সংসদ নির্বাচন নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ

মানুষের কিছু প্রাথমিক প্রেরণা বা আবেগ (প্রাইমারি ইমপালসিভ) থাকে। যেমন কেউ অন্যায় করলে আরেকটি অন্যায় দিয়ে তাকে প্রতিহত করা। খুনের বদলে খুন, প্রতিশোধ অথবা কাউকে ফাঁসি দিয়ে দেয়া। এসব প্রাইমারি ইমপালসিভ থেকে বের হয়ে সার্বিক কল্যাণের জন্য যে কাজটি হয় সেটাই সভ্যতা, সেটাই সুন্দর। সেটাকেই বলি মানবতা। খুনের বদলে খুন, হত্যার বদলে হত্যা বা চোখের বদলে চোখ কিংবা রক্তের বদলা রক্ত— এসব অন্য যা-ই হোক সভ্যতার নিদর্শন কিন্তু নয়। মানুষ আর পশু— দুই জাতির মধ্যে তুলনামূলক বিচারে মানুষকেই শ্রেষ্ঠ বা উত্তম বলা হয়। একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায়, হিংস্রতায় মানুষ পশুকেও হার মানায়। মানুষ যদি পাশবিক হয় তাহলে পশুকেই মানবিক বলা দরকার। আমরা মানুষ পাশবিক বা পৈশাচিক হব নাকি পশু মানবিক হবে?

বাংলাদেশের সুন্দরবনে এবং নানা ঝোপ-জঙ্গলে যত পশু বা জন্তু-জানোয়ার আছে, তারা যতটা ভয়ঙ্কর মানবসমাজের জন্য, মানুষ তার চেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর ও পাশবিক নিজেদের প্রাইমারি ইমপালসিভের তাড়নায়। এটা সমাজের সার্বিক কল্যাণে এক ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে নিচ্ছে। রাজনীতিতেও এ প্রবণতা দেশে-বিদেশে বাড়ছে। এ বিষয়ে সচেতন ও মানবিক মূল্যবোধ দুটোর ব্যাপারেই সূক্ষ্ম চিন্তা এখন গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ, রাষ্ট্র ও এর নানা কার্যকরী প্রতিষ্ঠানে দুর্বৃত্তায়ণ, দুর্নীতি, অন্যায়, অবিচার কমছে না। এটাকে এক ধরনের মানসিক মুনাফার সন্ত্রাস বলা যায়।

সারা বিশ্বে যে পুঁজিবাদী রাজনীতি এবং এর সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিজয় বা উৎসব, এর পেছনে সক্রিয় এক প্রকার মুনাফা লাভের অসম প্রতিযোগিতা এবং সন্ত্রাসী মনোভাব। আধুনিক সমাজের অনেক বাস্তবতা অনেকের মতে সময়, স্পেস এবং এসবের কনট্রাস্ট বা ডাইমেনশন। নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থপরতা আমাদের মানবিক সংবেদনশীলতার মৃত্যু ঘটাচ্ছে। এমনই এক অন্ধকারের পথে হাঁটছি স্বাধীনতা-উত্তর থেকে। নানা রকম তত্ত্ব, উপাত্ত বা যুক্তি দিয়ে অনেকেই আমরা এ চলাকেও সময় ও বাস্তবতা বলতেই পারি। যাই বলি না কেন, সেটা আমাদের চরিত্রের শুধু প্রাইমারি ইসপালসিভ; সভ্যতা না, বর্বরতা।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর গণতান্ত্রিক পথে চলার প্রত্যয়ে আমাদের নির্বাচন মহড়া বা নাটক, যা আমরা দেখেছি এবং দেখলাম। এর আরেকটি অধ্যায় শেষ হলো ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮। এ নির্বাচন নিয়ে গত কয়েক মাসের অনেকের নানা আলোচনা-সমালোচনা, সম্ভাবনা, বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবনাচিন্তা বা হিসাব সফল হয়নি। নেতিবাচক আচরণের কাছে সভ্যতা, মানবতা ও চক্ষুলজ্জাও হেরে গেছে। এটা ভালো হলো, না খারাপ— এ ব্যাপারে উপসংহার দেয়ার সময় আসেনি। তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হলো, পুঁজিবাদী অর্থনীতির অবকাঠামোয় বিকশিত বাহ্যিক উন্নতি যে মুনাফাকে লক্ষ্য করে অগ্রসর হয়, বর্তমান কালের নির্বাচন সেই প্রক্রিয়ার একটি অংশ। এটা ওয়াল স্ট্রিট মার্কেটের মতোই ওঠানামা করে, এর অংশীদার বা স্টেকহোল্ডারদের স্বার্থের অনুকূলে কাজ করে।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে কথা, বোধ, প্রযুক্তি এবং এর ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু মানবচরিত্রের পরিবর্তন হয়নি। বাহ্যিক বা দৃশ্যত ডেভেলপমেন্ট বা উন্নতি সমাজের কোনো স্ট্রাকচারাল পরিবর্তন ঘটায়নি। এ স্ট্রাকচারাল উন্নতি বলতে সমাজের বিভিন্ন স্ট্রাটিফিকেশনের বিভাজন, উঁচু-নিচু স্তরের অবকাঠামো এবং এর নানা বিভাজনকে উপেক্ষা করা যায় না। সমাজ বা রাষ্ট্রের উন্নতিতে সমাজের অভ্যন্তরীণ গঠন এবং এর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় সার্বিক অর্থে মানুষের নৈতিকতা, মানবিকতা, সুশাসন ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা না পেলে অর্থনৈতিক উন্নতি অর্থহীন। এতে সমাজ ও রাষ্ট্রে শোষণ বৃদ্ধি পায়, অন্যায় ন্যায় হয়। প্রতিক্রিয়াশীলদের শক্তি ও নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি পায়। এখন পর্যন্ত আমাদের প্রায় প্রতিটা রাজনৈতিক গতিপ্রবাহ প্রতিক্রিয়াশীল ও কর্তৃত্বায়নের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। এটাই টাইম, স্পেস ও ডাইমেনশনের বাস্তবতা কিনা। তাহলে কি আমরা ধরে নেব সততা, মানবতা, নৈতিকতা এসব আদর্শিকতা (আইডিয়ালিজম) বাস্তবতার বন্ধু নয়, শত্রু? বিশেষজ্ঞরাই বলতে পারবেন। তাহলে কি অনেকের মতোই বলব, নেতৃত্বে আইডিয়ালিজম থাকা ভালো, তবে সেটা বাস্তবতার পথে অন্তরায় হলে ভিন্ন বাস্তবতাই অধিক আইডিয়াল নেতৃত্বের কাছে? যেখানে রিয়ালিটিকেই বলা হবে ইট ইজ মোর আইডিয়াল দ্যান আইডিয়ালিজম অ্যালোন? হ্যাঁ বলা যায়, যুক্তিতর্কও করা যায় পক্ষে-বিপক্ষে। কিন্তু সততা ও সুশাসনকে বন্দি করে কেবল উন্নতি কিসের এবং কার উন্নতিকে নিশ্চিত করবে বা করে।

অনেকেই জানেন, ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ বলে একটা কথা ও তত্ত্ব প্রচলিত আছে। এটা বাহ্যিক উন্নতির পাশাপাশি সমগুরুত্বপূর্ণ বলেও অনেকেই মনে করেন। সামগ্রিক জাতীয় বা ‘জিএনএইচ’ গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস ভুটানের সরকারকে নির্দেশ করে। এটা জনসংখ্যার যৌথ সুখ ও সুনাম পরিমাপের জন্য ব্যবহার হয়। ভুটান সরকার মনে করে, কেবল মোট জাতীয় সম্পদ ও গড়পড়তা সম্পদ বাড়লেই জনগণ শান্তি পাবে না; যদি না সেই সমাজের মানুষের মনে সুশাসন, শোষণমুক্তি এবং এর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হয়। এ নিশ্চয়তা অর্জনের পক্ষে জিএনএইচের চারটি প্রাথমিক স্তম্ভের কথাও বলা হয়। যেমন ১. টেকসই ও ন্যায়সঙ্গত সামাজিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ২. পরিবেশ সংরক্ষণ, ৩. সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও প্রচার, ৪. সুশাসন। জিএনএইচ গুরুত্ব দেয় নাগরিকের মানসিক সুস্থতা, স্বাস্থ্য, সময় ব্যবহার, শিক্ষা এবং সব সম্প্রদায়ের নিরাপদ জীবন— এ প্রতিটা ক্ষেত্রে নাগরিকের মানসিক ও আত্মিক শান্তি অর্জনে। এ তত্ত্ব বিশ্বাস করে যে কেবল অর্থনৈতিক প্রগতির ব্যাপকতা নাগরিকের জীবনকে শান্তি দিতে পারে না। সেই জিডিপিই কেবল অগ্রাধিকার ও গুরুত্ব পেলে সমাজে জিএনএইচ উপেক্ষিত হয়। আমাদের রাজনীতির নানা জয়-পরাজয়। নির্বাচন, এর কোথাও জিএনএইচ বৃদ্ধি বা অর্জনের বিষয়ে কতটা আমরা ত্যাগী, সৎ ও দায়িত্ববানের পরিচয় রাখতে পেরেছি গত চার-পাঁচ দশকে? ২০১৮-এর একাদশতম জাতীয় নির্বাচন এবং এর ফলাফল নাগরিকের সার্বিক সুখকে নিশ্চিত রাখবে কিনা আগামী পাঁচ বছর— দুশ্চিন্তা ও ভয় দুটোই আছে। কেন এ দুশ্চিন্তা ও ভয়। কারণ বহুবিধ। সংক্ষেপে কয়েকটিকে নির্দেশ করতে এবং সমাধান কী বলার চেষ্টা করব। এ প্রসঙ্গে বলতে বা স্বীকারও করতে হয়— ১. যে সমাজের ওপর পাশ্চাত্য প্রভাব বেশি, তার নিজস্ব ধর্ম অর্থে স্বতন্ত্র চিন্তা লোপ পায়। ধার করে পোলাও খেয়ে সুখ, সুখ পরিতৃপ্তি হয়। আবার এ রকম সমাজে প্রায়ই ইতিহাসের অপ্রিয় সত্যকে অসত্য ও ভিত্তিহীন বলে প্রচার করে স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা থেকে দূরে সরে যায় নাগরিক। এতে সমাজের অভ্যন্তরে, এর বিভিন্ন সামাজিক স্তরবিন্যাসে অপরাধের বৈধতার বিকাশ ঘটে। জীবন আলোকিত হতে থাকে কেবল চমকের দৃশ্যে। অর্থনীতি বেলুনের মতো বড় দেখা যায়, যার ভেতরে কেবলই বাতাস।

আমাদের বড় জাতীয় সংকট ও সমস্যার আরেকটি দোদুল্যমানের ক্ষেত্র জাতীয়তা নিয়ে বিভেদ। স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছরে এসেও এ বিষয়ে এখনো আমরা জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি। আমাদের রাজনীতির বিভাজন ও অনৈক্য এ কারণেও বর্তমান। জাতি হিসেবে আমাদের আত্মপরিচয় নিয়ে আছে দ্বন্দ্ব— আমরা কী বা কে। একসময় নিজেদের ভারতীয় বলতাম। বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হওয়ার পর হলাম বাঙালি। তারপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, বাংলাদেশী। অনেকে জাতীয়তা বললে বলি হয় হিন্দু নয় মুসলমান। কিন্তু হিন্দু বা মুসলমান যার যার ধর্মবিশ্বাস ও সম্প্রদায়যুক্ত ভাবনা। কেবল জাতীয় পরিচয় কী? ৩. বৈষম্য ও বিতর্ক আছে শিক্ষা ব্যবস্থা এবং এর চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়েও। গত পাঁচ দশকে এ বিষয়ে আমাদের বৃহত্তর কোনো ঐকমত্য কোনো রাজনৈতিক শ্রেণী বা দল সুস্পষ্ট করতে পারিনি। শিক্ষাটি হবে কেবলই ভোগের না সেবার? ৪. পরিবারমুখী বা পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি আমাদের অতীতমুখী করছে। ৫. বহুধারায় বিভক্ত মধ্যবিত্তের আর্থিক ও মনস্তাত্ত্বিক দুর্নীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এ সবকিছুর সমাধানে সার্বিক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা ও প্রতিপালন জরুরি। উল্লিখিত সমস্যার সমাধানে প্রথম পদক্ষেপ দুঃখজনক হলেও বলতে হবে সমাজে স্বশাসন কোনো সুশাসনের বিকল্প নয়। যে পথে আমরা হাঁটছি, যে পথে ২০১৮-এর ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ফলাফল দেখছি, দুটোই চিন্তার বিষয়। চিন্তার বিষয় মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি মানবিক ও সর্বজন ঐকমত্যের দর্শনে আমরা বিভেদের রেখা টেনে দিয়েছি শুধু রাজনৈতিক দলীয় স্বার্থের কারণে। নিজেদের মূল্যবোধ ও ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠার মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে চলে গেছে আজকের সমাজ ও রাজনীতি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শত্রু এখন কমবেশি আমরা সবাই নিজেদের প্রিমিটিভ চিন্তা এবং কিছু চারিত্রিক প্রাইমারি ইমপালসিভের কারণেও।

সম্প্রতি ইয়েমেনের স্বৈরশাসনের বিপক্ষে এর বিপ্লবী সংগঠনের নেতা মোহাম্মদ আনহাউসি আল জাজিরায় তার এক সাক্ষাতে বলেছেন, ‘আমরা সার্বিক ঐকমত্যের একটি গণতান্ত্রিক ইয়েমেন দেখতে চাই।’ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি সুরক্ষায় একটি বৃহত্তর ঐকমত্যের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজই মুক্তিযুদ্ধ, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার সপক্ষে থাকবে। শক্তি প্রয়োগ, দুঃশাসন, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দলীয়তন্ত্র বা মন্ত্র সততা ও ন্যায়পরায়ণতা, কোনোটারই বিকল্প নয়। মুক্তিযুদ্ধ যে আদর্শের পক্ষে এবং বৈষম্যের বিপক্ষে ছিল, সেটার যুদ্ধ এখনো চলছে।

মোটাদাগে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত আদর্শ ও ভাবনা এখনো ভীষণভাবে ভূলুণ্ঠিত এবং পরাজিত। প্রচলিত রাজনৈতিক স্বার্থের লড়াইয়ে ৩০ ডিসেম্বর একাদশতম ভোটের রাজনীতিতে ভিন্ন ফলাফল হলে সেটাও কোনো সুসম্ভাবনার দিক উন্মোচন করত কিনা, তা-ও বলা কঠিন।

লেখকমাহমুদ রেজা চৌধুরী,রাজনীতি বিশ্লেষক

 

 

সূত্র: বণিক র্বাতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ