক্টোবরে খবর ছেপেছিল—লেখালেখি উন্নততর চিকিৎসক উৎপাদনে সহায়ক। স্ট্যানফোর্ড মেডিকেল স্কুলে ‘আর্টস, হিউম্যানিটিজ ও মেডিসিন প্রোগ্রাম’ নামে বিশেষ কোর্স পরিচালিত হয়। বিভিন্ন সময় ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিয়ন অব ফিজিসিয়ান-রাইটার’, বার্ষিক কংগ্রেস করেন ইউরোপে। আমি একটি পত্রিকার নাম জানি—জার্নাল অব পোয়েট্রি থেরাপি…। এ পরম্পরায় ‘মেডিকেল হিউম্যানিটিজ’ নিয়ে এখন বিস্তর আলোচনা হচ্ছে এবং তরুণ চিকিৎসকদের পাঠ্যসূচিতে এর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রস্তাবনা এসেছে। অন্যান্য দেশ তো বটেই, পার্শ্ববর্তী দেশ নেপালেও ‘মেডিকেল-মানববিদ্যা’ এখন যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে। কাজেই মানুষের বৃহত্তর যে জ্ঞান কাঠামো, সেই অনুসন্ধিৎসার পথ ভিন্ন হলেও আমরা সবাই একই নৌকার যাত্রী হয়ে পড়ি। ছিঁড়ে ছিঁড়ে অন্যকে ব্যাখ্যা করার চল যেহেতু বর্তমান, অতএব তোমরাও হয়তো এ প্রশ্ন এড়াতে পারোনি শেষ পর্যন্ত।

গল্পের কৌশল বা টেকনিকে প্রভাব

বলা যায়, আপনার গল্প আমার অধ্যয়নের তালিকায় প্রায় সবগুলোই আছে; সেই পাঠ থেকে আমার ধারণা হয়, আপনার গল্প বলার কৌশলে সরাসরি না হলেও বাক্যের গঠনগত কৌশলে গাবোর [গ্যাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেস] কোথাও না কোথাও প্রভাব আছে—এ সম্বন্ধে আপনার ব্যক্তিগত অবস্থান কী?

মামুন হুসাইন: আমার মতো অকিঞ্চিৎ মানুষের গায়ে মার্কেসের সিলমোহর দিয়েছ, আনন্দিত হলেও তুমি ভেবে নাও—অন্ধের নাম দিয়েছ পদ্মলোচন! আমার প্রথম পুস্তিকা প্রকাশের বছর মার্কেসের নোবেলখ্যাত উপন্যাস হাতে পাই। মার্কেসের উপন্যাস পাঠে আমার নিঃসঙ্গতা কমতে থাকে এই ভেবে যে আমার চিন্তনজগতের খানিকটা খানিকটা ছায়া এই প্রথম কোথাও সমান্তরাল প্রবাহিত হতে দেখছি। তাতে সামান্য সাহসের সঞ্চয় হয়। মার্কেসের হাত ধরে চেনা ইউরোপীয় মডেলের বাইরে গল্প-উপন্যাস লেখার যে চল, তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয় এবং এ আবিষ্কার আমাদের কালে ছিল এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা। মার্কেস যে বাস্তববাদ বর্ণনা করেছেন, তা ছিল ক্রিটিকদের ভাষায় কুহকী বাস্তববাদ। যদিও তুমি মার্কেসেই স্থিত হয়েছ, কিন্তু আমাদের উড়নচণ্ডী মন তখন খুঁজে পেয়েছে বোর্হেস, ওর্তেগাই গাসেত, কার্পেন্তিয়ের, ফুয়েন্তেস, রুলফো, কোর্তাসার ইত্যাদি। লাগাতার সামরিক অভ্যুত্থান, হত্যা, গুম, ধ্বংস ইত্যাদি মিলিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র যা যা করে, এসবের আভাস আমরা পাচ্ছি তখন এ দুরন্ত লেখককুলের লেখায়। ফলে এদের পাঠবৃত্ত থেকে দু-একটি শব্দ-বাক্য আত্তীকরণ হয়নি, তা অস্বীকার করি কী করে! কিন্তু আমার বাক্যের গঠনগত কৌশল কোথায় পৃথক, কোথায় একান্নবর্তী পরিবারের সদস্য, আমি নিজে এখনো সঠিক জানি না। হয়তো তোমরা, যারা নিবিষ্ট পাঠক, তোমরা এ ব্যবচ্ছেদকর্মে অধিক সফল হবে।

গল্পের প্লট  টাইমফ্রেম

অধিকাংশ বলার চেয়ে বলা ভালো, মামুন হুসাইনের সব গল্পই নির্দিষ্ট কোনো টাইমফ্রেমে আবদ্ধ থাকে না, প্লটের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য; কিন্তু গল্প-উপন্যাসে সময় [টাইম] অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথাগত গল্প-উপন্যাসের প্রচলিত টাইমফ্রেমের চৌহদ্দি ভাঙার ক্ষেত্রে আপনার নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আছে কি?

মামুন হুসাইন: এক্ষনে আমার সব ভ্রষ্টাচারের ‘উদ্দেশ্য’ খুঁজে পেতে আবিষ্কার করা বুঝতে পারি তোমার প্রধান অভীষ্ট। মনীষীরা বলেছেন: মন্ত্রের গূঢ় রহস্য সহসা প্রকাশ করতে নেই! আমি কি জানি, আমি কে? বড় সময়ের, নিরিখে আমাদের পরিচয়…ফরগেটফুলনেস…কেবল বিস্মৃতি! তারকোভস্কির মতো মেধাবী সিনেমাটোগ্রাফার ধন্দে পড়েছিলেন ‘সময়’ নিয়ে—টাইম উইদ ইন টাইম…কাজটি বেজায় শক্ত, কিন্তু করতে হবে। মৃত্যুর ৪০০ বছর পর শেকসপিয়র তাঁর শিল্পকর্ম বিষয়ে বছরে শতাধিক বই লিখিয়ে নিলেও সবার জন্য নিশ্চয়ই সেই রাজযোটক বরাদ্দ হয়নি। আইনস্টাইন বলতেন: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের বিভাজন, পদার্থবিদদের কাছে ইল্যুশন! অনেক কাল আগে, কিয়ের্কেগাডের ডায়েরিতে পড়েছিলাম, জীবনকে বুঝতে চাইলে পেছনটা ঘুরে দেখতে হবে। কিন্তু জীবন অতিবাহিত করতে হয় ভবিষ্যতের নিরিখে; জয়েস ৭৮৩ পৃষ্ঠার ইউলিসিস রচনা করেন একটি দিনের নিরিখে।

বাংলাদেশের গল্পউপন্যাস

বাংলাদেশের গল্প-উপন্যাস বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ কিংবা তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাল অতিক্রম করে কতটা এগিয়েছে বিশের দ্বিতীয় দশকে? একনজরে যদি বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে তুলনা করে সংক্ষেপে কিছু বলেন।

মামুন হুসাইন: কথাটি কি ‘বাংলাদেশের’ না ‘বাংলা ভাষার’? এক্ষনে দুই বাংলার বাইরেও যেমন ত্রিপুরা, আসাম, বিহার, আন্দামানসহ গোলার্ধজুড়ে শুরু হয়েছে ডায়েস্পোরা সাহিত্যের এক বিপুল বিস্তার। কত দূর এগিয়েছে, এর অনুপুঙ্খ মাপজোখ, এর রোডম্যাপ—সাহিত্য ডিপার্টমেন্ট যেভাবে করে, তা আমার আয়ত্তাধীন নয়। বাংলা ভাষাকে আমার সবসময়ই ঐশ্বর্যশীল, বলশালী ও রাজসিক মনে হয়। প্রধান অধিপতিদের বাইরে অন্য বিশিষ্ট লেখক—বিশিষ্ট লেখাপত্রের নাম করা যায়, বড় একটি নির্ঘণ্টও করা সম্ভব। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ছাড়া সাতচল্লিশ-উত্তর বেশির ভাগ লেখায় পাকিস্তান ও পাকিস্তান নামক নতুন রাষ্ট্রের অধিবাসী হওয়ার সরল ঘটনা ও বর্ণনা লিপিবদ্ধ হয়েছে। ওয়ালীউল্লাহ আমার ধারণা বাংলা ভাষায় প্রথম মানুষ, যিনি ইউরোপের চিন্তনকে আমাদের পলিমাটিতে সন্নিবেশিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কাজী আবদুল ওদুদের ‘নদীবক্ষে’ উপন্যাসটি নিয়ে আলাদা পাঠ-পর্যালোচনা হওয়া দরকার। এক্ষনে আবু ইসহাকের কথা স্মরণ আসছে। সরদার জয়েনউদ্দিনের নিম্নবৃত্ত বয়ান দ্বারা আমি আক্রান্ত হতে পারিনি কখনো। আবুল ফজল, আবু রুশদ আবার নতুন করে পাঠ নেয়ার ইচ্ছা সহসা জাগে না। তবে শামসুদ্দিন আবুল কালামের ‘কাশবনের কন্যা’ কখনো মনে হয় আবার উল্টে দেখি—জানি না সময় নামক মহাশয় দয়াদ্র হবেন কিনা!

যত দূর বুঝেছি, ষাটের দশকেই লেখককুলের মধ্যে প্রথম নিজেকে ব্যবচ্ছেদ করার ঝোঁক তৈরি হয়। তারিক আলীর সেই বিখ্যাত বই স্ট্রিট ফাইটিং ইয়ারস স্মরণ করা যায়। রাষ্ট্রের আধিপত্য, সামরিক অকুপেশন ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের ভেতর নতুন একটি উপস্থাপনা, নতুন একটি বয়ান তৈরি হতে থাকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভাবনার অভিমুখ আরো খানিকটা স্বচ্ছ হয়—যার প্রমাণ স্বরূপ শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, আবুবকর সিদ্দিক, মাহমুদুল হক, ইলিয়াস, সুশান্ত মজুমদার, আহমেদ বশির, মঞ্জু সরকার, শাহাদুজ্জামান, ইমতিয়ার, শাহিন আখতারসহ আমাদের কালের অকালপ্রয়াত শহীদুল জহির পর্যন্ত পৌঁছানো যায় অনায়াসে। আর এর বাইরে দশকওয়ারির হিসাবে সব গুরুত্বপূর্ণ লেখক তো এখনো সক্রিয়ভাবে লিখেই চলেছেন—এ নাম-ঠিকানাটা আমি এড়িয়ে গেলাম। পাশাপাশি ভারতের বাংলা রাজ্যের চেনা নক্ষত্রমণ্ডলীর বাইরেও এক্ষুনি একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখকবলয়ের সৃষ্টিশীলতা খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায়, যা সতীনাথ, জগদীশ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, সমরেশ বসুর বাইরেই অবস্থান করছে। এ পর্বে স্মরণ করছি অমিয়ভূষণ, মহাশ্বেতা, দেবেশ, স্বপ্নময়, অভিজিৎ সেন, নবারুণ ইত্যাদি।

শিল্পীজীবনের মৌনতা

সমকালে আপনি একজন শক্তিশালী গল্পকার হওয়ার পরও আপনার নীরবে নিভৃতে কিংবা মৌনব্রত পালনের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য আছে কি?

মামুন হুসাইন:  ব্যাধি আমার ব্যক্তিত্বের, বহন করছি সেই শৈশব থেকে। গ্যাং স্পিরিট নিয়ে প্রচুর বন্ধুবান্ধব, হুল্লোড় করছি, স্কুলপলায়ন করছি বেজায়—এ রকম অভিজ্ঞতা আমার জীবনে খুব সামান্য। অকালপিতৃবিয়োগের ছায়া আমি আজীবন বহন করতে করতে প্রায়ই বেদনার্ত ও নিঃসঙ্গ হই। আর গল্প-উপন্যাস লিখে জগৎ জয় করার ক্ষমতা নিশ্চয়ই আমার নেই। সর্বোপরি খ্যাতিমান হওয়ার জন্য যে আয়োজন, যে জনসংযোগ ও চুক্তিপত্র তৈরি করতে হয়, সে সম্পর্কে আমার জ্ঞান বড্ড ক্ষীণ। আমি নিশ্চয়ই গান্ধীজির মৌনব্রত বা চার্চের পুরোহিতের মতো রিট্রিটে নেই—কথাবার্তা, জলপান, অন্নগ্রহণ ইত্যাদি সামাজিক সম্পর্ক আমি নিশ্চয়ই তোমার সঙ্গে নস্যাৎ করিনি কখনো।

বাংলাদেশের গল্পের ভবিষ্যৎ

আমাদের দেশের তরুণ গল্পকাররা যে ধারায় আগ্রহী হয়ে লিখছে, তাতে আপনি কি বাংলাদেশের গল্প-গল্পকার নিয়ে আশাবাদী কোনো মন্তব্য করতে পারেন?

মামুন হুসাইন: এখন আমি তো জ্যোতিষী নই যে ভবিতব্য নিয়ে মন্তব্য করতে পারি। রবীন্দ্রনাথের কথা আছে: ‘আমরা গল্পপোষ্য জীব…।’ সে হিসেবে পৃথিবী লয় না হওয়া পর্যন্ত মানুষ অনর্গল গপ্পোবাজ। এখন ‘গপ্পোবাজি’ ও ‘গল্প লেখা’ এক সমান্তরালে যায় কিনা, এ নিয়ে আমরা আলোচনা করতেই পারি। বিদ্যা, ভাবনা ও চিন্তনের সঙ্গে আমার বিবেচনায় এক ধরনের বিষাদময়তা যুক্ত থাকে; কিন্তু ‘নৈরাশ্য’ ও ‘বিষাদময়তা’ নিশ্চয়ই সমার্থক নয়। কাজেই তীব্র মনোবৈকল্য না হওয়া পর্যন্ত আমি আশাবাদী থাকতেই চাই।

এ মুহূর্তে বয়সের আন্দাজে যাকে ‘তরুণ’ বিবেচনা করছি, তিনিও নিশ্চয়ই সময়ের খাল-নদী পাড়ি দিতে বসেছেন; অতএব বার্ধক্য-জরা, এসব মানবপ্রজাতির একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। লেখা তো বয়স ও ত্বকের উজ্জ্বলতা দিয়ে বাঁচে না; আর সময় সবচেয়ে নির্মম বিচারক—জগতের অসাধারণ-উজ্জ্বল মানুষ এবং তার সৃষ্টিসম্ভার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে চিরতরে। আমাদের কালে দশকওয়ারি বিচার-বিশ্লেষণ শুরু হয়েছিল…এখন তা ক্রমবর্ধমান হয়ে ‘শূন্যের দশকে’। সব লেখা আয়ত্তে এসেছে, সব লেখার পাঠবৃত্ত তৈরি করতে পেরেছি, তা বললে মিথ্যে হবে। শূন্য দশকের শাজান শীলন, সৈকত আরেফিন—এঁদের আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি এবং এঁদের শেষতম লেখাটিও পাঠ করার সুযোগ হয় হয়তো আমার। তৌহিন হাসানের একটি গল্প পড়েছিলাম ‘গণিত মাস্টার’; কিন্তু ও নিজে পরিচয় না দিলে আমি চিনতে পারব না। নূরুন্নবী শান্তর সঙ্গে দেখা হয়েছে এক-দুবার, খুব সামান্য কথা হয়েছে, কিন্তু গল্পের বাইরেও ওঁর নানা গদ্য পড়ার সুযোগ হয়েছে দৈনিকের কল্যাণে।

এ রকম নাম বর্ণনা, মুগ্ধতা ও আত্মীয়তার রেশ ধরে অন্য দশক থেকেও একটি লম্বা-ছোট তালিকা প্রণয়ন সম্ভব। আমার ভাবনায় নতুন লেখকদের সামনে এখন জগতের সর্বোচ্চ উজ্জ্বল সৃষ্টিসম্ভার উন্মুক্ত; শুধু সাহিত্য নয়, শিল্পের বিবিধ শাখা-প্রশাখা এখন তাদের করতলগত। ঝুঁকি, সম্ভাবনা, রক্ষণশীলতা ইত্যাদির অভিঘাতও তাই বিপুল—উন্মুক্ত জানালা দিয়ে তথ্য পাচার হচ্ছে হু হু; কিন্তু ‘তথ্য’ কেথায় জ্ঞান ও মনীষাকে স্পর্শ করে, কোথায় বিযুক্ত করে, কোথায় আত্তীকরণ করে, সে পরীক্ষায় পাস নম্বর অর্জন এখন প্রধান বিবেচ্য বিষয়। আর মহাকালই বিবেচনা করবে; আমাদের অক্ষমতা, সবলতা, উদ্যমতা ও শক্তিমত্তা অথবা একেবারে অন্য প্রেক্ষিত থেকে দেখা যায়—এক দঙ্গল তরুণ বৃদ্ধ, বৃদ্ধ তরুণ, তরুণী বৃদ্ধা, অশীতিপর মানুষ আমরা একদিন পথ হেঁটেছিলাম একত্রে, আমরা আমাদের বেঁচে থাকার কথাটা আমাদের মতো বলতে চেয়েছিলাম আমাদের যৌথ অভিজ্ঞানে; যেখানে খ্যাতি, অখ্যাতি, দুর্যোগ, পুরস্কার—এসব ছিল লেখার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অথবা বাই-প্রডাক্ট।

কথাশিল্পীর সমকাল থেকে স্কেপ করার মানসিকতা

একজন কথাশিল্পী যখন তাঁর সমকাল থেকে স্কেপ করেন, তখন মূলত তিনি বাস্তবতাকে এড়িয়ে যেতে চান কিংবা সমকালের বাস্তবতা প্রকাশ করে বিতর্কে জড়াতে চান না। আমি মনে করি, কথাশিল্পীর এ মানসিকতা সত্য-সুন্দরের বিপক্ষে; কেননা কথাকারের দায় হচ্ছে বাস্তবতাসংলগ্ন থেকে সাহিত্য রচনা করা। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?

মামুন হুসাইন: ইতিহাসের সময় ও কাল বিষয়ে খানিকটা কথা বলা গেছে এরই মধ্যে। ‘বাস্তবতা’ শব্দ কি ইংরেজি ‘রিয়েলিজম’-এর সমার্থক? শুরুতে রিয়েলিজম ছিল সহজ বা সরল হওয়া। ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাঁর ‘লিরিক্যাল ব্যালাড’ [১৮০০]-এর ভূমিকায় লিখেছেন, এ কবিতা মানুষের ‘রিয়েল ল্যাঙ্গুয়েজ’-এ কথা বলবে। ইতিহাসে দেখা যায়, ১৯ শতকের পেইন্টার গুস্তাভ কুরবেট ১৮৫০ সালে ‘ডু-রিয়েলিজম’ নামে প্যারিসে যখন প্রদর্শনীর আয়োজন করেন, তার অব্যবহিতপর অ্যাডমুন্ড ডুরান্টির সম্পাদনায় ‘রিয়েলিজম’ নামক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। যেহেতু এর গোড়াপত্তন হয় ফরাসিতে, তখন একে বলা হতো ফ্রেঞ্চ স্টাইল রিয়েলিজম, যা পরবর্তী সময়ে ‘ইংলিশ রিয়েলিজম’-এর উদ্ভব ঘটায়। বিশেষ করে ডিকেন্স, জর্জ এলিয়ট ও এলিজাবেথ গাসকেলের হাতে। আর ১৯ শতকের শেষ প্রান্তে ‘রিয়েলিজম’ গতি পায় যুক্তরাষ্ট্রে। স্তাঁদালের সুবিখ্যাত কথাটি স্মরণ আছে—‘আ নভেল ইজ আ মিরর ওয়াকিং ডাউন দ্য রোড।’ লক্ষ করি, এ সময়ের বাস্তবতা তৈরি হয় কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে: ১. শিল্পায়ন ২. মানবতাবাদ ৩. বিজ্ঞানের শনৈঃশনৈ উন্নতি এবং ৪. সমাজবিজ্ঞানের উদ্বোধন। এর পরও তর্ক থেকেই যায় রিয়েলিস্ট নভেলের গঠনপ্রকৃতি নিয়ে এবং রিয়েলিজম নিয়েও নানা সময় বিস্তর তত্ত্ব তৈরি হয়েছে; যার প্রমাণ মেলে অরকেকসের ‘মিমেসিস’, আয়ান ওয়াটের ‘রাইজ অব নভেল’, রেমন্ড ট্যালিসের ‘ইন ডিফেন্স অব রিয়েলিজম’, মিশেল রিফাতারের ‘ফিকশনাল ট্রুথ’ ইত্যাদিতে। যা হোক, খুব মোটা দাগে বললে এ মুহূর্তের ‘ঘটনা’ নিয়ে বক্তব্য প্রকাশ না করলেই তিনি পলাতক, তিনি ‘বিতর্কে জড়াতে চান না’—এ চটজলদি মন্তব্য আমি করতে চাই না। পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য সাহিত্য রচিত হয়েছে, যদিবা তা ইতিহাস আশ্রয়ী হয়ে থাকে, মূল ঘটনার বহু বছর পর আবার যিনি রচনা করছেন, তিনি হয়তো ওই ঘটনার সময় জন্মগ্রহণই করেননি, তিনি ছিলেন নিতান্ত শৈশবে। কাজেই স্রষ্টা কখন আক্রান্ত হবেন সৃষ্টিশীলতার জটাজালে, তা আমরা নিশ্চয়ই দাগ কেটে বলতে পারি না, পারি না কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে।

তুমি কথাকারের ‘দায়’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছ—এ বিষয়েও নানা যুক্তিতর্ক সম্ভব। দায় কি পার্টির কাছে, নিজের কাছে, সমাজের কাছে, নাকি নতুন সাহিত্যের মেনিফেস্টোর কাছে? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মতো স্বচ্ছ মানুষটিও সংঘবদ্ধতার ঝাঁজ গ্রহণ করতে পারেননি। আবার যদি তিরিশের-চল্লিশের উত্তাল ভারতবর্ষ দেখি—সাধারণ মানুষের সমান্তরালে নাট্যশিল্পী, গায়ক, কবি, লেখক, চলচ্চিত্রকার সমাজের তাত্ক্ষণিক ঘটনায় স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করেছেন, প্রতিবাদ করছেন এবং সত্য-ন্যায়ের পক্ষে জনমত তৈরি করেছেন। এ রকম অংশগ্রহণ, ভাষা-আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, স্বাধীনতা আন্দোলন হয়ে, আমরা আমাদের দেশের নানা উত্তাল মুহূর্ত দেখেছি। সংবেদনশীল শিল্পী আমাদের দেশে নানা সময়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, আহত হয়েছেন, এমনকি মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন। এখন সব শিল্পী, সব সংবেদনশীল মানুষ, ব্যক্তিত্বের বিশেষ গঠনের কারণে অন্য মানুষের মতো সমমাত্রায় রাজপথে সোচ্চার বক্তৃতা করার ঘটনা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না—এর অর্থ কি পলায়নবৃত্ততা? হয়তো তা-ই, আবার সবসময় তা নয়। সত্য-সুন্দরের পক্ষের মানুষ এজরাপাউন্ডের মতো ব্যক্তি নািসদের পক্ষে রেডিওতে বক্তৃতা করার হেতু কী?

ডেভিড থরোর ‘সিভিল ডিজওবিডিয়েন্স’ স্মরণ করুন, আবার অন্য ঘটনাও ঘটেছে সারা ইউরোপে। জর্জ অরওয়েল, হিটলারের ভয়ঙ্কর বিস্তার নিয়ে সুপ্রচুর কথা বলেছেন। ‘কমব্যাট’ পত্রিকার হয়ে ক্যামু গুরুত্বপূর্ণ মতামত লিখছেন। স্পেনের আঁধার কালকে মোকাবেলার জন্য পৌঁছেছেন হেমিংওয়ে, লোরকা, হার্নেন্দাজ, নেরুদা, রাফায়েলসহ অজস্র মনীষী-শিল্পী। মায়াকোভোস্কির কবিতা ‘কনভার্সেশন উইদ আ ট্যাক্স কালেক্টর অ্যাবাউট পোয়েট্রি’ যেন বা কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো। সোলঝেনিিসনের কথা নাই-বা বললাম। ‘স্ট্যালিন-এপিগ্রাম’ লিখে ওসিপ ম্যানডেলস্টান নির্বাসিত হচ্ছেন; বহ বছর পর্যন্ত মিখাইল বুলগাকোভের উপন্যাস ‘দ্য মাস্টার অ্যান্ড মারগারিটা’ প্রকাশে বাধা তৈরি করা হয়। কোরিয়ার সামরিক শাসক পার্ক চুং হিং ১৯৭৫-এ ‘উইন্টার রিপাবলিক’ নামক কবিতা লেখার জন্য একজন স্কুলশিক্ষককে বন্দি করেছেন। এ উদাহরণ স্প্যানিশ গৃহযদ্ধ হয়ে আমাদের ঘরবাড়ির সোমেনচন্দ, শহীদ সাবের, মাতুব্বর, ১৪ই ডিসেম্বর, হুমায়ুন আজাদ, দীপন ইত্যাদি হয়ে আরো বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত করা যায়। লেখকের এ দায় থেকেই তখন তত্ত্বকথা তৈরি হয়—আমরা বলি রেজিস্ট্যান্স থিওরি, বলি রেজিস্ট্যান্স লিটারেচার।

আপনার মূল্যবান সময় অপচয় করে দীর্ঘক্ষণ আমার সঙ্গে সাহিত্য-শিল্পের বিবিধ বিষয় নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন, এজন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

মামুন হুসাইন: তুমি অনেক যত্ন করে, কষ্ট করে আমার গল্প-উপন্যাস কিংবা লেখালেখি নিয়ে কথা বলেছ, তবে গুটিকয় পাঠক ব্যতীত বিপুলসংখ্যক পাঠকের কাছে পৌঁছেনি আমারা লেখা, এ দীর্ঘ আলোচনার শেষে আমার প্রত্যাশা—লেখাগুলো আমাদের হয়ে উঠুক। আমার লেখালেখির উপদ্রব সহ্য করার জন্য তোমাকেও অনেক ধন্যবাদ।

 

 

 

সূত্র: বণিক র্বাতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ