সাফল্য খুঁজতে হবে সঠিক নেতৃত্ব, মেধা আর কৌশলে

বহু প্রতীক্ষিত নির্বাচন হয়ে গেল। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মহাজোট বিপুল বিজয় লাভ করল সরকারে থেকে উন্নয়নের জয়যাত্রার সঙ্গে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করতে পেরে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি হয়ে নতুন ভোটার তরুণদের স্বপ্ন দেখাতে পেরে আর আলোকিত ও অনালোকিত নির্বাচনী কৌশল ব্যবহার করে। বিএনপি তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভূমিধস পরাজয়ের মুখে পড়েছে দেশজুড়ে নেতাকর্মীদের সংগঠিত করতে না পারায়, সরকারি চাপের মুখে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো সাংগঠনিক শক্তি না থাকায়, নেতৃত্বের দুর্বলতায়, জামায়াত নেতাদের ধানের শীষে জড়িয়ে রেখে নবীন ভোটারদের বিরাগভাজন হওয়ায়, নির্বাচনকে সহিংস করার জন্য নেতিবাচক পথ অবলম্বন করার পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ায় এবং সরকার ও সরকারি দলের কৌশল বুঝতে না পারায়।

বিএনপি ২০১৪ সালে নির্বাচনে না গিয়ে যে খেসারত দিয়েছিল সে পথে এবার আর না হেঁটে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিল। কিন্তু শপথ না নিয়ে আবার একটি বিভ্রান্তি তৈরি করল। রাজনীতিতে রাগ-ক্ষোভ আর আবেগের জায়গা নেই। ২০১৪ সালের দুর্বল নির্বাচনের পরও আন্দোলন শাণিয়ে মহাজোটকে বিপন্ন করতে পারেনি বিএনপি। আর এবার কৌশলের কাছে ধরাশায়ী বিপন্ন ঐক্যফ্রন্ট ক্ষুব্ধ হয়ে এবং মামলা করে কতদূর এগোতে পারবে?

বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্টের দাবিমতো মহাজোট ও সরকার যদি নির্বাচনে কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং করে থাকে, তবে ক্ষোভ প্রকাশ না করে আওয়ামী লীগের মতো মহাপ্রতাপশালী দলের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন গড়ে তুলে মধ্যবর্তী নির্বাচন আদায় করতে হবে। দেশের কেউ বিশ্বাস করবে না সে সক্ষমতা বর্তমান বিএনপির আছে। অন্যদিকে মহাজোট সরকার ও নির্বাচন কমিশন দৃশ্যত নির্বাচনকে অপেক্ষাকৃত ভালোভাবে সম্পন্ন করার কৃতিত্ব বিশ্ববাসীর সামনে দেখাতে পেরেছে। নির্বাচনে যেকোনো সময়ের তুলনায় সংঘাত কম হয়েছে। দেশজুড়েই ভোটারের উপস্থিতি ছিল ভোটকেন্দ্রে। দেশি-বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। ছোটখাটো অভিযোগ বাদ দিলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিজয়ী নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দিত করেছে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান অভিন্দন জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে। এসব কারণে সরকার একটি দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। ফলে এই নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেবেন না বলে ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত সাতজন যে প্রতিবাদ করে শপথ নিলেন না, এতে কার ক্ষতি হলো আর কারই বা লাভ হলো! আমাদের মতো দেশগুলোর এই চরিত্রের কথা বিশ্ববাসী জানে যে এখানে নির্বাচনে হেরে গেলে পরাজিত পক্ষ নির্বাচন বর্জন করে এবং উত্থাপন করে কারচুপির অভিযোগ। সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের আগেই এই ধারণা তৈরি হয়ে যায়।

লাভ কার হলো জানি না, তবে সরাসরি ক্ষতি হলো দল হিসেবে বিএনপির এবং জনগণের। বিএনপির ক্ষতি হলো সংসদে থেকে সরব হয়ে দলের পক্ষে, দেশের পক্ষে অন্তত কথা বলতে পারত—সে সুযোগ তারা হারাল। বাইরে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সংসদের ভেতর থেকে যে শক্তি সঞ্চয় করতে পারত সে সুযোগটি তারা গ্রহণ করল না। জনগণের ক্ষতি এই হলো যে প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের জন্য একজনও যদি ন্যায্য কথা সংসদে উত্থাপন করতে পারত, তাতে অনেক ক্ষেত্রে সংযত হতে পারত সরকারপক্ষ। এতে সংসদ অনেক বেশি কার্যকর হতো। আমরা বলব, বিএনপি অতীতের মতো আরো একটি ভুল করে বসল।

বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্টের নেতারা কি হিসাব করে বের করতে পেরেছেন তাঁদের পরাজয়ের কারণ? ধরে নিই অভিযোগমতো ভোটের ফলাফলে কারচুপি করেছে সরকারপক্ষ। যদি তা না করত, তবু কি নির্বাচনে বিজয় পেত ঐক্যফ্রন্ট? হয়তো আসনপ্রাপ্তি এর চেয়ে দ্বিগুণ বা তিন গুণ হতে পারত। হয়তো বেশ কয়েকজন প্রার্থী জামানত হারাতেন না। সংসদে তো তাঁদের সংখ্যালঘিষ্ঠই থাকতে হতো। হয়তো প্রধান বিরোধী দল হওয়ার সুযোগ থাকত। অনেকে বলবেন, কী করে আমি এমন মন্তব্য করছি?

নির্বাচন-পূর্ব এবং নির্বাচনকালীন সময়টাকে আমরা লক্ষ করতে পারি। প্রথমত, বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্টের নেতারা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছিলেন যে তাঁদের পক্ষে জনজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বাস্তবে সে জোয়ারের নমুনা আমরা কোথাও দেখিনি। দ্বিতীয়ত, বিএনপি নেতারা বলে যাচ্ছিলেন, তাঁদের কর্মীরা নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্র পাহারা দেবে। কারণ যা-ই হোক, বাস্তব ক্ষেত্রে নির্বাচনের দিন বিএনপিকর্মীদের ভোটকেন্দ্রের ত্রিসীমানায়ও দেখা যায়নি। অল্প কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির পোলিং এজেন্ট পাওয়া গেছে। কোনো কোনো কেন্দ্র থেকে ধানের শীষের পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়ার অভিযোগও আছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দেশজুড়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধানের শীষের প্রার্থীরা পোলিং এজেন্টই জোগাড় করতে পারেননি। ভোলার একজন বিএনপি নেতার ফাঁস হওয়া ফোনালাপে দেখা যাচ্ছে তিনি নিজ দলের পোলিং এজেন্ট না পেয়ে এজেন্ট হওয়ার জন্য ইসলামী ছাত্রশিবিরের ছেলেদের খুঁজছেন। বিপক্ষ দলের ভয়ে যেখানে ঐক্যফ্রন্টের হেভিওয়েট প্রার্থীরা নির্বাচনের দিন ঘরে বসে কাটিয়েছেন, সেখানে সাধারণ কর্মীরা বেরোবে কোন ভরসায়! নির্বাচনের দিন সাধারণত বিভিন্ন দলের কর্মীরা যার যার ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনা এবং নানা সহযোগিতা করার জন্য তৎপর থাকে। এবার এ চিত্র বেশির ভাগ অঞ্চলে দেখা যায়নি। তাই বলে আমি বলছি না এ ধরনের পরিবেশ কাম্য। কিন্তু এটিই বাস্তবতা বা আমাদের রাজনীতির কুসংস্কৃতি। কিন্তু আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতির ইতিহাসের দিকে তাকালে খুব কম সময়ই দেখেছি বিরোধী দলের জন্য নির্বাচনের মাঠ খুব কুসুমাস্তীর্ণ ছিল। তবে বিরুদ্ধ অবস্থা মোকাবেলার জন্য প্রতিপক্ষ সক্রিয় থাকত। নেতৃত্ব যদি সবল হয়, তবে দল অন্তপ্রাণকর্মীরা শত বাধায়ও ঘরে বসে থাকে না। আর শক্তির ভারসাম্য পরিবেশকে অনেকটা স্বাভাবিক রাখতে পারে।

দ্বিতীয়ত, নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই মহাজোটের বিজয় লাভের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হচ্ছিল। দেশি-বিদেশি জরিপেও তেমন কথা বলছিল। আর বিএনপি নেতারাও মনোবল হারাচ্ছিলেন। আমরা বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও বরকতউল্লা বুলুর ফাঁস হওয়া ফোনালাপের কথা স্মরণ করতে পারি। সেখানে একপর্যায়ে মওদুদ আহমদ বলছিলেন, ‘আমরা বড়জোর ২০-২২-৩০টা সিট পেতে পারি।’ তা ছাড়া পুরনো ধারামতে নির্বাচনের দিন প্রথমার্ধেই বেশ কয়েকজন ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করে সরে দাঁড়ান। মির্জা আব্বাসের মতো প্রার্থীরাও রাগ করে নিজের ভোট দিতে কেন্দ্রে যাননি। এ সবই ঘটেছে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতার জন্য। লড়াই না করে লড়াইয়ের মাঠ থেকে সরে আসা মোটেই বীরোচিত কাজ নয়। অথচ নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত ঐক্যফ্রন্টের নেতারা বলে আসছিলেন, তাঁরা শেষ সময় পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে থাকবেন। বড় নেতারা অবশ্য কথা রেখেছিলেন। যাঁরা বর্জন করেছেন তাঁদের প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে নেতারা জবাব দিয়েছেন এসব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তাহলেই বুঝতে হবে দলের চেইন অব কমান্ড বলতে কিছু ছিল না। আসলে বিগত ১০ বছরে যেখানে বিএনপি নেতাদের তৃণমূল পর্যায়ে দল পুনর্গঠন করার কথা ছিল, তখন নেতারা ঢাকায় বসে গত্বাঁধা বিবৃতি পাঠ করে গেছেন। একদিকে মামলা-হামলার চাপ, অন্যদিকে নেতাদের শীতঘুম বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোকে দুর্বল করে ফেলে। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া দণ্ডিত হয়ে কারারুদ্ধ হলে বিএনপি নেতাদের দুর্বলতা অনেক বেশি স্পষ্ট হয়। বরাবরের মতোই লন্ডন নেতৃত্ব তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি; যে কারণে প্রায় জনসমর্থনহীন ছোট দলগুলোকে নিয়ে যখন বিএনপি ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে তখন বিএনপি নেতারা ফ্রন্টের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে রাখতে পারেননি। বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে তা ইতিবাচক মেসেজ দেয়নি।

তৃতীয়ত, আদালতের রায়ে যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে চিহ্নিত জামায়াতে ইসলামী এরই মধ্যে নিবন্ধন হারিয়েছিল। এই দলের ২২ জনকে বর্ণচোরা হিসেবে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করে বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম। এতে বিএনপির প্রতি ক্ষুব্ধ হওয়ার কথা এবারের অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রায় আড়াই কোটি নতুন ভোটারের। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভোলানোর নানা অপকর্ম বিএনপি করেছে ক্ষমতায় থেকে। এই ভোটাররা কিশোর বয়সে সেসব ইতিহাস বিকৃতি স্কুল পাঠ্য বইয়ে পড়েছে। বড় হতে হতে সত্য উন্মোচিত হয়েছে ওদের সামনে। এ জন্য এমনিতেই ওরা বিএনপিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল। এবার আবার জামায়াতকে নির্বাচনের সুযোগ করে দেওয়াটা এই ভোটারদের বড় অংশ মানতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধ না দেখা এই প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আবেগ অনেক বেশি স্পষ্ট।

এসব বাস্তবতাকে বিচার না করে বিএনপি নির্বাচনে জিতে সরকার গঠনের চিন্তা যদি করে থাকে, তবে কি একে অলীক স্বপ্ন-কল্পনা বলা যাবে না? বিএনপি বরাবরই নেতিবাচক রাজনীতির পথে হেঁটেছে। ইতিবাচক রাজনীতি করে ক্ষমতায় আসার মনোবল যেন শুরু থেকেই হারিয়ে ফেলেছিলেন দলের নেতারা। তাই আদালতের রায় সূত্রেই বলব, ২১ আগস্টের নিকৃষ্ট গ্রেনেড হামলার দায় এই দলের ওপর পড়েছে। জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতার দায়ও জনরব অনুযায়ী বিএনপিকে বহন করতে হচ্ছে। আর ২০১৩-১৪ সালের আগুন সন্ত্রাসের কথা তো মানুষ ভুলতে পারেনি। এসবের বিরূপ প্রভাব কি ভোটের মাঠে বিএনপির ঘাড়ে পড়বে না?

আমরা ১০ বছর ধরে লিখে আসছি ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তা না করে আগে সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটানো উচিত বিএনপি নেতাদের। তৃণমূল পর্যন্ত সুসংগঠিত করা উচিত দলকে। জামায়াতের সংস্রব ত্যাগ করা উচিত। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্বকে প্রজন্মের সামনে খাটো করার বিকৃত চেষ্টা না করে এবং ১৫ই আগস্টের মর্মন্তুদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে জন্মদিনের আনন্দে ঢেকে দেওয়ার অমানবিক অপচেষ্টা না করে স্বাভাবিক রাজনীতির পথে হাঁটা উচিত। বিএনপির সৌভাগ্য দেশজুড়ে দলটির অসংখ্য নিবেদিত কর্মী-সমর্থক আছে। আর দুর্ভাগ্য তাদের পরিচালিত করার মতো যোগ্য নেতৃত্ব নেই। এই বাস্তবতাই বিএনপিকে সঠিক লক্ষ্যে কখনো পৌঁছতে দেয়নি। ভুল থেকে তো এখনো বেরোতে পারছে না। ঐক্যফ্রন্টসহ যে সাতটি আসন তাদের হাতে আছে, তাঁদের তো জনগণ ভোট দিয়েছে সংসদে গিয়ে দায়িত্ব পালনের জন্য। কিন্তু তাঁরা শপথ না নিয়ে ভোটারদের প্রতি কি অবিচার করলেন না? আমরা আশা করব, আরো বেশি ভ্রান্তি বাড়িয়ে বিএনপি দলটিকে নিঃশেষ করে দেবে না। ইতিবাচক রাজনীতির পথে হাঁটলে বিএনপি নিশ্চয়ই আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। এমন ত্রিশঙ্কু অবস্থা থেকে বেরোতে হলে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব যেমন প্রয়োজন হবে, তেমনি প্রয়োগ করতে হবে মেধা আর রাজনৈতিক কৌশল।

লেখক :এ কে এম শাহনাওয়াজ,অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

 

সূত্র:কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ