উন্নয়ন হতে পারে গণতন্ত্র হবে না

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে গেল। আমরা ফলাফল দেখলাম, এখন নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এই নির্বাচন নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

হাফিজ উদ্দিন : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে মূল্যায়ন আপনারা মানে গণমাধ্যমই বেশি করেছে। আমি নিজে যতটুকু দেখেছি, আমার সামনে যা ঘটেছে বা আমার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের কাছে তাদের যে অভিজ্ঞতা শুনেছি; তাতে করে বলতে হয়, এই নির্বাচনে যে কারচুপি হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমার অনেক আত্মীয়ই ভোট দিতে পারেননি। ভোট দিতে গেলে তাদের বলা হয়েছে, আমাদের সামনেই ভোট দিন কিংবা ব্যালট পেপারটা দিয়ে যান, আমরাই ভোট দিয়ে দেব। যেখানে ইভিএম ছিল, সেখানে তারাই টিপে দিয়েছে, ভোটারকে ভোট দিতে দেওয়া হয়নি, এমন ঘটনাও ঘটেছে। আমি নিজে যেখানে ভোট দিই, সেখানে বিরোধী দলের পোলিং এজেন্ট কিংবা তাদের কর্মী-সমর্থক কাউকেই দেখিনি। ভোটারদের কোনো ভিড় বা লাইন ছিল না, সোজা গিয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে ভোট দিয়ে চলে এসেছি।

এখন যে সংসদ গঠিত হলো, এর মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্রের চর্চা কতটা এগোতে পারবে বলে আপনার মনে হয়?

হাফিজ উদ্দিন : টেলিভিশনের খবরে দেখলাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সদস্যরা শপথ নিয়েছেন। কিন্তু জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কিংবা বিএনপি ও গণফোরামের সাতজনের কেউই শপথ নেননি। আরেকটি বিষয় হলো, জাতীয় পার্টি চাচ্ছে সরকারে থাকতে। তাহলে তো আর কোনো বিরোধী দলই থাকল না। গতবার তাও বিরোধী দলের নামে জাতীয় পার্টি ছিল, অবশ্য তারা আবার সরকারেও ছিল।

দেশ রূপান্তর : তাহলে, আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের বাইরে সংসদে থাকছেন মাত্র তিনজন স্বতন্ত্র সদস্য। আপনি কি মনে করছেন যে, এতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সাধারণ রীতি ব্যাহত হবে?

হাফিজ উদ্দিন : অবশ্যই ব্যাহত হবে। কেননা, সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারি দল থাকবে, বিরোধী দল থাকবে; কিন্তু এখানে তা হচ্ছে না। ভোটের মাঠে সমান সুযোগ না থাকায় আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন ছিল- আওয়ামী লীগ জিতবে, কিন্তু একটা শক্তিশালী বিরোধী দল সংসদে আসবে। সেটা কিন্তু হয়নি। গণতন্ত্র থাকতে হলে অবশ্যই বিরোধী দল থাকতে হবে, বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা হয় না। এই সরকার উন্নয়ন কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু এভাবে গণতন্ত্র হবে না। এই পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর একটা কথা মনে পড়ল। আপনাদের বা অন্য কোনো পত্রিকায় দেখলাম ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচনে সংসদে মাত্র সাতজন ছিলেন সরকারি দল বা আওয়ামী লীগের বাইরে। বঙ্গবন্ধু নিজে তখন বলেছিলেন, পঁচিশ জনের কম বিরোধী দল হয় না, তারা একটা গ্রুপ হিসেবে থাকবে ঠিক বিরোধী দল হিসেবে নয়।

এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যে নতুন সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে, তাদের কী কী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বলে আপনি মনে করছেন?

হাফিজ উদ্দিন : চ্যালেঞ্জ আর কী! এখন তো জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের লোকেরা নির্বাচনে কারচুপি-টারচুপির অভিযোগ এনে নতুন নির্বাচন দাবি করছে। তারা হয়তো আবার নির্বাচন কমিশনেও যাবে। এসব আন্দোলনের কথাও তারা বলছে। কিন্তু সরকার তো কোনোভাবেই এসব শুনবে না, মানবে না। তাহলে হয়তো দেশে আবার একটা রাজনৈতিক অস্থিরতা হতে পারে, একটা আশঙ্কা আছে। এই তো। এছাড়া আর চ্যালেঞ্জ কী!

টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার তাহলে কী কী লক্ষ্য নিয়ে সামনে এগোতে পারে বলে মনে করেন?

হাফিজ উদ্দিন : আওয়ামী লীগ সরকার যদি এখন কাজ করতে চায়, তাহলে অনেক কাজ করতে পারে। তাদের যেহেতু কোনো বাধাবিপত্তি নেই, আগেও ছিল না, মানে গত সংসদেও ছিল না। তাদের ইশতেহারে অনেক ভালো ভালো লক্ষ্যের কথা বলা আছে। এখন সেগুলো বাস্তবায়নের দিকে তারা মন দিতে পারে। যদি সেটা তারা করে তো খুবই ভালো কথা। সেটা খুবই ভালো হবে। আওয়ামী লীগের যেসব অর্থনৈতিক কর্মসূচি আছে তার মধ্যে কিছু কিছু নিয়ে আমার নিজের বা দেশের কিছু অর্থনীতিবিদের দ্বিমত আছে। এখন তারা যদি ভিন্নমতকে বিবেচনা করে, গ্রহণ করে সেটা আরো ভালো। দেশের জন্যও খুবই ভালো হবে।

আপনি একসময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনি জানেন, গত এক দশকে আওয়ামী লীগ সরকার অনেক মেগা প্রজেক্ট বা বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। অনেকগুলো বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। এই ইশতেহারেও আরও অনেক বৃহৎ প্রকল্পের কথা আছে। এ সবের বাস্তবায়নে তারা কতটা সফল হবে বলে আপনি মনে করেন?

হাফিজ উদ্দিন : বিভিন্ন সময়ে চাকরির সুবাদে বা কাজের সুবাদে আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি। আমাদের এখানে অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়, সবক্ষেত্রে এটা ঠিক নয়। ভেবেচিন্তে ভালো প্রকল্প নেওয়া উচিত। তাছাড়া অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের এখানে ব্যয় অনেক অনেক বেশি। সব সময়েই দেখা যায়, কাজ শেষ করার জন্য বার বার মেয়াদ বাড়াতে হয়, এমনকি ব্যয়ও বাড়াতে হয়। আরেকটা সমস্যা হলো, অনেক ক্ষেত্রে আমাদের এখানে প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে ‘অপরচুনিটি কস্ট’ দেখা হয় না, ‘প্রায়োরিটি’ দেখা হয় না, ‘কস্ট বেনিফিট’ দেখা হয় না। যেটা করা দরকার ভাবা হলো, সেটা করা শুরু হয়ে গেলÑ এমন সমস্যাও আছে। ফলে এসব ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব সমস্যা আছে বলে আমার মনে হয়েছে। মেগা প্রজেক্টগুলোর মধ্যে পদ্মা সেতু আছে। এটা ভালো প্রকল্প। আমরা সবাই চাই। পায়রা সমুদ্রবন্দর আছে। এটা নিয়ে আমাদের দেশের অনেক অর্থনীতিবিদের অনেক প্রশ্ন আছে। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প নিয়েও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদসহ অনেকের অনেক প্রশ্ন আছে। এখন এসব মেগা প্রজেক্ট যদি সময়মতো শেষ করা যায়, তাহলে সেটা খুবই ভালো। পুরো দেশের জন্যই তা ভালো।

বৃহৎ প্রকল্পগুলোর বাইরেও আমাদের দেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিয়ে প্রায়ই কথা হয়। সহজে ব্যবসা করার সূচকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে সমমানের দেশগুলো থেকেই শুধু নয়, আফগানিস্তানের চেয়েও পিছিয়ে আছে।

হাফিজ উদ্দিন : এ বিষয়ে কিছু সমস্যা আছে। বিনিয়োগের প্রশ্নে এখানে ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা কাঠামোর কিছু সমস্যা আছে। একটা হলো বিদ্যুৎ, গ্যাস, রাস্তাঘাটের সমস্যা; আরেকটা হলো আমাদের এখানে ব্যবসার অনুমোদন নিতে অনেক অনেক সময় লাগে। অনেক দুয়ারে যেতে হয়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ইত্যাদি ইত্যাদি। বিভিন্ন সংস্থা থেকেও বলা হচ্ছে যে, আমাদের ব্যবসার পরিবেশ এখনো ভালো হয়নি। এখনো আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। সরকার যদি চায় যে, আমাদের ব্যবসার পরিবেশ উন্নত হোক, তাহলে ভালো একটা তদন্ত কমিটি করে খতিয়ে দেখতে হবে- কেন এটা সম্ভব হচ্ছে না, কী কী করলে এটা অর্জন করা সম্ভব হবে। নতুন সরকার যদি এসব দূর করার জন্য উদ্যোগ নেয়, সেটা খুবই ভালো কথা।

বিভিন্ন সময়ে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবেও আপনাকে আমরা সরব দেখেছি। এই সময়ে আমাদের দেশের নাগরিক সমাজ কেমন ভূমিকা পালন করছেন বলে আপনি মনে করেন। এই সময়ে আপনি কোন বিষয় নিয়ে কথা বলতে চান?

হাফিজ উদ্দিন : নাগরিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে কিছু কথা বলে আসছে, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে সেগুলোর কিছু কিছু আছে, কিছু কিছু নেই। আমরা ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলে আসছি। সংবিধান এবং নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের এখানে এখন ‘এক ব্যক্তির সরকার’ বা ‘এককেন্দ্রিক সরকার’ হয়ে গেছে। যিনি দলের প্রধান, তিনিই সংসদের নেতা আবার তিনিই প্রধানমন্ত্রী। ফলে তিনি অনেকটা ‘ইলেক্টেড ডিক্টেটর’ হয়ে যাচ্ছেন। যেমন আমাদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ দ্বারা। কিন্তু এখানে রাষ্ট্রপতির হাতেও কোনো ক্ষমতা নেই। ফলে ক্ষমতার ভারসাম্যের যে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ সেটা আসছে না।

আমি নিজে বিভিন্ন সময়ে বলেছি, যদি একটা ‘গ্রেটার ইলেক্টোরেট’ বা সংসদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলরদের নিয়ে গঠিত একটা কাঠামো থেকে যদি সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতেন, তাহলে আপনা থেকেই রাষ্ট্রপতির পদের শক্তি তৈরি হতো। কিন্তু এমন কিছু তো আমাদের এখানে হচ্ছে না। তারপর বিচার বিভাগ নিয়ে আমাদের অনেক সমস্যা আছে। বিচার বিভাগ, হায়ার জুডিশিয়ারি, পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ আমাদের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক সমস্যা আছে। এসব সমস্যা সমাধানে আমরা সংবিধান অনুযায়ী আইন করার কথা বলে এসেছি। কিন্তু কোনো সরকারই আইন করেনি। এখন আওয়ামী লীগ সবচেয়ে পুরনো দল, তাদের মধ্যে অনেক দক্ষ লোক আছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেও অত্যন্ত দক্ষ। এখন তারা যদি চান তাহলে এটা করা সম্ভব। এটা করলে দেশে আইনের শাসন, সুশাসন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। এটা করতে পারলে তাদের অনেক সুনাম হবে, দেশেরও অনেক উপকার হবে।

এবারের নির্বাচনে ভোটারদের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তরুণ ভোটার। বর্তমান সময়ের তরুণদের আপনি রাজনীতি সচেতন মনে করেন কি? আপনার কাছ থেকে এখনকার তরুণদের সমস্যা কিংবা সম্ভাবনার কথা শুনতে চাই।

হাফিজ উদ্দিন : প্রথম কথা হলো, তরুণদের অবশ্যই সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। যাতে তারা জ্ঞানার্জন করতে পারে, মানুষ হয়ে উঠতে পারে। তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু শিক্ষা এবং কর্মসংস্থান দুই ক্ষেত্রেই আমাদের আরো অনেকদূর যেতে হবে, দুই ক্ষেত্রেই বিস্তর সমস্যা রয়েছে। আর তরুণদের কথা যদি বলি, আমি সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের বেশকিছু আন্দোলনে মাঠে নামতে দেখেছি, যাতে আমার মনে হয়েছে, তারা যথেষ্টই রাজনীতি সচেতন হয়েছেন। ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনে আমি নিজেও তরুণদের সঙ্গে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। কিছুদিন আগে চাকরির কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে একেবারেই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ‘রাষ্ট্র মেরামতের আন্দোলন’ আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। তরুণদের নিয়ে আমি আশাবাদী।

এম হাফিজ উদ্দিন খান  সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা, সাবেক সচিব ও সাবেক মহা-হিসাব নিরীক্ষক

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আহমেদ মুনীরুদ্দিন

 

 

 

 

সূত্র:দেশ রূপান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ