ঋণ

ব্যাংকে যদি আপনার ১ লাখ ডলার ঋণ থাকে, তাহলে ব্যাংক আপনার মালিক বনে যাবেন। আর ব্যাংকে যদি আপনার ১০ কোটি ডলার ঋণ থাকে, তাহলে আপনিই ব্যাংকের মালিক হয়ে যাবেন।

—আমেরিকান প্রবাদ

ঋণের উদ্ভব, ইতিহাসে প্রবেশের আগে একটু সমসাময়িক দুনিয়ায় ঘুরে আসে যাক। ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ বদ্রিলার যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান জাতীয় ঋণকে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ানো একটি মিসাইলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ১৯৯৬ সালে তিনি এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক কিছু কথা লিখেছিলেন—

‘টাইমস স্কয়ারের একটি ইলেকট্রনিক বিলবোর্ড আমেরিকার পাবলিক ঋণের পরিমাণ প্রদর্শন করছে। পরিমাণটা মনে হয় জ্যোতির্বিদ্যাসংক্রান্ত এক গাণিতিক ফিগার, কয়েক হাজার বিলিয়ন ডলার এবং এটা সেকেন্ডে ২ লাখ মার্কিন ডলার হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এ ঋণ কখনই পরিশোধ করা হবে না। কোনো ঋণই কখনো পরিশোধ করা হয় না। ঋণের শেষ পরিমাণটা কখনই গণনা করা হবে না। যুক্তরাষ্ট্র এখনই তার ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম নয়, কিন্তু এটা কোনো প্রভাবও রাখবে না। এ ভার্চুয়াল দেউলিয়াত্বের জন্য কোনো আখেরি বিচারের দিন নেই। ব্রডওয়েতে স্থাপিত বিলবোর্ডের দিকে তাকালে মনে হবে এর উড়ন্ত গাণিতিক মানগুলো যেন মহাকাশের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার স্তরটি ছুঁয়ে ফেলবে। এগুলো দেখলে মনে হবে মহাকাশের ছায়াপথের আলোকবর্ষের দূরত্ব। ঋণকে স্বাধীনতা দেয়ার গতি যেন দুনিয়ার স্যাটেলাইটের গতির মতো। সত্যিকার পরিস্থিতিটা এ রকমই, ঋণ তার নিজস্ব কক্ষপথে ঘুরে বেড়ায়।’

বদ্রিলার ভেবেছিলেন ঋণের মিসাইল হয়তো দুনিয়ার মাটিকে স্পর্শ করবে না। কিন্তু তার এ পর্যবেক্ষণ সত্য হয়নি। ইতালীয় চিন্তাবিদ ফ্র্যাংকো বেরারদি সম্প্রতি তার দি আপরাইজিং : অন পোয়েট্রি অ্যান্ড ফিন্যান্স গ্রন্থে বলেছেন, গত কয়েক বছরে বদ্রিলারের অনুমানের ভিন্নটাই ঘটেছে। ঋণ আবার ধরণীতে ফিরে এসেছে। তিনি একে বলছেন মেটাফিজিক্যাল ডেট। এ ঋণ শোধ করতে গিয়ে মানুষের জীবন, মেধা, আনন্দ সবই উৎসর্গ হয়ে যাচ্ছে।

টাকা-পয়সার ইতিহাস আলোচনায় সবসময়ই আসে মুদ্রা, সোনা-রুপার মুদ্রা, মোহর এবং শেষমেশ কাগজের নোটের কথা। কিন্তু মুদ্রা তো ইতিহাসের একেকটি সভ্যতা, রাজত্বের সঙ্গে এসেছে এবং তাদের সঙ্গেই চলে গেছে। আধুনিক সময়ে কাগজের নোটের নকশা, মানের পরিবর্তন হয়। সমাজের যে জাল মানুষকে একত্র করে রাখে, তার অন্যতম শক্তিশালী শক্তি হচ্ছে টাকা। টাকাই হচ্ছে সেই বাধ্যবাধকতা, যার জন্য জীবন সমাজের কাছে বাঁধা পড়ে যায়। জীবিকা বা আয়ের অনিশ্চয়তা টাকার আবির্ভাবের আগে বিনিময় প্রথার আমলেই ঋণের প্রয়োজনীয়তা ও প্রথা চালু করে দিয়েছিল।

ঋণের চরিত্র উন্মোচনে কিছু জটিলতা আছে। সমাজে মানুষের কাছে মানুষের নানা রকম বাধ্যবাধকতা, দায়িত্ব থাকে। এসবের মধ্যে ঋণ বা আর্থিক ঋণ ভিন্ন। মা-বাবার কাছে আমরা সবাই ঋণী, কিন্তু সে ঋণ আমাদের শোধ করতে হয় না বা শোধ করা সম্ভব নয়। অর্থের ঋণ সমাজে যেকোনো রূপেই হোক না কেন, তা দাসত্বের অস্তিত্বের কথা জানান দেয়— নৃতত্ত্ববিদ ডেভিড গ্রেবার তার সুবিশাল গ্রন্থ ডেটদ্য ফার্স্ট ৫০০০ ইয়ারস-এ এমনটাই বলেছেন।

ডিম আগে না মুরগি আগে— প্রশ্নটির মতোই অর্থনীতিতে একটি কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন আছে, কার আগে আবির্ভাব— টাকা না ঋণের? পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমেই মানুষের বেচা-কেনার সংস্কৃতি চালু হয় এবং পরবর্তী সময়ে ঋণের প্রথা যাত্রা করে। কিন্তু নৃতত্ত্ববিদ ডেভিড গ্রেবারের মতে, শ্রম বিভাগের সঙ্গে সঙ্গেই ঋণের যাত্রা হয়েছিল। অর্থাৎ সেটা টাকা আবির্ভাবের অনেক আগের ঘটনা।

ঋণের ইতিহাসের শুরু হয়েছিল মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন ভূমিতে। মেসোপটেমিয়ার কিউনিফর্মের মর্মোদ্ধারের মাধ্যমে উদ্ধার করা গেছে সে ইতিহাস। এটা খ্রিস্টের জন্মের সাড়ে তিন হাজার বছর আগের কথা। আজ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে ফোরাত ও দজলা নদীর তীরে যেতে হবে আমাদের। মিসরের হায়ারোগ্লিফিকও নীল নদের তীরে দূর অতীতে ঋণের অস্তিত্বের জানান দেয়। ইতিহাসে প্রমাণিত হয়ে যায় ধাতব মুদ্রা ব্যবহার শুরুর অন্তত হাজার বছর আগেই মানবসমাজে ঋণের ধারণার কার্যক্রম আবির্ভূত হয়েছিল। তবে মিসরের চেয়ে মেসোপটেমিয়ার দলিলপত্রই বেশি ভালোভাবে টিকে আছে। মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয় সভ্যতার অর্থনীতি পরিচালিত হতো মন্দির ও প্রাসাদের আধিপত্যে। শুরুতে সুমার অনেকগুলো স্বাধীন নগরে বিভক্ত থাকলে খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দে একটি কেন্দ্রীয় ও সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। মন্দির কর্তৃপক্ষই এ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। এ ব্যবস্থায় বিনিময়ের একটি মৌলিক একক ছিল, যার নাম শেকেল। এক শেকেল রুপার ওজন সমান ছিল এক বুশেল যব। এই এক শেকেল ছিল ৬০ ভাগের সমষ্টি এবং এক মাসে ৩০ দিন ধরে সব হিসাব করা হতো। মন্দিরের কর্মীরা দিনে দুই বেলা যবের রেশন পেত। মন্দিরের কর্মকর্তারা এ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন সম্পদের হিসাব রাখতে এবং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সেসব বিতরণ করতে।

ঋণের উৎস জানা গেল, কিন্তু লাভ বা সুদের উদ্ভব কবে হয়েছিল, তা নির্দিষ্ট করা যায়নি। কারণ, ধারণাটি লিখন পদ্ধতি আবিষ্কারের আগেই হয়েছিল। প্রাচীনকালে ঋণের সঙ্গে মিথ্যা বলাকে একই রকম বিষয় বলে বিবেচনা করা হতো এবং দুটোকেই ঘৃণার চোখে দেখা হতো। হেরোডটাস লিখেছেন, ‘পারস্যের মানুষ মিথ্যা বলাকে অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখত এবং সবচেয়ে অমর্যাদাকর বিষয় বলে মনে করত। কারণ তারা ভাবত, ঋণগ্রস্ত মানুষ অবশ্যই মিথ্যা কথা বলবে।’ খ্রিস্টপূর্ব ২৪০২ অব্দে মেসোপটেমিয়ার লাগাশের রাজা এনমেটেনা একটি রাজকীয় দলিলে উল্লেখ করেছেন, তাদের শত্রু উমার রাজা তাদের অনেক কৃষিজমি দখল করে রেখেছে। লাগাশের রাজা বলছেন, যদি কেউ যদি এ জমির ভাড়া হিসাব করে, তাহলে উমা লাগাশের কাছে সাড়ে চার ট্রিলিয়ন লিটার যবের ঋণে আবদ্ধ। বোঝাই যায়, লাগাশের রাজার এ হিসাব সঠিক নয়, অনেকটা কাল্পনিকভাবে বাড়িয়ে বলা হয়েছে। মূল উদ্দেশ্য ছিল উমার বিরুদ্ধে যুদ্ধের একটা অজুহাত তৈরি করা। এছাড়া, তিনি বোধহয় এটাও দেখাতে চেয়েছিলেন যে তিনি গণিত বেশ ভালো জানেন।

এনমেটেনার আমলে ভোক্তাঋণের বিপরীতে মুনাফা বা সুদের ব্যবস্থা চালু ছিল। রাজা এনমেটেনা সেই যুদ্ধ করেন এবং উমার বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন। এর দুই বছর পর তিনি এক আদেশে (শিলালিপিতে খোদিত) তার রাজ্যে সবার ঋণ মওকুফের সাধারণ ঘোষণা দেন। এর কিছুদিন পর রাজা এনমেটেনা গর্বভরে আরো ঘোষণা দেন, ‘তিনি লাগাশে মানুষের স্বাধীনতা (আমারগি) প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন। তিনি মায়ের কাছে সন্তানকে এবং সন্তানের কাছে মাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তিনি সব বকেয়া সুদ মওকুফ করেছেন।’ ঘোষণাটি মানবসভ্যতার ইতিহাসে গভীর তাত্পর্যময়। দুনিয়ার ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক, প্রশাসনিক দলিলে এই প্রথমবারের মতো স্বাধীনতা শব্দটির ব্যবহার দেখা গেল।

এনমেটেনার আদেশসংক্রান্ত শিলালিপিতে ঋণ মওকুফের শর্ত বা নীতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি। কিন্তু অর্ধশতক পর তার উত্তরসূরি উরুইনিমজিনাও ২৩৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের নতুন বছরে ঋণ মওকুফের একটি সাধারণ ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার সব শর্তই খুব স্পষ্ট ছিল—এখানে শুধু চলমান ঋণই নয়, বরং সব ধরনের বকেয়াই মওকুফ করে দেয়া হয়েছিল, যেমন—কোনো ফি কিংবা অপরাধের সাজাস্বরূপ দেয়া অর্থদণ্ড। শুধু এক ধরনের ঋণই এ মওকুফের আওতার বাইরে ছিল—সব ধরনের বাণিজ্যিক ঋণ।

লাগাশের অনুরূপ দলিল, ঘোষণা-পরবর্তী সময়ে সুমার, ব্যাবিলন, অ্যাসিরীয় সভ্যতায় দেখা যায়। সবখানেই এসব মওকুফের উদ্দেশ্য হিসেবে একই ধরনের কথা বলা হয়েছে—‘ন্যায়বিচার ও সমতা’ প্রতিষ্ঠা, বিধবা ও এতিমদের রক্ষা। বিখ্যাত হাম্মুরাবি ১৭৬১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্যাবিলনের ঋণ মওকুফের ঘোষণা দেন, ‘শক্তিশালীরা দুর্বলদের ওপর অত্যাচার করতে পারবে না।’

মিসর দুনিয়ার অন্যতম প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সভ্যতা। তবে মেসোপটেমিয়ার সঙ্গে মিসরের ঋণ বিষয়ে মৌলিক ফারাক দেখা যায়। শুরুর দিকে মিসরীয় সভ্যতায় ঋণ ও সুদের প্রচলন ছিল না। মিসরের নীল নদ ও কেন্দ্রীভূত শক্তিশালী শাসন কাঠামো এখানে কর ব্যবস্থাকে দক্ষ করে তুলেছিল। ফলে রাষ্ট্র বেতন-ভাতা প্রদান করত। বাণিজ্যিক ঋণের তেমন অস্তিত্ব ছিল না। মানুষ যেটুকু ঋণ নিত, সেটা সাধারণ প্রতিবেশীর কাছ থেকে ধার নেয়ার মতো।

টাকা থাক বা না থাক ঋণের আদিতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মানুষের ঋণের ফাঁদে আটকে যাওয়া। প্রাচীনকালে ঋণের দায়ে পরিবারের সদস্যদের বিক্রি করে দিতে হতো আর শেষমেশ ঋণগ্রহীতা ঋণদাতার দাসে পরিণত হতো। প্রাচীনকাল হোক আর আধুনিক যুগ ঋণ অন্যকে দাসে পরিণত করে। অর্থনৈতিক শোষণ প্রক্রিয়ার গুরুতর একটি যন্ত্র হচ্ছে ঋণ। অন্যকে ধ্বংস করারও ভালো একটি পদ্ধতি হলো ঋণ। বেশি দূর যেতে হবে না, সাম্প্রতিককালে ঋণের দায় মেটাতে না পেরে এক দেশ আরেক দেশের কাছে নিজের সমুদ্রবন্দর ছেড়ে দিয়েছে এমন নজির বর্তমান।

প্রাচীনকালের সমাজ-সংস্কৃতিতেও ঋণের প্রভাব ছিল। মেসোপটেমিয়ার রাজারা বিভিন্ন উপলক্ষে বন্দিদের যেমন মুক্তি দিতেন, তেমনি অনেক ঋণগ্রস্তের ঋণ পরিশোধ বা মওকুফ করতেন। প্রাচীন ইসরায়েলে বিভিন্ন বার্ষিকীতে এ ঋণ পরিশোধের প্রথা চালু করা হয়েছিল। অনেক গোষ্ঠী সুদ আদায়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। আবার অনেক ক্ষেত্রে ঋণের বিপরীতে সুদহার নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল এবং এটা কোনোভাবেই ৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। প্রাচীন গ্রিক ও রোমানরা তাদের সমাজে ঋণ ও দাসত্বের সংকট মোকাবেলা করত নতুন এলাকা দখল করার মাধ্যমে। সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে তরুণ সেনাদের সামনে নানা আয়ের পথ খুলে যেত। লুটের মালের ভাগ ঋণগ্রস্ত ও গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা হতো, যাতে তারা অর্থনৈতিক সংকট থেকে বের হতে পারে।

অর্থনীতিতে মুদ্রার ব্যবহার শুরু হওয়ার মাধ্যমে মানুষের মনোজগতে বিরাট পরিবর্তন আসে। মানুষ ভাবতে শুরু করে, সবকিছু পরিমাপ ও ক্রয়-বিক্রয়যোগ্য। সব সভ্যতায়ই বস্তুবাদী দার্শনিকদের আবির্ভাব ঘটে। আর এ বস্তুবাদী দর্শনের বিপরীতে আবার আদর্শিক, মানবতাবাদী ও ধর্মীয় আন্দোলন শুরু হয়, যেমন—সোফিস্টদের বিরুদ্ধে গ্রিক দর্শন এবং ভারতে বৌদ্ধ দর্শনের বিকাশ।

ভারতবর্ষের ইতিহাসে দেখা যায়, মৌর্য সাম্রাজ্যে সম্রাট অশোকের আমলে অর্থনীতিতে কিছু গুরুতর পরিবর্তন আসে। অশোক সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড পরিহার করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সমাজে এক ধরনের সংস্কার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল। বণিকরা এ সংস্কারে অখুশি হননি। সে আমলের বৌদ্ধ ধর্মীয় অর্থনীতি নিয়ে পণ্ডিত মহলেই এক ধরনের ধাঁধা আছে। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা নিজস্ব সম্পদের মালিক হতে পারেন না। অন্যদিকে এ ধর্মে ঋণ কিংবা সুদ নিয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। সহজ কথায় মৌর্য সাম্রাজ্যে অশোকের আমলে যুদ্ধ, সহিংসতাকে ত্যাগ করা হলেও বাণিজ্যে কোনো নিষেধ ছিল না। অশোকের মৃত্যুর পর মৌর্য সাম্রাজ্যের ক্ষয়ের পর ভারতবর্ষে উত্থান ঘটে হিন্দু শাসনের। এ সময় রচিত অনেক হিন্দু আইন শাস্ত্রীয় গ্রন্থে ঋণ পরিশোধের নিশ্চয়তা, জামিন, অঙ্গীকারপত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। এমনকি চতুবর্ণের কার ঋণের কী সুদ হবে সেটাও নির্ধারণ করে দেয়া এবং বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে সুদের হারে তফাত ছিল ব্রাহ্মণের জন্য সবচেয়ে কম আর শূদ্রের জন্য বেশি। তবে ডেভিড গ্রেবারের মতে, সেই আমলে দুনিয়ার অন্য অঞ্চলগুলোর তুলনায় হিন্দু সমাজের ঋণসংক্রান্ত নিয়মনীতি উচ্চমানের ছিল। যেমন ঋণ শোধ করতে না পারলে ভারতে কাউকে দাসে পরিণত করা হতো না। নারী কিংবা শিশুদের বিক্রি করে দেয়ার ঘটনাও ভারতে খুব একটা দেখা যায়নি, বরং এ সময়ে ভারতের গ্রামে কিছুমাত্রায় প্রচলিত দাস প্রথাও উঠে গিয়েছিল। আইন অনুসারে কেবল সুদ পরিশোধ করে যে কেউ মুক্ত থাকতে পারত। মূল পরিশোধ করতে কয়েক পুরুষ চলে যেত। আর তিন পুরুষেও মূল শোধ না হলে সেটা মওকুফ হয়ে যেত।

মধ্যযুগে সমাজ ও অর্থনৈতিক জীবনে নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। চীনে মধ্যযুগেও প্রাচীন সাম্রাজ্যের সার অক্ষুণ্ন ছিল। রাজশক্তি তখনো বণিকদের দমিয়ে রাখতে পেরেছিল; গরিব মানুষদের রাষ্ট্রই রক্ষা করত। ভারতে গ্রাম্য সমাজ স্থানীয় রীতি-প্রথা দিয়েই শাসিত হতো। টাকা ধার দেয়া বা বণিক সমাজ তখনো সমাজে উঁচু স্তরে উঠতে পারেনি।

ইসলাম ধর্মের মাধ্যমে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের মধ্যে একটা বিরাট দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল। বণিকরাই ধর্ম বিস্তারে ভূমিকা রাখতে শুরু করলেন এবং তারা সমবেতভাবে সুদের চর্চা পরিত্যাগ করেন। বণিকরা যেহেতু ধর্মীয় কোড অব অনার দিয়ে পরিচালিত হতেন, তাই তাদের নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রশক্তির কোনো ভূমিকা নিতে হতো না। অর্থনীতি কিংবা ধর্মে নাক না গলিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোযোগ দিয়েছিল। এরা দাসদের আটক করে তাদের অস্ত্রে সজ্জিত করে নতুন এলাকা বিজয়ে ব্যবহার করেছিল। অন্যদিকে ইউরোপে বাজার, টাকা ও রাষ্ট্র সংকুচিত হয়ে যাচ্ছিল এবং পুরনো দিনের বিনিময় প্রথা জনপ্রিয় হচ্ছিল। অবশেষে গির্জা এবার সুদের ব্যবসার বিরুদ্ধে অবস্থান নিল।

মধ্যযুগে দুনিয়ার অর্থনীতির একটি বিরাট অংশ নিয়ন্ত্রণ করেছিল মুসলমানরা। আরবের শহরগুলো ছিল প্রশাসক ও বণিকদের পরিচালনায় শাসিত। এরা অন্যদের ঋণ দিত কিংবা ঋণ নিতে বাধ্য করত। ফলে সাধারণ মানুষ, কৃষকদের চোখে এরা ছিল ঘৃণিত চরিত্র। কিন্তু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর এ বণিকদের অনেক শয়তানি ত্যাগ করতে হলো এবং এবার তারা সমাজের নেতৃত্বে চলে এলেন। বাণিজ্যের ব্যাপারে শুরু থেকেই ইসলামে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখা গেছে। ইসলামে সুদ হারাম। কিন্তু মুনাফা করার ব্যবস্থা ছিল, যেমন বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস ফি ছিল। বাকিতে পণ্য কিনলে নগদের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হতো। ফলে বণিকরা ঋণ দিতে পারতেন। কিন্তু এ মুনাফা ব্যাংকিং ব্যবস্থা হওয়ার মতো সমৃদ্ধ ছিল না। ফলে বণিকদের জন্য কাগজে-কলমে নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়া ও রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা ছিল। এ অঙ্গীকারপত্রকে বলা হতো ‘সাক’, ‘সেক’ বা “রু’কা”। এ সাক আধুনিক চেকেরই প্রতিরূপ, এরপর এ চেকের ব্যবহার বৃদ্ধি পেতে থাকে। ৯০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ একটি মজার ঘটনা জানা যায়, কোনো এক ধনী আরব এক কবির কবিতা শুনে খুশি হয়ে তাকে উপহারস্বরূপ একটি চেক প্রদান করেন। কিন্তু সেই কবি ব্যাংকে গিয়ে টাকা তুলতে গেলে চেকটি বাউন্স হয়ে যায়। কবি তখন দুঃখে একটি কবিতা লিখে ফেলেন, যার মূলকথা ছিল— এভাবে তো আমিও হাসি মুখে লাখ টাকা দান করতে পারি।

সুদে ঋণ নিয়ে বাণিজ্য করা কিংবা মূলধন হিসেবে সুদে কাউকে টাকা ধার দেয়ার বদলে মুসলিম সমাজ ভিন্ন এক উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ প্রক্রিয়ায় এক পক্ষ দিত পুঁজি, আরেক পক্ষ মাঠে কাজ করত এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ ফেরত না পেয়ে পুঁজি সরবরাহকারী কেবল লাভের একটি অংশ পেতেন। অনেক সময় শ্রমিকরাও লভ্যাংশের ভিত্তিতে কাজ করতেন। এ সময় বাণিজ্যে সততা ও সুনাম একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে। আরব মুসলমানরা তাদের সততার কারণে অন্যদের বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে অর্থ না থাকলেও স্রেফ তার সততার কারণে তাকে কোনো বাণিজ্য উদ্যোগে শামিল করা হতো। এ সততা মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চলে ইসলামের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ইসলাম বাজারকে বৈশ্বিক করে তুলেছিল এবং সেটা তারা করেছিল কোনো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা পুলিশি, কারাগারের হুমকির সাহায্য না নিয়েই। কেবল নিজস্ব সততা আর নীতিই তাদের এ বাজার প্রতিষ্ঠার মূল সহায় ছিল।

প্রাচীন দাসপ্রথা আধুনিক যুগে নেই। কিন্তু নৃতত্ত্ববিদ ডেভিড গ্রেবার মনে করেন, ‘আমাদের সমাজ যদি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে বুঝতে হবে যুদ্ধ, দখলদারিত্ব ও দাসত্বের রেশ এখনো রয়ে গেছে। ঋণ এখনো আমাদের সম্মান, সম্পত্তি ও স্বাধীনতার ধারণায় শক্তিশালী উপাদান হিসেবে রয়ে গেছে। কিন্তু সাদা চোখে প্রক্রিয়াটি দেখা যায় না।’

অর্থনীতিতে ঋণ নিয়ে নানা রকম বিতর্ক আছে। অ্যাডাম স্মিথ ও রিকার্ডো ঋণের ভূমিকা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। এরপর উনিশ শতকের মধ্যভাগে অর্থনীতিবিদরা বললেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা যথেষ্ট গণতান্ত্রিক। কারণ, এর মাধ্যমে অলস ধনীদের টাকা থেকে পরিশ্রমী, সৃষ্টিশীল অসচ্ছলরা বিনিয়োগের জন্য পুঁজির জোগান পাচ্ছেন এবং নতুন সম্পদ সৃষ্টি করতে পারছেন। এ তত্ত্ব ব্যাংকের অস্তিত্বের পক্ষে যুক্তির জোগান দেয়। কিন্তু এ পক্ষই আবার ঋণগ্রহীতার জন্য নানা রকম রক্ষাকবচ তৈরি করে, সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে সৃষ্টি হয়েছে একেবারে ভিন্ন পরিস্থিতি। সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন লুডভিগ ফন মিজেজ। তার মতে, আধুনিক সময়ে ঋণাদাতারা আর ধনী নন, আর ঋণগ্রহীতারা গরিব নন। গরিবদের নানা রকম আমানত থেকেই বরং এখন ধনীদের ঋণ দেয়া হয়। লুডভিগ লিখেছেন:

‘জনমত সবসময়ই ঋণদাতাদের বিরুদ্ধে। ঋণদাতাদের চিহ্নিত করা হয়েছে অলস ধনী হিসেবে আর গ্রহীতাদের কর্মঠ। দাতারা নিষ্ঠুর শোষক আর গ্রহীতারা শোষণের শিকার সরল মানুষ। এ ধারণা ঋণদাতাদের বিভিন্ন দাবি সরকার কর্তন করলে খুশি হয়। তারা খেয়াল করেন না, উনিশ শতকের পুঁজিবাদী বিকাশ ঋণদাতা ও গ্রহীতা শ্রেণীর গঠন পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। সেই প্রাচীন এথেন্স, রোমের কৃষি আইন ও মধ্যযুগে ঋণদাতা ছিল ধনী এবং গ্রহীতারা গরিব। কিন্তু এই বন্ড, ডিবেঞ্চার, মর্টগেজ, ব্যাংক, সেভিং ব্যাংক, লাইফ ইনস্যুরেন্সের যুগে মধ্যম আয়ের মানুষই বরং ঋণদাতায় পরিণত হয়েছে।’

ওপরের দুটি যুক্তিই দুনিয়ার বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমর্থকরা সুযোগমতো ব্যবহার করেন। সুদের ওপর জীবিকা নির্বাহকারীরা অবশ্যই বলবেন, বিধবা আর পেনশনভোগীদের বাঁচাতে ঋণ ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। টমাস ফ্রিডম্যান মনে করেন, সবাই এখন এক্সন মোবিলের হিস্যাদার। ধনীদের এখন গরিবদের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। আরেক বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখক নায়াল ফার্গুসন তার আলোচিত গ্রন্থ দি অ্যাশেন্ট অব মানি (২০০৯) গ্রন্থে বলেছেন, ‘লোভী ঋণদাতাদের শোষণের কারণেই দুনিয়ায় দারিদ্র্য টিকে আছে, এটা সঠিক নয়। বরং দরিদ্রতার কারণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান না থাকা। গ্রহীতার যখন সহজে ঋণ নেয়ার ব্যবস্থা থাকবে, তখন কেবল সে বড় হাঙ্গর ঋণদাতাদের হাত থেকে বাঁচতে পারবে। এটা সম্ভব যখন সঞ্চয়কারীরা তাদের টাকা বিশ্বাসযোগ্য কোনো ব্যাংকে রাখতে পারবে এবং সেখান থেকেই তা অলস ধনীদের পকেট থেকে পরিশ্রমী গরিবদের হাতে যাবে।’

ঋণ বলতে আমরা কী বুঝি? ফ্র্যাংকো বেরারদির মতে, ঋণ হচ্ছে ‘অ্যাক্ট অব ল্যাংগুয়েজ’, একটি ওয়াদা। আর নিওলিবারেল অর্থনীতিতে ঋণ করা এক অবশ্য প্রয়োজনীয়তায় পরিণত হয়।

ডেভিড গ্রেবার তার সুবিশাল বপুর গ্রন্থ ডেটদ্য ফার্স্ট ৫০০০ ইয়ারসের উপসংহারে বলেছেন, ‘ঋণ কী? ঋণ হচ্ছে ওয়াদার বিকৃতি। এটা হচ্ছে এমন এক ওয়াদা, যা গণিত আর সহিংসতা দিয়ে কলুষিত হয়। প্রকৃত স্বাধীনতার অর্থ যদি হয় বন্ধু তৈরি করা, তাহলে অবশ্যই সত্যিকার ওয়াদা করার সামর্থ্যও থাকতে হবে।’ গ্রেবার মনে করেন, আমাদের এমন এক দুনিয়া তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে ওয়াদা করতে পারবে, তার ওয়াদায় সহিংসতার হুমকি থাকবে না।

লেখক:শানজিদ অর্ণব

 

 

 

সূত্র: বণিক র্বাতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ