দূষিত হচ্ছে সমুদ্রের নীল জল

পর্যটন মৌসুমের শুরু থেকেই দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিনে বেড়েছে অতিরিক্ত মানুষের চাপ। এখন তিনটি প্রমোদতরি ও ১০টির বেশি কাঠের ট্রলার নিয়ে প্রতিদিন সেন্ট মার্টিন যাচ্ছেন ৩ হাজারের বেশি পর্যটক। গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ছয়টি প্রমোদতরি ও ৩০টির বেশি কাঠের ট্রলার নিয়ে প্রতিদিন সেন্ট মার্টিন গেছেন ৭ হাজারের বেশি পর্যটক। কয়েক দিনের মধ্যে পুরোদমে ছয়টি জাহাজ পুরনায় চালু হলে লোকসমাগম বেড়ে যাবে। প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এই দ্বীপে এভাবে লোকসমাগম বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বিগ্ন পরিবেশ অধিদপ্তর।

গতকাল রোববার সকালে টেকনাফের দমদমিয়া জেটিঘাট থেকে সেন্ট মার্টিনে গেছে তিনটি  জাহাজ। এর মধ্যে কেয়ারি সিন্দাবাদে ৬৬৩, এমভি ফারহান ক্রুজে ৫৪৩ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গ্রিন লাইন-১ জাহাজে ১১০ জন যাত্রী ছিলেন।

জাহাজ কর্তৃপক্ষ জানায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চার দিন আগে জাহাজ চলাচল বন্ধ ছিল। নির্বাচনের পর পর্যটকেরা ভ্রমণে আসছেন কম। এখন ধারণক্ষমতার কম যাত্রী নিয়ে তিনটি জাহাজ সেন্ট মার্টিন যাচ্ছে। যাত্রী না থাকায় এলসিটি কাজল ও বে ক্রুজ নামে দুইটি জাহাজ ঘাটে পড়ে আছে। তবে কয়েক দিনের মধ্যে পর্যটকের আগমন বেড়ে যাবে। তখন ছয়টি জাহাজ চলাচল করবে। এ ছাড়া গতকাল তিনটি জাহাজের বাইরে ১০-১২টি কাঠের ট্রলারে করে সেন্ট মার্টিন গেছেন আরও কয়েক শ যাত্রী।

গত অক্টোবর থেকে সেন্ট মার্টিন-টেকনাফ নৌপথে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়। চলবে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ১ মার্চ থেকে সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের রাতযাপনের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি করা আছে।

পরিস্থিতি দেখতে গত ১৬, ১৭ ও ১৮ নভেম্বর সেন্ট মার্টিন অবস্থান করে পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি দল। এ সময় তাঁরা পর্যটকবাহী প্রমোদতরি (জাহাজ) চলাচল, লোকজনের বিচরণ, দ্বীপের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সমুদ্রতলের প্রবাল, শামুক-ঝিনুক নিয়ে অনুসন্ধান করেন।

দলের সদস্য ও পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী পরিচালক সাইফুল আশ্রাব বলেন, তখন ছয়টি প্রমোদতরি ও ৩০টির বেশি কাঠের বোটে করে দিনে ৭ হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন ভ্রমণে গেছেন। বেশির ভাগ পর্যটক সেখানকার ১০৬টি হোটেল-কটেজে থাকেন। কোনো হোটেলে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নেই। হোটেল বর্জ্য চলে যাচ্ছে সমুদ্রে। এতে সমুদ্রের স্বচ্ছ নীল জল ঘোলাটে হচ্ছে। প্রমোদতরির ইঞ্জিনের পাখার (প্রপেলার) কারণে সমুদ্রের তলদেশের বালু পানিতে মিশে প্রবালের ওপর জমে আস্তরের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে বিশাল প্রবাল এলাকা মরে যাচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, অনুসন্ধান দলের সদস্যরা তিন দিনে সেন্ট মার্টিনের তিন দিকের প্রবাল আস্তর থেকে বিপুল পরিমাণ পলিথিন, নৌকার মাছ ধরার জাল, প্লাস্টিক বোতল, ক্যান ও সিগারেটের উচ্ছিষ্ট উদ্ধার করেছেন। দ্বীপের তিন দিকের কয়েক শ একর প্রবাল এলাকায় বালুর আস্তর জমে থাকতে দেখেছেন তাঁরা।

এ ছাড়াও সৈকত থেকে লোকজনকে শামুক-ঝিনুক আহরণ করতে দেখা গেছে। লোকসমাগমের কারণে গভীর সমুদ্র থেকে ডিম পাড়তে আসা ক্লান্ত ও দুর্বল মা কচ্ছপগুলো সৈকতে উঠতে পারছে না। ক্রমান্বয়ে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন সেন্ট মার্টিন মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে।

অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে সরকার। দ্বীপটিতে ১৫৪ প্রজাতির শৈবাল, ১৫৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৬৮ প্রজাতির প্রবাল, ১৯১ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১০ প্রজাতির কাঁকড়া, ৬ প্রজাতির প্রজাপতি, ২৩৪ প্রজাতির মাছ, ৪ প্রজাতির উভচর ও ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে। দ্বীপে ৭৭ প্রজাতির স্থানীয় পাখি, ৩৩ প্রজাতির পরিযায়ী পাখিসহ মোট ১১০ প্রজাতির পাখি ও ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ছিল। এখন অনেক বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, দ্বীপের প্রবাল, শামুক-ঝিনুকসহ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। হোটেল বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে সমুদ্রের স্বচ্ছ নীল জল। আর সৈকতে কোলাহল বৃদ্ধি পাওয়ায় গভীর সমুদ্র থেকে ছুটে আসা মা কচ্ছপও ডিম দিতে পারছে না।

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন কক্সবাজারের (টুয়াক) সভাপতি তোফায়েল আহমদ বলেন, সেন্ট মার্টিনকে রক্ষার বিষয়ে টুয়াক দ্বীপে সচেতনমূলক কাজ করছে। অতিরিক্ত লোকসমাগম নিয়ন্ত্রণ করতে হলে কাঠের বোট চলাচল বন্ধ করতে হবে। সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের রাতযাপনের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে পুরো কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের প্রভাব পড়বে। তখন ৪০ হাজার পরিবার বেকার হয়ে পড়বে।

সেন্ট মার্টিন ইউপি চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন, আগে দৈনিক ১৫ হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন আসতেন। এখন দেড় হাজার। তবে কিছু দিনের মধ্যে লোকসমাগম বেড়ে যাবে। আগের মতো এখন যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনাও ফেলা হচ্ছে না।

সেন্ট মার্টিন হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, ‘দ্বীপ ভ্রমণে আসা পর্যটকদের আমরা সচেতন করছি। তাই প্রবাল, শামুক-ঝিনুক আহরণ অনেক কমে গেছে। তবে পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারি উদ্যোগ দরকার।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ৫৯০ হেক্টর আয়তনের ৭ দশমিক ৮ বর্গকিলোমিটারের এই প্রবালদ্বীপে অতিরিক্ত মানুষের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে দ্বীপের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে গেছে। এ কারণে শতাধিক নলকূপে লবণ পানি ঢুকে গেছে। বিশেষ করে ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত দ্বীপের ৭ হাজার মানুষ পানীয়জল সংকটে পড়ে। নলকূপ ও পুকুরের লবণযুক্ত পানি খেয়ে অনেকে ডায়রিয়াসহ জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, গত এক দশকে প্রবালদ্বীপটির পরিবেশ প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য অনেক ক্ষতি হয়েছে। এসব রক্ষায় সরকার অতিরিক্ত পর্যটক নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিচ্ছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ