বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী

দেশে দেশে কিছু বিরল প্রতিভাবান ব্যক্তি আছেন যাঁরা ক্ষমতার বলয়ের বাইরে থেকেও সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন। সেই পঞ্চাশের দশক থেকে বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী তাঁর শিক্ষা, রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও সমাজ বিষয়ে মননশীলতার মাধ্যমে এক যুগান্তকারী রাজনৈতিক ভিত্তির সূচনা করেন। জীবনের বৃহত্তম পরিসরে তাঁর বহুমুখী কর্মকাণ্ডে দেশের ও দশের জন্য মঙ্গল বয়ে এনেছে যা তাঁর কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলেই আমরা দেখতে পাই। বাংলাদেশকে নিয়ে তাঁর সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।

কিছু কিছু মানুষ আছেন যাঁরা অনায়াসে মানুষের মনে ঠাঁই নেন পরম শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় আর মমত্বে, যাঁরা এ পৃথিবীতে নীরবে নিভৃতে কাজ করে যান কলরবমুখর প্রাঙ্গণ থেকে কিছুটা দূরে। অবিরত চলে তাঁদের কাজ। বিচারপতি চৌধুুরী তেমনই একজন ব্যক্তি। পরিশীলিত, মার্জিত এবং মহৎ উদ্যমী।

আবেগাপ্লুত হৃদয়ে আমি আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করছি এমন একজন মহান মানুষের প্রতি যাঁর হৃদয়ের ভালোবাসা আমাকে স্পর্শ করেছিল। আমার জীবনের একেবারে প্রথম প্রহর থেকে তিনি ছিলেন আমার পিতার একজন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু এক কথায় তাঁদের সম্পর্ক ছিল বড় ভাই ছোট ভাইয়ের মতো। আমি তাঁর কাছ থেকে চিরজীবন স্নেহ-ভালোবাসা পেয়ে এসেছি এবং আমার বাবার মৃত্যুর পর যে কয় বছর তিনি আমাদের মাঝে ছিলেন তাঁর মহব্বতভরা দিল আমাদের সাহস ও উৎসাহ জুগিয়েছে তেমনি তাঁর নানাধিক স্মৃতিচারণা থেকে প্রচণ্ডভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছি। তিনি আমার পিতৃতুল্য ব্যক্তি ছিলেন। আল্লাহর দরবারে তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।

বিচারপতি চৌধুরী অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ঢাকার সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্সে তাঁর ছাত্রজীবনের সূচনা। তিনি ১৯৪০ সালে বরিশাল জিলা স্কুল থেকে স্টার মার্কসসহ প্রথম বিভাগে পাস করেন এবং ইংরেজিতে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় ডি সিলভা স্বর্ণপদক লাভ করেন। এরপর তিনি কলকাতায় পড়াশোনা করেন। ১৯৪৭ সালের শেষ দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং এম এ ও এল এল বি ডিগ্রি লাভ করেন।

বিচারপতি চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ছাত্র নেতৃত্বের সূচনা থেকে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম ছাত্র সংসদের ১৯৪৮-৪৯ সালে ভিপি ছিলেন। ’৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র চার মাসের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন ছাত্রসমাজ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ভাষা আন্দোলনের স্থপতি অধ্যাপক আবুল কাসেমের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলতলায় এক প্রতিবাদ সভায় মিলিত হয়। ছাত্র নেতৃবৃন্দের মধ্যে এ সভার অন্যতম বক্তা ছিলেন আবদুর রহমান চৌধুরী। সভা শেষে বিক্ষোভ মিছিল হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে এটাই ছিল প্রথম প্রতিবাদ সভা ও মিছিল। এসব ঘটনা আলোচনার সূত্র ধরে প্রাসঙ্গিকভাবেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থেও চাচা অর্থাৎ আবদুর রহমান চৌধুরীর বিষয়ে উল্লেখ দেখতে পাই। ১৯৪৮ সালের মার্চে পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফরে এলে তাঁর সঙ্গে ছাত্র নেতৃবৃন্দের যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় সে বৈঠকে আবদুর রহমান চৌধুরী পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দেন। ওই বৈঠকে ছাত্রদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিটাও গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপিত হয়। তিনি পুনর্গঠিত ও সম্প্রসারিত প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।

১৯৪৮ সালের নভেম্বরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান পূর্ব পাকিস্তান সফরে এলে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য দাবিসংবলিত যে ঐতিহাসিক স্মারকলিপি প্রদান করা হয়, তা প্রণয়নের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল তৎকালীন তুখোড় ছাত্রনেতা আবদুর রহমান চৌধুরীর ওপর। তিনি যথার্থভাবে দায়িত্ব পালন করে স্মারকলিপি প্রণয়ন করেন। বস্তুত সে স্মারকলিপি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সামগ্রিক দাবি। এর ভিত্তিতেই আমাদের জাতীয়তা ও স্বাধিকার আন্দোলন গড়ে ওঠে।

তিনি ১৯৪৮ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছাত্র-যুব সম্মেলনে তৎকালীন পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। সম্মেলনে তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে বাংলা ভাষায় ভাষণ দেন। কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সম্ভবত এটাই প্রথম বাংলায় ভাষণ হিসেবে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। ’৫৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক যুব সম্মেলনে তিনি পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের উজ্জ্বল কর্মতৎপরতার স্বাক্ষর রাখেন। ’৪৮ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ডিবেটিং টিম ঢাকা সফরে এলে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং টিমের নেতৃত্ব দেন।

বিচারপতি চৌধুরী ১৯৫৫ সালে ঢাকা হাই কোর্টে আইনজীবী হিসেবে যোগদান করেন। ’৫৮ থেকে ’৭৩ সাল পর্যন্ত তিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেন। তিনি ১৯৬৬-’৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান হাই কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল ও ’৬৯ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

’৬৯ সালে তিনি ন্যাশনাল শিপিং করপোরেশনের পরিচালক নির্বাচিত হন। শিপিং করপোরেশনের সম্প্রসারণ ও শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সংরক্ষণে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ’৭৩ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং ’৮৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। একজন ন্যায়পরায়ণ, নির্ভীক ও তীক্ষè বুদ্ধিসম্পন্ন বিচারক হিসেবে তিনি বহু স্মরণীয় রায় প্রদান করেছেন।

বিচারপতি চৌধুরী ১৯৭৭-৭৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তখন বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়। জাপানের মতো একটি শক্তিশালী দেশকে পরাজিত করে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে বিচারপতি চৌধুরী মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।

দেশের আদর্শসচেতন বুদ্ধিজীবী, কূটনীতিক, সাংবাদিক, সাহিত্যিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী নিয়ে তিনি লিবার্টি ফোরাম প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ফোরাম সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

বিচারপতি চৌধুরী ইনস্টিটিউট অব হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্সের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট। এ প্রতিষ্ঠানটি ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টের সঙ্গে সংযুক্ত। তিনি বাংলাদেশ বসনিয়া সলিডারিট ফ্রন্টের প্রথম চেয়ারম্যান  নির্বাচিত হন।

বিচারপতি চৌধুরী আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের প্রেসিডেন্ট ও বাংলা একাডেমির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, বাংলাদেশ ডায়াবেটিস সমিতি, জাতীয় যক্ষ্মা সমিতির (নাটাব) জীবনসদস্য ছিলেন।

তিনি ১৯৯৩ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব আরবিট্রেশনে আরবিট্রেটর হিসেবে নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু পর্যন্ত ওই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

বিচারপতি চৌধুরী ১৯৯৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘কামিনী কুমার দত্ত স্মারক বক্তৃতা’ প্রদান করেন। আইন ও আইনের শাসন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সমাজবিজ্ঞানের ওপর তিনি অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন। তার লেখা বই ‘ডেমোক্র্যাসি, হিউম্যান রাউটস অ্যান্ড রুল অব ল’ ১৯৯৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশ করে। ভাষা আন্দোলনে অসামান্য অবদানের জন্য বিচারপতি চৌধুরীকে ‘প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম স্বর্ণপদক’ প্রদান করা হয়। আইন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার প্রভৃতি বিষয়ের ওপর বিচারপতি চৌধুরী এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বহু সম্মেলনে অংশগ্রহণ ও সভাপতিত্ব করেছেন। একজন আইনজীবী হিসেবে, একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে, সবসময়ই একজন বাগ্মী হিসেবে, একজন অভিভাবক হিসেবে বিচারপতি চৌধুরী ছিলেন ক্ষুরধার ব্যক্তিত্বের প্রজ্ঞায় উজ্জ্বল, আকর্ষণীয় এবং অনন্যসাধারণ। তিনটি কাল তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। ব্রিটিশ যুগ, পাকিস্তান যুগ ও বাংলাদেশ যুগ। কলিকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র থাকাকালে ১৯৪৬ সালে তিনি মুসলিম লীগের গণভোটের সংগঠক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

পারিবারিক দিক নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম ধনাঢ্য-বনেদি-সংস্কৃতিমনা-সমাজসচেতন-উলানিয়ার জমিদারবাড়ির সন্তান হিসেবে তিনি বেড়ে উঠলেও পারিপার্শ্বিকতাবোধ, সামাজিক দায়িত্ব ও মানবিক অনুভূতি কখনো তার ব্যক্তিত্বের ভারিক্কিকে আচ্ছন্ন করেনি। সহজ-সরল, বুদ্ধিদীপ্ত, বাকচাতুর্যে তিনি সবাইকে সম্মোহিত করতে পারতেন। আমাদের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা নির্মাণ, রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার প্রতিটি ধারার সঙ্গে বিচারপতি চৌধুরীর সংযোগ ছিল ঘনিষ্ঠতর। বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী ১ ডিসেম্বর, ১৯২৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১১ জানুয়ারি, ১৯৯৪ সালে ৬৭ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

লেখক : আবুল হাসান চৌধুরী,সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী,গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

 

 

 

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ