বাংলার বইপত্র নিষিদ্ধকরণের দলিলপত্র

এই নিবন্ধের প্রায় পুরোটাই ব্রিটিশ ভারতের বাংলায় বইপত্র নিষিদ্ধকরণ-সংক্রান্ত দাপ্তরিক চিঠিপত্র, টোকা, প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও আইনকানুনের ইংরেজি থেকে বাংলায় ভাষান্তর। শিশির কর ‘ব্রিটিশ শাসনে বাজেয়াপ্ত বাংলা বই’ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও গবেষণাধর্মী কাজ করেছেন। উদ্ধৃতি ও ইংরেজি টেক্সট বেশির ভাগ তার গবেষণা গ্রন্থ থেকেই দেয়া হয়েছে।

আমাদের আলোচনার প্রথম নিষিদ্ধ বইয়ের নাম ‘বর্তমান রাজনৈতিক সংকট ও মোছলমানদের কর্ত্তব্য’; লেখক মাহম্মদ আশানুল হক আফেনদি। বইটি বাংলাদেশের রংপুর থেকে প্রকাশিত।

রংপুরের জেলা প্রশাসক এই বইয়ের আপত্তিকর ও প্ররোচনামূলক কিছু অংশ শনাক্ত করেন:

ক. কে এ দেশের মোছলমানদের হাত হইতে এছলামের ঝাণ্ডা ছিনাইয়া লইয়াছে?

খ. কে ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে…জঘন্য ষড়যন্ত্র করিয়াছে?

গ. ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট সমগ্র মানবজগতের মধ্যে এছলামকে যতটা ক্ষতিগ্রস্ত করিয়াছে, ইহার আগে কখনও কোনো জাতি বা দেশ উহাকে এইরূপ সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে নাই।

ঘ. এইরূপ কঠোর আততায়ী ও এছলামের যথাসর্বস্ব লুণ্ঠনকারী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ।

ঙ. মোছলমানগণ। বলুন, সত্য কথা বলুন ইহারা কে? ভারতের ২২ কোটি হিন্দু না কংগ্রেস না ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট।

চ. কে এ দেশের মোছলমানদিগকে দীর্ঘ এক শতাব্দী পর্যন্ত দাবাইয়া রাখিয়া হিন্দু ভ্রাতাদিগকে উপরে চড়াইয়াছে?

(শিশির করের গ্রন্থ)

এ ধরনের কিছু প্রশ্ন রেখে জেলা প্রশাসক বাংলা সরকারের চিফ সেক্রেটারিকে যে চিঠি লিখেন, তা অনূদিত হচ্ছে—

মহোদয়

এই চিঠির সঙ্গে ‘বর্তমান রাজনৈতিক সংকট  মোছলমানদের কর্ত্তব্য’ শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রেরণ করে আপনার বিবেচনা আদেশের জন্য নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো উপস্থাপন করছি।

ভারতীয় দণ্ডবিধি ১২৪  ধারায় বর্ণিত অপরাধের আওতায় বিবেচনাধীন বইটির পুরোটাই পড়ে এবং লেখক  মুদ্রাকরউভয়কেই এই ধারার আওতায় দায়ী করা যায়। এই সিদ্ধান্ত পূর্ব গৃহীত যে ব্রিটিশ ভারতে গঠিত সরকার মানে ভারতে ব্রিটিশশাসনএর প্রতিনিধিত্বকারী রাজনীতিক ব্যবস্থা প্রশাসনিক বিধিবিধান থেকে যত স্বতন্ত্রই হোকতা ব্রিটিশ ব্যবস্থা হিসেবেইগণ্য।

বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালিয়ে এই পুস্তিকার সব কপি আটক করা হয়েছে এবং ছাপাখানা থেকে পাণ্ডুলিপিও উদ্ধার করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোয় রংপুর জেলায় বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যন্ত প্রতিনিয়ত কৃষক সভা ও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। স্থানীয় পরিস্থিতি পর্যালোচনায় আমি বুঝতে পারি জনগণের মনে উত্তেজনা সঞ্চার করার (৭৫ ভাগ মুসলমান) চেষ্টা করা হচ্ছে, তা এখনই শক্ত হাতে দমন করা প্রয়োজন।

কাজেই এ অবস্থায় নিচে সংযুক্ত তফসিল অনুযায়ী লেখা ও মুদ্রাকরের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধি ১২৩ এ এবং ১৫৩-এর বিধান অনুযায়ী আইনে সোপর্দ করার সদয় অনুমোদন প্রার্থনা করছি। এ বইটিকে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক বিবেচনা করা যায়।

তফসিল

১. মাহম্মদ আশানুল হক আফেনদি

গ্রাম: সোনারাই, থানা: ডোমার, জেলা: রংপুর।

২. নিবারণ চন্দ্র চক্রবর্তী

নবাবগঞ্জ, রংপুর শহর, কালীকৃষ্ণ মেশিন প্রেসের মালিক

৩. মুদ্রাকর (এখনো নিশ্চিত শনাক্তকরণ করা সম্ভব হয়নি)।

***

এই চিঠি পাওয়ার পর সরকারের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের রাজনৈতিক মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত এডিশনাল সেক্রেটারি মিস্টার হিচিংস জেলা প্রশাসককে লিখেন:

প্রিয় খান বাহাদুর

আপনার ৩১ মার্চ ১৯৩৯এর ২২২সি নং পত্রের (উপরের পত্রজবাবে আপনাকে জানাচ্ছি যে ‘বর্তমান রাজনৈতিক সংকট মোছলমানদের কর্তব্য’ লেখক  মুদ্রাকরের এবং ছাপাখানার মালিকের বিচারের জন্য আপনি যে প্রস্তাব পাঠিয়েছেনসরকার৩১ অনুমোদন করেছে। তবে আনুষ্ঠানিক আদেশ জারির জন্য নিচের তথ্যগুলো আবশ্যকযা যত শীঘ্র সম্ভব পাঠাবেন:

মুদ্রাকরের নাম  ঠিকানা

যে পুলিশ কর্মকর্তা  মামলার তদন্ত করবেনতার নাম।

 মামলায় বিচার কি আপনি নিজে করবেননা কোনো স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট তা করবেনফৌজদারি কার্যবিধির ১৪ ধারাঅনুযায়ী সরকার তাকে নিয়োগ দেবে।

আমি আপনাকে জানাতে চাই মুদ্রাকরের নাম পাওয়া না গেলে তার বিরুদ্ধে বিচারের আদেশ প্রদান করা সম্ভব হবে না।

১৮৬৭ সালের প্রেস অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন অব বুকস অ্যাক্টএর  ধারায় বাধ্যতামূলক প্রকাশক  মুদ্রাকরের নাম সংযোজন এইপুস্তিকায় করা হয়নি।  অপরাধের দায়ে আপনি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ভাবছেন কিনা জানাবেন।

স্বরাষ্ট্র দপ্তরের এডিশনাল সেক্রেটারির চিঠির জবাব:

গোপনীয়     

আধা সরকারি পত্র নম্বর ৫২৭/সি              

রংপুর জেলা অফিস

 ১৬ আগস্ট ১৯৩৯

প্রিয় মিস্টার হিচিংস

আপনার ২৬ জুলাই ১৯৩৯ তারিখের ১৬৫০ নম্বর পত্রে ‘বর্তমান রাজনৈতিকসংকট  মোছলমানদের কর্তব্য’ পুস্তিকার লেখকমুদ্রাকর  ছাপাখানারমালিকের বিচারসংক্রান্ত আমার প্রস্তাবের জবাবে আমি কয়েকটি বিষয় উপস্থাপন করছিপ্রেস অ্যাক্টএর ১২ ধারায় ছাপাখানারমালিক নিবারণ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে এর মধ্যেই মামলা হয়েছে। ছাপাখানার মালিক বৃদ্ধ এবং পেশাগত দিক দিয়ে একজনপুরোহিত। তিনি অজ্ঞতাবশত  কাজটি করেছেন এবং ভবিষ্যতে  ধরনের পুস্তিকা প্রকাশ করবেন না বলে অঙ্গীকারনামাদিয়েছেন।

মুদ্রাকরের নাম নিশ্চিত হওয়া গেছেকিন্তু পুলিশ সুপার মনে করেন তার সাক্ষ্যের তেমন বস্তুগত গুরুত্ব নেইসুতরাং মামলায়তাকে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেননি।

এই পরিস্থিতিতে আমি আপনাকে অনুরোধ করছি ভারতীয় দণ্ডবিধি ১২৪ এবং ১৫৩ ধারা অনুযায়ী কেবল লেখকেরবিরুদ্ধে মামলার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রদান করুন।

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাবির উদ্দিন বিশ্বাসএসআই অভিযোগকারী হিসেবে মামলার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

এই মামলার বিচার করার জন্য সদরের মহকুমা কর্মকর্তা রাজা সুরেন্দ্র নারায়ণ রায় বাহাদুরকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪ ধারারস্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা যেতে পারে।

এর পর পরই গভর্নরের আদেশক্রমে রাজা সুরেন্দ্র নাথ রায় বাহাদুর স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হলেন।

‘বর্তমান রাজনৈতিক সংকট ও মোছলমানের কর্তব্য’ বাজেয়াপ্ত হলো।

প্রজ্ঞাপন

নম্বর ৪১৯৩, ৭ আগস্ট ১৯৩৯

১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ৯১-এ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে গভর্নর হিজ ম্যাজেস্টি ব্রিটিশরাজের অনুকূলে ‘বর্তমান রাজনৈতিক সংকট ও মোছলমানদের কর্তব্য’ শীর্ষক পুস্তিকাটি যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখান থেকে বাজেয়াপ্ত করবেন। সোনারাই, ডোমার রংপুরের মুহাম্মদ আহসানুল হক কর্তৃক লিখিত এবং কালীকৃষ্ণ মেশিন প্রেসে মুদ্রিত এই পুস্তিকাটিকে ব্রিটিশ ভারতে স্থাপিত সরকারের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ, তা অসন্তুষ্টি ও শত্রুতার অনুভূতি ছড়াবার মতো উপাদান এ পুস্তিকায় রয়েছে। হিজ ম্যাজেস্টির প্রজাদের মধ্যেও অনুরূপ অনুভূতির সৃষ্টি করে, যা ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪-এ ১৫৩-এ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

তারপর লেখক মুহাম্মদ আহসানুল হক আফেন্দিকে অভিযুক্ত হলেন।

প্রজ্ঞাপন

নম্বর ৪৬২০-পি

তারিখ: ৩১ আগস্ট ১৯৩৯

গভর্নর অবহিত হয়েছেন যে, গ্রাম সোনারাই, থানা: ডোমার, জেলা: রংপুরের মুহাম্মদ আহসানুল হক আফেন্দি তার লেখা ‘বর্তমান রাজনৈতিক সংকট ও মোছলমানের কর্তব্য’ নামে বই লিখে দণ্ডবিধি ১২৪-এ এবং ১৫৩-এ ধারায় বর্ণিত অপরাধ করেছেন। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৯৬ ধারার বিধানবলে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাব-ইন্সপেক্টর সাবিরউদ্দিন বিশ্বাসকে উক্ত অপরাধ কাজ করার অভিযোগে পুস্তিকার লেখক মুহাম্মদ আহসানুল হকের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করা হলো।

গভর্নরের আদেশক্রমে

বাংলা সরকারের সেক্রেটারি

স্বরাষ্ট্র দপ্তর (রাজনৈতিক)

আগস্ট ১৯৩৯।

তারপর ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করে লেখকের বিচার হলো। লেখককে দণ্ডবিধি ১২৪-এ ও ১৫৩-এ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে মামলা পরিচালনা করা হলো। ৩১ মে ১৯৪০ মামলার রায় হলো। স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট সুরেন্দ্র নাথ রায় ইংরেজি পত্রযোগে সরকারকে অবহিত করলেন:

সাজার ব্যাপারে বলতে গেলে এটা অনস্বীকার্য যে অপরাধটি অত্যন্ত গুরুতর। একই সঙ্গে এটা স্মর্তব্য এটিই অভিযুক্ত ব্যক্তির করা প্রথম অপরাধ। তার সামাজিক মর্যাদা ভালো এবং একজন জোতদার। আমি মনে করি সবদিক বিবেচনা করে তাকে দেড় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ১২৪-এ ধারায় দেড় বছর এবং ১৫৩-এ ধারায় দেড় বছর, যা একই সঙ্গে চলমান—সমীচীন হবে বলে মনে করি।

সুতরাং তাকে ১৮ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করলাম।

এই পুস্তিকার রচয়িতা আদালতের এ আদেশ মেনে কারাবরণ করেছেন না, এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন এর কোনো রেকর্ড গবেষক খুঁজে পাননি।

নবীন চন্দ্র সেনের ছেলের আবেদন

জানুয়ারি ১৯১৬ সাহিত্যিক নবীন চন্দ্রের ছেলে ব্যারিস্টার এন সি সেন রেঙ্গুন থেকে বাংলা সরকারের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের (রাজনৈতিক বিভাগ) সচিবকে বাবার বইপত্র নিয়ে যে চিঠি লিখেন, তা অনুষ্ঠিত হলো—

মহোদয়

সম্মানের সাথে আমি আপনাকে অবহিত করছি যে আমার বাবা প্রয়াত নবীন চন্দ্র সেন প্রথম শ্রেণীর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন,দীর্ঘ ৩৫ বছর বিশ্বস্ততার সাথে চাকরি করে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁকে বাংলা ভাষার একজন প্রধান কবি বিবেচনা করা হয়এবং তার রচনাবলী বাংলা সাহিত্যে অত্যন্ত উঁচু স্থান অধিকার করে আছে।

আমি তাঁর একমাত্র সন্তান এবং রেঙ্গুনে আইন ব্যবসায় নিয়োজিত রয়েছি। আমার অবস্থান কোলকাতা থেকে অনেক দূরেহওয়ায় আমার বাবার বইপত্রের প্রকাশনার ব্যবস্থা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এই ধরনের সমস্যা হতে পারে তা অনুমানকরে মৃত্যুর কয়েক মাস আগে আমার বাবা এই দায়িত্ব তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধুর পুত্র বাবু শরৎ কুমার বসুকে প্রদান করে।বাবার বন্ধু শৈশব থেকেই তার সাথে ঘনিষ্ঠ। আট বছর আগে আমার বাবা প্রয়াত হনতারপর থেকেই বাবু শরৎ কুমার বসুঅত্যন্ত সদয় হয়ে আন্তরিকতার সাথে তাঁর বই ছাপাপ্রকাশ করা এবং বাজারজাত করার ব্যবস্থা করে আসছেন।

সম্প্রতি আমার বাবার একটি বই ‘প্রবাসের পত্র’ পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। ১২৯৯ বঙ্গাব্দে প্রথম প্রকাশিত এই বই ২৪ বছর ধরেমুদ্রিত অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে এবং বাজারে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমান সংস্করণটি কেবলমাত্র পুনর্মুদ্রণএতে কোনো সংযোজন বাবিয়োজন ঘটেনি। কিন্তু আমি শরৎ কুমার বসুর কাছ থেকে জেনেছি কলকাতার পুলিশ কমিশনার তাকে ডেকে নিয়ে জানিয়েছেনযে সরকার এই বইয়ের কয়েকটি অনুচ্ছেদ আপত্তিকর বলে মনে করছে এবং তাকে সমস্ত অবিক্রীত কপি সরকারের কাছেসমর্পণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

বাবু শরৎ কুমার বসু প্রস্তাব করেন যে সব পৃষ্ঠায় আপত্তিকর বক্তব্য রয়েছেতা ছিঁড়ে ফেলেসরকারের কাছে সমর্পণ করবেন এবং প্রয়োজনীয় অংশ ছেপে আবার বইয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করবেন।পুলিশ কমিশনার  প্রস্তাবে রাজি না হলে তিনি অবশিষ্ট অবিক্রীত বই সমর্পণে সম্মতি জানান।

যেহেতু বাবু শরৎ কুমার বসু আমার পক্ষে আমার বাবার এই পত্রের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালনকরছেন এবং যেহেতু এগুলোর গ্রন্থস্বত্ব সম্পূর্ণভাবে আমারইসেজন্যই পুলিশ কমিশনারের সাথেতার সাক্ষাতের বিষয়টি আমাকে জানিয়েছেন।

আমি সবিনয়ে আপনাকে জানাতে চাইআমার বাবা যখন এই বইটি লিখেন তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ছিলেন এবংতখন তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে অধিষ্ঠিত। সে সময় তার পক্ষে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ছড়ানো কিংবাসরকারকে হেয় করে কিছু লেখা সম্ভব ছিল না এবং এতে ব্রিটিশ সরকারের সপ্রশংস অনুচ্ছেদ রয়েছেব্রিটিশ শাসনে ভারতেযে উপকার সাধিত হয়েছে এবং যে দীর্ঘ  অবিচ্ছিন্ন শান্তি বিরাজ করছেতার প্রশস্তি রচনা করেছেন।

যা হোক এখন যেহেতু বইটির কিছু অনুচ্ছেদ অবাঞ্ছিত মনে করা হচ্ছেতা আর বইয়ে ছাপা ঠিক হবে না। আমি সেইঅনুচ্ছেদগুলো বাদ দিতে এবং সরকার নির্দেশ অনুযায়ী তা প্রকাশ করতে আগ্রহী। আমি একান্তভাবে আশা করছি সরকারআমার প্রার্থনা কবুল করবে এবং আমি বিশ্বাস করি  রকম উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সাহিত্যকর্ম সরকার চিরদিনের জন্য মুছে ফেলতেচাইবে না।

আমার আবেদন যদি মঞ্জুর করা হয়তাহলে আমি প্রস্তাব করববর্তমান সংস্করণ থেকে আপত্তিকর অংশ বাদ দিয়ে তা বিনষ্টকরার জন্য সরকারের নির্ধারিত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে  অংশগুলো দেওয়া হবে এবং কিছু পাতা পুনর্মুদ্রণ করে এর সাথেসংযোজন করা হবে। আমি সবিনয়ে জানাতে চাই প্রচুর অলংকরণসহ বর্তমান সংস্করণটি ছাপাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতেহয়েছেযদি সব কপি ধ্বংস করা হয়তা হলে বিশেষ আর্থিক ক্ষতিসাধিত হবে।

যদি আমার প্রস্তাব গ্রহণ না করা হয়তাহলে আমাদের হাতে থাকা সব কপি সমর্পণ করতে প্রস্তুত থাকব। একই সঙ্গে যেহেতুবইটি বহু বছর ধরে বিরাজ করছেএর কোন কোন অনুচ্ছেদে আপত্তিকর কোনো কিছু রয়েছে এমন ধারণা ছাড়াই পুনর্মুদ্রিতহয়েছেআমি কি ক্ষতি পুষিয়ে দেবার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাতে পারি না?

যথাযথ সম্মান প্রদানপূর্বক

আপনার একান্ত বাধ্যগত ভৃত্য

এন সি সেন

ব্যরিস্টারএট

১নং বার স্ট্রিট

রেঙ্গুন

 জানুয়ারি ১৯১৬

কবি ও লেখক নবীন চন্দ্র সেন ১০ ফেব্রুয়ারি ১৮৪৭ সালে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের রাউজানে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক পাস করে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগদান করেন। ২৩ জানুয়ারি ১৯০৯ সালে তার মৃত্যু হয়। তার রচনার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত পলাশীর যুদ্ধ। অন্যান্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে আকাশ রঞ্জিনী, তিন খণ্ডে মহাভারত ভানুমতি, প্রবাসের পত্র, আমার জীবন, অমিতাভ, খ্রিস্টের জীবন, ক্লিওপেট্রা, গীতা  চণ্ডি।

নবীন চন্দ্রের পলাশীর যুদ্ধ রচনায় নিষিদ্ধ হওয়ার বহু উপকরণ থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি, তবে এর আপত্তিকর অংশ স্কুলপাঠ্য গ্রন্থ থেকে বাদ দেয়ার জন্য বাংলা সরকারের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি নবীন চন্দ্রকে চিঠি দিয়েছেন। পলাশীর যুদ্ধনাট্যাভিনয়ও আপত্তির মুখে পড়ে। তখন বলা হয় এ নাটক ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। কলকাতার পুলিশ কমিশনারের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ১৪ মার্চ ১৯৩২ এর মঞ্চায়ন নিষিদ্ধ করে দেয়।

প্রবাসের পত্র নিয়ে গোয়েন্দা বিভাগের আপত্তি করা অনুচ্ছেদ থেকে কয়েকটি পঙিক্ত উদ্ধৃত হলো:

ক. যে ইংরাজ মোগলের দয়াতে ভারতে বাণিজ্য করিতে আইসে, সে মোগলের সিংহাসনে বসিল। আকবরের উত্তরাধিকারী তাহার বৃত্তিভোগী হইয়া সামান্য ব্যক্তির মতো দিল্লি নগরে বসতি করিতে হইনি। ময়ূর সিংহাসন নাদের শাহ লইয়া গিয়াছিল, দেওয়ান-আমির দেওয়ান-মাস ব্রিটিশ সেনানিবাস হইল। ব্রিটিশ রাজত্ব ক্রমে বিস্তৃত হইয়া পাঞ্জাব পর্যন্ত বিস্তৃত হইল। রণজিৎ সিংহের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হইল। ভারতের মানচিত্র লাল হইয়া গেল।

খ. প্রতিহিংসায় মত্ত ইংরাজরা তোপের দ্বারা সহস্র সহস্র নর-নারীকে জলমগ্ন করিয়া নিহত করেন। কেবল একপক্ষেই নৃশংসতার অভিনয় হয় নাই।

গ. তখন সেনাপতি হডসন এই শিশুদিগকে দিল্লিদ্বারের কাছে বন্দিভাবে লইয়া গিয়া, স্বহস্তে তাহাদিগকে গুলি করিয়া বধ করেন।

ইংরেজ শাসনে এই সত্যভাষণ সরকারের পছন্দ হবার কোনো কারণ নেই।

বিষের বাঁশিপ্রলয় শিখাচন্দ্রবিন্দুভাঙ্গার গান

বিষের বাঁশির রচয়িতা এবং প্রকাশক উভয়ই কাজী নজরুল ইসলাম।

বিষের বাঁশিতে কতটা বিষ আছে, তা প্রথম সরকারকে একটি ইংরেজি পত্রে অবহিত করলেন বাবু অক্ষয় কুমার দত্ত গুপ্ত। তিনি ছিলেন বেঙ্গল লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান। পাবলিক ইনস্ট্রাকশন বিভাগকে লেখা তার পত্রটি অনূদিত হলো। চিঠির তারিখ ২১ আগস্ট ১৯২৪—

মহোদয়,

কোনো এক কাজী নজরুল ইসলাম রচিত বিষের বাঁশি নামের ২১ আগস্ট ১৯২৪ বেঙ্গল লাইব্রেরিতে গৃহীত হয়বইটি এইচিঠির সাথে সংযুক্ত করা হলো।

ইংরেজিতে অনূদিত অংশ (এতদসঙ্গে সংযুক্তপ্রমাণ করে এই প্রকাশনা কেমন ভয়ংকরআপত্তিজনক প্রকৃতিরলেখক তারবিপ্লবী অনুভূতির প্রকাশ করেছেন এবং তরুণদের বিদ্রোহ করতে এবং আইন অমান্য করতে প্ররোচনা দিচ্ছেন। অস্বচ্ছ ধারণারওপর ভয়াবহ উদ্দেশ্য সাধন করতে বারংবার যেসব উত্তেজক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছেতার মধ্যে রয়েছে রক্তস্বৈরাচার,মৃত্যুআগুননরকদানব  বজে  মতো শব্দ। আমি এর সাথে যোগ করতে চাই যে এই লেখক আগেও একবার রাষ্ট্রদ্রোহেরঅভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন। তখন থেকে তিনি  ধরনের লোকের সাথে যোগসাজশ রক্ষা করে চলেছেন। আমি সুপারিশকরছি অপরাধ তদন্ত বিভাগের স্পেশাল ব্রাঞ্চকে  প্রকাশনাটির দিকে দৃষ্টি দিতে বলা হোক।

এই পত্রের সাথে সংযুক্ত গ্রন্থটি কাজ শেষ হয়ে যাবার পর দয়া করে ফেরত দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।

অক্ষয় কুমার দত্ত গুপ্তের সুপারিশ বিফলে যায়নি। ১৮ অক্টোবর ১৯২৪ পুলিশ কমিশনার মিস্টার টেগার্ট বাংলা সরকারের চিফ সেক্রেটারিকে লিখলেন:

মহোদয়

যথাযথ সম্মান জানিয়ে ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯২৪ বাংলার পাবলিক ইনস্ট্রাক্টরকে লিখিত কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিষের বাঁশি’-সংক্রান্ত একটি পত্রের অনুলিপি আপনার কাছে পাঠাচ্ছি।

এই গ্রন্থের লেখক গত বছর ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪  ১৫৩ ধারায় শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি। ধূমকেতু রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় তারএক বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছিল। এই বইয়ের যে বিষয়কিছু অনূদিত অংশ থেকে তা স্পষ্ট করে দেয় যে এটি বিপজ্জনকধরনের আপত্তিকর। তাই আমি বইটি অবিলম্বে বাজেয়াপ্ত করার সুপারিশ করছি।

২২ অক্টোবর ১৯২৪ চিফ সেক্রেটারি এ এন মোবারলের স্বাক্ষরে ‘বিষের বাঁশি’ বাজেয়াপ্ত করার আদেশ জারি হয় এবং তা গেজেটে ছাপা হয়।

এ আদেশের পরপর পুলিশ বই আটক করতে নেমে যায়। কলকাতার আর্থ পাবলিশিং হাউজ (কলেজ স্ট্রিট), ইন্ডিয়ান বুক ক্লাব (কলেজ-স্ট্রিট মার্কেট), কল্লোল পাবলিশিং (কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট), ডি এম লাইব্রেরি (কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট), বরেন্দ্র লাইব্রেরি (কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট), সরস্বতী লাইব্রেরি (রমানাথ মজুমদার স্ট্রিট), বরেন্দ্র এজেন্সি (কলেজ স্ট্রিট), বাণী প্রেস (মদন মিত্র লেন)— এ আটটি প্রতিষ্ঠানে হানা দিয়ে মোট ৪৪টি বিষের বাঁশি উদ্ধার করে।

এ রকম একটি মারাত্মক উসকানিমূলক বই লেখার অপরাধে কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট নজরুলকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন।

***

নজরুলের ‘প্রলয় শিখা’ নিষিদ্ধ হওয়ার ১৭ বছর পর ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। ম্যাজিস্ট্রেট টি রক্সবারা এই গ্রন্থ রচনার জন্য ভারতীয় দণ্ডবিধি ১২৪-এ ধারার প্রমাণিত অপরাধে কাজী নজরুল ইসলামকে ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। নজরুল প্রলয় শিখার কেবল লেখকই নন, প্রকাশক ও মুদ্রাকরও।

চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল হয়।

হাইকোর্টে বিচারক ছিলেন জাস্টিস লর্ড উইলিয়ামস এবং জাস্টিস এস কে ঘোষ। ৩১ মার্চ ১৯৩৯ প্রকাশিত সংবাদ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় হাইকোর্ট চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ বাতিল করে দেন এবং আসামি কাজী নজরুল ইসলামকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন।

লেখক মুক্ত হলেও বই নিষিদ্ধই রয়ে গেল।

১৯৩৭ সালে ‘ফনীমনসা’ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব যথারীতি চিফ সেক্রেটারির কাছে আসে এবং তিনি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন এই বইয়ে ভারতীয় দণ্ডবিধি ১২৪-এ এবং কার্যবিধি ৯৯ এ ধারায় মামলা রুজু করার পর্যাপ্ত উপাদান নেই।

১৯৬২ সালে ‘সর্বহারা’র কৃষাণের গান, ধীবরের গান, রাজা-প্রজা, ফরিয়াদি ও সর্বহারা কবিতার জন্য এই বই বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ করার এবং নজরুলকে ১২৪-এ ও ১৫৩-এ ধারায় বিচারের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কবি বেঁচে যান এবং তার কাব্যগ্রন্থও নিষিদ্ধ হওয়ার হাত থেকে রেহাই পায়।

রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ রুদ্রমহলের লেখক কাজী নজরুল ইসলামের বিচারের প্রস্তাব উত্থাপিত হলেও শেষ পর্যন্ত তা বেশি দূর এগোয়নি।

১৯৩৯ সালে স্বরাষ্ট্র দপ্তর বলল, বইগুলো (নজরুলের) আপত্তিকর এবং দেশদ্রোহমূলক। এসব বইয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে নেয়া ঠিক হবে না।

এর মধ্যে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য হুমায়ুন কবীর ১০ মার্চ ১৯৩৯ কাউন্সিল অধিবেশনে কাজী নজরুল ইসলামের বিষের বাঁশি, ভাঙ্গার গান, চন্দ্রবিন্দু, প্রলয় শিখা ও যুগবাণী— এই পাঁচটি বইয়ের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে কি না …

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সরকার বইগুলোকে দেশদ্রোহমূলক বলে মনে করে।

হুমায়ুন কবীরের প্রশ্ন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নাড়া দেয়। মন্ত্রণালয় থেকে কলকাতার পুলিশ কমিশনার ২৭ আগস্ট ১৯৪০ লেখা হয়:

মহোদয়

আমি আদিষ্ট হয়ে জানাচ্ছি যে কাজী নজরুল ইসলামের কয়েকটি বইয়ের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার প্রসঙ্গে বেঙ্গললেজিসলেটিভ কাউন্সিলের চলতি অধিবেশনে হুমায়ুন কবীরের প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে বইগুলো পুনরায় পরীক্ষা করা প্রয়োজনীয়হয়ে পড়েছে।

 অবস্থায় সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত (বিষের বাঁশি (প্রলয় শিখা (চন্দ্রবিন্দু (ভাঙ্গার গান বই স্বরাষ্ট্র বিভাগেপাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হলো। কাজ শেষ হয়ে যাবার পর বইগুলো ফেরত পাঠানো হবে।

অখণ্ড বাংলার মুখ্যমন্ত্রী আবুল কাশেম ফজলুল হক ১৬ জানুয়ারি ১৯৪১ সালে তার পাঠানো একটি নোটে উল্লেখ করেন। মুসলমানরা অভিযোগ করছেন হিন্দু লেখকদের বাজে বইও নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি পাচ্ছে, কিন্তু মুসলমান লেখকদের বেলায় বৈষম্য তাদের অসন্তষ্ট করেছে।

২৫ মার্চ ১৯৪১ স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয় কাজী নজরুল ইসলামের বই সম্পর্কে সরকারের মতামত জানিয়ে দেয়:

আমরা ভাঙ্গার গান, প্রলয় শিখা এবং চন্দ্রবিন্দুর কপি সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছি। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয় আর বিবেচনা করা সমীচীন হবে না।

যুগবাণী ১৯২২ সালে এবং বিষের বাঁশী ১৯২৪ সালে নিষিদ্ধ হয়েছিল, উভয় গ্রন্থই রাষ্ট্রদোহমূলক বিবেচিত হয়েছে। এই মহাযুদ্ধের সময় এসব বইয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান হয়ে উঠবে। অন্তত যুদ্ধের কারণে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকুক।

স্বরাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের পরামর্শ মুখ্যমন্ত্রী আবুল কাশেম ফজলুল হকও মেনে নিয়েছেন। নথিতে লেখা হয়েছে; মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন। কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন নেই। নথির কার্যক্রম বন্ধ করে বিষের বাঁশি গ্রন্থটি কলকাতা পুলিশ কমিশনারকে পাঠিয়ে দেয়া হোক।

টীকা :

দণ্ডবিধি ১২৪-এ

এই ধারায় রাষ্ট্রদ্রোহের শাস্তি বর্ণিত। এতে যাবজ্জীবন বা যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে।

দণ্ডবিধি ১৫৩-এ

বিভিন্ন শ্রেণীর জনগণের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করা। দুই বছর সশ্রম বা বিনা শ্রম কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয় দণ্ডই হতে পারে।

ফৌজদারি কার্যবিধি ৯৯-এ

কতিপয় প্রকাশনা বাজেয়াপ্ত ঘোষণা ও তল্লাশি পরোয়ানা জারি করা। সরকার যদি মন করে প্রকাশনার দণ্ডবিধি ১২৩-এ, ১২৪-এ, ১৫৩-এ, ১৯২, ১৯৫-এ, ৫০৫, ৫০৫-এ ধারার উপাদান রয়েছে, তখন প্রকাশনা বাজেয়াপ্ত করার অধিকার রাখে।

পাদটীকা: লেখক, প্রকাশক, মুদ্রাকর অনভিপ্রেত কিছু লিখলে, প্রকাশ করলে, ছাপালে শাস্তি পেতে পারেন।

কিন্তু আপনাকে কেউ বই উৎসর্গ করলে এবং সেই বইয়ে আপত্তিকর, প্ররোচনামূলক ও রাষ্ট্রদোহের উপাদান থাকলে আপনিও ছাড় পাবেন না।

হীরালাল সেন ‘হুঙ্কার’ নামের কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উৎসর্গ করেছিলেন। হুঙ্কার কবিকে জেলে ঠেলে দিল। রবীন্দ্রনাথ কলকাতা থেকে খুলনার আদালতে এসে বললেন এই উৎসর্গ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না।

মামলায় সাক্ষী হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেঁচে গেলেন।

লেখক:আন্দালিব রাশদী

 

 

 

সূত্র: বণিক র্বাতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ