বিরলপ্রজ কবি

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকালে ‘এখন যৌবন যার, মিছিলে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়’-এর মতো অনুপ্রেরণাদায়ী পঙ্‌ক্তি লিখে বাংলা কবিতায় জায়গা করে নেন হেলাল হাফিজ। তাঁর কবিতা সংগ্রাম-মিছিল- দেয়াল লিখনের কাব্যভাষা হয়ে অভ্যুত্থানের উজ্জীবনী হিসেবে কাজ করলেও প্রেম ও বিরহের কবি হিসেবে তাঁকে আবিস্কার করা যায়।

কবিতার মানের ব্যাপারে নিরাপস হেলাল হাফিজ দেশপ্লাবী কবি পরিচিতির পরও বই প্রকাশে সময় নেন দেড় যুগের বেশি। কাব্যচর্চায় তিনি পারফেকশনিস্ট, সৎ, আপসহীন ও ভাঁড়ামিমুক্ত। যেনতেন কবিতা সংকলন করে বইয়ের সংখ্যা ও আকার বাড়াতে কখনোই চাননি। দেড় শতাধিক কবিতা থেকে মাত্র ৫৬টি কবিতা বাছাই করেন গ্রন্থভুক্ত করার জন্য। পুরোপুরি তৃপ্ত না হওয়ায় পত্রিকায় প্রকাশিত অনেক কবিতাও বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে চাননি। কবির এই সংযম যে ফলদায়ী; ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত বহুল আলোচিত কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ প্রকাশের পরই তা বোঝা যায়। প্রকাশের পরই এ বই নিয়ে আলোড়ন ওঠে; আপামর পাঠক মহল তা লুফে নেয়। রাতারাতি বিক্রি হয়ে যায় প্রথম সংস্করণের সব কপি। বইয়ের কবিতাগুলো উঠে যায় মানুষের মুখে মুখে। পাঠকদের উত্তরোত্তর চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক দিনের মধ্যে প্রকাশ করতে হয় বেশ কয়েকটি সংস্করণ। মাত্র ৫৬টি কবিতা দিয়ে বাংলা সাহিত্যে জায়গা করে নেয়া, পরবর্তীকালে খুব কম লিখে কিংবা না লিখে বিগত তিন দশকের বেশি সময় ধরে কবিতাক্ষেত্রে নিজেক প্রাসঙ্গিক রাখা সাহিত্যশিল্পে বিরল বললে অত্যুক্তি হয় না। হেলাল হাফিজকে তাই বিরলপ্রজ কবি বলতে দ্বিধা থাকে না।

কবি হেলাল হাফিজ ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর জন্ম নেন নেত্রকোনার তেলিগাতীতে। আগে থেকে কাব্যচর্চা করলেও ঊনসত্তরে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতা প্রকাশের পর রাতারাতি কবি হিসেবে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। গণঅভ্যুত্থান ও সমসাময়িক পটভূমিতে এই কাব্যভাষা এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল তখন, ঢাকার এমন কোনো দেয়াল ছিল না যাতে উৎকীর্ণ হয়নি ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়’। এই আন্দোলন-সংগ্রামের পটভূমিতে কবি হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও তিনি কার্যত প্রেম ও বিরহের কবি। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’তে অধরা প্রেমাস্পদের প্রতি কবির আজন্ম প্রেম, বিরহ ও আত্মহাহাকার উচ্চকিত হয়ে উঠেছে। কবিতাগুলোর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে বেদনাবৃত্তে নিমজ্জিত একজন নিঃসঙ্গ মানুষের প্রতিকৃতি। ব্যক্তিগত জীবনে কবি যেমন নিঃসঙ্গ, নির্লোভ, সংসারহীন, নিভৃতচারী ও প্রেমিক মানুষ; তার কবিতার মধ্য দিয়েও তেমন একটি প্রতিকৃতি খুঁজে পাওয়া যায়। বহু কবিতা ও পঙ্‌ক্তির উল্লেখ করা যায়, যেখানে কবি হেলাল হাফিজ প্রেম ও বিরহকাতর মানুষ হিসেবে আবিস্কৃৃত হন। তবে মুক্তিযুদ্ধপূর্ব ও মুক্তিযুদ্ধোত্তরকালে লেখা কবিতায় মিছিল-সংগ্রামের সুর ধ্বনিত হয়েছে। কখনো প্রেমিকাকে ছেড়ে যুদ্ধে যাচ্ছেন কবি, কখনো সংগ্রাম আর অস্ত্রের প্রেমে মগ্ন হয়েছেন। ‘দুঃসময়ে আমার যৌবন’ কবিতায় কবি বলছেন- ‘এরকম দুঃসময়ে আমি যদি মিছিলে না যাই,/ উত্তরপুরুষে ভীরু কাপুরুষের উপমা হবো/ আমার যৌবন দিয়ে এমন দুর্দিনে আজ/ শুধু যদি নারীকে সাজাই’। যুদ্ধের সময় সংগ্রাম যুদ্ধকে প্রেমিক বানিয়েছিলেন, যুদ্ধ থেকে ফিরে প্রেমিকার কাছে আকুতি করছেন ‘জীবন বাজি ধরেছিলাম প্রেমের নামে, রক্তঋণে স্বদেশ হলো/ তোমার দিকে চোখ ছিল না/ জন্মভূমি সেদিন তোমার সতীন ছিলো।…আজকে আবার জীবন আমার ভিন্ন স্বপ্নে অংকুরিত অগ্ন্যুৎসবে/ তোমাকে চায় শুধুই তোমায়’। …তবু সবই ব্যর্থ হবে/ তুমি কেবল যুঁই চামেলী বেলী ফুলেই মগ্ন হলে।/ তার চেয়ে আজ এসো দু’জন জাহিদুরের গানের মতন হৃদয় দিয়ে বোশেখ ডাকি, দু’জীবনেই বোশেখ আনি’। ‘অস্ত্র সমর্পণ’ কবিতায় অস্ত্রই ছিল তার প্রেম ‘মারণাস্ত্র মনে রেখো ভালবাসা তোমার আমার। /নয় মাস বন্ধু বলে জেনেছি তোমাকে, কেবল তোমাকে। …মনে আছে, আমার জ্বালার বুক/ তোমার কঠিন বুকে লাগাতেই গর্জে উঠে তুমি/ বিস্টেম্ফারণে প্রকম্পিত করতে আকাশ, আমাদের ভালবাসা/ মুহূর্তেই লুফে নিতো অত্যাচারী শত্রুর নিঃশ্বাস’।

কবি হেলাল হাফিজের কবিতাগুলোর নিচে সৃজনকাল উল্লেখ থাকায় কবিতার পটভূমি বুঝতে সুবিধা হয়। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র ৫৬টি কবিতা ষাট, সত্তর ও আশির দশকে লেখা। ১৯৭৬ সালের পর প্রথম কবিতাটি ১৯৮০ সালের। ছয় বছর বিরতির পরের কবিতাটির নাম ‘প্রত্যাবর্তন’। ‘প্রত্যাবর্তনের পথে/ কিছু কিছু ‘কস্টলি’ অতীত থেকে যায়।/ কেউ ফেরে, কেউ কেউ কখনো ফেরে না। কেউ ফিরে এসে কিছু কিছু পায়/ মৌলিক প্রেমিক আর কবি হলে অধিক হারায়। তবু ফেরে, কেউ তো ফেরেই,/ আর জীবনের পক্ষে দাঁড়ায়,/ ভালবাসা যাকে খায় এইভাবে সবটুকু খায়’। বুঝতে অসুবিধা হয় না কবি প্রেম, বিরহ, ব্যর্থতায় সব হারিয়ে হতাশায় নিমজ্জত হয়েছিলেন। দীর্ঘ বিরতির পর হয়তো তিনি কবিতা ও জীবনে ফিরে এসেছেন। জীবনের হতাশা ও শূন্যতা আরও স্পষ্ট হয়েছে ‘মানবানল’ কবিতায়… ‘আগুন পোড়ালে তবু কিছু রাখে/ কিছু থাকে, / হোক না তা ধূসর শ্যামল রঙ ছাই,/ মানুষে পোড়ালে আর কিছুই রাখে না/ কিচ্ছু থাকে না,/ খাঁ খাঁ বিরান, আমার কিছু নাই’। কবির ছন্দপ্রয়োগ টনটনে। তাঁর কবিতায় সব ছন্দই আশ্চর্য জাদুতে খেলা করেছে। তবে তবলার বোলে আবৃত্তির মতো যে ছড়াছন্দ স্বরবৃত্ত, সেটিতেও কবি আশ্চর্য গাম্ভীর্য আনতে সক্ষম হয়েছেন। বিষয় ও কাব্যভাবনা স্বরবৃত্তে এমনভাবে প্রকাশ করেছেন, যা অতুলনীয়। উদাহরণ দিচ্ছি-

‘রঙিন শাড়ির হলুদ পাড়ে ঋতুর প্লাবন নষ্ট করে/ ভরদুপুরে শুধুই কেন হাত বেঁধেছো বুক ঢেকেছো/ যুঁই চামেলী বেলীর মালায়,/ আমার বুকে সেদিন যেমন আগুন ছিলো/ ভিন্নভাবে জ্বলছে আজও,/ তবু সবই ব্যর্থ হবে/ তুমি কেবল যুঁই চামেলী বেলী ফুলেই মগ্ন হলে’ (অগ্ন্যুৎসব)।

‘মাটির সাথে মিশে গিয়ে জৈবসারে গাছ বাড়াবো/ ফুল ফোটাবো, গোলাপ গোলাপ স্বদেশ হবে/ তোমার আমার জৈবসারে।/ তুমি আমি থাকবো তখন/ অনেক দূরে অন্ধকারে, অন্যরকম সংসারেতে’ (অন্যরকম সংসার)।

‘তোমার বুকে বুক রেখেছি বলেই আমি পবিত্র আজ/ তোমার জলে স্নান করেছি বলেই আমি বিশুদ্ধ আজ’ (হিরণবালা)।

‘ঘরের কষ্ট, পরের কষ্ট পাখি এবং পাতার কষ্ট/ দাড়ির কষ্ট/ চোখের বুকের নখের কষ্ট,/ একটি মানুষ খুব নিরবে ‘নষ্ট হবার কষ্ট আছে/ কষ্ট নেবে কষ্ট’ (ফেরিওয়ালা)।

‘জন্মাবধি ভেতরে এক রঙিন পাখি কেঁদেই গেলো/ শুনলো না কেউ ধ্রুপদী ডাক,/ চৈত্রাগুনে জ্বলে গেলো আমার বুকের গেরস্থালি/ বললো না কেউ তরুণ তাপস এই নে চারু শীতল কলস’ (যাতায়াত)।

‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ই শুধু নয়; কবির বহু পঙ্‌ক্তি মানুষের মুখে মুখে ফেরে। আপামর প্রেমিক, বিরহকাতর পোড় খাওয়া মানুষ, সংগ্রামী যুবা সবাই কবির পঙ্‌ক্তিতে খুঁজে পান নিজের কণ্ঠ। পাঠকের হৃদয়ের কথাটি অকপট সততায় বাক্যবন্দি করার কঠিন কাজটি হেলাল হাফিজ করেছেন অবলীলায়। ‘ভালবাসা যাকে খায়, এইভাবে সবটুকু খায়’, ‘মূলতই ভালবাসা মিলনে মলিন হয় বিরহে উজ্জ্বল’, ‘একমানবী কতোটাই বা কষ্ট দেবে’, ‘নিউট্রন বোমা বোঝো, মানুষ বোঝো না’, ‘আমি নিপুণ ব্লটিং পেপার’, ‘আমাকে পাবে না খুঁজে, কেঁদে কেটে, মামুলী ফাল্‌গুনে’, ‘একাই ছিলাম আমি পুনরায় একলা হলাম’, ‘আমার কষ্টেরা ভালই আছেন’, ‘আমি তোমাদের ডাক নাম উদার যমুনা’, ‘মানুষে পোড়ালে আর কিছুই রাখে না’, ‘আমার মতো ক’জনের আর সব হয়েছে নষ্ট’, ‘স্বাধীনতা সব খেলো, মানুষের দুঃখ খেলো না’, ‘কেউ ডাকে না তবু এলাম, বলতে এলাম ভালবাসি’, ‘আমি ছেড়ে যেতে চাই, কবিতা ছাড়ে না’, ‘একবার ডাক দিয়ে দেখো আমি কতোটা কাঙাল’, ‘দুঃখের আরেক নাম হেলাল হাফিজ’- এ রকম বহু পঙ্‌ক্তি মানুষের মুখে মুখে।

হেলাল হাফিজ কবি বিরলপ্রজ, স্বল্পবাক ও অন্তরালপরায়ণ। এ রচনা তার কবিতার পূর্ণাঙ্গ আলোচনা নয়; কয়েকটি প্রবণতার উল্লেখমাত্র। জীবনভর লেখা শতাধিক কবিতা থেকে মূলত বেরিয়েছে তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থ (২০১২ সালে প্রকাশিত ‘কবিতা একাত্তর’-এর ৭১টি কবিতার ৫৬টিই আগের বই থেকে নেয়া)। এর মধ্য দিয়ে তুমুলভাবে জনপ্রিয় হয়ে পাঠক ও ভক্তকুলের কাছে নিজের অনিবার্য প্রাসঙ্গিককতা অটুট রেখেছেন তিনি। যোগাযোগ, তদবির, প্রশস্তিপ্রিয় যুগে নিভৃতচারী কবির এই সাফল্য তাঁর ঈর্ষণীয় সৃষ্টির মাধুর্যকেই বড় করে তোলে।

লেখক : মাহমুদ হাফিজ

 

সূত্র : সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ