গণতন্ত্রই নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

আমরা আরও একটি বছর পেছনে ফেলে এলাম। স্বাগত ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ। বর্ষশুরুর এই বিশেষ আয়োজনে পেছন ফিরে ও সামনের দিকে দৃষ্টি ফেলেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সুলেখক আকবর আলি খান। ইতিমধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে; এ মাসেই একটি নবনির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেবে; সামনের দিনগুলোতে সরকার ও জনগণের জন্য কী অপেক্ষা করছে, আমাদের অর্থনীতি ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন মশিউল আলম

আমাদের এই কথোপকথন যখন ছাপার অক্ষরে ও ভিডিও মাধ্যমে প্রথম আলোর পাঠক–দর্শকদের কাছে পৌঁছাবে, তখন নতুন বছর ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিন শুরু হবে। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে যাবে। এই সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যাঁরা নতুন সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন, তাঁদের উদ্দেশে আপনার কী বলার থাকবে?

আকবর আলি খান: শুভ নববর্ষ! আমি আশা করি যে ২০১৯ সালে আমরা আরেক ধাপ এগিয়ে যাব। নতুন সরকার অবশ্যই এ বছরের প্রথম দিকে দায়িত্ব গ্রহণ করবে। কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও সে কিন্তু পুরোনো সরকারের ধারাবাহিকতায়ই ক্ষমতায় আসবে। কারণ, এ নির্বাচনে দুটি জোট অংশগ্রহণ করেছে, এ দুটি জোটই দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতের রাজনীতিতে লিপ্ত রয়েছে। যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানেও এর পরিসমাপ্তি ঘটেনি; সেই সংঘাতের রাজনীতিই চালু ছিল। সুতরাং আমরা ২০১৯ সালেও সংঘাতের রাজনীতির পথেই পা বাড়াচ্ছি। এই সংঘাত কমানোর কোনো উদ্যোগ কোনো রাজনৈতিক দল নিতে পারেনি, এটা আমাদের জন্য একটা বড় দুর্ভাগ্য। সংঘাতের রাজনীতির ফলাফল মোটেও ভালো হয় না, সুতরাং আমরা ২০১৯ সালেও শঙ্কার মধ্যেই থাকব।

আমাদের মনে হয়, এই সংঘাতের রাজনীতিতে লিপ্ত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়া এবং একবার ক্ষমতায় যেতে পারলে যেকোনো উপায়েই তা রক্ষা করা। সে কারণে একটি সরকারের মেয়াদ শেষে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রায় অর্ধশতকের ইতিহাসেও গড়ে উঠল না। আমাদের রাজনীতির এই পরিণতি কেন ও কীভাবে হলো?

আকবর আলি খান: বাংলাদেশের রাজনীতির একটা বৈশিষ্ট্য হলো বংশগত রাজনীতি। এ ধরনের রাজনীতি অতীতমুখী হয়, ভবিষ্যতের দিকে তাকায় না। অর্থাৎ যে বংশ যখন রাজত্ব করেছে, তার গরিমাকে পুঁজি করেই তারা চলতে চায়। ভবিষ্যতের দিকে তাদের দৃষ্টি থাকে না। বড় দুই রাজনৈতিক জোটের বাইরেও বংশগত রাজনীতি প্রাধান্য বিস্তার করেছে। এটা একটা বড় কারণ, এ ছাড়া আরও অনেক কারণ আছে। বাংলাদেশে যে দলাদলির রাজনীতি আমরা দেখে আসছি, তা দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের ইতিহাসে আছে। শুধু ব্রিটিশ আমলে নয়, তার আগেও দলাদলির রাজনীতি ছিল। আমাদের এখানে গ্রামের যে কাঠামো, সেখানে সামাজিক পুঁজি গড়ে ওঠেনি এবং আমাদের গ্রামগুলো উত্তর ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের গ্রামের তুলনায় অনেক বেশি দুর্বল। সুতরাং আমাদের ইতিহাসের মধ্যেও এর উপাদান রয়েছে এবং এর সঙ্গে বর্তমানকালের বংশগত রাজনীতি এই প্রক্রিয়াকে আরও অনেক জটিল করে তুলেছে।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?

আকবর আলি খান: এই পরিস্থিতি বর্ণনা করা যায় একটা ছড়ার সাহায্যে: দেয়ার ওয়াজ আ ইয়াং লেডি অব রাইগা, হু স্মাইলড অ্যাজ শি রোড অন আ টাইগার, দে রিটার্নড ফ্রম দ্য রাইড, উইথ দ্য লেডি ইনসাইড, অ্যান্ড দ্য স্মাইল অন দ্য ফেস অব দ্য টাইগার। এ ছড়ায় বলা হয়েছে, রাইগার এক কুমারী মেয়ে হাসিমুখে বাঘের পিঠে চড়েছিল। কিন্তু বাঘের পিঠে চড়া যত সোজা, নামা তত সোজা নয়। সুতরাং সে আর নামতে পারেনি, বাঘের পিঠেই তার সমাপ্তি ঘটেছে। সুতরাং বংশগত রাজনীতির যে বংশ একবার ক্ষমতায় আসে, তারা কোনোমতেই আর ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি হয় না। এর ফলেই আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বার বার সংকট দেখা দেয়।

এটা রাজনীতিক ও রাজনৈতিক দলগুলোর দিক। কিন্তু একটা সমাজে রাজনীতিকদের বাইরেও নানান শক্তি থাকে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি, সিভিল সমাজ, বুদ্ধিজীবী মহলসহ নানা সামাজিক শক্তি জনগণের তরফ থেকে গণতান্ত্রিক অধিকারসহ নানা ধরনের দাবি–দাওয়া তোলে, যা রাজনীতিকদের ওপর কোনো না কোনো মাত্রায় চাপ সৃষ্টি করে। সেই চাপের মুখে রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের বদলানোর মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আমাদের দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বা সিভিল সমাজ রাজনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারছে না, তাদের কোনো প্রভাব অনুভূত হয় না। এটা কেন হলো?

আকবর আলি খান: প্রথমে সিভিল সোসাইটি নিয়ে বলি। বাংলাদেশে পাকিস্তান আমলে সিভিল সোসাইটি অনেকটা শক্তিশালী ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ হওয়ার পরে সংঘাতমূলক রাজনীতিতে সিভিল সোসাইটি প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। সিভিল সোসাইটিতে কারা আছেন? আইনজীবীরা আছেন, শিক্ষকেরা আছেন, সাংবাদিকেরা, পেশাজীবীরা আছেন। প্রতিটা গোষ্ঠীই দলীয় ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে গেছে। আমরা বিভিন্ন দলকে সমর্থন করতে পারি, কিন্তু কতগুলো বিষয়ে আমরা একমত থাকব—এ রকম দেখা যাচ্ছে না। আইনজীবীদের মধ্যে নয়, সাংবাদিকদের মধ্যে নয়, কোনো পেশাজীবী গোষ্ঠীর মধ্যে নয়, কোথাও এ ধরনের ঐকমত্য দেখা যাচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি খুবই দুর্বল। এখন যাঁরা নির্বাচন নিয়ে কিছু কথা বলেন, তাঁদেরই সিভিল সোসাইটি বলে গালি দেওয়া হয়। আসলে বাংলাদেশে সিভিল সোসাইটি খুব দুর্বল।

গণতন্ত্রায়ণে মধ্যবিত্ত শ্রেণিরও কিন্তু ভূমিকা থাকে।

আকবর আলি খান: বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, তারা দীর্ঘদিনের ত্যাগ–তিতিক্ষার মাধ্যমে মধ্যবিত্ত হয়নি। হঠাৎ করে অনেকেই মধ্যবিত্ত হয়ে গেছেন। এই মধ্যবিত্তদের অনেকেই রাজনীতিকে ব্যবহার করে দুর্নীতির মাধ্যমে বিরাট অংকের টাকার মালিক হয়ে গেছেন। এ রকম হঠাৎ উঠে আসা মধ্যবিত্ত রাজনীতির ওপরে কোনো গঠনমূলক প্রভাব ফেলে না। এরা ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে। আমি বলব না যে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো মধ্যবিত্ত বাংলাদেশে একেবারেই নেই; আছে, কিন্তু এ দেশে আরেকটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছে, যে গড়ে উঠেছে কালো টাকার ওপর। যারা কালো টাকার কারণে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে প্রবেশ করেছে, তারা কিন্তু কোনো ভালো প্রভাব রাখতে পারে না। সুতরাং না মধ্যবিত্ত, না সিভিল সমাজ—কেউই এখন বাংলাদেশের সমাজ পরিবর্তনে প্রভাব রাখার অবস্থায় নেই।

এ রকম দুর্বল গণতান্ত্রিক পরিবেশে একদিকে ভিন্নমত, বিরুদ্ধমত ইত্যাদির জায়গা সংকুচিত হচ্ছে, কিন্তু অর্থনৈতিক অবস্থার তেমন অবনতি অন্তত গত দুই মেয়াদে ঘটেনি; প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে। কিন্তু গণতন্ত্রহীন বা দুর্বল গণতান্ত্রিক পরিবেশ অব্যাহত থাকলে অর্থনীতির ওপরেও ভবিষ্যতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে কি না?

আকবর আলি খান: কিছুদিন আগে সিঙ্গাপুরে এক সেমিনারে গিয়েছিলাম, সেখানে বাংলাদেশের দুর্নীতি সম্পর্কে কথা হচ্ছিল। সিঙ্গাপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা আমাকে বলেন, তোমরা দুর্নীতি নিয়ে চিন্তিত কেন? দুর্নীতি হলে তো অর্থনীতির উন্নতি ত্বরান্বিত হতে পারে। আমি তাঁদের বলেছিলাম, বড় কথা হচ্ছে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন উন্নয়নই বড় কথা নয়, বড় কথা হচ্ছে, কিন্তু সেই উন্নয়নের সুফল কাদের হাতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে যে উন্নয়ন হচ্ছে, এর সুফল মুষ্টিমেয় লোকের হাতে যাচ্ছে, বেশির ভাগ লোক এই উন্নয়নের সুফল পাচ্ছে না। তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, যারা অর্থ উপার্জন করে, সমাজে তাদের বিশ্বাসযোগ্য পন্থায় অর্থ উপার্জন করার প্রয়োজন রয়েছে। যদি দেখা যায়, বেশির ভাগ লোকের উন্নতি হচ্ছে না, কিছু লোক লুটপাট করে ধনী হয়ে যাচ্ছে, তাহলে কিন্তু সেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সমাজের অনুমোদন লাভ করে না এবং সমাজে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে কিছু লোক লুটপাট করে ধনী হয়ে যাচ্ছে, এতে বেশির ভাগ লোক ঈর্ষান্বিত। তারা মনে করে যে অত্যন্ত অবৈধভাবে কাজ চলছে। এর ফলে যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলোর ওপর মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। যদি প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা না থাকে এবং যদি তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ থাকে, তাহলে সে সমাজে যেকোনো ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে। সে জন্য বাংলাদেশে শুধু অর্থনৈতিক উন্নতি করলেই হবে না, আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে ধনবৈষম্য লোকজনের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে: যারা ধনী হয়েছে, তারা সঠিকভাবে, সরকারকে কর দিয়ে, সমস্ত আইন–কানুন মেনে ধনী হয়েছে। কিন্তু সেটা না করে যদি একজন রাস্তার হকার ঝট করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যায়, তাহলে এটাতে সমাজে অসন্তোষ দেখা দেবে। আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা বললে বলতে হয়, এটা একক কোনো সরকারের আমলে নয়, ৯০ দশক থেকে প্রবৃদ্ধি ক্রমশ বেড়েছে। সব দলেরই ভূমিকা আছে, কোনো দল বলতে পারবে না যে শুধু আমাদের জন্যই প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

এই ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণ কী? অনেকে বলেন, এটা মিরাকল।

আকবর আলি খান: একটা কারণ হলো, আমাদের দেশের প্রায় কোটিখানেক মানুষ বিদেশে কাজ করছেন। ফলে প্রচুর পরিমাণ অর্থ দেশে প্রবেশ করছে, এটা আমাদের অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করেছে। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশ কৃষি খাতে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৭১ সালে যেখানে ১ কোটি টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হতো, সেখানে এখন প্রায় ৪ কোটি টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হচ্ছে। অর্থাৎ প্রায় ৪ গুণ উৎপাদন বেড়েছে। আর পোশাকশিল্প খাতে প্রায় ৫০ লাখ নারী নিয়োজিত হয়েছেন, তাঁরা যে কাজ করছেন, তার ফলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি অনেক বেড়ে গেছে। এভাবে আমরা আমাদের অদক্ষ ও আধা দক্ষ শ্রমশক্তি থেকে সুফল পেয়েছি। এই সুফলের ফলেই আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি চলছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যদি হঠাৎ কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন হয় এবং বিপুলসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক দেশে আসে, তাহলে কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি আর থাকবে না। অথবা আমরা যদি কোনো কারণে পোশাকশিল্পের বাজার হারাই, তাহলেও আমাদের অর্থনীতির ওপর বিরাট নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কৃষি খাতে অগ্রগতির একটা সীমা আছে, সেটাও আস্তে আস্তে কমে আসার সম্ভাবনা আছে। সুতরাং আমাদের নতুন নতুন রপ্তানি খাত চিহ্নিত করতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে। আমাদের মানবসম্পদ উন্নয়নের কাজ ভালোভাবে পরিচালনা করতে হবে। এখন আমরা বলি যে আমাদের দেশের শিক্ষার হার অনেক বেশি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ ছেলে পড়ছে, অন্যান্য দেশে এই হার অনেক কম। কিন্তু আসলে এগুলো শুধু সংখ্যার মারপ্যাঁচ, গুণগত মানের দিক থেকে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমশ নিচের দিকে নেমে আসছে। এটা যদি রোধ করা না যায়, তাহলে আমাদের এসব অর্থহীন হয়ে যাবে। আমাদের স্বাস্থ্য খাতেও বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা যেভাবে এগোচ্ছি, সেভাবে এগোতে চাইলে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য আমাদের আরও অনেক কিছু করতে হবে। বাংলাদেশে এখন যে অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে, তা পুঁজিনির্ভর নয়, মানবসম্পদ–নির্ভর। মানবসম্পদ–নির্ভর উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে হলে মানবসম্পদকে সুষ্ঠুভাবে গড়ে তোলার জন্য আরও উদ্যোগ নিতে হবে।

সারা পৃথিবীতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে উৎপাদনক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে, লোকবলের প্রয়োজনীয়তা কমে আসছে। এটা বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ অত্যন্ত জনবহুল দেশ, এখানে কর্মসংস্থানের বিরাট সংকট আছে। উৎপাদনক্ষেত্রে অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রসারের ফলে বেকারত্ব বেড়ে যেতে পারে। এই সমস্যা আমরা কীভাবে মোকাবিলা করব?

আকবর আলি খান: এটা বাংলাদেশের জন্য বিরাট এক সমস্যা হবে। যেমন আমাদের পোশাকশিল্প চলে অদক্ষ ও আধা–দক্ষ শ্রমিক দিয়ে। পোশাক খাতে এই শ্রমশক্তির ব্যাপক চাহিদা এতকাল ছিল, তাই এত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এখন যদি কম্পিউটারের মাধ্যমে পোশাকশিল্প নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে ব্যয় অনেক কমে যাবে। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার অনেক কম, অতি সহজে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব। এভাবে অর্থ সংগ্রহ করে যদি আমেরিকানরা নিজেরাই পোশাকশিল্পে বিনিয়োগ করে, তাহলে তারা সস্তায় বাংলাদেশের চেয়ে ভালো পোশাক তৈরি করতে পারবে। ফলে আমরা তৈরি পোশাকের বাজার হারাব। সুতরাং এই মুহূর্তে আমরা যেভাবে চালাচ্ছি, আগামী দশ বছর পরে আর এভাবে চালাতে পারব না। সে জন্যই আমি বলছিলাম যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন করতে হবে। শুধু অদক্ষ ও আধা–দক্ষ শ্রমশক্তির ওপর নির্ভর করে আমরা আর বেশিদূর এগোতে পারব না। দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করতে হবে, সে জন্য উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। এখন বাংলাদেশের বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুধু সনদ দেওয়া হয়, শিক্ষা দেওয়া হয় না। আমাদেরকে সনদের বদলে শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

এ মাসেই নতুনভাবে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। সামনের দিনগুলোতে নতুন সরকারের জন্য এবং দেশের জনগণের জন্য আপনি কী ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখেন?

আকবর আলি খান: পঞ্চদশ শতকের কবি চণ্ডীদাস লিখে গেছেন, ‘গড়ন ভাঙিতে পারে আছে কত খল, গড়িয়া ভাঙিতে পারে যে জন বিরল।’ অর্থাৎ গড়ে তোলা একটা কাঠামোকে ভাঙা খুব সোজা, কিন্তু সেটা নতুন করে গড়া অত্যন্ত কঠিন কাজ। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একটা বিরাট বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। গণতন্ত্রের গড়ন বা কাঠামো প্রায় ভেঙে গেছে। কাঠামো নতুন করে গড়া অত্যন্ত কঠিন কাজ। এই কাজ যদি সঠিকভাবে করা না হয়, তাহলে আগামী দশকগুলোতে আমাদেরকে এর দায় বহন করতে হবে। গণতন্ত্রের কাঠামো নতুন করে গড়ার জন্য আমাদের অনেক কিছু করতে হবে, যেমন আইনের শাসন—এটা প্রতিষ্ঠা করার জন্য অনেক বড় বড় সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যা বলে গেছেন, আজও তা সমভাবে প্রযোজ্য। বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমাদের দেশে যে আইন, সেখানে সত্য মামলায়ও মিথ্যা সাক্ষ্য না দিলে শাস্তি দেওয়া যায় না। মিথ্যা দিয়ে শুরু হয় আর মিথ্যা দিয়ে শেষ করতে হয়। যে দেশে বিচার ও ইনসাফ মিথ্যার ওপর নির্ভরশীল, সে দেশের মানুষ সত্যিকারের ইনসাফ পেতে পারে কি না, সন্দেহ।’ এই হলো বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর মূল্যায়ন। তিনি প্রায় ৫০ বছর আগে এই কথাগুলো লিখেছিলেন, তারপর থেকে বিচারব্যবস্থার কোনো উল্লেখযোগ্য সংস্কারও হয়নি, কোনো উন্নতিও হয়নি। আমাদের বিচারব্যবস্থায় নতুন করে আইন–কানুন করতে হবে, নতুন করে কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। সেগুলো করা জন্য বিরাট পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে।

আর প্রশাসনিক ব্যবস্থা?

আকবর আলি খান: বাংলাদেশের প্রশাসন ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে গেছে। আমি বলি, এই ব্যবস্থা গ্রেশাম বিধির ব্যামোতে আক্রান্ত। অর্থাৎ এখানে ভালো লোকদের দুষ্ট লোকেরা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এই ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হলে আমলাতন্ত্রের সামগ্রিক পুনর্গঠনের প্রয়োজন হবে। তেমনই পুলিশ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। এই ধরনের বড় বড় সংস্কার খুব অল্প সময়ে করা যায় না। সংস্কার করার জন্য অত্যন্ত দৃঢ় রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রয়োজন। আগামী দিনের সরকার যদি আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, পুলিশ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংস্কার করতে না পারে, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ বুনিয়াদ গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। এর সঙ্গে সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য সুদৃঢ় নীতির ওপর ভিত্তি করে সরকারকে এগিয়ে যেতে হবে। মানবসম্পদ উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা না হলে আমরা অর্থনৈতিক উন্নতি ধরে রাখতে পারব না। আমাদের মনে রাখতে হবে, শুধু অর্থনৈতিক উন্নতির জন্যই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা হয়নি; বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল ভিত্তি ছিল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। বাংলাদেশে যদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না পায়, তাহলে শুধু অর্থনৈতিক উন্নতিতে জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা মেটানো সম্ভব হবে না। সুতরাং বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অবশ্যই সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। এটাও হবে আগামী সরকারের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

আপনি যে বড় বড় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেন, সেগুলো করার দায়িত্ব রাজনীতিকদের। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি জনমুখিতা হারাতে হারাতে একটা হতাশাব্যঞ্জক অবস্থায় পৌঁছেছে। রাজনীতি ঠিক না হলে তো কোনো সংস্কারই হবে না। রাজনীতির এই দুর্দশা কাটানোর উপায় কী?

আকবর আলি খান: সমস্যাগুলো দুইভাবে দেখা যেতে পারে: একটা স্বল্পকালীন দৃষ্টিকোণ থেকে, আরেকটা দীর্ঘকালীন দৃষ্টিকোণ থেকে। বাংলাদেশে বর্তমানে যে অবস্থা, তাতে স্বল্পকালীন দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো সমাধান দেখা যায় না। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এগুলোর সমাধান সম্ভব বলে আমার বিশ্বাস। সুতরাং আমরা যদি বলতে চাই, আগামী দুই বা পাঁচ বছরের মধ্যে বিরাট পরিবর্তন হবে, তাহলে সেটা আশা করাটা ঠিক হবে না। কিন্তু আমরা যদি ১৫–২০ বছরের কথা ভাবি, তাহলে পরিবর্তন আসবে, কারণ পরিবর্তন–বিরোধীরা যতই শক্তিশালী হোক, দেশের মানুষ বুঝতে পারবে, কী করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আস্তে আস্তে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও পরিবর্তন আসবে বলে আমার বিশ্বাস। রাজনৈতিক দল, জনসাধারণ, সিভিল সমাজ—সবাই মিলে আমরা হয়তো সামনের দিকে এগিয়ে যাব, এটাই আমার বিশ্বাস।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

আকবর আলি খান: আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

 

 

সূত্র: প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ