প্রাচীনতম বাঙ্গালা গদ্য-পুস্তক

দিল্লিতে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ক্ষমতা তখন মধ্য গগনে। বাংলা তার বিশাল সাম্রাজ্যের একটি সমৃদ্ধশালী সুবাহ বা প্রদেশ। সেই সময় এক ধর্মান্তরিত বাঙালি খ্রিস্টানের (ক্যাথলিক) কলম থেকে রচিত হয়েছিল খ্রিস্ট ধর্মের মহিমা প্রচারের উদ্দেশ্যে অতি পুরনো বাংলা গদ্যে লেখা একটি পুস্তিকা, যা পরবর্তীতে ব্রাহ্মণ রোমান ক্যাথলিক সংবাদ নামে খ্যাত। এর লেখকের জন্ম পূর্ববঙ্গের ভূষণার এক হিন্দু জমিদার বা হিন্দু রাজবংশে। তবে তিনি কোন রাজবংশের সন্তান, তার পিতৃদত্ত নাম কী ছিল বা তিনি কোন বর্ণের, তা কিছুই জানা যায় না। তবে খ্রিস্টান পাদ্রি তার নাম দিয়েছিলেন আন্তোনিয়ো রোজারিও। তিনি আজো এ নামেই পরিচিত। আদি বাংলা গদ্যের অন্যতম পথিকৃৎও তিনি। ঢাকা তখন বাংলার রাজধানী। ঢাকার একদা সমৃদ্ধশালী নওয়ারা বা নৌবাহিনী সুবেদার মীর জুমলার মৃত্যুর পর উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রায় ধ্বংসের সীমায় পৌঁছেছে। চট্টগ্রাম-আরাকানে ঘাঁটি গেড়ে বসা মগ-ফিরিঙ্গি দস্যুদের প্রতিরোধ করার শক্তি মোগল সুবেদারের নিঃশেষিত। মগরা চট্টগ্রাম ঘাঁটি থেকে বেরিয়ে নদীপথে যখন তখন হানা দেয় হুগলি, যশোর, ভূষণা, বাকলা, বিক্রমপুর, সোনারগাঁ, ঢাকা প্রভৃতি স্থানে। পূর্ব ও দক্ষিণবঙ্গ মগদের লুণ্ঠনে ও অত্যাচারে জর্জরিত— সেই অরাজক কালের কোনো একদিন মগরা ভূষণা থেকে এই বালক কুমারকে তার খেলার সঙ্গীদের সঙ্গে অপহরণ করে। পর্তুগিজরা তাকে মগদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষা দেয়। যিনি তাকে ধর্মান্তরিত করেছিলেন, সেই পাদ্রি রোজারিওর নামানুসারে তার নতুন নাম হয় আন্তোনিয়ো দো রোজারিও। যেহেতু এ বালক রাজবংশের সন্তান, তাই পাদ্রি মানোয়েল বালকের নামের আগে ‘দোম’ শব্দটি জুড়ে দেন। পর্তুগিজ ভাষায় দোম শব্দের অর্থ কুমার বা প্রিন্স।

বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খানের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম মগ-ফিরিঙ্গিমুক্ত হলে সেখানকার বন্দি বাঙালিদের সঙ্গে মুক্তি পেয়ে দোম আন্তোনিয়ো তার নিজ দেশে ফিরে এসে খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। আন্তোনিয়ো বাংলার অগাস্টিন খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। দোম আন্তোনিয়োর জীবত্কাল সপ্তদশ শতকের শেষার্ধে। ঢাকা জেলার ভাওয়াল পরগণার নাগরী গ্রাম তার বাসস্থান ও কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র।

বাংলার পশ্চিম দিকে যেমন— হুগলি-ব্যান্ডেল পর্তুগিজ ফিরিঙ্গি খ্রিস্টানদের বাণিজ্য ও ধর্ম প্রচারের কেন্দ্র, পূর্ববঙ্গে তেমনি ঢাকা-ভাওয়ালে তাদের ধর্মকর্মের বড় রকম আস্তানা গড়ে ওঠে। সেখানে এবং তার আশপাশে বহু পর্তুগিজ ও দেশীয় খ্রিস্টানের বাসস্থান হয়।

খ্রিস্ট ধর্মের প্রচারক হিসেবে দোম আন্তোনিয়োর বেশ নামডাক হয়। বাগ্মী হিসেবেও তার জনপ্রিয়তা ও সাফল্যের কমতি ছিল না। যদিও ধর্ম প্রচারকের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ তার নেই। বাস্তব বুদ্ধি দিয়ে তিনি প্রথমেই উপলব্ধি করেছিলেন যে নিরক্ষর, নিম্নবর্ণের দরিদ্র হিন্দুদের মধ্যে ধর্মের বাণী পৌঁছাতে হলে দুরূহ তত্ত্বকথায় বেশি মনোযোগ না দিয়ে তাদের ভাষায় এবং তাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতার নিরিখেই তাকে ধর্মকথা শোনাতে হবে। জনশ্রুতি রয়েছে, তিনি নাকি অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার বাঙালি হিন্দুকে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন। উপমহাদেশে খ্রিস্টান মিশনারিদের মধ্যে এ সংবাদ সে সময়ে যথেষ্ট আলোড়ন তুলেছিল। ৩০ হাজার সংখ্যাটি হয়তো কিছুটা অতিরঞ্জিত হতে পারে। তবে প্রচারক হিসেবে তার সাফল্যের প্রতি এটি একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত বলে ধরে নেয়া যায়।

এমন সাফল্যের পরও সারা জীবন তাকে দারিদ্র্য ও অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়তে হয়েছে। খাজনা বাকি পড়ায় নিয়মিত রাজপুরুষদের লাঞ্ছনা সহ্য করেছেন তিনি। এমনকি জীবনের শেষ ভাগেও অভাব পিছু ছাড়েনি তার। কথায় বলে, দারিদ্র্য সর্বগুণনাশিনী। দোম আন্তোনিয়োর দুর্ভাগ্যময় জীবনে হয়তো এ দারিদ্র্য দোষই তাকে নানা মিথ্যা অপবাদ ও বিড়ম্বনায় ফেলেছিল।

জীবনভর আন্তোনিয়োর দেহে ধর্ম প্রচারকের একশীলা তকমাটা জোঁকের মতো সেঁটে ছিল। এমনকি তার মৃত্যুর পরও দীর্ঘদিন ধর্ম প্রচারকের পরিচয় তার লেখক পরিচয়টি মুছে দিয়ে বড় হয়েই প্রচারিত হয়ে এসেছিল। কেউ মূল্যায়ন করেননি ধর্ম প্রচারক হিসেবে তিনি বেশি সফলকাম, নাকি বাংলা ভাষার অন্যতম আদি গদ্যনির্মাতা হিসেবে বেশি কৃতিত্বের দাবিদার। জীবদ্দশায় দোম আন্তোনিয়োর লেখক স্বীকৃতি মেলেনি বিন্দুমাত্র।

এর কারণ অধিকাংশ মানুষের জানা ছিল না যে তিনি খ্রিস্ট ধর্মের মহিমা ও হিন্দু অবতারবাদের অসারতা প্রমাণের জন্য গদ্য ভাষায় বাংলায় কোনো পুস্তিকা লিখেছিলেন। জানা ছিল না রোমান হরফে হাতে লিখে পর্তুগিজ অনুবাদসহ পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে মুদ্রণের জন্য পাঠানো হয়েছিল। সে সময়েই যদি তার পুস্তিকাটি মুদ্রিত হতো, তবে ‘ব্রাহ্মণ রোমান ক্যাথলিক সংবাদ’ পেত বাংলা গদ্যের প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থের বিরল সম্মান, পাদ্রি মানোয়েলের লেখা ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’ পুস্তিকাটি নয়। বহু বছর পর বইটি ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড. সুরেন্দ্রনাথ সেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। লেখক নিজে এ বইয়ের কোনো নামকরণ করেননি। সম্পাদকের উদ্যোগে বইটি ‘ব্রাহ্মণ রোমান ক্যাথলিক সংবাদ’ নামে বের হয়ে বাংলার আদি গদ্যের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিখ্যাত হয়েছে।

দুই

সপ্তদশ শতকের শেষার্ধে বাংলা গদ্যের সাহিত্যে অনুশীলন শুরু হয়নি। দোমের হাতের কাছে কোনো রচনাদর্শ ছিল না, তাই নিজের গদ্য রচনার ধারা তিনি নিজেই স্থির করেছিলেন। বাংলা কাব্যে প্রচলিত সাধু ভাষা, ভাওয়াল এলাকার কথ্য ভাষা মিলিয়ে তার গদ্যের কাঠামো তৈরি করেছিলেন। লেখক পর্তুগিজ ভাষায় দক্ষ ছিলেন, ফলে তার রচনায় পর্তুগিজ গদ্যেরও কিছুটা প্রভাব পড়েছে। দীনেশ চন্দ্র সেনের অভিমত, ‘এই কারণে দোমের রচনা খুব অনুপযোগী হয়নি। ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে তার বইটির গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলা গদ্যের দুর্লভ পুরনো নিদর্শন হিসাবে এর মূল্য কিছুতেই উপেক্ষা করা যায় না।’

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম জানা যায়, পুরনো বাংলা গদ্যে খ্রিস্ট ধর্মবিষয়ক দু’খানি বই লেখা হয়েছিল এবং তার একখানির লেখক দোম আন্তোনিয়ো, আরেকজন মনোয়েল দ্য আস্সুমপসাও। ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দে অগাস্টিন সম্প্রদায়ের ফাদার আম্ব্রসিও এক পত্রে গোয়ার রাজপ্রতিনিধিকে ভাওয়াল মিশনের ইতিহাস লিখে পাঠান। তাতে প্রসঙ্গক্রমে ভাওয়াল মিশনের প্রতিষ্ঠাতা দোম আন্তোনিয়োর সংক্ষিপ্ত জীবনকাহিনী ছিল, সেই কাহিনী অগাস্টিন পাদ্রি ফাদার হস্টেনের লেখা থেকে প্রচারিত হলে দোম আন্তোনিয়োর নামের এ অপরিচিত লেখকের সঙ্গে বাঙালির প্রথম পরিচয় ঘটে। তার লেখা বইয়ের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হতে আরো ২৩ বছর লেগে যায়। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ড. সুরেন্দ্রনাথ সেনের সম্পাদনায় দোম আন্তোনিয়োর বই প্রথম মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত হলো। পুঁথিটি বাংলায় লেখা হলেও এর আখ্যান থেকে কিন্তু বইটির নাম জানা যায় না। মনোয়েল দ্য আস্সুমপসাও, যে পর্তুগিজ পাদ্রি গ্রন্থটির পর্তুগিজ অনুবাদ করেছিলেন, তিনি গ্রন্থটির পরিচয় দিয়েছেন এভাবে—

‘জনৈক খৃষ্টান বা রোমান ক্যাথলিক ও জনৈক ব্রাহ্মণ বা হিন্দুদিগের আচার্যের মধ্যে শাস্ত্র সর্ম্পকীয় তর্ক ও বিচার।’ বইটির কোনো বাংলা নাম না থাকলেও উপরোক্ত নাম বর্ণনা থেকে সহজেই বইয়ের বিষয়বস্তু বোঝা সম্ভব।

রোমান হরফে হাতে লেখা পুঁথির আকারে এ বই পর্তুগালের এভেরা নগরীর গ্রন্থাগারে পাওয়া গেছে। এটি এখনো লিসবনের জাতীয় গ্রন্থাগারে রক্ষিত আছে।

মনোয়েল অনূদিত এর পর্তুগিজ সংস্করণে মুদ্রিত হলেও গ্রন্থ ছাপা হয়েছিল বলে মনে হয় না। আগেই বলা হয়েছে যে, গ্রন্থটির প্রথম মুদ্রিত সংস্করণ ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ড. সুরেন্দ্রনাথ সেনের সম্পাদনায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়। ১১৮ পৃষ্ঠায় সম্পূর্ণ বইটির প্রথম ৮৩ পৃষ্ঠা ও শেষের ২ পৃষ্ঠা মোট ৮৫ পৃষ্ঠা ড. সেন নকল করে এনেছিলেন। ড. সেনের কাছে মানোয়েল যে আখ্যানপত্র লিখেছেন, তাতে বইয়ের বিষয় এবং প্রকৃতি ছিল সুস্পষ্ট। ড. সেন সেই আখ্যানপত্রের পরিচয় অনুসারে বইটির নাম দেন ব্রাহ্মণ-রোমান ক্যাথলিক সংবাদ।

আঠারো শতকের প্রথম ভাগে বাংলাদেশে কোনো মুদ্রণযন্ত্রই ছিল না। তাই আঠারো শতকের সপ্তম দশকের আগে বাংলা হরফ এ দেশের মুদ্রণযন্ত্রে ব্যবহার হয়নি। সে কারণেই দোমের পুস্তিকা রোমান হরফে লিখে মুদ্রণের জন্য পর্তুগালে পাঠানো হয়েছিল। অনেক গবেষকের অনুমান (অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়), মূলত পুস্তক বাংলা হরফেই লেখা হয়েছিল, পরে পর্তুগালে পাঠানোর সময় অথবা এ দেশের পর্তুগিজ পাদ্রিদের বোঝানোর সুবিধার জন্য পুস্তকটিকে রোমান হরফে নকল করা হয়েছিল। পাদ্রি মনোয়েলের কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ রোমান হরফে ছাপা হয়েছিল— এ কথা আগেই বলা হয়েছে। কিন্তু কোনো কারণে দোমের গ্রন্থ মুদ্রিত হয়নি। অন্যদিকে দেখা গেছে ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে এ পর্তুগিজ পাদ্রি মালয়ালি অক্ষর নির্মাণ করে তাতে নানা পুস্তক-পুস্তিকা ছেপে বের করেছিলেন। বাংলাদেশের পর্তুগিজ পাদ্রিরা একটু চেষ্টা করলেই এখানেও মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করে বাংলা হরফ ঢালাই করতে পারতেন। তাহলে আমাদের বাংলা হরফের জন্য আঠারো শতকের সপ্তম দশক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো না, দোমের পুস্তিকা এ দেশেই ছাপা হতে পারত।

দোম আন্তোনিয়ো নিজে বাঙালি ছিলেন। বাল্যকাল পর্যন্ত বাঙালি পরিবারেই মানুষ। পরে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হলেও বাঙালি হিন্দুর ধর্ম সংস্কার ও আচার-আচরণ সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন। তিনি মনে হয় অল্প-বিস্তর সংস্কৃতও জানতেন। এ পুস্তিকায় তিনি কয়েকটি সংস্কৃত শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন। অবশ্য তাতে ভুলের সংখ্যা প্রচুর। বাংলা গদ্যের সেই সময়ের লিখিত রূপ সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা ছিল তার।

একদা বাঙালি হিন্দু থাকায়, হিন্দু ধর্ম ও সেই ধর্মের আচার-আচরণের আপাত ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে তিনি বেশ সচেতন ছিলেন। ফলে হিন্দু ধর্মের ওপর তার আক্রমণ অনেক সময় তীব্র হয়ে উঠেছে। সমালোচকরা বলেন, তার কোনো কোনো মন্তব্য, যা শুধু খ্রিস্টান পাদ্রির মুখে প্রয়োগ করা হয়েছে, তার কিছু যৌক্তিকতা আছে— এটি স্বীকার করতে হবে। (ভূমিকা, পুরাতন বাংলা গদ্য গ্রন্থ, সম্পাদনা অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, প. বঙ্গ বাংলা আকাদেমি) দোম যে যুক্তি বিচারের মানদণ্ডে হিন্দু ধর্মকে কাটাছেঁড়া করেছেন, সেই একই অস্ত্র রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্ট ধর্মেও প্রয়োগ করা যায়।

সমালোচকরা বলেন, দোম আন্তোনিয়ো ভুলে গিয়েছিলেন যুক্তিতর্ক দিয়ে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সত্যাসত্য নির্ণয় হয় না। দোমের বইয়ের প্রশ্ন ও উত্তর পড়লে মনে হবে ব্রাহ্মণ অতি সহজেই খ্রিস্টান গুরুর কাছে মাথা পেতে দিয়েছেন এবং যুক্তিতর্কের লড়াইটা হয়েছে একপেশে। ‘কলমটি ছিল রোমান ক্যাথলিকের প্রচারকের হাতে। সেটি কোনো ব্রাহ্মণের হাতে থাকলে গ্রন্থটি নিশ্চিত ভিন্ন রূপ ধারণ করত।’

অশিক্ষিত, ধর্মজ্ঞানহীন নিম্ন বর্ণের হিন্দু সমাজে খ্রিস্ট ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে পর্তুগিজ প্রচারকরা তত্ত্বকথার খুব গভীরে প্রবেশ করা বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেননি। একইভাবে দোম আন্তোনিয়ো তার গ্রন্থে ওজনদার তত্ত্বকথা এড়িয়ে গভীর কোনো তত্ত্বদর্শনে প্রবেশ করেননি। মূল আক্রমণের লক্ষ্য ছিল, হিন্দুর যেসব পৌরাণিক কাহিনী অলৌকিক যুক্তি বিশিষ্ট মনে হয়েছে, তিনি বেছে বেছে শুধু সেগুলোকেই আক্রমণ করেছেন। দোমের বইয়ের ভাষার জড়তা নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। অনেকের ধারণা, পর্তুগিজ খ্রিস্টান মিশনারিদের সঙ্গে সংস্পর্শের জন্যই হয়তো দোম আন্তোনিয়োর ভাষায় প্রায় নানা ধরনের খুঁত দেখা যায়। অথবা রোমান লিপ্যন্তরীকরণের ফলে মূলের জাতকুল নষ্ট হয়ে গেছে। এসব সমালোচনা সত্ত্বেও তারা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন যে পুরনো বাংলা গদ্যের দৃষ্টান্ত হিসেবে এ বইয়ের মূল্য অপরিসীম।

দোমের বই সম্পর্কে বেশকিছু বলা হলো। এবার আমরা দেখব কেমন ছিল তার বইয়ের ভাষা। ক্ষুদ্র এ পুস্তকখানি অলঙ্কারশাস্ত্রের হিসাবে নগণ্য হলেও এর গুরুত্বহানি হয়নি। এ বইখানিতে প্রশ্নোত্তরে হিন্দু ধর্মের তুলনায় খ্রিস্ট ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। বইখানি ‘ক্যাটেকিস্ট’-এর টেক্সট, অর্থাৎ দোম আন্তোনিয়োর ধর্ম প্রচারের বক্তৃতার লিখিত রূপ। প্রশ্নোত্তরে খ্রিস্ট ধর্মের মূলতত্ত্ব যারা ব্যাখ্যা করেন, তাদের ‘ক্যাটেকিস্ট’ বলে। দোম আন্তোনিয়ো এ রকম একজন ক্যাটেকিস্ট ছিলেন। ফলে তার গ্রন্থে ব্রাহ্মণ একেকটি অবতারের প্রসঙ্গ করে এগোতে থাকেন আর পাদ্রি সঙ্গে সঙ্গে দোষ দেখিয়ে ব্রাহ্মণের যুক্তি খণ্ডন করে বীরদর্পে এগিয়ে চলেন।

গ্রন্থটি রোমান হরফে লিখিত। দৃষ্টান্তস্বরূপ রোমান হরফে লেখা এবং বঙ্গীয়কৃত অংশ নিচে দেয়া হলো।

Bramance— Tomi care bhoso?

Rom— Poromexorere Purno Bromere.

B— Tobe tomora boro utom bhosna bhoso, amora tahre bhusi.

R— Zodi tomora xei Purno Bromere bhoso tobe queno eto cubit cudhoram nana odhormo bhosona deqhi?

B— Tomi emot guiamonto hoia amardiguer Peromexorere ninda coroho? ehate tomardiguer xastre oparniman nahi.

R— Amarghore xastre liqhiasen ze zon dhormo ninda core, xe boro naroqui; ebons ze zon odhormere dhormo bole xe moha naroqui.

B—Tobe to tomardiguer xastre * * ze ninda corile moha naroqui hoe; tobe queno ninda corila?

R— Amito dhormo ninda corina, dhormere dhormo cohi; odhoremere odhormo cohi; puniore punio cohi; zononire zononi cohi; strire stri cohi; Bromere Bromon cohi; Chondalere dhondal cohi; dhugdere dhugdo cohi; Gochonere gochona cohi; Omerter omerto cohi; bixere bix cohi: emot cothae punio bade pap nahi; ehate protoque na zanile dhormadhoremo zanite na pare; poriname(e) mucti na hoe eha na zanile, e caron ehare ninda na cohi.

B— Etoze tomi cohila, ch amare prothoquie buzhaiba; quintu dhormadhorma tini loaen. Dharmo tini odhorma tinil.

R— Exocal protoqhie buzhaibo zemot ziguaxa coroho; dhormadhormo tini loaenna dhormo carzio corte xastor diassen tahan crepac, amora [o] dhorom carzio, coria, tahan xastre longona coria amora pap cori; tin xastrete bemoti deen. Pixonio, Bhut ar xorir; ei xocol bromia tahan odharmo amora cori; ei ze dhormadhormotonuxare bhog diben; xoto carzio cori; tobe mucti diben;

ব্রাহ্মণ— তোমি কারে ভজো?

রোম— পরমেশরেরে পূর্ণো ব্রমেরে।

ব্র— তবে তোমোরা বরো উতম ভজোনা ভজো, আমোরা তাহারে ভজি।

রো— যদি তোমরা সেই পূর্ণো ব্রমেরে ভজ তবে কেনো এতো কুবিত

কুধরাণ নানা অধর্মো ভজোনা দেখি?

ব্র— তুমি এমত গিয়ামোন্তো হইয়া আমারদিগের পরমেশরেরে নিন্দা করহ?

এ হাতে তোমারদিগের শাস্ত্রে অপারনিমান নাহি?

রো— আমারঘোর শাস্ত্রে লিখিয়াছেন যে জন ধর্মো নিন্দা করে, সে বড়ো নারোকী এবং যে জন অধর্মেরে ধর্মো বলে সে মহা নারোকী।

ব্র— তবে তো তোমারদিগের শাস্ত্রে *** যে নিন্দা করিলে মহা নারোকী

হএ; তবে কেনো নিন্দা করিলা?

রো— আমিতো ধর্ম নিন্দা করিনা, ধর্মেরে ধর্মো কহি; অধর্মেরে অধর্মো কহি; পুণ্যোরে পুণ্যো কহি; জননীরে জননী কহি; স্ত্রীরে স্ত্রী কহি; ব্রমেরে ব্রমণ কহি; চণ্ডালেরে চণ্ডাল কহি; ধুগদেরে ধুগদো কহি; গোচোনেরে গোচনা কহি; অমেরতেরে অমেরতো কহি; বিষেরে বিশ কহি; এমত কথাএ পুণ্যো বাদে পাপ নাহি; এহাতে প্রতখ্যে না

জানিলে ধর্মাধর্মো জানিতে না পারে; পরিণামে মুক্তি না হএ এহা না

জানিলে একারণ এহারে নিন্দা না কহি।

ব্র— এতো যে তুমি কহিলা, এহা আমারে প্রতখ্যে বুঝাইবা; কিন্তু ধর্মাধর্মো

তিনি লওয়াএন, ধর্মো তিনি অধর্মো তিনি।

রো— এ সকল প্রতখ্যে বুঝাইবো যেমত জিজ্ঞাসা করহ; ধর্মাধর্মোর তিনি লওয়াএন না, ধর্মো কার্য করিতে শাস্তোর দিয়াছেন তাহান ক্রেপাএ; আমোরা [অ] ধর্মো কার্যো করিয়া তাহান শাস্ত্রে লঙ্গনা করিয়া আমোরা পাপ করি। তিন শাস্ত্রতে বেমতি দিন, পিশুন্যো, ভূত আর শবীর; এই সকল ব্রমিয়া তাহান অধর্মো আমোরা করি; এই যে ধর্মাধর্মোতোনুসারে ভোগ দিবেন, সত্কার্য করি। তবে মুক্তি দিবেন।

গবেষকদের অভিমত, ব্রাহ্মণ-রোমান ক্যাথলিক সংবাদ পড়তে গেলে দেখা যায়, রোমান হরফে লিপ্যন্তরীকৃত বলে বাংলা শব্দের উচ্চারণ অনেক সময়ে বিপর্যস্ত হয়েছে। মানোয়েলের ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’ গ্রন্থেও একই ব্যাপার ঘটেছে। কোনো কোনো সময়ে অর্থবোধেও বিশেষ বিঘ্ন হয়েছে। দোমের বইয়ের রোমান হরফে লেখা পুঁথির বাংলা লিপ্যন্তরীকরণ করেছেন ওই গ্রন্থের সম্পাদক ড. সুরেন্দ্রনাথ সেন। মনোয়েলের বইটি প্রথম থেকেই রোমান হরফে লেখা অথবা বাংলা হরফ থেকে রোমান হরফে রূপান্তর করা হয়েছিল কিনা, তা জানা যায় না। গবেষকদের অভিমত, আড়াইশ বছর আগে ইউরোপে ধ্বনিতত্ত্ব অনুযায়ী বর্ণমালার ব্যবহার হয়নি। ফলে পর্তুগিজ পাদ্রিরা ধ্বনিতাত্ত্বিক লিপ্যন্তরীকরণ রীতির কিছুই অবগত ছিলেন না। সুতরাং তাদের রোমান হরফে লেখা বানানে বাংলা শব্দের আকৃতি কোনো কোনো সময়ে পুরোপুরি বদলে গেছে। এমনকি কোনো কোনো শব্দের রূপ এত দ্রুত বদলে গেছে যে তার অর্থবোধে নানা অসুবিধা হয়।

জেসুইট ও অগাস্টিন পাদ্রিদের গোয়ার খ্রিস্টান কর্তৃপক্ষকে পাঠানো প্রতিবেদন বা পত্রগুলো ছাড়া দোম আন্তোনিয়োর জীবনের তথ্য বা ব্যক্তিগত পরিচয় আর অন্য কোনো সূত্র থেকে জানা যায় না। তার প্রথম জীবনের কাহিনী মোটামুটি বিস্তৃতভাবে বলা হয়েছে ১৬৭৮ খ্রিস্টাব্দের লেখা জেসুইট পত্রে এবং ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দে লেখা অগাস্টিন পাদ্রিদের চিঠিতে। এগুলো সবই ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ইংরেজি অনুবাদসহ যত্নের সঙ্গে রক্ষিত আছে। গবেষকদের অভিমত, দোম আন্তোনিয়ো সম্পাদনকৃত জেসুইটদের কাহিনী প্রাচীনতম ও পুণ্যতম। জেসুইট ও অগাস্টিন পত্রে রাজপুত্র দোমের ভূষণা থেকে অপহরণ, পরে তার ধর্মান্তকরণ ও নতুন খ্রিস্টান নাম ধারণ এবং ১৭ জানুয়ারি ১৬৬৬-এ চট্টগ্রাম মগ-ফিরিঙ্গি চিরতরে মুক্ত হলে তার স্বদেশে প্রত্যাবর্তন— এসব তথ্যই আমরা উভয়ের সূত্রেই পেয়েছি। দোম আন্তোনিয়োর পিতৃদত্ত নাম, জন্ম, বয়স, ধর্ম, আকৃতি-প্রকৃতি সম্পর্কে অগাস্টিনরা তথ্য দিতে পারেননি। শুধু বলেছেন দোম আন্তোনিয়ো ভূষণার রাজপুত্র।

জেসুইটদের প্রতিবেদন থেকে প্রথম জানা যায়, অপহূত বালকটি হিন্দু এবং ভূষণার প্রাচীন রাজবংশের সন্তান। রাজপুত্র এবং প্রাচীন রাজবংশের সন্তান সমার্থক বলা চলে না। ড. সুরেন্দ্রনাথ সেনও ভূষণার রাজপুত্রের বংশপরিচয়ের সন্ধান পাননি। অনেক গবেষকের ধারণা, দোম আন্তোনিয়ো সম্ভবত বারো ভূঁইয়াদের সম্পর্কিত এবং পরাজিত সত্রাজিত রায়ের বংশের ছেলে। অগাস্টিনরা তাকে বরাবরই রাজপুত্র বলে চালাতে বেজায় ব্যস্ত ছিল।

উদ্দেশ্য রাজপুত্র কথাটি নিংড়ে রোমাঞ্চ সৃষ্টি করা, নিজ সম্প্রদায়ের মর্যাদা বৃদ্ধি করা— লিখেছেন তারাপদ মুখোপাধ্যায়। জেসুইটদের লেখায় রাজপুত্রের অপহরণের সময় বলা হয়নি। তবে দোম আন্তোনিয়োর জীবনের কয়েকটি ঘটনা সম্পর্কে জেসুইটদের পত্রে সময় নির্দেশ আছে। নির্দেশগুলো পুরোপুরি ভুল মনে করারও যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই, বিশেষ করে বিরুদ্ধ প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত। কোনো কোনো গবেষকের এ অভিমত। তারা আরো বলেন, ঘটনার কাল সম্পর্কে জেসুইটদের ধারণা স্পষ্টতর ছিল। তার একটা দৃষ্টান্ত: জেসুইটদের কাহিনীতেই দোম আন্তোনিয়োর এক ঐতিহাসিক পুরুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল বলে জানা যায়। এ ঐতিহাসিক ব্যক্তি বাংলাদেশের মোগল সুবেদার নবাব শায়েস্তা খান। জেসুইটদের সূত্র থেকে আরো জানা যায়, কয়েকজন মুসলমানকে ধর্মান্তর করার অপরাধে শায়েস্তা খানের বিরাগভাজন হয়ে দোম আন্তোনিয়ো কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। বিচারে ইসলাম ধর্ম ত্যাগীদের বেত মারার শাস্তি হলো। দোম আন্তোনিয়ো শাস্তির হাত থেকে রেহাই পেলেন। তবে তাকে সতর্ক করে দেয়া হলো এই বলে যে, কোনো মুসলমানকে ধর্মান্তর করা দণ্ডনীয় অপরাধ (সম্রাট শাহজাহানের ফরমানে এ বিধান জারি হয়েছিল)। যদি ভবিষ্যতে তিনি এমন অপরাধ করেন, তবে তার কঠোর শাস্তি হবে। বিনা শাস্তিতে কারামুক্ত হয়ে দোম আন্তোনিয়ো ভরসা পেয়ে শায়েস্তা খানের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। দোমের দারিদ্র্য ও ধর্মানুরাগ দেখে শায়েস্তা খানের সহানুভূতি হলো। তিনি দোমের প্রার্থনা মঞ্জুর করে ভূষণা জেলায় কিছু পতিত জমি তাকে বরাদ্দ করলেন সেখানে ধর্ম প্রচারের কেন্দ্র স্থাপন করার জন্য। এছাড়া চারটি গ্রামের চৌধুরী পদ দিলেন। এ চারটি গ্রামের আয় থেকে সরকারের খাজনা দেয়ার পর যা থাকবে তা দোম আন্তেনিওর প্রাপ্য। পরে অবশ্য শায়েস্তা খান চৌধুরীর পদ প্রত্যাহার করেছিলেন। কিন্তু ভূষণার পতিত জমি দোম আন্তোনিয়োর অধিকারেই রইল। একটি আশ্রম বানিয়ে শিষ্যদের নিয়ে সস্ত্রীক তিনি সেখানে বাস করতে লাগলেন। মনে হয় দোম মুসলমানদের ধর্মান্তরিত না করার নির্দেশ পুরোপুরি মেনে চলেছিলেন। কারণ তার এ জমি নবাব পুনরায় তাকে খাজনার বিনিময়ে বরাদ্দ দিয়েছিলেন। শায়েস্তা খানের কাছ থেকে যে পতিত জমি দোম পেয়েছিলেন, তার দলিলপত্র সম্পর্কে গবেষকরা কোনো তথ্য দিতে পারেননি। তবে ঘটনাটি জেসুইটদের বানানো নয়, তার প্রমাণ অগাস্টিন পাদ্রিদের পত্রেও রয়েছে। তারাও লিখেছেন, নবাব শায়েস্তা খান সম্পূর্ণ একটি গ্রাম বরাদ্দ করেছিলেন। সময়ের এ নির্দেশগুলোর সাহায্যে দোম আন্তোনিয়োর জীবনের কয়েকটি প্রধান ঘটনার আনুমানিক সময় নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দোম আন্তোনিয়োর জীবনের কয়েকটি প্রধান ঘটনার আনুমানিক সময় নির্ধারণ সম্ভব। তার জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর আনুমানিক সময়—

জন্ম: ১৬৪৩ খ্রি., অপহরণ— ১৬৪৯, স্বদেশে প্রত্যাবর্তন— ১৬৬৬, বিবাহ ১৬৬৬, গ্রন্থ রচনা— ১৬৬৮, হুগলি গমন— ১৬৭৪, ধর্মনগর— ১৬৮০, মৃত্যু— ১৬৯৫। জেসুইটদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিন্ন হওয়ার পর দোম আন্তোনিয়োর কোনো সংবাদ জানা যায়নি।

এবার একজন প্রত্যক্ষদর্শী পাদ্রি, যিনি দোমকে স্বদেশে দেখেছিলেন এবং আট মাস একসঙ্গে পূর্ববঙ্গে থেকে দোমের খ্রিস্টান উপনিবেশগুলো ঘুরে দেখেছিলেন, তার বিবরণ আলোচনা করা যাক। এ প্রত্যক্ষদর্শীর নাম ফাদার আন্তোনিও মগলহএস। তার এ বিবরণ লন্ডন ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। গবেষকরা এর অনুবাদের সাহায্যে জেসুইট পাদ্রিদের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেছেন।

তিন

বাংলায় দোম আন্তোনিয়োর মিশনারি কাজে সাফল্যের কাহিনী শুনে আগ্রার জেসুইট পাদ্রিরা বিস্মিত ও উত্ফুল্ল। বাংলায় তখন অগাস্টিন সম্প্রদায়ের প্রাধান্য। জেসুইটের প্রভাব বেশ স্তিমিত। তারা দোমের মিশন সম্পর্কে খুব কমই জানেন এবং আরো বিশদ জানার জন্য আগ্রা জেসুইট কলেজের রেক্টর ফাদার আন্তেনি মগলহএসকে এ কাজের দায়িত্ব দেয়া হলো। আগ্রার জেসুইটদের আগ্রহের আরো একটা বড় কারণ হলো, বাংলাদেশের কাছাকাছি বলে আগ্রা থেকে তারা সহজেই পৌঁছে যাবেন দোম আন্তোনিয়োর মিশনে সাহায্য করার জন্য। এছাড়া দোমের মিশন বাংলার যে অঞ্চলে, সে অঞ্চল সম্পর্কে মগলহএসের যথেষ্ট জ্ঞান ছিল এবং স্থানীয় ভাষায়ও তিনি দক্ষ।

আট মাসের বেশি দোম আন্তোনিয়োর সঙ্গে তার সব মিশন ঘুরে মগলহএস আগ্রায় ফিরে এলে দোম আন্তেনিওর সমসাময়িক অবস্থা সম্পর্কে মগলহএসের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ গোয়ায় ও লিসবনে পাঠানো হয়। এ বিবরণ ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ৯৮৫৫ সংখ্যক পুঁথির ৯৯-১০৯ পাতায় ২ আগস্ট ১৬৭৮ খ্রিস্টাব্দে গোয়ার-প্রভিনশিয়ালকে পাঠানো হয়। (সূত্র: ইতিহাসে উপেক্ষিত/তারাপদ মুখোপাধ্যায়, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা)

এ বিবরণটি প্রত্যক্ষদর্শীর চোখে দেখা দোম আন্তোনিয়োর প্রচারক জীবন ও তার সমসাময়িক অবস্থা জানার এক মূল্যবান দলিল। এবার শোনা যাক মগলহএস কী তথ্য আমাদের জন্য রেখে গেছেন।

মগলহএসের তিন মাসেরও কিছু বেশি সময় লেগেছিল বাংলায় পৌঁছতে। কারণ প্রায় দুই সপ্তাহ তিনি আগ্রায় আটকে ছিলেন। বহু কষ্টের পর বাংলায় পৌঁছে তিনি খবর পেলেন দোমের খ্রিস্টান উপনিবেশ ঢাকায়।

 

কেমন দেখতে ছিলেন দোম আন্তোনিয়ো? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে মগলহএসের লেখা দোমের দৈহিক বর্ণনার দ্বারস্থ হতে হবে। এ বর্ণনায় দোমের একটি চমত্কার কলমচিত্র রয়েছে।

দোম আন্তোনিয়ো লোকটি বেঁটেখাটো। গায়ের রঙ কালো। মুখখানা কৃশ এবং একটু রুক্ষও। দেখে মনে হয় তার বয়স ৪০ কিন্তু আসল বয়স চল্লিশের নিচে। বয়সের তুলনায় তাকে বয়স্ক দেখায়। ঐহিক ঐশ্চর্য বলতে তার কিছু নেই কিন্তু পারমার্থিক ঐশ্বর্যের দ্যুতিতে তিনি ভাস্বর। নিজের জাতের একটি মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে। তার সহধর্মিণীও খ্রিস্টান এবং আধ্যাত্মিক ব্যাপারে স্বামীর অনুগামিনী। দোম আন্তোনিয়োর বাড়িতে স্ত্রী ছাড়া তার মা ও পিতামহ আছেন। অপরিসীম দায়িত্বের মধ্যে তারা জীবন যাপন করেন। গ্রামখানিই দোম আন্তোনিয়োর একমাত্র সম্পত্তি।

এরপর মগলহএস দোমের আর্থিক দুরবস্থা এবং তার প্রতিকূল পরিবেশ নিয়ে বেশকিছু তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ধর্মনগর গ্রামখানিই দোমের একমাত্র সম্পত্তি। গ্রামটির বার্ষিক খাজনা ১০০ টাকা ধার্য করা আছে। কিন্তু গ্রাম থেকে বা অন্য কোনো সূত্রে তার উপার্জন কিছুই নয়। তাই খাজনার দায়ে নিয়মিত তিনি রাজকর্মচারীদের হাতে লাঞ্ছিত হন। তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে মগলহএসের ধারণা হলো, খ্রিস্ট ধর্মতত্ত্বে দোমের পাণ্ডিত্য প্রগাঢ় এবং ধর্ম সাধনায় তিনি একাগ্রচিত্ত। মগলহএস আলোচনা প্রসঙ্গে দোমকে জানালেন, তিনি দোমের নবদীক্ষিত খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য উত্সুক। একথাও জানাতে মগলহএস ভুললেন না যে, তাদের সঙ্গে একত্রে বসবাস করে আধ্যাত্মিক ও মানসিক উন্নতিতে সব রকম সাহায্য করার ইচ্ছা নিয়েই তার বাংলাদেশে আগমন। দোম এ কথা জেনে অত্যন্ত উত্ফুল্ল হয়ে নবদীক্ষিত খ্রিস্টানদের গ্রামগুলো ঘুরে দেখাবেন বলে রাজি হলেন। মগলহএস জানাচ্ছেন, গ্রাম পর্যটনের এ পরিকল্পনা অতর্কিতে একটা বড় বাধার মুখে পড়ল। পূর্ববঙ্গে তখন অগাস্টিন ক্যাথলিকদের প্রভাব খুব বেশি। জেসুইট পাদ্রিদের তারা প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে প্রীতির চোখে দেখেন না। লাড়িকল বন্দরের অগাস্টিন পাদ্রি মগলহএসের গতিবিধির ওপর কড়া নজর রেখেছিলেন। কী উদ্দেশ্যে তিনি বাংলায় এসেছেন, দোমের সঙ্গে কী বিষয়ে কথাবার্তা হয়েছে, সে খবরও এ অগাস্টিন পাদ্রির কাছে এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে।

পরদিন দোম আন্তোনিয়ো মগলহএসের সঙ্গে দেখা করতে এসে জানালেন, অগাস্টিন পাদ্রি রূঢ় এবং স্পষ্ট ভাষায় দোমকে অনেক তিরস্কার করেছেন। যার সারমর্ম: অগাস্টিনদের স্নেহে ও যত্নে দোম আন্তোনিয়ো মানুষ হয়েছেন। একজন অগাস্টিন ফাদার তাকে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষা ও শিক্ষা দিয়েছেন। দোম আন্তোনিয়ো যেসব হিন্দুকে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষা দিয়েছেন, তারাও অগাস্টিন সম্প্রদায়ভুক্ত। অন্য সম্প্রদায়ের লোককে এ অগাস্টিন খ্রিস্টানদের মধ্যে নাক গলাতে দেয়া শুধু নির্বুদ্ধিতার নয়, বিশ্বাসঘাতকতা। এ বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তাকে সম্প্রদায় থেকে বিতাড়িত করা হবে। খ্রিস্ট ধর্ম প্রচার করার অধিকারও দোম আন্তোনিয়োর থাকবে না। জেসুইট পাদ্রির সঙ্গ পরিত্যাগ না করলে দোম আন্তোনিয়োর পরিণাম যে কী ভয়াবহ হবে, তার বিশদ উল্লেখ করে আন্তোনিয়োকে গুরুতর হুমকি দেয়া হলো। মগলহএস দোমকে সান্ত্বনা দিয়ে বুঝিয়ে বললেন যে, সম্প্রদায় থেকে বিতাড়িত করার হুমকিতে তিনি যেন ভয় না পান। এখানকার পাদ্রিদের হাতে সম্প্রদায় থেকে বিতাড়িত করার ক্ষমতা নেই। দোমের প্রধান ও প্রথম কর্তব্য মগলহএসের ভাষায় নবদীক্ষিত খ্রিস্টান শিষ্যদের প্রতি। তাদের শুধু খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষাই দেয়া হয়েছে। দীক্ষার পরে খ্রিস্ট ধর্মতত্ত্বে তাদের যে নিয়মিত শিক্ষা দেয়ার প্রয়োজন, সে দীক্ষা তাদের দেয়া হয়নি। সুতরাং খ্রিস্টান হয়েও তারা খ্রিস্ট ধর্ম অনুসারে জীবন যাপন করছে না। এ বাধা কাটিয়ে না উঠতে পারলে দোম ও তার নবদীক্ষিত শিষ্যদের উভয়েরই অমঙ্গল। তার কথায় দোমের সাহস হলো। মগলহএসকে খ্রিস্টানদের গ্রামে নিয়ে যেতে রাজি হলেন দোম। যাওয়ার ব্যবস্থা গোপনে এবং এমন সতর্কতার সঙ্গে করা হয়েছিল যে অগাস্টিন পাদ্রিরা বিন্দুমাত্র টের পাননি বলে মগলহএস তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন। মাসে কুড়ি টাকা ভাড়ায় একখানা নৌকা নিয়ে গোপনে এক অন্ধকার রাতে মগলহএস ও দোম আন্তোনিয়ো বেরিয়ে পড়লেন। ঢাকায় পৌঁছে শুনলেন দোমের উপনিবেশ ঢাকায় নয়, ঢাকার কাছাকাছি লাড়িকল নামের জায়গায়। [শিহাবুদ্দিন তালিশের বিবরণে Ladhikol একটি সমৃদ্ধ নৌবন্দর। এখানে অনেক ফিরিঙ্গি ব্যবসায়ীর বাস। তাদের লবণের ব্যবসা ছিল। এ জায়গাটি চণ্ডীপুরের ১৩ মাইল পশ্চিমে। Rennell-এর ম্যাপে (প্রথম ম্যাপ) জায়গাটির বানান Luricol]

লাড়িকল পৌঁছে তিনি শুনলেন দোমের নিবাস ধর্মনগর নামে একটি গ্রামে। গ্রামটির প্রতিষ্ঠাতা দোম আন্তোনিয়ো। নামকরণও তার (সম্ভবত এ গ্রামটিই দোম নবাব শায়েস্তা খানের ঔদার্যে লাভ করেছিলেন)। মগলহএস ধর্মনগর যাত্রা করলেন। কিন্তু লোকের দুর্ব্যবহারে আর বিরোধিতায় ধর্মনগরে ঢুকতে পারলেন না তিনি। লাড়িকলে ফিরে আসতে বাধ্য হলেন। তিনি দোমকে চিঠি লিখে লাড়িকলে এসে দেখা করার জন্য নৌকাসহ এক পত্রবাহককে ধর্মনগর পাঠালেন। চারদিন অপেক্ষার পর নৌকাসহ পত্রবাহক দোমের চিঠি নিয়ে ফিরে এল। দোম আন্তোনিয়ো এলেন না। তবে চিঠিতে দোম জানালেন, তিনি অবিলম্বে দেখা করতে পারছেন না। কারণ জেলা প্রশাসক চৌধুরীর কাছে দোমের কিছু খাজনা বাকি পড়ে আছে। চরম অর্থাভাবের জন্য বাকি খাজনা শোধ করার উপায় তার নেই। তার নিজের গ্রামের মধ্যে তিনি নজরবন্দি হয়ে আছেন। যে লোকটি চিঠি নিয়ে এসেছিল, মগলহএস তার হাতে তত্ক্ষণাৎ কিছু টাকা দিয়ে তাকে ধর্মনগর পাঠালেন। ‘সেই টাকায় নিজেকে খালাস করে সেদিনেই দোম আন্তোনিয়ো আমার (মগলহএস) সঙ্গে দেখা করতে এলেন। সাক্ষাৎ হতেই আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম’— লিখেছেন মগলহএস। মগলহএস নদীপথে যাত্রা এবং যেসব গ্রামে দোমের শিষ্যরা রয়েছে সেসব পরিদর্শন করে গ্রামের নাম, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা ইত্যাদি বিশদ বর্ণনা তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন। তিনদিন চলার পর দোমের খ্রিস্টান শিষ্যদের যে গ্রামে তিনি প্রথম উপস্থিত হয়েছিলেন, তার নাম আকিনপুর (হাকিমপুর?)। যেখানে ৫০০ ঘর খ্রিস্টানের সঙ্গে মগলহএসের পরিচয় হয়। এভাবে তিনি প্রায় ৫০-৬০টি গ্রামে সশরীরে উপস্থিত হতে পেরেছিলেন। শরীর অসুস্থ থাকায় তিনি শুধু নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোই পরিদর্শন করেছেন। পায়ে হেঁটে নদীর তীর ছেড়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেননি। যেসব গ্রামে গেছেন সেখানে দোমের খ্রিস্টান শিষ্যদের সংখ্যা গণনা করেছেন এবং প্রত্যেক গ্রামের পাশে সংখ্যা দিয়ে প্রতিবেদন সম্পূর্ণ করেছেন। তবে স্বীকার করেছেন যে, অনেক গ্রামেই তিনি যেতে পারেননি। এসব গ্রাম অগাস্টিন সম্প্রদায়ের পাদ্রির এলাকা।

মগলহএস তার প্রতিবেদনে দোম আন্তোনিয়ো ভূয়সী প্রশংসা করে মন্তব্য করেছেন, ‘একটি সাধারণ লোক (দোম আন্তোনিয়ো) ধর্ম প্রচারের কাজে যার বিন্দুমাত্র শিক্ষা বা পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না, তিনি যদি এত স্বল্প সময়ের মধ্যে ৩০ হাজার লোককে ধর্মান্তরিত করতে পারেন, তাহলে আমরা পেশাদার ধর্মযাজকরা, যাদের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা দীর্ঘকালের, তারা গোটা দেশটাকে খ্রিস্টান করে ফেলতে পারব না কেন।’ মগলহএসের এ আশাবাদ অবশ্য পূর্ণ হয়নি।

দোম আন্তোনিয়োর সঙ্গে আট মাস বাংলাদেশের গ্রামে-প্রাঙ্গণে ঘুরে, তার খ্রিস্টান শিষ্যদের সঙ্গে  কথা বলে মগলহএস গোয়ায় যে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ পাঠিয়েছেলেন, সম্ভবত তার জেরেই বাংলাদেশে জেসুইট পাদ্রিদের প্রচার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর পরই মগলহএস বাংলা ছেড়ে আগ্রায় ফিরে যান। বাংলায় তার স্থলাভিষিক্ত হন পাদ্রি সাতুচ্চি। তিনি ঠিক কতদিন পূর্ব বাংলায় ছিলেন, তা সঠিক বলা যায় না। সাতুচ্চি কিন্তু মগলহএসের মতো দোম আন্তোনিয়োকে নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখাননি। বরং তাকে নিরাশই করেছিলেন। দোম আন্তোনিয়ো অগাস্টিন সম্প্রদায়ভুক্ত হলেও তার জেসুইট ও অগাস্টিন উভয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। অগাস্টিনদের হুমকিও ছিল জেসুইটদের সঙ্গে মেলামেশার অপরাধের জন্য। পরবর্তীতে দুই সম্প্রদায়ের কাছেই দোম আন্তোনিয়ো অপরাধী। জেসুইটের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে তিনি অগাস্টিনদের বিরাগভাজন হন। হুমকিতে ভয় পেয়ে অগাস্টিনদের দলে আবার ফিরে যাওয়ায় জেসুইটদের কাছে অপরাধী। দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দলের একটির সঙ্গে শেষ পর্যন্ত থাকলে সম্ভবত তিনি দুই দলেরই বিরাগভাজন হতেন না বলে অনেকেই মতামত ব্যক্ত করেছেন।

দোম আন্তোনিয়োর জেসুইটদের সঙ্গে যোগাযোগের একটি কারণই প্রধান বলে মনে করেন তারাপদ মুখোপাধ্যায়। দোমকে অপহরণের পর অগাস্টিন পাদ্রি কিনে নিয়েছিলেন। সুতরাং অগাস্টিনদের চোখে তিনি ক্রীতদাস। জেসুইটরা কখনো এমন কথা বলেননি, আর আন্তোনিয়োর দীক্ষাদাতা মানোয়েল পাদ্রি তাকে কখনই ক্রীতদাসের মতো দেখেননি, সে রকম ব্যবহারও করেননি। চট্টগ্রামে দীক্ষাদাতা মানোয়েলের স্নেহচ্ছায়ায় দোম মানুষ হয়েছিলেন। দেশে ফিরে দোম দেখলেন এখানে অবস্থা অন্য রকম। ফলে তিনি নিজের এবং তার শিষ্যদের আত্মসম্মানের ব্যাপারে সচেতন হয়েছিলেন। এ অসম্মান ও অমর্যাদায় ক্লান্ত দোম অগাস্টিন সম্প্রদায় ত্যাগ করে সম্ভবত মুক্ত হতে চেয়েছিলেন। তবে জেসুইটদের কাছেও তার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। গোয়ার অগাস্টিন প্রভিনশিয়াল বাংলাদেশে জেসুইটদের ধর্ম প্রচারের আবেদন মঞ্জুর করেনি। ফলে বাংলাদেশে জেসুইটরা প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। সেই বিরোধিতা অতিক্রম করার অর্থবল ও জনবল অনেকটাই জেসুইটদের ছিল না। মগলহএসের উত্তরাধিকারী সাতুচ্চির কাছ থেকে তেমন উৎসাহব্যঞ্জক সাড়া তিনি পাননি। ফলে নিরুপায় হয়ে আবার দোম অগাস্টিনদের কাছেই ফিরে গিয়েছিলেন। তারপর কতদিন দোম আন্তোনিয়ো বেঁচেছিলেন তা অনুমানের বিষয়। কিন্তু যতদিন বেঁচে থাকুন, স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি উৎসাহ নিয়ে ধর্ম প্রচারে নেমেছিলেন, সেই উদ্যম ততদিনে শেষ হয়ে গেছে। অনেকেই বলেন, দু’পক্ষকেই খুশি করতে গিয়ে দোমের জীবন এক ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে এ দুই বিবদমান প্রতিদ্বন্দ্বীর দ্বৈরথেই দোম আন্তোনিয়ো নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিলেন। দারিদ্র্য নিপীড়িত সমসাময়িকদের চোখে অবহেলিত। সমাজে অবহেলিত এ মেধাবী বাঙালি গদ্যকার ও কুশলী প্রচারক বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন। ইতিহাস তাকে মনে রাখেনি, শুধু ব্রাহ্মণ রোমান ক্যাথলিক সংবাদের পাতায় তিনি বেঁচে রয়েছেন।

লেখক:মাহবুব আলম

 

 

 

সূত্র: বণিক বার্তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ