জনতুষ্টবাদী নেতাদের উত্থান ও বৈশ্বিক রাজনীতির গতিমুখ

বিগত সময়ে অনুষ্ঠিত বড় বড় দেশের কয়েকটি নির্বাচন বিশ্বের জন্য অশনিসংকেত। এসব নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন পুরো দুর্নীতিপ্রবণ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা (এস্টাব্লিশমেন্ট) ভাঙার অঙ্গীকারকারী, সমরপ্রিয়, সংখ্যালঘু নিষ্পেষণকারী এবং মিডিয়া দমনকারী জনতুষ্টবাদী কিছু নেতা; রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণের মাধ্যমে যারা দেশে দেশে গভীর বিভাজন সৃষ্টি করেছেন। না, আমি ২০১৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা বলছি না, অধিকন্তু ব্রাজিলে ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী তথাকথিত ট্রাম্প অব ট্রপিকস-খ্যাত জায়ের বোলসোনারোর কথাও বলছি, যিনি নতুন বছরের ১ জানুয়ারি দেশটির ক্ষমতায় আরোহণ করেন।

সম্ভবত বলসোনারো ট্রাম্প, হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান এবং পোলিশ নেতা জ্যারোস্লো ক্যাকজিয়ানস্কির (যিনি বিদ্যমান পুরো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ভাঙার এবং পদ্ধতিগত দুর্নীতি অবসানের প্রতিশ্রুতিতে জয়ী হয়েছিলেন) মতো তথাকথিত রূপান্তরকামী নেতাদের গ্রুপভুক্ত হবেন। তবে কি একইভাবে এদিক থেকেও তিনি ট্রাম্প, অরবান ও কিছুটা ক্যাকজিয়ানস্কির কাতারে যোগ দেবেন, যারা নতুন ধরনের দুর্নীতির বিস্তার রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলে শাসন ব্যবস্থায় নিজেদের ক্ষমতা সংহতকরণের চেষ্টা চালাচ্ছেন?

অব্যাহতভাবে ‘আবর্জনা সাফের’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সম্ভবত দুর্নীতির মাত্রা একটি নজিরবিহীন পর্যায়ে উন্নীত করেছেন, যা ফেডারেল আমলাতন্ত্রের বিপুলাংশকেও আচ্ছন্ন করেছে। বাজেট উপেক্ষা করে, প্রতিষ্ঠিত আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও প্রটোকল এবং কূটনীতিকদের পাশ কাটিয়ে তিনি ওপেন পজিশন পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রধানত সেনাবাহিনীকে দূরে রাখার নীতি নিয়েছেন ট্রাম্প, যদিও এখানে তিনি বারবারই নিজের ক্ষমতার পক্ষে ঊর্ধ্বতন কমান্ডারদের বিশেষায়িত জ্ঞান ব্যবহারের মাধ্যমে সেনা নৈতিকতাকে কলঙ্কিত করেছেন।

অভিজ্ঞতা বলে, রাষ্ট্রযন্ত্র (স্টেট অ্যাপারেটাস) বিকল করা হলে সুশাসন অধিকতর অনানুষ্ঠানিক, নীতি অধিক ব্যক্তিকেন্দ্রিক, নির্বাহী ক্ষমতা আরো আধিপত্যশীল এবং নেতার প্রতি আনুগত্য আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ট্রাম্প আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা হিসেবে তার পরিবারের সদস্যদের বসিয়েছেন, আনুগত্য তদারকির জন্য জ্যেষ্ঠ অর্থায়নকারীদের এজেন্সিতে স্থান দিয়েছেন এবং গত অর্ধশতকের ইতিহাসে ক্ষমতায় আরোহণের প্রথম বছরে যেকোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশি নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের নিয়োগকৃত কর্মীদের মাত্রাছাড়া স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ছদ্ম লবিস্ট, অনিবন্ধিত প্রভাবক/কূটনীতিকদের (দালাল) জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যারা বড় বড় করপোরেশন এমনকি বিদেশী সরকারগুলোর সঙ্গে নিজেদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, ট্রাম্পের অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা নিউট গিংরিচ স্বাস্থ্যসেবা কোম্পানিগুলো ও মর্টগেজ জায়ান্ট ফ্যানি মেইর পক্ষে তদবির করেছিলেন। ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা মাইকেল কোহেনকে পরামর্শের জন্য এটিটি অ্যান্ড টি ও নোভার্টিসের মতো করপোরেশন থেকে অর্থ প্রদান করা হয়েছিল। সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা পরামর্শক মাইকেল ফ্লিন ও ট্রাম্প ক্যাম্পেইন চেয়ারম্যান পল ম্যানফোর্টের বিরুদ্ধে রাশিয়া ও তুরস্কের সঙ্গে তদবির করার অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে।

এবার আসুন যাকে আমি বলি ছদ্ম অভিজাত (শ্যাডো এলিট) তাদের কথায়। বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার পক্ষে এ কুশীলবরা সরকারি ও ব্যক্তি পরিসরের মধ্যে যুক্ত অস্বচ্ছ এবং পুরোপুরি উন্মোচন না হওয়া ভূমিকা পালন করেন। উদাহরণস্বরূপ প্রতিরক্ষা পরামর্শক বোর্ডে বসা অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ও অ্যাডমিরালরা নিজেদের কনসাল্টিং ফার্ম কিংবা কর্মরত ডিফেন্স কোম্পানির জন্য সেনা সম্পর্ক (মিলিটারি কনট্যাক্ট) ব্যবহারে তথ্য উন্মুক্তকরণের জন্য ডিফেন্স এজেন্ডা গঠনে সাহায্য করতে পারেন।

একইভাবে ট্রাম্পের নিয়োগকৃত কর্মকর্তাদের প্রায়ই শিক্ষা, অর্থ এবং বিশেষ করে জ্বালানি খাতসহ ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এমন শিল্পের সঙ্গে থাকে গভীর সম্পর্ক; যদিও তাদের কাজ আপাতভাবে নিজস্ব এজেন্সিগুলোর প্রতি দ্বন্দ্বমূলক মনে হয়। এমনকি খোদ প্রেসিডেন্টই নিজের কার্যালয়ে ‘ট্রাম্প ব্র্যান্ডের’ উত্তাপ ছড়িয়েছেন। ট্রাম্প নিজস্ব ব্যবসা থেকে নিজেকে বিযুক্ত রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং তার নেয়া সিদ্ধান্তগুলো (আনুষ্ঠানিক কিংবা অন্য কোনো ধরনের) স্পষ্টভাবে এর বটম লাইনকে প্রভাবিত করেছে।

এটা সত্য, আমেরিকান গণতন্ত্র এখনো তুলনামূলক সুরক্ষিত এবং ট্রাম্প প্রশাসন বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের দিক থেকে (উভয় প্রতিষ্ঠানকে তিনি অব্যাহতভাবে আঘাত করেছেন) তাত্পর্যপূর্ণভাবে প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। অরবানের অধীনে হাঙ্গেরি (ট্রাম্পের অনুসারী বিশ্বনেতাদের প্রথম কয়েকজনের অন্যতম) কিংবা জ্যারোস্লো ক্যাকজিয়ানস্কির অধীনে পোল্যান্ডের ক্ষেত্রেও এমনটি হওয়া সম্পূর্ণ অভিনব ঘটনা নয়। ট্রাম্প যেখানে সরকার দুর্বল করার মাধ্যমে দুর্নীতির পথ সহজতর করেছেন, সেখানে অরবান ও ক্যাকজিয়ানস্কি নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি, নীতি বদলানো এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কুক্ষিগত করায় দৃষ্টি দিয়েছেন।

এদিকে হাঙ্গেরিতে অরবান অনুরাগী বা সমর্থকদের কয়েকটি স্বাধীন সরকারি তদারকি সংস্থার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বিচার বিভাগকে কব্জায় রেখে অরবান নিজের মতো করে সংবিধান সংশোধনের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। কিছু প্রাতিষ্ঠানিক বাধা অবশিষ্ট রেখে ওয়াচডগ সংস্থা ফ্রিডম হাউজের ভাষায় পুরো দেশে তিনি সৃষ্টি করেছেন একটি ব্যাপকতর বিচারহীন দুর্নীতির পরিবেশ।

২০১০ সালের নির্বাচনে অরবানের ফিডেজ পার্টি যখন বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিল, তখন তিনি ঘোষণা করেছিলেন— এটি এক ‘বিপ্লবের’ দিন; কেননা হাঙ্গেরির জনগণ গোষ্ঠীতন্ত্রের (অলিগার্ক) শাসন বিতাড়ন করেছে, যারা অব্যাহতভাবে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। যদিও অরবান নতুন প্রজন্মের এক গোষ্ঠীতন্ত্রের উত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তবু তিনি ভিন্নতর কিছু দেখাতে পারেননি। বলতে গেলে, অরবান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে স্বজনপ্রীতির নজির স্থাপন করেছেন। তিনি ব্যক্তিগত বন্ধুবান্ধব ও রাজনৈতিক মিত্রদের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সম্পদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে পলিটিক্যাল ইনসাইডারদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের হিসাব অনুযায়ী, হাঙ্গেরির ৭০ শতাংশ সরকারি সংগ্রহ প্রক্রিয়া (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট) এখন দুর্নীতি দ্বারা সংক্রমিত। সম্ভবত এ দুর্নীতির ক্ষতি জিডিপির ১ শতাংশের কাছাকাছি। হাঙ্গেরির নিজস্ব সম্পদের বাইরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ছাড়কৃত অর্থের কয়েক বিলিয়ন ইউরো অরবান তার অনুসারীদের দিয়েছেন, যার অন্তত অর্ধাংশ এখন পরিশোধ করতে হচ্ছে।

হাঙ্গেরির ক্ষমতা কেন্দ্রের হোতাদের সবসময় নিজের পক্ষে রাখা যেন অরবানের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। এ লক্ষ্য পূরণের পরিকল্পনা নিয়ে তিনি অনেকদিন ধরে কাজ করে আসছেন। উদাহরণস্বরূপ, অরবান সমর্থক একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী (অলিগার্ক) আঞ্চলিক সংবাদপত্র শিল্পের বাজারের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে।

পোল্যান্ডের বাস্তবতাও হাঙ্গেরির চেয়ে ভিন্ন নয়। বর্তমানে সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক পদে না থাকা জ্যারোস্লো ক্যাকজিয়ানস্কি নেতৃত্বাধীন পোল্যান্ডের ক্ষমতাসীন ’ল অ্যান্ড জাস্টিস (পিআইএস) পার্টিও একইভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অবরুদ্ধ করে রেখেছে। ফিডেজের মতো পিআইএস নিজেও একটি দুর্নীতিবিরোধী দাওয়াই হাজির করেছিল, যেটি ২০১৫ সালের নির্বাচনে দলটিকে চূড়ান্ত বিজয়ে সাহায্য করেছিল। তবে কর ফাঁকি রোধের মতো কিছু ন্যায্য দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ নিলেও একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করেছে দেশটির সরকার। ফলে দেশটিতে দুর্নীতিবিরোধী এজেন্ডা যেন অনেকটা কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতা সংহতকরণের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

এদিকে পিআইএস আমলাতন্ত্র (বেসামরিক প্রশাসন), বিচার বিভাগ ও মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা চালিয়েছে। পিআইএস ক্যারিয়ার পেশাজীবীদের বের করে দেয়ার জন্য সিভিল সার্ভিস আইন পরিবর্তন করেছে। তাদের স্থলে বসিয়েছে তার অনেক অনুসারী ও সমর্থকদের। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন কোম্পানির প্রধানদেরও গণহারে অদলবদল করেছে।

ন্যূনতম জবাবদিহিতা নিয়ে জ্যারোস্লো ক্যাকজিয়ানস্কির আস্থাভাজন অনুসারীরা পোল্যান্ডে এখন প্রধান সিদ্ধান্তগুলো নেয়। একটি ব্যাংকিং কেলেঙ্কারি তদন্তের বিষয়টি এখানে উল্লেখ করা হয়। আলোচ্য কেলেঙ্কারি তদন্তে যুক্ত এক শীর্ষ নিয়ন্ত্রকের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যাংকারের কাছ থেকে ঘুষ নেয়ার ঘটনা পিআইএস ও ক্যাকজিয়ানস্কি সমর্থিত প্রভাবশালীদের যুক্ততার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে তাদের অপকর্মের ফলে সৃষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতির বিষয়টিও তুলে ধরে।

ছয় হাজার মাইল দূরের ব্রাজিলে সদ্য ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বলসোনারোর ভাষ্যেও পূর্বোক্ত নেতাদের একই প্রতিধ্বনি শোনা গেছে, যিনি অঙ্গীকার করেছেন, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তির নেতৃত্বে সরকারি বিভাগগুলো পরিচালিত হবে না। অন্যত্র থাকা প্রতিরূপ জনতুষ্টিবাদীদের কর্মকৃতি বিবেচনায় ব্রাজিলের জনগণের অবশ্য বলসোনারোর আলোচ্য ভাষ্যে খুব একটা আশান্বিত হওয়া উচিত নয়।

লেখক:জেনিন আর. ভিদাল

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

 

 

সূত্র:বণিক র্বাতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ