নির্বাচনের রাজনীতি বনাম রাজনীতির বিতর্ক

লেখালেখি যতটা, ঘটনার তৎপরতা তার চেয়ে অনেক বেশি। বারবার বুঝিয়ে দিচ্ছে চলতি বছরটা বর্তমান পর্যায়ে এসে প্রবলভাবেই নির্বাচনের। অন্য সব ঘটনা তলিয়ে যাচ্ছে নির্বাচনী স্রোতের টানে। নির্বাচনী রাজনীতির জোয়ার দেশজুড়ে। বলা বাহুল্য, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গুরুত্বই যেন ভিন্নমাত্রার। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি, বাকিরা আপাতত গৌণ। তবু জোট-মহাজোট কম নয়। আওয়ামী লীগ এবার মরিয়া তার শাসনক্ষমতা ধরে রাখতে। তাদের ভাষায়, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে। কারণ তারা ব্যাপক উন্নয়ন কর্মযোগে হাত লাগিয়েছে। সেগুলো শেষ করতে হলে আরেকবার ক্ষমতায় আসা দরকার। এটাই তাদের প্রধান নির্বাচনী স্লোগান। অন্যদিকে এতদিন নির্বাচন বর্জন করে নির্জীব বিএনপি এবার জেগে উঠেছে এমন বোধোদয়ে যে, দলকে টিকিয়ে রাখতে হলে এ পর্যন্ত অনুসৃত নেতিবাচক রাজনীতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করে তুলতে হবে। নতুবা সামনে সমূহ বিপদ। ইতিমধ্যে দলে অনেক বিপর্যয় ঘটে গেছে। তারা ক্ষমতাসীন থাকাকালে অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা না করে ক্ষমতার দাপটে যেসব কাণ্ড ঘটিয়েছিল, বিএনপিকে এখন তার মাসুল দিতে হচ্ছে। দলীয় প্রধান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এখন কারাগারে। তিনি আবার নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত।

ঘটনা কি কাকতালীয়, না অন্য কিছু! রাজনীতির ভবিতব্য যে, দীর্ঘ সময় পর গুরুত্বপূর্ণ একাদশ সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে দলীয় প্রধানের এ দুর্নীতি মামলার টানে তার কারাজীবন শুরু; অন্যদিকে ঠিক এ সময়েই কি-না বহু আলোচিত গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণা। এ রায় বিএনপিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছুটা হলেও কোণঠাসা করে ফেলেছে। এ ঘটনা নিয়ে তারা যতই প্রতিবাদী চিৎকার করুন না কেন, ভবি ভোলার নয়। তৎকালীন ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে ওই দায় মেটানো কঠিন। এ বিষয়ে তারেক-বাবরদের কর্মকাণ্ড ইতিহাস হয়ে আছে। সমকালীন সংবাদ ভাষ্যগুলো তাদের পক্ষে নয়। অবশ্য ভুলভ্রান্তি রাজনৈতিক দলমাত্রেরই কর্মপরিসরে ঘটে থাকে। কিন্তু এ রক্তাক্ত ঘটনা মেনে নেওয়া বা হজম করা কঠিন; অস্বীকার তো নয় বটেই।

দুই

এমন পরিস্থিতিতে দলে ও জোটের রাজনীতিতে শক্তির সঞ্চার ঘটাতে সম্ভবত কোনো কোনো শুভানুধ্যায়ী বা কথিত উপদেষ্টার পরামর্শে বিএনপির রাজনৈতিক জোট সম্প্রসারণ প্রক্রিয়ায় ড. কামাল হোসেন প্রমুখ একাধিক সংগঠনের সহযোগে ঐক্যফন্ট গঠিত। অনেক সমারোহে। কিন্তু বহু আলোচিত এ ঘটনা প্রত্যাশিত জোয়ার আনতে পারেনি রাজনীতির অঙ্গনে। তবে সম্ভাবনা নেই- এমন কথা হয়তো বলা যাবে না। তাই আওয়ামী লীগ এই জোট-ঐক্যের দুর্বল বিন্দু নিয়ে যথারীতি প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ কারণে একে ‘ষড়যন্ত্রের রাজনীতি’ নামে অভিহিত করে চলেছে। এ বিষয়ে যেমন মন্ত্রী পর্যায়ের সদস্য, তেমনি দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বও সমানতালে নানা অভিযোগ নিয়ে সরব। বলতে হয়, রাজনীতির মাঠ সরগরম বাদ-প্রতিবাদে। শারদীয় উৎসবে ঢাকিদের ঢাক বাজানোর মতোই প্রচারের আওয়াজে জমজমাট রাজধানী থেকে শহর-বন্দর। সংবাদপত্রগুলোতে এ বিষয়ে উপসম্পাদকীয়, নিবন্ধ লেখার ধুম যে যার মত ও পক্ষ নিয়ে। কারণ কুরুক্ষেত্র শুরু হওয়ার বেশি দেরি নেই। পর্যালোচনা চলছে রাজনীতির সমীকরণ, জোট রাজনীতির ভবিষ্যৎ এবং ভোট রাজনীতির সম্ভাব্য পরিণাম বা ভবিষ্যৎ নিয়ে।

বিএনপির এই মুহূর্তের বড় সমস্যা তার সর্বোচ্চ শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়ে। দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া কারাগারে একাধিক মামলায় জর্জরিত। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় হাইকোর্টে তার সাজা বাড়িয়ে পাঁচ থেকে দশ বছর করা হয়েছে। দ্বিতীয় প্রধান একই কারণে লন্ডন প্রবাসী। গ্রেনেড মামলার আপাতত রায় তার স্বদেশে ফেরার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে দল পরিচালনায় প্রধান নেতার অভাব। অভাব জনমত আকর্ষণ করার মতো ‘ক্যারিশমা’সম্পন্ন নেতার। এ ঘটনা বিএনপির জন্য যেমন রাজনৈতিক-সাংগঠনিক সমস্যা, তার চেয়ে বড় কথা নির্বাচন-প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা। এ দুর্বলতার বিশেষ একটি দিক হলো, দলের প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে কে ওই মর্যাদার স্থানটিতে আপাতত আসীন হতে পারবেন। বলা বাহুল্য, এ প্রশ্নেই শুরু হবে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও কোন্দল। কেউ কাউকে আসন ছেড়ে দিতে চাইবে না। নাম উল্লেখ না করেই এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা চলে।

ঘটনাটি আওয়ামী লীগের জন্য তুরুপের তাস বলা চলে। এটা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের না জানা বা না বোঝার কথা নয়। তাদের এই বিশেষ ক্ষেত্রে এক পা এগিয়ে থাকার বাস্তবতা সত্ত্বেও তাদের শীর্ষ নেতৃত্বে সম্প্রতি বাস্তবায়িত বিএনপির সমস্যাসংকুল ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে অস্বস্তি বিরাজ করছে। তাদের বিএনপিবিরোধী কঠিন কঠিন উচ্চারণের নেপথ্যে এই অস্বস্তি বা শঙ্কারই প্রকাশ। শঙ্কা ঢাকতে তাদের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের নানামাত্রিক বিএনপিবিরোধী বক্তব্য বা বিবৃতি চলছে একাধারে। বিএনপি কি এ রাজনৈতিক তাৎপর্যের সত্যটি বোঝে? বিচক্ষণ রাজনীতিবিদদের পক্ষে তা না বোঝার কথা নয়। হয়তো তাই চরম রাজনৈতিক দুর্দশার মধ্যেও বিএনপি শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে নির্বাচন নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ পাচ্ছে। যদিও তারা হয়তো জানেন, এ নির্বাচনে জয়লাভ তাদের মোটেই সহজ নয়, বরং বলা চলে কঠিনের চেয়ে কঠিন তাদের দলনেত্রী খালেদা জিয়া বিহনে। আর সে জন্যই তাদের প্রতিটি সভায়, বৈঠকে বা জনসভায় দলনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রশ্ন প্রধান হয়ে উঠছে। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেনেড মামলার রায়ের বিরুদ্ধে তাদের উচ্চারণ অবশ্য আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়ার অংশ। দলের নেতৃত্বঘটিত দুর্বলতা পূরণ তাদের জন্য বলা বাহুল্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

দলনেতৃত্বের উল্লিখিত ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে, কার পরামর্শে জানি না, তবে অনুমান করা চলে, দল প্রধানের স্থলে জোট প্রধান রাজনৈতিক অঙ্গনের একজন পরিচিত মুখ, পরিণত বয়সী বা বয়স্ক রাজনৈতিক নেতাকে বেছে নিতে হয়েছে বিএনপিকে। কারণ হালের মাঝি কাণ্ডারি ছাড়া নির্বাচনী-বৈতরণী পার হওয়ার লড়াই চালানো কঠিন। এ বাছাই পর্ব আবার সমস্যাও তৈরি করে। একদিকে দলের পূর্বতন নেতা সাবেক রাষ্ট্রপতি বি. চৌধুরী, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে আসা বর্তমান গণফোরাম নেতা প্রখ্যাত আইনজ্ঞ ড. কামাল হোসেন। যিনি ব্যক্তি পর্যায়ে নির্বাচনী রাজনীতির ক্ষেত্রে সফল হিসেবে পরিচিত নন। এ দুইয়ের দ্বন্দ্বে বিএনপি ড. কামাল হোসেনকেই জোট নেতৃত্ব তথা ঐক্যফ্রন্টের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নিয়েছে সম্ভবত ড. হোসেনের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে, নিজ দলীয় একদা নেতার পরিবর্তে। আর সম্ভবত প্রধান পদটি হাতে না পাওয়ার কারণে ডা. বি. চৌধুরীর ঐক্য-উদ্যোগে সহযোগী হয়েও শেষ পর্যন্ত ঐক্যফ্রন্ট থেকে সরে যাওয়া।

তিন

এসবই একজন রাজনৈতিক বিশ্নেষকের জন্য কিছু ‘যদি’ ‘হয়তো’ ইত্যাদি শব্দনির্ভর যুক্তিতর্কের কথা। কেননা দলের একান্ত ভেতরের অপ্রিয় সত্যগুলোর বাস্তব চালচিত্রের সবকিছু জানা সম্ভব হয় না। প্রসঙ্গত ঐক্যফ্রন্ট সম্বন্ধে দু’একটি প্রশ্নবিদ্ধ তথ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন বিএনপির নির্বাচনী রাজনীতির আশা-আকাঙ্ক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে ড. কামাল হোসেনের সাম্প্রতিক বক্তব্য-বিবৃতির সঙ্গতি-অসঙ্গতি নিয়ে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমান নির্বাচন সামনে রেখে তাতে অংশগ্রহণ বিএনপির জন্য অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম শর্ত ও জয়ের স্বপ্নপূরণ সেদিক থেকে প্রধান বিষয়, যাতে নির্বাচনে জয়লাভ করে বন্দি খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা যায় এবং তারেক রহমানকে নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে আনা যায়। আগেই বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অবস্থাদৃষ্টে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় তাদের পক্ষে মোটেই সহজ নয়। তবু তাদের ভাবনা, চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী?

বিএনপির দিক থেকে ঐক্যফ্রন্ট গঠন যে নির্বাচনী যাত্রায় জয়লাভের আশা নিয়ে- সে সম্পর্কে প্রশ্ন বা ভিন্নমতের কি কোনো অবকাশ আছে? কারণ, তাদের প্রধান লক্ষ্য তো নির্বাচনে জয়ী হয়ে দলীয় প্রধানের মুক্তি নিশ্চিত করা। অথচ ড. কামাল হোসেন সম্প্রতি গণফোরাম আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন ভিন্ন কথা। তার বক্তব্যমতে, ‘ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনী জোট নয়। ফ্রন্ট গঠনের উদ্দেশ্য সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য জনমত গঠন করা।’ ঐক্যফ্রন্টের সূচনালগ্নের বক্তব্য-বিবৃতিতে এমনটি কারও মনে হয়নি এবং পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত বিবরণেও তেমন ধারণার প্রকাশ ঘটেনি। বরং এর ভিন্ন বা বিপরীত চিন্তাই সম্ভবত প্রকাশ পেয়েছিল তখন। ড. কামাল হোসেনের এ বক্তব্য কি বিএনপির পক্ষে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হবে? কিন্তু অবাক হওয়ার মতো বিষয় যে, এ প্রসঙ্গে বিএনপি নেতৃত্ব কোনো প্রতিবাদ বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেনি। এর আগেও ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, তিনি কোনো উচ্চপদ লাভের আশায় ঐক্যফ্রন্ট গঠনে এগিয়ে আসেননি। যাই হোক, এবার ড. কামালকে দেখা যাচ্ছে দেশের প্রধান শহরগুলোতে সভা বা জনসভা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে দৃঢ়কণ্ঠে নিজ বক্তব্য তুলে ধরতে। এর সূচনা ঐক্যফ্রন্টের চট্টগ্রাম সমাবেশে।

লালদীঘি ময়দান বিভাগপূর্ব কাল থেকেই রাজনৈতিক ঘোড়দৌড়ের মাঠ হিসেবে পরিচিত। সেখানে সমাবেশ অনুষ্ঠানের অনুমতি না পেয়ে ঐক্যফ্রন্ট ২৭ অক্টোবর (২০১৮) তাদের দলীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় সমাবেশের আয়োজন করে। সেখানে নেতাদের প্রত্যয়ী ঘোষণা :’সাত দফা আদায় না করে ফিরব না।’ অন্যদিকে স্বভাবে-বক্তব্যে নম্র কামাল হোসেনের এ সভায় ঘোষণা তুলনামূলক বিচারে অনেক কঠিন।

এসব বক্তব্যের অন্তর্নিহিত সত্য বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। হয়তো তাই একই দিনের কাগজে প্রকাশিত একদিকে আওয়ামী লীগ দলের সভানেত্রীর আহ্বান নৌকাকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করার জন্য, অন্যদিকে জয়-এর ঘোষণা :’কোনো শক্তি নেই ভোটে আওয়ামী লীগকে হারাবে।’ আসলে বর্তমান রাজনৈতিক তৎপরতার একই লক্ষ্য :আগামী নির্বাচনে জয়লাভ। আমাদের দৈনিকগুলোর অধিকাংশ পরিসরজুড়ে নির্বাচনী তৎপরতার খবরাদি এবং আলোচনা-পর্যালোচনা। একসময় নির্বাচনের মাঠে আওয়ামী লীগ-বিএনপি ছিল নিকট প্রতিদ্বন্দ্বী। পর্যায়ক্রমে জয়-পরাজয়। তবে এখন অবস্থা কিছুটা হলেও ভিন্ন। আওয়ামী লীগের পালে বাতাসের জোর অধিক বলে জল্পনা-কল্পনা, লেখালেখি। তবু রাজনীতিতে, বিশেষত নির্বাচনে শেষ কথা বলে কিছু নেই। এটাও এক রাজনৈতিক সত্য। তাই এ মুহূর্তে জয়-পরাজয় নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী সম্ভব নয়। তবু নানা হিসাব-নিকাশে সম্ভাবনার দিক থেকে আওয়ামী লীগ কিছুটা এগিয়ে।

লেখক : আহমদ রফিক

ভাষাসংগ্রামী, প্রাবন্ধিক, রবীন্দ্র গবেষক, কবি

 

সূত্র : সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ