ষাটের দশকের কবিতা ও আমাদের আধুনিকতা

পর্ব ::২
[গত সংখ্যার পর]

৪. ওয়েস্টল্যান্ডের রবীন্দ্রনাথ

টিএস এলিয়টের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগসূত্রতা বড় আকারে ধরার মতো একটি বিষয়। রবীন্দ্রনাথের লেখায়, বিশেষত চিঠিপত্রে, আধুনিক কবিতার প্রসঙ্গ এলেই এলিয়টের কথা এসেছে। বুদ্ধদেব বসুকে গদ্য কবিতার ব্যবহার নিয়ে ১৯৩৬ সালের এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন :’গদ্যকাব্য সম্বন্ধে তর্ক না করে যথেচ্ছা লিখে যাওয়াই ভালো। আজ যারা আপত্তি করছে কাল তারা নকল করবে। সঙ্গে এ কথাও যোগ করছেন, ‘এলিয়ট প্রমুখ অনেক কবি নির্মিল নিশ্ছন্দ কবিতা লিখে চলেছেন।’ এটা লেখাই স্বাভাবিক। ওয়েস্টল্যান্ড ও ফোর কোয়ারটেস-র কবির হাতেই আধুনিক ইংরেজি কবিতার উদ্বোধন হয়েছিল। ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয় তার ওয়েস্টল্যান্ড, পরবর্তী যুগের ওপর এর সমতুল্য প্রভাব দুর্নিরীক্ষ। এখনও, এই একুশ শতকে এসেও, কানে বাজে ‘লাভ সং অব আলফ্রেড প্রুফ্রক’ থেকে ‘ইন দ্য রুম উইমেন কাম অ্যান্ড গো/টকিং অব মিকেল এঞ্জেলো’, অথবা ওয়েস্টল্যান্ডের ‘লন্ডন ব্রিজ ইজ ফলিং ডাউন ফলিং ডাউন ফলিং ডাউন’, অথবা এর বিখ্যাত শেষ লাইন ‘শান্তি শান্তি শান্তি’। এই শেষ লাইনটির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ অন্তর্লীন হয়ে জড়িয়ে আছেন। ঘটনাটি এ রকম।

এটি আমাদের জানা যে, এলিয়ট স্নাতকোত্তর পর্যায়ে দর্শনের ছাত্র ছিলেন (বিএ অবশ্য করেছিলেন, তুলনামূলক সাহিত্যে) হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। এক বছর ফ্রান্সে গিয়ে দার্শনিক বের্গসঁ’র কাছে দর্শনও পড়েছিলেন সরবন বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে আবার হার্ভার্ডে ফিরে এসে ভারতীয় দর্শন এবং সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে অধ্যয়ন করেন। এদিক থেকে এলিয়টের কবিতায় ভারতীয় দর্শন ও সংস্কৃত ভাষা-সাহিত্যের যে উল্লেখ মাঝে মাঝে ঘটে থাকে তার পেছনে বহু দিনের পাঠ অধ্যয়নের প্রভাব ক্রিয়াশীল ছিল। অর্থাৎ পুরো বিষয়টা কেবল ফর্মের চাতুরী, পাঠকদের চমৎকৃত করার জন্য কলাকৌশলের অংশ হিসেবে দেখা যাবে না। ‘ফোর কোয়ারটেস’ কাব্যগ্রন্থে এলিয়ট বলেন, ‘আই সামটাইমস ওয়ান্ডার ইফ দ্যাট ইজ হোয়াট কৃষ্ণা মেনট’ (‘সময় সময় আমি ভাবি কৃষ্ণ কি এটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন’)। কথাটা যাকে বলে শব্দের ধ্বনিগত চাতুর্যের জন্য কেবল উচ্চারিত হয়নি। এর পেছনে তার আজীবন দর্শন পাঠের অভিজ্ঞতাও কাজ করেছিল। সুতরাং রবীন্দ্রনাথের সাহায্য ছাড়াই তার পক্ষে ওয়েস্টল্যান্ড কবিতায় উপনিষদীয় স্তোত্র থেকে ‘দত্তা, দয়াধ্যাম, দমইয়াতা/শান্তি, শান্তি, শান্তি’ চরণ দুটি সন্নিবেশিত করা অস্বাভাবিক ছিল না। স্তোত্রটি বৃহদারণ্যক উপনিষদ থেকে : দত্তা-র অর্থ দান, দয়াধ্যাম-এর অর্থ সমবেদনা, এবং দমইয়াতা’র অর্থ নিয়ন্ত্রণ।

রবীন্দ্রনাথ যখন ১৯২২ সালে প্রথমবারের মতো আমেরিকায় এলেন সেবারই তরুণ এলিয়টের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এই পরিচয়ের গাঢ়তা অটুট ছিল প্রায় আমৃত্যু। প্রথম সাক্ষাতের সময় এলিয়টের বয়স ছিল সাতাশ, রবীন্দ্রনাথের একান্ন। হার্ভার্ডের ভারতীয় দর্শনের অধ্যাপক ও এলিয়টের শিক্ষক উডস সাহেবের বাসায় নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেবার হার্ভার্ডে দেওয়া তার বক্তৃতামালাই ‘সাধনা’ গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছিল। উডস সাহেবের বাসায় প্রতিভাধর তরুণ এলিয়টও আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। সেই সন্ধ্যায় রবীন্দ্রনাথ উপনিষদ থেকে আবৃত্তি করেন, গানও গেয়ে শোনান, ডাকঘরের পাণ্ডুলিপি পড়ে শোনান। এলিয়টের সহপাঠী আরএফ র‌্যাট্রে সেই আসরে উপস্থিত ছিলেন। ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে র‌্যাট্রে সাহেব সেই সান্ধ্য-আসরের স্মৃতিচারণ করে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সিলেক্টেড লেটার্স থেকে জানা যাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথকে সেই প্রবন্ধের একটি কপি পাঠিয়ে র‌্যাট্রে লেখেন, ‘আপনার মনে আছে কিনা জানি না- আমার এক সহপাঠী বন্ধু সেদিন সন্ধ্যায় উপস্থিত ছিলেন, তিনি এখনকার বিখ্যাত কবি টিএস এলিয়ট। তিনি ও আমি একই সঙ্গে ভারতীয় দর্শনের চর্চা করেছি। হতে পারে যে সেদিন সন্ধ্যায় আপনার মুখে আবৃত্তি শুনেই তার ওয়েস্টল্যান্ড কবিতার (শেষের লাইনে) ‘শান্তি, শান্তি, শান্তি’ ব্যবহার করতে আগ্রহী হন। আমি অবশ্য তার কবিতার অনুরাগী নই, কিন্তু তার খ্যাতির কথা ভেবে তথ্যটি উল্লেখ করলাম।’ এ চিঠি পেয়ে রবীন্দ্রনাথ জানালেন, ‘মি. এলিয়ট বিষয়ে যা লিখেছেন সেটি পড়ে কৌতূহলী হলাম।’ এরপর তিনি এলিয়ট সম্পর্কে তার পূর্বাপর আগ্রহের কথা, এলিয়টের কবিতার প্রকরণগত দক্ষতা, ‘ম্যাজাই যাত্রা’র বাংলা অনুবাদ করা ইত্যাদি প্রসঙ্গের উল্লেখ করেন। সেটি সম্ভবত র‌্যাট্রে সাহেবকে বোঝানোর জন্য যে, এলিয়ট তারও প্রিয় কবি।

তবে এলিয়টের কবিতার স্বাদ রবীন্দ্রনাথের মনে সংক্রমিত হয়েছিল ধীরে ধীরে। বুদ্ধদেব বসু, বিষুষ্ণ দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, এমনকি ইয়েটসভক্ত জীবনানন্দ দাশ এলিয়টীয় জ্বরে প্রথম থেকেই কম্পমান ছিলেন। বস্তুত বোদলেয়ারের পরই এলিয়ট ছিলেন বাংলার এই তরুণ কবিকুলের ঘোষিত নেতা। বিশেষত বিষ্ণু দে এলিয়ট দ্বারা আগাগোড়া প্রভাবিত ছিলেন মার্কসবাদে অনুরক্তি সত্ত্বেও। লাভ সং অব আলফ্রেড প্রুফ্রক, ওয়েস্ট ল্যান্ড ও ফোর কোয়ারটেটস থেকে নানা অংশ বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন এরা প্রায় সবাই। নিজেদের কাব্য প্রকরণেও এলিয়টের কলা-কৌশল প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উৎসাহী ছিলেন ত্রিশের এই কবিরা। এলিয়ট নিজে কিন্তু তার কাব্যের নানা ব্যাখ্যা নিয়ে নিস্পৃহ ছিলেন। নৈর্ব্যক্তিক ঢঙে লেখা ছিল তার কবিতাগুলো, রোমান্টিক মেজাজের ঠিক বিপরীতে। এই স্টাইল অনুসরণ করা সহজ ছিল না ত্রিশের কবিদের পক্ষে :তাদের কবিতা ছিল মর্মে মর্মে রোমান্টিক এবং অনেকাংশে অতি-ব্যক্তিক। তাছাড়া এলিয়ট ভারতীয় ও খ্রিস্টীয় দর্শনে অনুপ্রাণিত ছিলেন। এটিও বাংলার এই আধুনিক কবিদের পক্ষে আত্মস্থ করা কঠিন ছিল। কিন্তু এলিয়টের কবিতার আধুনিক উচ্চারণ, উপমা ও সংলাপের ব্যবহার, গদ্য কবিতার লাইনের মাঝে মাঝে ঝিলিক দিয়ে ওঠা অন্ত্যমিলের বিন্যাস, বিষাদ ও হতাশার সুর ত্রিশের কবিদের মন জয় করে নিয়েছিল। ফলে সঙ্গত কারণেই ‘আধুনিক কাব্য’ আলোচনার মধ্যে প্রবেশ করতে গিয়ে এলিয়টের কবিতার উদাহরণ টানেন রবীন্দ্রনাথ। বাংলা কবিতায় আধুনিকতা বিতর্কের সূত্রপাত এ প্রবন্ধের সুবাদেই। অবশ্য উদাহরণগুলো মোটের ওপর এলিয়টের প্রতি সুবিচার করেনি। ওয়েস্ট ল্যান্ড সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত, অথচ ওয়েস্ট ল্যান্ড থেকে নাটকীয় সব উদ্ৃব্দতি টানা যেত আধুনিক কাব্যে গদ্য-পদ্যের মেলবন্ধন বোঝাতে গিয়ে।

‘আধুনিক কাব্য’ প্রবন্ধে কবি বলতে চেয়েছেন আধুনিকতার সংজ্ঞা যুগে যুগে পাল্টায়। যেমন উনিশ শতকের ইংরেজি কবিতায় প্রাধান্য পেয়েছিল ব্যক্তির খেয়াল-খুশির আত্মপ্রকাশ। নানারূপে সেকালের ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শেলি, বায়রন তাদের ব্যক্তিসত্তাকে প্রকাশ করেছিলেন :তারা ‘বাহিরকে নিজের অন্তরের যোগে দেখেছিলেন; জগৎটা হয়েছিল তাদের নিজের ব্যক্তিগত… তখনকার কালে সেইটেই ছিল আধুনিকতা।’ তখন চেষ্টা ছিল ব্যক্তির প্রকাশকে কী করে মোহনীয় করে তোলা যায় সে বিচারে বিশ শতকের কবিতায় ক্রমেই আরো বেশি করে বেজেছে নৈর্ব্যক্তিতার সুর। সেখানে ব্যক্তির চেয়ে বেশি করে মনোযোগ এসে পড়ছে বহির্বিশ্বের পরিবর্তনের ওপর, সমাজের ওপর, এতে করে বহিরঙ্গের চাপে অন্তরঙ্গ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। এই ধারার কবিতা ‘বলতে চায় মোহ জিনিসটাতে আর কোনো দরকার নেই।’ বিজ্ঞানের অনুসরণ করে এই ধারার কবিতা হয়ে উঠছে নিরীক্ষাধর্মী, সবকিছুর ‘নাড়িনক্ষত্র বিচার করে’ দেখছে, বলছে মূলে মোহ নেই, আছে কার্বন, আছে নাইট্রোজেন, আছে ফিজিওলজি, আছে সাইকোলজি। সেকালের বিচারে এই নতুন কবিতার ধারা হয়ে উঠছে এ যুগের ‘আধুনিক কবিতা’। এই প্রসঙ্গে কবি দু’বার এলিয়টের উদ্ৃব্দতি দিলেন। তার মধ্যে একটি ‘লাভ সং অব আলফ্রেড প্রুফ্রক’ থেকে দীর্ঘ অনুবাদ, যার শুরুটা পাঠকদের মনে করিয়ে দিই :

‘এ-ঘরে ও-ঘরে যাবার রাস্তায় সিদ্ধ মাংসের গন্ধ,

তাই নিয়ে শীতের সন্ধ্যা জমে এল।

এখন ছ’টা-

ধোঁয়াটে দিন, পোড়া বাতি, শেষ অংশে ঠেকল।’

কবির কাছে বোদলেয়ারকে মনে হয়েছিল ‘ফার্নিচার পোয়েট’ হিসেবে আর হাল আমলের এলিয়টের কবিতাকে মনে হয়েছে সংস্কারের বাছ-বিচারহীন, সংস্কারের কোনো তোয়াক্কা না করে যে কোনো বিষয় উপকরণই কবিতায় মাননীয় করে তুলতে উদগ্রীব। এই যে সবকিছুকে কবিতায় স্থান দিতে চাওয়া তা কিসের জোরে? রবীন্দ্রনাথ তারও উত্তর খুঁজে পেয়েছেন : “এখানকার কাব্যের যা বিষয় তা লালিত্যে মন ভোলাতে চায় না। তাহলে সে কিসের জোরে দাঁড়ায়। তার জোর হচ্ছে আপন সুনিশ্চিত আত্মতা নিয়ে, ইংরেজিতে যাকে বলে ক্যারেক্টার … অর্থাৎ একটা সমগ্রতার আত্মঘোষণা … নিজের সম্বন্ধে সেই চেহারা আর কিছু পরিচয় দিতে চায় না, কেবল জোরের সঙ্গে বলতে চায় ‘আমি দ্রষ্টব্য’।” আধুনিক কবিতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের সম্মতির দিকটি এখানে এড়িয়ে যাওয়ার নয়। এলিয়টের কবিতাকে এই নতুন যুগের ‘আধুনিক’ ধারার প্রতিনিধিত্বশীল প্রবণতা হিসেবে অকুণ্ঠ স্বীকৃতি দিয়েছেন কবি :’আজকের দিনে যে-সাহিত্য আধুনিকের ধর্ম মেনেছে, সে সাবেক-কালের কৌলীন্যের লক্ষণ সাবধানে মিলিয়ে জাত বাঁচিয়ে চলাকে অবজ্ঞা করে। তার বাছবিচার নেই। এলিয়টের কাব্য এই রকম হালের কাব্য, ব্রিজেসের কাব্য তা নয়।’

তবে ‘আধুনিক কাব্য’ প্রবন্ধ চিত্তাকর্ষক এই কারণে নয় যে, রবীন্দ্রনাথ ওয়েস্ট ল্যান্ড প্রকাশের ১০ বছরের মাথায় ১৯৩২ সালে এসে এলিয়টকে আধুনিক ইংরেজি কবিতার প্রতিনিধিত্বশীল ধারা হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন এবং সে সুবাদে আধুনিক কাব্যধর্মকেই স্বীকার করে নিচ্ছেন। ত্রিশের কবিকুলের জন্য তা একটি বড় অর্জন নিঃসন্দেহে। যদিও রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধটি নিয়ে পরবর্তী সময়ে কল্লোল ও পরিচয়ের পাতায় তারা বিতর্ক তুলবেন আধুনিক কবিতার বিশিষ্টতা নিয়ে। এ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ আধুনিকতার একটি চিরকালীন সংজ্ঞা দিয়েছেন- এতেই তার চিন্তার মৌলিকত্ব :’নদী সামনের দিকে সোজা চলতে চলতে হঠাৎ বাঁক ফেরে। সাহিত্যও তেমনি বরাবর সিধে চলে না। যখন সে বাঁক নেয় তখন সেই বাঁকটাকেই বলতে হবে মর্ডা‌ন্‌। বাংলায় বলা যাক আধুনিক। এই আধুনিকটা সময় নিয়ে নয়, মর্জি নিয়ে।’ আধুনিকতা শুরু হয়েছে কেবল শিল্প-বিপ্লবের পর, অথবা বিশ শতকের গোড়ায় এসে- এ কথায় রবীন্দ্রনাথের আস্থা ছিল না। হাজার বছর আগের চীনের কবি লি-পোকে তাকে বরং আধুনিক বলে মনে হয়েছে :লি-পো ছিলেন ‘আধুনিক’, তার ছিল ‘বিশ্বকে সদ্য দেখা চোখ।’ এখন এসে দেখতে পাচ্ছি, রবীন্দ্রনাথের চিন্তা উত্তর-আধুনিক তত্ত্বের কাছাকাছি হয়ে উঠেছে। আধুনিকের এই সংজ্ঞায় তারপর ব্যক্তিগত দর্শনের রঙও চড়ালেন :’আমাকে যদি জিজ্ঞাসা কর বিশুদ্ধ আধুনিকতাটা কী, তাহলে আমি বলব, বিশ্বকে ব্যক্তিগত আসক্তভাবে না দেখে বিশ্বকে নির্বিকার তদ্‌গতভাবে দেখা। এই দেখাটাই উজ্জ্বল, বিশুদ্ধ; এই মোহমুক্ত দেখাতেই খাঁটি আনন্দ।’ এই অতিরিক্ত বিশেষণ প্রযুক্ত আধুনিকতার সংজ্ঞা পাউন্ড, এলিয়ট, বুদ্ধদেব অথবা সুধীন্দ্রনাথ কেউই মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। মোহমুক্ত উদাসীন নির্বিকারত্ব এদের আরাধ্য ছিল না।

রবীন্দ্রনাথ যে এলিয়টের কবিতা এত মনোযোগ দিয়ে পাঠ করেছিলেন, এমনকি কয়েকটি কবিতা বা তার অংশবিশেষ (‘তীর্থযাত্রী’ ছিল সমগ্র অনুবাদ) ইংরেজি থেকে নিজেই ভাষান্তর করেছিলেন, সে কথা কখনো এলিয়টের কানে পৌঁছেছিল কি-না তা জানার উপায় নেই। প্রাথমিক উচ্ছ্বাসের পর পাউন্ড প্রকাশ্যে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে নীরব ছিলেন, ১৯১৩ সালের নোবেলপ্রাপ্তির পর থেকেই। আর কোনো প্রবন্ধ লেখেননি কবিকে নিয়ে। তারপরও পাউন্ড কবির সাথে মাঝে মধ্যে চিঠি লিখে যোগাযোগ রেখেছেন। ‘আধুনিক কাব্য’ প্রবন্ধেও পাউন্ডের একটি কবিতার বড় করে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এলিয়ট ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে কখনোই কোনো পত্রালাপ হয়নি- অধ্যাপক উডসের বাসায় তাদের সেই দেখাই প্রথম ও শেষ দেখা। তবে পরোক্ষ একটি যোগাযোগ- দুই ভুবনে দুই পুরোধা কবির পক্ষে তা থাকাই খুব সম্ভবপর- থেকে থাকবে।[ক্রমশ]

লেখক:বিনায়ক সেন

 

 

সূত্র: সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ