মঞ্চে উঠলেই ভয় কেটে যায়

ফেরদৌসী মজুমদার। একুশে পদকজয়ী অভিনেত্রী। হাজারেরও বেশিবার মঞ্চে আলো ছড়ানো এই ব্যক্তিত্বের জীবনের গল্প শুনেছেন রুদ্র আরিফ ও আরাফাত শাহরিয়ার

রামেন্দু মজুমদার যতবার আমার পায়ের কাছে আসছেন, ততবার আমি বলে উঠছি, ‘খবরদার, আমার পা ছোঁবেন না।’ প্রতিবারই তিনি সরে যান। প্রডিউসার রেগে গেলেন। আসলে অবিবাহিত কোনো মেয়ের গায়ে কেউ স্পর্শ করবে, এটা মেনে নেওয়ার মতো সংস্কার তখনো তৈরি হয়নি।

অন্যদিকে ‘ঢেউয়ের পরে ঢেউ’ নাটকে আমার হিরো ছিলেন সৈয়দ আফসার আলী। নদীর ধারে মেয়েটি হাত বাড়ায়, ছেলেটিও হাত বাড়ায়। দুজন হাত ধরলে নাটকটির শেষ। এবারও আমি বললাম, ‘হাত ধরতে পারব না।’ কী আর করা। সেখানে বাদল রহমান (চলচ্চিত্রকার) ছিলেন। তাঁর হাত ছোট ছিল, আমার মতো। সাবান দিয়ে তাঁর হাতে আমার চুড়ি পরানো হলো। তাঁর মুখ দেখানো হলো না! এসব ভাবলে এখন খুবই হাসি পায়!

ছোটবেলার কথা মনে পড়ে?

যদিও আমার বাড়ি নোয়াখালী, জন্ম কিন্তু বরিশালে, ১৮ জুন ১৯৪৩। বাবা আবদুল হালিম চৌধুরী ছিলেন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। জেলায় জেলায় ঘুরে বেড়াতেন। সে কারণে আমাদের ভাই-বোনদের বিভিন্ন জায়গায় জন্ম। আমরা বড় হয়েছি ঢাকায়ই। সেন্ট্রাল রোডে। বাড়ির নাম ‘দারুল আফিয়া’। আমার মায়ের নামে নাম। দারুল আফিয়ার বারান্দাটা অনেক লম্বা ছিল। ১১টি ঘর, দোতলা বাড়ি। বাবা থাকতেন নিচের তলার একেবারে পুবের ঘরটায়। অত্যন্ত কড়া মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর কথা ছিল—পড়াশোনা আর ধর্মকর্ম। যে পড়বে না, তার ভাত নেই। সন্ধ্যায় মেয়েদের বাইরে থাকা তো দূরের কথা, ছেলেদেরও ৮টা-সাড়ে ৮টার মধ্যে বাড়ি ফিরতেই হতো। আমাদের ছিল একান্নবর্তী পরিবার। আত্মীয়-স্বজন, গ্রামের বাড়ির লোকজন এসেও থাকত। মা ছিলেন একেবারেই মাটির মানুষ।

এই সেদিনও লম্বা ফ্রকটার পেছনের অংশটা মাথায় তুলে রাস্তা দিয়ে ভোঁ দৌড় দিয়েছি। এদিকে যে পেছন দিকটা উদাম হয়ে গেল, সেই খেয়ালও নেই। প্যান্টের মধ্যে বহু যত্নে কোমরে রাখা চকচকে সিকিটা কতবার বাথরুমে টুপ করে পড়ে গেছে আর বুক ফেটে গেছে। সেই দুঃখের কোনো শেষ নেই। সেদিনের চার আনার জন্য এত শোক! যদিও সেদিনের চার আনার বাদাম আমরা ৮-১০ জন খেয়েও শেষ করতে পারতাম না।

আপনার ভাই-বোনরা তো বিখ্যাত মানুষ

আমরা আট ভাই, পাঁচ বোন। ভাই-বোনদের মধ্যে আমি ১১ নম্বর। সবচেয়ে বড় ভাই মানিক ভাই (জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী) আমার চেয়ে ২০ বছরের বড়। এরপর একে একে মুনীর ভাই (শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী), নাদেরা আপা (কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রীসংঘের নেত্রী নাদেরা বেগম), নাসির ভাই (চট্টগ্রাম ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের সাবেক ভাইস প্রিন্সিপাল নাসির চৌধুরী), জহুর ভাই (সেনা কর্মকর্তা আবদুল কাইয়ুম), কণা আপা (অনুবাদক রওশন আরা বেগম), মঞ্জু ভাই (মঞ্জুর এলাহী), দিলু আপা (দিলারা বেগম), শেলী ভাই (সুইজারল্যান্ডপ্রবাসী স্কলার আবুল ফাতাহ মোহাম্মদ ইকবাল), রুশো (শামসের চৌধুরী), আমি (তখন আমার নাম ছিল ফেরদৌস আরা বেগম), বানু (আয়মান আফতাব বানু), খোকা (মাহবুব এলাহী) এবং সবার ছোট বোন রাহেলা (রাহেলা বানু)। আমার মনে হয়, বাবা অত কড়া না হলে আমরা মানুষ হতাম না।

অভিনয়ে এলেন কিভাবে?

আমি তখন কলেজে পড়ি। একদিন মুনীর ভাই এসে বললেন, ‘ফেরদৌসী, তোকে একটা অভিনয় করতে হবে।’ আমি অভিনয় করব! আমি কি অভিনয় পারি নাকি? ভাই বললেন, ‘এটা একটা রোবটের চরিত্র। দুই হাত সমান করে, ঠাস ঠাস করে হাঁটবি। পটাশ পটাশ শব্দ করি। কোনো সংলাপ লাগবে না। কোনো এক্সপ্রেশন লাগবে না।’ রাজি হলাম। বোধ হয় ভেতরে একটা ইচ্ছা ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে হয়েছিল নাটকটি—‘ডাক্তার আব্দুল্লাহর কারখানা’। কারেল চাপেক অবলম্বনে শওকত ওসমানের নাটক। আমি অভিনয় করে চলে এলাম। বাবা টের পেলেন না। এভাবেই অভিনয়জীবন শুরু।

টেলিভিশনে অভিনয়?

প্রথম টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করি ১৯৬৪ সালে। মুনীর চৌধুরীর লেখা ‘একতলা দোতলা’। প্রডিউসার ছিলেন মনিরুজ্জামান। খুব কড়া নির্মাতা। এক মাস রিহার্সাল হয়েছিল। ওখানে আমার নায়ক ছিলেন রামেন্দু মজুমদার। তখনো আমাদের বিয়ে হয়নি। একটি দৃশ্যে মেয়েটির পায়ে মুগুর পড়ে একটা আঙুল থেঁতলে যায়। মনিরুজ্জামান বুঝিয়ে দিলেন, নায়ক এসে আমার সেই আঙুলটি একটু ধরে দেখবে। তিনি (রামেন্দু মজুমদার) যতবার আমার পায়ের কাছে আসছেন, ততবার আমি বলে উঠছি, ‘খবরদার, আমার  পা ছোঁবেন না।’ প্রতিবারই তিনি সরে যান। প্রডিউসার রেগে গেলেন। আসলে অবিবাহিত কোনো মেয়ের গায়ে কেউ স্পর্শ করবে, এটা মেনে নেওয়ার মতো সংস্কার তখনো তৈরি হয়নি।

অন্যদিকে ‘ঢেউয়ের পরে ঢেউ’ নাটকে আমার হিরো ছিলেন সৈয়দ আফসার আলী। নদীর ধারে মেয়েটি হাত বাড়ায়, ছেলেটিও হাত বাড়ায়। দুজন হাত ধরলে নাটকটির শেষ। এবারও আমি বললাম, ‘হাত ধরতে পারব না।’ কী আর করা। সেখানে বাদল রহমান (চলচ্চিত্রকার) ছিলেন। তাঁর হাত ছোট ছিল, আমার মতো। সাবান দিয়ে তাঁর হাতে আমার চুড়ি পরানো হলো। তাঁর মুখ দেখানো হলো না! এসব ভাবলে এখন খুবই হাসি পায়!

প্রথম নাটকের পারিশ্রমিক দিয়ে বিশেষ এক উপহার কিনেছিলেন।

৭৫ টাকা পারিশ্রমিক পেয়েছিলাম। বাবাকে গিয়ে বললাম, ‘আমি আপনাকে একটা মশারি দিতে চাই।’ তাঁর কথা, ‘আমি আর বাঁচব না। তোরা আমাকে আর মশারি দিস না।’ আমি বললাম, ‘আব্বা, যদি আপনাকে মশারি কিনে দিই, তাহলে আমার পরিশ্রমটা সার্থক হয়।’ তিনি বললেন, ‘এইটা হারামের টাকা। আমারে মশারি কিনে দিতে হবে না, যা।’ আমি চলে এলাম। বাবাকে মা বোঝালেন। বাবা পাত্তা দিলেন না। একেবারে ভোরে উঠে নামাজ পড়ার নিয়ম ছিল আমাদের বাসায়। নামাজ পড়ে আমি বাবার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখি, তিনি মশারিটা খাটিয়েছেন। সাদা টুপি, সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি, সাদা দাড়ি তাঁর। শুয়ে নিজের বুকে আঙুল দিয়ে আনমনে টোকা দিচ্ছেন। উত্তেজিত থাকলে এমনটা করতেন। আমি গিয়ে দরজায় দাঁড়াতেই ইশারায় ডাকলেন। মশারির ভেতর ঢুকতে বললেন। আমি ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম। বললেন, ‘দেখলাম, তোর কান্নার অভিনয়টা খুব ভালো!’ এক দিন আমি দেখি, বাবা খবরের কাগজ পড়ছেন, আর কলম দিয়ে দাগ টেনে মাকে কী যেন দেখাচ্ছেন, আর হাসছেন। পত্রিকায় আসলে আমার অভিনয়ের প্রশংসা করা হয়েছিল। বাবার সেই দুর্বলতার সুযোগটা আমি নিয়ে নিলাম! আমার সাহস বেড়ে গেল। অভিনয়ে পুরো মনোনিবেশ করলাম।

রামেন্দু মজুমদারের সঙ্গে বিয়ে…

তাঁর সঙ্গে আগে তেমন পরিচয় ছিল না। তিনি ইংরেজিতে পড়তেন। আমি পড়তাম বাংলায়। তবে মুনীর ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ ছিল। ‘একতলা দোতলা’য় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে আমরা একটু কাছাকাছি আসি। কথাবার্তা বলি। তবে অন্য কিছু ভাবিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের আর তাঁদের ক্লাস একই সময়ে ছুটি হতো। দেখতাম, তিনি নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটছেন। হঠাৎ খেয়াল করতাম, আমি রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছি, তিনিও দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি হয়তো একটা রিকশা পেয়ে আমাকে নিয়ে দিলেন; কিন্তু আমি তো তাঁকে সঙ্গে চড়াব না। আমি সেই রিকশায় চলে আসতাম। আস্তে আস্তে আমার খারাপ লাগত। অন্য একটা রিকশা নিয়ে তিনি আমাদের বাড়ি পর্যন্ত চলে আসতেন।এক দিন দোতলায় দাঁড়িয়ে দেখি, তিনি নিচ দিয়ে যাচ্ছেন। আমি চেঁচিয়ে বললাম, ‘আপনি কী চান?’  তিনি বললেন, ‘কিছু না! এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম।’ আমার পাশে থাকা বড় বোন খোঁচা দিয়ে বললেন, ‘ওনাকে ওপরে আসতে বল।’ যা হোক,  বাড়িতে সবাই তাঁকে পছন্দ করত।  একসময় চিঠি লিখলেন, ‘ইউনির্ভাসিটির সেরা মেয়েটিকে আমার ভালো লেগেছে।’ আমি বললাম, ‘আপনি আমাকে দেখলেন কখন? আপনি তো সব সময় নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটেন।’ বললেন, ‘আমি নিচের দিকে তাকিয়েই হাঁটতাম। কিন্তু যখন চোখ তুলেছি, তখন আপনাকে দেখেছি। তখন আমার খুব ভালো লেগেছে। আর অন্যদিকে তাকাইনি।’ এটি ১৯৬৪-৬৫ সালের ঘটনা। এরপর পাঁচটা বছর তাঁকে দেখেছি। বিয়ে করার জন্য যুদ্ধ করেছি। শুরুতে সম্পর্কটা কেউ মানতেই পারেনি। আমার একবার খুব অসুখ হলো। মায়ের সঙ্গে বাবা রাগ দেখালেন, ‘তুমি কেমন মা? মেয়ের রাত্রে জ্বর আসে, শুকিয়ে যাচ্ছে, তারে জিগাও—কী হইছে?’ বাবা আসলে খুবই বিচক্ষণ ছিলেন। থার্ড ইয়ারে পড়ার সময় থেকেই আমার বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে। আমি মানা করে দিই। বাবা বললেন, ‘এত সম্পর্ক আসে, কী জবাব দেব? তুই যে কস বিয়া করুম না। বিয়ের তো বয়স হইছে।’ এরপর বাবার পরামর্শেই দ্বিতীয়বার মাস্টার্স করতে ভর্তি হলাম। একসময় আমাদের বিয়েটাও হলো, মুনীর ভাইয়ের বাসায়। যদিও খুব আয়োজন করে বিয়ে হয়নি। তবে আমি বিশ্বাস করি, আমার সুখের মূলে মা-বাবার আশীর্বাদ ছিল।

আপনারা একসঙ্গে ‘থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠা করলেন।

‘থিয়েটার’ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক নাট্যগোষ্ঠী থেকে। তখন ওখানে ছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন, রফিকুল ইসলাম, রামেন্দু মজুমদার প্রমুখ। একবার এক নাটকে আমি রফিকুল ইসলাম স্যারের স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেছি। সহপাঠীদের মধ্যে খুব উত্তেজনা, ‘তুই স্যারের বউ হবি? দেখিস লোকজন তোকে খেপাবে!’ যাহোক, সেটির নাট্যকার-ডিরেক্টর ছিলেন মুনীর ভাই। তিনি নিজে চোরের ভূমিকায় অভিনয়ও করেছিলেন। স্রেফ দুইবার জানালা দিয়ে মুখ উঁচু করে দেখিয়েছেন। ওইটুকু করেই সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। মুনীর ভাই বলতেন, ‘নাটকে ছোট বা বড় কোনো রোল নেই। যতটুকু তুমি করবে, ততটুকুই যদি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পার, মানুষের মনে দাগ কাটতে পার—তাহলেই হলো।’

থিয়েটারের প্রায় সব নাটকেই আমি মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছি। এটা নিয়ে কারো কারো সঙ্গে একটু মনোমালিন্য, বচসা, নানা রকম কথা হয়েছে। কিন্তু আবদুল্লাহ আল মামুন তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। তিনি বলতেন, ‘আমি অনেক কষ্ট করে নাটক করেছি। কোনো অনভিজ্ঞ মহিলাকে নিয়ে আমি আমার নাটকের মান খারাপ করতে চাই না। তখন থিয়েটারে নারী অভিনেত্রী খুব বেশি কেউ ছিলেনও না। আমাকে শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে আবদুল্লাহ আল মামুনের অবদান অনেক। আমি তো অভিনয়ের অনেক কিছু জানতাম না। কখনো আবৃত্তির ক্লাস, নাটকের ক্লাস করিনি। তিনি সব সময় বলতেন, ‘ফেরদৌসী, আপনি পারবেন।’ মঞ্চে ওনার লেখা ও নির্দেশনায় ‘সুবচন নির্বাসনে’, ‘এখনও দুঃসময়’, ‘এখনো ক্রীতদাস’ নাটকগুলো করেছি। ‘সুবচন নির্বাসনে’ নাটকে সংসারে নারীর অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। ‘এখনো ক্রীতদাস’ সাংঘাতিক জননন্দিত হয়েছিল। বস্তির প্রেক্ষাপট। ওখানে কতগুলো অশ্লীল গালাগাল ছিল। ‘এখনও দুঃসময়’ বন্যার প্রেক্ষাপটে লেখা। আবদুল্লাহ আল মামুন সমসাময়িক সমস্যা নিয়ে নাটক লিখতেন। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কলম ধরতেন।

‘থিয়েটার’-এ কতগুলো নাটক করেছেন?

‘কবর’, ‘সুবচন নির্বাসনে’, ‘এখনও দুঃসময়’, ‘চারদিকে যুদ্ধ’, ‘চোর চোর’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘সেনাপতি’, ‘ওথেলো’, ‘অরক্ষিত মতিঝিল’, ‘এখনো ক্রীতদাস’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘এখানে এখন’, ‘কুরসী’, ‘স্পর্ধা’, ‘তাহারা তখন’, ‘গোলাপ বাগান’, ‘মুক্তি’, ‘শেষ খেলা’, ‘মুক্তধারা’…কত যে নাটক! মঞ্চে প্রায় ৩৭টি নাটকে অভিনয় করেছি। এক হাজার ২০০-এর বেশিবার মঞ্চে দাঁড়িয়েছি। আমার অভিনয়জীবনের মোড় ঘুরে যায় ‘কোকিলারা’ করে। বাংলাদেশের প্রথম একক নাটক। তিনটি এপিসোড। বিরতিসহ দুই ঘণ্টা ১৫ মিনিট। সংলাপে ঠাসা। এটাও আবদুল্লাহ আল মামুনের লেখা। তাঁর একটি বড় গুণ ছিল—কাকে দিয়ে কোথায়, কখন, কী অভিনয় করাবেন তা তিনি জানতেন। আমার তখন ফুল অ্যানার্জি। তখন তো একক নাটক করা কঠিন। এক দিন হঠাৎ আমাকে বললেন, ‘ফেরদৌসী, নাটক লিখেছি। প্রথম এপিসোডটি মনিবদের নির্যাতনের শিকার হওয়া কাজের মেয়ের। দ্বিতীয়টি এক গৃহিণীর। তৃতীয় এপিসোডটি উকিলের। আপনি করবেন তো?’ আমার বুকটা কেঁপে উঠল। দুই ঘণ্টা আমি একা। বললাম, ‘কী বলেন! আমাকে দিয়ে হবে না এটা।’ আমি কিন্তু বেশির ভাগ নাটকেই তাঁকে বলেছি, আমাকে দিয়ে হবে না। তিনি ধমকে বলেছেন, ‘আপনাকে দিয়েই হবে।’ এখন বুঝি, আমার জন্য এটা কত পাওয়া। ‘কোকিলারা’তে প্রায় ১৬-১৭টি চরিত্র। আঞ্চলিক ভাষা, শুদ্ধ ভাষা, প্রমিত ভাষা—সবই আছে। আমি বললাম, ‘এটা তো আমার মুখস্থই হবে না।’ তিনি বললেন, ‘সমস্যা নেই। যেদিন মুখস্থ হবে, আমাকে জানাবেন।’ সারা দিন-রাত ‘কোকিলারা’ পড়তাম। সংসার করতে হতো। লাউ কাটছি, তরকারি ধুচ্ছি, পাশেই স্ক্রিপ্ট। ঘরে গিয়ে একবার উঠি। আয়নার সামনে দাঁড়াই। একজন নতুন কাজের লোক এসেছিলেন বাসায়। টের পেতাম,  তিনি মাঝেমধ্যেই একটু উঁকি দিয়ে আবার চলে যান। আমি কিছু বলতাম না। একদিন তিনি আরেকজনকে  জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওনার কি মাথা খারাপ? সারা দিন বকবক করে। আয়না দেখে হাসে!’

প্রথম প্রদর্শনীর কথা মনে আছে?

প্রথম প্রথম মঞ্চের পাশে গিয়ে পা কাঁপত। মনে হতো, আমার কেউ নেই। অন্য নাটকে তো অনেকে থাকে। আর এত দর্শক। হাউসফুল। আবদুল্লাহ আল মামুন কিন্তু কাছে আসতেন না। দূরে পায়চারি করতেন। আর থিয়েটারের লোকজন এসে সান্ত্বনা দিতেন; কিন্তু একবার মঞ্চে উঠতেই ভয় কেটে গেল। এটা কিন্তু সব নাটকেই হয়।

মঞ্চনাটক নিয়ে প্রচুর বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। বিশেষ কোনো স্মৃতি?

কোরিয়ায় আমরা ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ যখন করি, যেহেতু বেশি লোক নেওয়া যাবে না, তাই আমি ডাবল অ্যাকটিং করেছিলাম। প্রথমে করেছি মাতব্বরের মেয়ে। তারপর এক গ্রাম্য মহিলার চরিত্র। ওখানে আমি অবাক হয়ে দেখেছি, মেকআপ কাকে বলে। মাতব্বরের মেয়ের গলায় মাদুলি, কানে মাদুলি, লাল ফিতা দিয়ে চুল বাঁধা, হাতে রুপার চুড়ি। এরপর গ্রাম্য মহিলার চরিত্র আসতেই চট করে আমাকে বুড়ি বানিয়ে দেওয়া হলো। একটা মধ্যবয়স্ক মেকআপম্যান মুহূর্তেই আমার চুলগুলোকে পাকিয়ে দিল! দেখে তো আমি নিজেই নিজেকে চিনি না!

আপনি তো নির্দেশনাও দিয়েছেন?

প্রথমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বোন’ নির্দেশনা দিয়েছিলাম, মমতাজউদদীন আহমদের নাট্যরূপে। তারপর আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘তাহারা তখন’। একসময় খেয়াল করলাম, নির্দেশনা দিতে আমি ততটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। তা ছাড়া, নির্দেশনা দিতে গেলে অভিনয় হবে না। আবদুল্লাহ আল মামুন যখন মঞ্চে নির্দেশনা দিতেন, নিজে কিন্তু অভিনয় করতেন না। অথচ তিনি বিরাট বড় অভিনেতা ছিলেন।

টেলিভিশনের বিশেষ কোনো চরিত্রের কথা বলবেন?

শহীদুল্লা কায়সারের ‘সংশপ্তক’ উপন্যাসটি নিয়ে একই শিরোনামে নাটক নির্মাণ করেছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। সেখানে হুরমতি চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। এখনো আমাকে কেউ কেউ সেই নামেই ডাকে।

নাটকটিতে যখন অভিনয় করি, তখন তো রক্ত টগবগা! কাজেই অভিনয় করেছি প্রাণ দিয়ে। তাই সার্থক হয়েছে। ওখানে খলিলউল্লাহ খান অভিনয় করেছিলেন মিয়াবাড়ির মিয়া চরিত্রে। সালিসে দুশ্চরিত্র বলে হুরমতিকে ছেঁকা দেওয়ার দৃশ্যটি দুর্দান্ত ছিল। জ্বলন্ত আগুনে পয়সা গরম করছেন লিয়াকত আলী লাকী। আমার কপালে ছেঁকা দেবেন। আবদুল্লাহ আল মামুন অস্থির হয়ে লাকীকে বারবার বলছেন, ‘খেয়াল রাখবা পয়সা দুইটা। একটা ঠাণ্ডা, একটা গরম। ভুলেও কিন্তু গরমটা দিয়ে দিয়ো না।’ এদিকে আমার কিন্তু এ নিয়ে কোনো ভয়ই নেই। ভাবটা এ রকম, ‘দিলেইবা!’ ছেঁকা দেওয়ার পর চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেলাম। আসলে ঠাণ্ডা পয়সা দিয়েই ছেঁকা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অভিনয় দেখে মানুষ ভাবল, পয়সাটা সত্যি গরম ছিল। মানুষের মনে দাগ কেটে গেল ঘটনাটি।

২০ বছর আগের কথা। আমি তখন উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে চাকরি করি। ‘সংশপ্তক’ নাটকটি যেহেতু বারবারই পুনঃ প্রচার করা হয়, এক দিন এক কাণ্ড ঘটল। বাচ্চা একটা ছাত্র দৌড়ে এসে উঁকি দিয়ে আমাকে দেখে চলে গেল। কয়েকবার এ রকম করল সে। কেন এমন করছে—বুঝতে পারলাম না। পরের দিন ওর মা আমাকে বলল, ‘আমার ছেলেটাকে নিয়ে এসেছি। ও প্রায়ই বলে, ওই যে ছেঁকা দিয়েছে। তাঁর কপালে ব্যথা করছে না? ও উদ্বিগ্ন হয়ে আছে। আপনি ওকে বলে দিন, আপনার কিছু হয়নি। আপনার কপালটা ওকে দেখান।’ ছেলেটি ওর মায়ের আঁচল ধরে, বড় বড় চোখে তাকিয়ে ছিল। আমি ওকে বুঝিয়ে বললাম।

সমসাময়িক অভিনেতাদের কথা শুনতে চাই

আলী যাকেরের সঙ্গে অভিনয় করে আনন্দ পেয়েছি। গোলাম মোস্তফার মতো এত বুদ্ধিমান, এত শিক্ষা খুব কম অভিনেতারই ছিল। টেলিভিশনের নাটকে তিনি সংলাপ খুব একটা মুখস্থ করতেন না; কিন্তু একটা কথাও বাইরের বলতেন না। বলতেন নিজের ভাষায়।

শিক্ষকতার সঙ্গে জড়ালেন কখন?

বিয়ের আগে থেকেই আমি টিচার। বাবা বলতেন, ‘বসে থাকবি না কখনো। এত লেখাপড়া করেছিস, এক দিনও বসে থাকবি না।’ মাস্টার্সের রেজাল্টের আগে বাবা বললেন, ‘কিছু একটা কর।’ আমি বললাম,  ‘আব্বা, স্কুলে চাকরি করি?’ বললেন, ‘ঠিক আছে।’ আমি আজিমপুর অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ে গিয়ে বায়োডাটা দিলাম। কিন্তু ম্যাট্রিকের সার্টিফিকেট ছিল না। হেড মিস্ট্রেস বললেন, ‘ম্যাট্রিক সার্টিফিকেটটা আগে জোগাড় করো।’ আমি চলে এলাম। বাবা বললেন, ‘তুই কি লাফ দিয়ে এমএ পাস করেছিস, ম্যাট্রিক ছাড়া? আবার যা।’ আবার গেলাম। হেড মিস্ট্রেসকে বললাম, ‘ওটা খুঁজে পাইনি।’ বাবার কথাটি তাঁকে শোনালাম। তাঁরা খুব হাসাহাসি করলেন।’ বেতন কত চাইব, বাবার কাছে আগেই জিজ্ঞেস করেছিলাম। বাবা বলেছিলেন, ‘২০০ টাকা চাস। তোর পাউডার, স্নো, কাজল—এই তিনটির খরচ যেন হয়ে যায় আর টিফিনের পয়সা। যেন আমার কাছে আর হাত পাততে না হয়।’ আমি ২০০ টাকাই চাইলাম। ওঁরা আবার হাসাহাসি করলেন। মিস্ট্রেস বললেন, ‘২০০ টাকাই? বেশি দিলেও চলবে না, কম দিলেও না?’

২০০ টাকা বেতনেই চাকরিটি পেয়ে গেলাম। বিয়ের পর চাকরিটি ছেড়ে দিই। এরপর উইলস লিটল ফ্লাওয়ারে চাকরি করি দীর্ঘদিন। ওখান থেকে অবসর নিয়ে যোগ দিই মাস্টার মাইন্ড স্কুলে। আরো কয়েকটি স্কুলে পড়িয়েছি। মূলত বাংলা পড়াতাম।

জীবনকে কিভাবে দেখেন?

বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে যতটুকু কাজ করেছি, ভালোবেসেই করেছি। আমার কোনো অতৃপ্তি নেই। দুই-তিনটি চলচ্চিত্র করেছি, শিবলী সাদিকের ‘মায়ের অধিকার’, নারগিস আক্তারের ‘মেঘলা আকাশ’। শুধু আফসোস, সত্যজিৎ রায়ের কোনো ছবিতে অভিনয় করতে পারিনি। মশিহউদ্দিন শাকের-শেখ নিয়ামত আলীর ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’তে অভিনয়ের প্রস্তাব এসেছিল; কিন্তু আমার মেয়েটা তখন ছোট বলে চরিত্রটি ডলি আনোয়ারকে দিয়ে দিয়েছি। দুটি জিনিস আমি খুব ভালোবাসি—গান আর আঁকা। আঁকাটাও শেখা হলো না। শিল্পী কামরুল হাসানের ছবি দেখলে অবাক হয়ে যাই—কিভাবে এমন সুন্দর আঁকতে পারেন একটা মানুষ! তবে আমার জীবনে কোনো আক্ষেপ নেই।

শ্রুতলিখন : মাসুদ রানা আশিক

(সেন্ট্রাল রোড, ঢাকা; ২২ জানুয়ারি ২০১৯)

 

 

 

সূত্র: কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ