সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে কিছু প্রশ্ন

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০১৮) যখন আপাতত বিরোধী দল হিসেবে চিহ্নিত বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে তখন রাজনৈতিক মহলে স্বস্তি ও আনন্দের সুবাতাস বয়ে গিয়েছিল : ‘যাক, নির্বাচনটা এখন ঠিকঠাক মতোই হবে। সে স্বস্তি জনগণের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল, বিশেষ করে রাজনীতিমনস্ক শিক্ষিত শ্রেণি, নাগরিক ও মহানাগরিকদের সব স্তরে।’

বিএনপি অবশ্য মুখ গোমড়া করেই নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণায় সম্মতি জ্ঞাপন করেছিল, সম্ভবত ড. কামাল হোসেনের যুক্তিতর্কের বেড়াজালে পড়ে এবং নিজেদের বিপন্ন অবস্থার অসহায়তার কথা ভেবে। তাদের কোনো দাবিই পূরণ না হওয়ায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা ক্ষুব্ধ ও বিশেষ করে খালেদা জিয়ার মুক্তি বা তাঁর নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে না পেরে। তাদের নির্বাচন পরিক্রমায় সবচেয়ে বড় তাস দলনেত্রী খালেদা জিয়া—এটা যেমন তাদের জানা, তেমনি জানা বাদবাকি সবারই।

সময় যতই পার হয়েছে, নানা বিষয়ে আইনি জটিলতা হ্রাস পাওয়ার বদলে আরো ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার বিচারসংক্রান্ত রায়, তাঁর জামিন না পাওয়া, এমনকি কারাদণ্ড বৃদ্ধি ও নির্বাচনে তাঁর অংশগ্রহণের যোগ্যতাবিষয়ক আইনি জটিলতার অবসান না ঘটার কারণে। বাস্তবিকই বিএনপির মনোভাব ক্রমেই জটিল হয়ে চলেছে নির্বাচন নিয়ে।

এর বড় কারণ দৈনিক পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত নানা মাত্রিক খবর, মূলত নির্বাচনবিষয়ক খবর, যা বিএনপির জন্য নেতিবাচক এবং তাদের বিচলিত করার পক্ষে যথেষ্ট। এবারের নির্বাচন উপলক্ষে সংবাদপত্র মহলে একটি নতুন শব্দের ব্যবহার যুক্ত হয়েছে—‘গায়েবি মামলা’। পত্রিকাগুলোর ভাষ্যে দেখা যাচ্ছে ‘গায়েবি মামলা’ এবং নানা হামলায় বা গ্রেপ্তার আতঙ্কে বিএনপি দিশাহারা অবস্থায়। স্বভাবতই নির্বাচন হয়ে উঠেছে শিরঃপীড়ার মতো।

এখন নির্বাচনের ময়দানের অবস্থা পর্যবেক্ষণই দৈনিক পত্রিকাগুলোতে আলোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণের অন্যতম প্রধান বিষয় বিএনপির পক্ষে নির্বাচনে অংশগ্রহণগত সমস্যা।

তাদের নেতৃস্থানীয়দের কেউ কেউ জেলে এবং অনেকেই আত্মগোপনে, যদিও মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হচ্ছে তাঁদের অনেকের নামে। এরই মধ্যে খালেদা জিয়াসহ অনেকের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা। বিএনপির প্রশ্ন : এ অবস্থায় তারা নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে কিভাবে, নির্বাচনী প্রচার চালাবে কিভাবে। সংবাদপত্রগুলোতে এসব সমাচারই পর্যালোচনায় সর্বাধিক প্রাধান্য পাচ্ছে। এবং তা নানা শিরোনামে। আন্তর্জাতিক সংবাদে মন নেই কারো। তেমনি লেখকদের।

ভোটের দিন যত এগোচ্ছে সংশয়, শঙ্কা, ভয়ভীতি, অনিশ্চয়তাবোধ ততই বেড়ে চলেছে, যেমন রাজনীতিমনস্ক মানুষের আলাপ-আলোচনায় তেমনি সংবাদপত্রগুলোর পর্যালোচনায়, নিবন্ধকারদের বিচার-বিশ্লেষণে। নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে—‘ভয়ভীতি, অনুরাগ-বিরাগের ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেক্ষতার সর্বোচ্চ মাত্রা বজায় রেখে যেন সমান সুযোগ-সুবিধার ভিত্তিতে ভোট প্রতিযোগিতার খেলাটা সম্পন্ন হয়। এখন রেফারি কতটা কী করতে পারবেন তা দেখার অপেক্ষায় মানুষ।

দুই.

এই যে স্বস্তি ও আনন্দের বদলে ভয়ভীতি, শঙ্কা ভূতের মতো এসে ময়দানে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে তা বোধ হয় একেবারে অলীক নয়। এমনটি এবার প্রত্যাশিত ছিল না মোটেই। একটা হালকা স্বস্তির আমেজ শুরুতে দেখা যাচ্ছিল। এখন অবস্থা পাল্টে যাওয়ার আভাস-ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দৈনিক পত্রিকার কিছু কিছু সংবাদ তেমন সংকেতই দিতে শুরু করেছে। কিন্তু মানুষ এখনো ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি বা ২০১৪ সালের জানুয়ারির কথা ভাবছে না।

কিন্তু হাওয়া বদলাতে কতক্ষণ? এক পক্ষ যদি মনে করে, দড়িটা হাত থেকে পিছলে যাবে বা অপর পক্ষ তার জন্য যেকোনো মূল্য দিতে থাকে, তাহলেই যত সমস্যা। এসব ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন একমাত্র ভরসা, সেই সঙ্গে তার নেপথ্য সহকারী নির্বাচনকালীন সরকার, যাদের দায়িত্ব মাঠপর্যায়ের তো বটে, পাশাপাশি মহল্লা থেকে মহল্লায়ই নয়, দেশের শহরগুলো ও গ্রামাঞ্চলে সর্বত্র মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের মন থেকে পূর্বোক্ত ভয়ভীতি, শঙ্কা দূর করা। যাতে তারা নির্বিঘ্নে, পূর্ণ নিরাপত্তায় ভোট দিতে পারে। নিজের ভোট ইচ্ছামাফিক দিতে পারে।

এসব তো কাগজ-কলমের কথা। বাস্তব থেকে কিছুটা হলেও দূরে। তাই ভোটাভুটি সামনে রেখে মানুষের মধ্যে একটা গোপন উত্তেজনা বিরাজ করছে। দু-একটি নিবন্ধে দেখা যাচ্ছে, সংখ্যালঘুদের নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার সমস্যা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ। এরই মধ্যে দেশের দূর অঞ্চল থেকে কিছু কিছু অপ্রিয়, অবাঞ্ছিত ঘটনার খবর আসতে শুরু করেছে। সঙ্গে দু-একটি গুরুতর ঘটনাও।

এসব নিয়ে নির্বাচন কমিশনের তৎপরতা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবস্থা গ্রহণের তৎপরতাও প্রয়োজনীয় মাত্রায় বলে কেউ কেউ মনে করছেন না। এ বিষয়ে অবস্থার অবনতি ঘটলে নির্বাচন কিছুতেই শান্তিপূর্ণ এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ হওয়ার কথা নয়।

তাই লক্ষ করা যাচ্ছে দৈনিকের পাতায় দু-একটি সম্পাদকীয়। তাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সংঘাতের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দিকে সর্বোচ্চ নজরদারি নিশ্চিত করতে। আরো বলা হচ্ছে দলীয় প্রেক্ষাপটে যথাযথ নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে। যেমন নির্বাচন কমিশন, তেমনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে। অর্থাৎ সরকারকে নির্বাচন উপলক্ষে পরিপূর্ণ নিরপেক্ষতা রক্ষা করে চলতে হবে।

তিন.

নির্বাচনসংক্রান্ত উদ্ভূত পরিস্থিতি মনে হয় আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে কিংবা তা বরাবর তাদের নজরদারিতে রয়েছে। তা না হলে কিছুদিন আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে কেন একাধিক দেশের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে। কেন প্রশ্ন উঠবে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তার অভাব, বিচারবহির্ভূত হত্যা প্রভৃতি ঘটনা নিয়ে। কেনই বা বাংলাদেশকে এসব ঘটনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হবে?

এখানেই শেষ নয়, তারা নির্বাচনের নিরপেক্ষতা রক্ষার প্রতি কঠোর নজরদারি রাখতে নির্বাচন কমিশনের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছিল। অবশ্য এ পর্যন্ত তথ্যে প্রকাশ, তারা বাংলাদেশের নির্বাচন তদারক করতে কোনো প্রতিনিধিদল পাঠাবে না। তবে এ ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।

অতিসম্প্রতি অর্থাৎ কয়েক দিন আগে মার্কিন কংগ্রেসে ওপরে উল্লিখিত বিষয়গুলো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবসহ আলোচনা চলেছে। সেখানে শুধু বাংলাদেশের সমাজে বিরাজমান সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি নিয়েই আলোচনা হয়নি, উঠেছে এক পক্ষে জামায়াত, অন্য পক্ষে হেফাজত ও ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে গণতন্ত্রীদের দহরম মহরমের কথা। গণতন্ত্র হুমকির সম্মুখীন।

আর সেসব প্রসঙ্গে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে এবং নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে আলোচনা। তবে বাদ যায়নি নির্বাচন প্রসঙ্গ। তাদের বিবেচনায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সমুন্নত রাখতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যেমন জরুরি, তেমন জরুরি নির্বাচনকে সম্পূর্ণ সুষ্ঠু ও অবাধ চরিত্রে সম্পন্ন করা। এ বিষয়ে তারা একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছে।

বাংলাদেশের এবারকার নির্বাচন নিয়ে দেশি-বিদেশি সব মহলে আলোচনা, সমালোচনা, করণীয়, ভবিষ্যৎ পরিণাম ইত্যাদি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। প্রত্যেকের দায়দায়িত্ব নিয়ে সচেতনতারও প্রকাশ ঘটছে। মনে হচ্ছে, বিষয়টি যেন এ দেশের জন্য সুস্থ অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। যেখানে শুদ্ধ গণতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

এমনকি আলোচনা চলছে এভাবে যে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও। ভোটের ময়দানে বা বুথে তাদের নির্বিঘ্ন এবং বাধাবন্ধহীন উপস্থিতির নিশ্চয়তার দায় নির্বাচন কমিশন ও সরকারের। ধরে নিতে হবে তা যেন হয় দলনিরপেক্ষ। কাজেই তাদের পক্ষপাতহীন স্বাধীন কর্মকাণ্ডে নির্বাচন কমিশন হস্তক্ষেপ করবে না, এমনটাই কাম্য। এসব বাধ্যবাধকতা কে কতখানি মানবেন সেটাই বড় প্রশ্ন।

এমন এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে ভোটের ঘণ্টা বেজে চলেছে। রাজনৈতিক দলের কর্মীদের মাথার ঘাম পায়ে পড়ছে। জোট-মহাজোট, শরিক দলে চলছে মতভেদের টানাপড়েন। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে নানা গুজব বাতাসে ভাসছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত। ডিসেম্বর মাস এভাবে চলবে। এরপর ভোটাভুটি, জয়-পরাজয়। কিন্তু তারপর? সামাজিক শান্তি বজায় রাখাটাই হবে বড় কাজ।

লেখক :আহমদ রফিক,কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

 

 

 

সূত্র: কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ