ভুয়া খবর ঠেকাতে ফেসবুক তৎপর আছে

নির্বাচন প্রভাবিত করতে ফেসবুকে নানা ধরনের গুজব ও ভুয়া খবর ছড়ায়। এতে মানুষ বিভ্রান্ত হয়। এই প্রসঙ্গ নিয়ে ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ায় ফেসবুকের পাবলিক পলিসি হেড শিবনাথ ঠাকরালের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মশিউল আলম

বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ফেসবুক। এর বাইরে জনমত গঠন এবং তা প্রচারের ক্ষেত্রেও ফেসবুক বড় ভূমিকা রাখছে। এটি পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য সমস্যা তৈরি করছে বলে কি আপনার মনে হয়?

শিবনাথ ঠাকরাল: আমরা জানি, মানুষ এখন সামাজিক যোগাযোগের পাশাপাশি সংবাদের জন্যও ফেসবুকে আসে এবং এটা জেনেই আমরা মিডিয়া ইকোসিস্টেমে আন্তরিকতার সঙ্গে ভূমিকা পালন করছি। আমরা আমাদের মিডিয়া পার্টনারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ রাখছি। তাদের কনটেন্ট যাতে আর্থিকভাবে মূল্যায়িত হয় এবং তারা যাতে তাদের ডিজিটাল বিজনেস এগিয়ে নিতে পারে, সে জন্য আমরা তাদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করি। সাংবাদিক ও প্রকাশকেরা যাতে পাঠকের ভাবনা বুঝতে পারেন এবং তঁাদের সঙ্গে মতের আদান–প্রদান করতে পারেন, সে জন্য তঁাদের মধ্যে সেতুবন্ধ গড়ে দিয়েছে ফেসবুক।

ফেক নিউজ বা ভুয়া খবর এখন একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে এবং এর সঙ্গে ফেসবুকের নাম জড়িয়েছে। ভুয়া খবর ঠেকাতে ফেসবুক কী করছে?

শিবনাথ ঠাকরাল: ভুয়া তথ্য আমাদের সবার জন্য ক্ষতির কারণ। এটি আসল তথ্যপ্রবাহে বিঘ্ন ঘটায়। ফেসবুক একা এর বিরুদ্ধে লড়াই করে কিছু করতে পারবে না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ ও সরকারগুলোর সম্মিলিত চেষ্টায় এটি করা সম্ভব। তবে ফেসবুকের যা যা করণীয়, তা করতে সে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ কারণে ফেসবুকের মাধ্যমে যাতে কোনো ভুয়া খবর না ছড়ায়, সে জন্য আমরা প্রযুক্তি ও জনবলের মিলিত চেষ্টায় কাজ করে যাচ্ছি।

 প্রথমত, আমরা ফেসবুকে দুষ্ট লোকদের তৎপরতা বন্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ভুয়া অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করে সেগুলো অকার্যকর করার জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অর্থ বিনিয়োগ করছি। ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে ক্ষতিকর ও বিভ্রান্তিমূলক গুজব ছড়ানো হয়। প্রতিদিন আমরা লাখ লাখ ভুয়া অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করে বন্ধ করে দিচ্ছি। প্রতিনিয়ত আমাদের প্রযুক্তিব্যবস্থার নবায়ন করে উত্ত্যক্তকারীদের শনাক্ত করছি এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বাদ দিয়ে দিচ্ছি। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে আমরা সারা পৃথিবীতে প্রায় ৬০ লাখ ভুয়া অ্যাকাউন্ট বাতিল করেছি। এগুলোর ৯৮.৫ শতাংশই আমরা শনাক্ত করেছি নিজেদের প্রযুক্তি দিয়ে। অর্থাৎ সেগুলোর ব্যাপারে কেউ কোনো আপত্তি জানানোর আগেই আমরা তাদের ধরতে পেরেছি।

দ্বিতীয়ত, ভুয়া খবর ছড়িয়ে যাতে কেউ অর্থনৈতিক ফায়দা তুলতে না পারে, সে জন্যও আমরা সচেষ্ট আছি। অনেকে অনেক সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভুয়া খবর ছড়ায়, অনেকে অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যেও তা করে। আমরা চেষ্টা করি যাতে কোনো পক্ষ নিজেদের বিজ্ঞাপন প্রচার করে অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে না পারে।

তৃতীয়ত, নিউজ ফিডে আপনার বন্ধুরা যেসব পোস্ট দেন বা আপনি যে পাতাগুলো ফলো করেন, তাদের মধ্য থেকে যেটি বেশি তথ্যবহুল ও বিশ্বাসযোগ্য, সেগুলো আপনার সামনে তুলে ধরার বিষয়টিকে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি।

বিভিন্ন দেশের জাতীয় নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার ক্ষেত্রে ফেসবুক ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। আগামী ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন। এই অবস্থায় আমাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

শিবনাথ ঠাকরাল: আমরা বিশ্বাস করি, সারা দুনিয়ায় গণতন্ত্রের ইতিবাচক শক্তি হিসেবে ফেসবুক ভূমিকা রাখছে। সব বয়সের মানুষের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা প্রকাশ, সুস্থ বিতর্ক ও মতবিনিময় করার ক্ষেত্রে ফেসবুক ভূমিকা রাখছে। ফেসবুকের কারণে নির্বাচনী এলাকার মানুষের কাছে নেতাদের জবাবদিহি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। আমাদের প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে কিছু লোক সব সময় তৎপর থাকে। তাদের ব্যাপারে আমরা সব সময় সতর্ক থাকি। আমরা এসব তৎপরতা ঠেকাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে যতগুলো দেশে জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেসব দেশের গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আমাদের সর্বোচ্চ সমর্থন থাকবে। এসব নির্বাচন সামনে রেখে গুজব ও হিংসা ছড়ানোর তৎপরতা রুখতে আমরা পৃথিবীজুড়ে শুধু ‘সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি’ টিমে কর্মীর সংখ্যা ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার জনে উন্নীত করছি। এই টিম বর্তমানে ৫০টির বেশি ভাষায় রিপোর্ট রিভিউ করে চলেছে। ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত ১২৭ কোটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট আমরা অকার্যকর করেছি।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, বাংলাদেশে নির্বাচনের দিন ফেসবুকে ব্যাপকভাবে গুজব এবং ভুয়া সংবাদ ছড়াতে পারে। বাংলাদেশে গুজব ও ভুয়া খবর ছড়িয়ে উসকানি দিলে তা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এই অবস্থায় এ দেশে নির্বাচনের সময় ভুয়া খবর ছড়াবে না—এটা নিশ্চিত করতে আপনারা কী করবেন?

শিবনাথ ঠাকরাল: আমরা জানি, লোকে ফেসবুকে প্রকৃত খবর জানতে চায়, আমরাও তা নিশ্চিত করতে চাই। এরপরও কোনো কোনো মহল গুজব ও ভুয়া খবর ছড়ানোর চেষ্টা করবে। তাদের ঠেকাতে আমাদের প্রযুক্তি ও জনবল চব্বিশ ঘণ্টা সতর্ক আছে। প্রযুক্তি এবং জনবলের সমন্বয়ে আমরা কোনটি ভুয়া খবর আর কোনটি সত্য খবর, তা বেছে বের করার চেষ্টা করি। এর মাধ্যমে উসকানিমূলক পোস্টগুলো আমরা বেছে বেছে তা সরিয়ে দিচ্ছি। এর পাশাপাশি কেউ কোনো পোস্টের বিষয়ে আপত্তি দিলে তা আমাদের কর্মীরা পর্যালোচনা করেন। এরপরে সরিয়ে দেওয়ার মতো হলে তা সরিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে—এমন সব কনটেন্ট আমরা সরিয়ে ফেলতে সচেষ্ট আছি।

অনেকে বলে থাকেন, ফেসবুকের ব্যবস্থাপনার ওপর আস্থা রাখা যায় না। কারণ, মুনাফার জন্য এই প্রতিষ্ঠান জবাবদিহি এড়িয়ে যায়। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

শিবনাথ ঠাকরাল: ২০১৮ সালজুড়েই ফেসবুকের বিরুদ্ধে এ প্রশ্ন উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে, ফেসবুকের ওপর মানুষের আস্থা কমেনি, বরং বেড়েছে। বহু দেশের বহু গণতান্ত্রিক আন্দোলন, মানুষের অধিকারের আন্দোলন ও বাক্স্বাধীনতার মূল প্ল্যাটফর্ম এই ফেসবুক। বহু মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ও বহু নিপীড়ন বন্ধ করতে ফেসবুক ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে আমরা ফেসবুকের এই শক্তি ব্যবহার করে মানুষে মানুষে বিভাজনের চেষ্টারও নজির পাই। এই সমস্যার একক কোনো সমাধান নেই। কিন্তু আমরা ধীরে ধীরে নিজেদের মানোন্নয়ন করে একটি আশাব্যঞ্জক অবস্থায় যেতে পারব। গত দুই বছরে আমরা নিজেদের অনেকখানি এগিয়ে নিয়েছি। আশা করছি, এই অগ্রগতির মধ্য দিয়ে আমরা ফেসবুককে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব। মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি জাগাতে ফেসবুক আগের চেয়ে বেশি ভূমিকা রাখবে। এতে ফেসবুকের প্রতি মানুষের আস্থা আগের চেয়ে বাড়বে।

আপনাকে ধন্যবাদ।

শিবনাথ ঠাকরাল: আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

 

 

সূত্র: প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ