ব্রিটিশদের বাংলায় আগমন

[ডব্লিউ কে ফার্মিঙ্গার ক্যালকাটা হিস্ট্রিক্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯১৪ সালের অক্টোবর সংখ্যা ঢাকা রিভিউতে প্রকাশিত তার নিবন্ধ ‘THE COMING OF THE ENGLISH TO BENGAL 1630-1698’-এর কিছুটা সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর উপস্থাপন করা হলো]

অগ্রগামী ইংরেজ বণিকদের একটি দল ১৬২০ সালে আগ্রা হয়ে সুরাট পৌঁছে, বিহারে বাণিজ্যিক বসতি স্থাপনের এ প্রাথমিক প্রচেষ্টা পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

১১ বছর পর টমাস রবিনসন বাংলায় পৌঁছার একটি উদ্যোগ নেন। ২৯ জুলাই ১৬৩১ তিনি মাসুলিপত্তম ত্যাগ করেন কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তার জাহাজ ‘হোপওয়েন’ বন্দরে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। পরের বছর টমাস উডসন ‘পার্ল’ জাহাজে বাংলার উপসাগরের দিকে রওনা হন। উদ্দেশ্য সিসা, অভ্র, সিঁদুর, পোশাকের বদলে চাল, মাখন ও অন্য ধরনের পোশাকের বিনিময় বাণিজ্য করা এবং বাংলায় বাণিজ্যের সম্ভাবনা উদ্ঘাটন। কিন্তু উল্টো দিকের প্রবল বাতাস পার্ল জাহাজকে গন্তব্যে পৌঁছতে দেয়নি। পার্ল ফিরে আসে।

১৬৩৩ সালে মাসুলিপত্তমে অবস্থানকারী কোম্পানির এজেন্ট বাংলা থেকে কাপড়ের জোগান বৃদ্ধির বিষয়ে উদারীকরণের জন্য দেশী নৌকায় আটজন ইংরেজকে ওড়িশা উপকূলে পাঠালেন। এ ভ্রমণের একটি বর্ণিল বিবরণ দিয়েছেন উইলিয়াম বার্টন। এ বিবরণ পাওয়া যাবে ১৭৫২ সালে প্রকাশিত “অসবর্ণ’স কালেকশনস অব ভয়েজেস অ্যান্ড ট্র্যাভেলস” গ্রন্থে। কটকের দরবারে আগমন নিয়ে বার্টন লিখেছেন:

৯ মে-র মধ্যে আমরা সবাই একত্রিত হলাম এবং রাতের বেলা কটকের উদ্দেশে (নৌকায়) রওনা হলাম। ১০ মে অপরাহ্ন ২টায় আমরা হারাপুর শহরে পৌঁছলাম এবং আমাদের দোভাষীর বাড়িতে বিশ্রাম নিলাম। ১১ মে আমরা শহরের গভর্নরের সঙ্গে দেখা করলাম এবং তাকে রাজার দেয়া ফরমান দেখালাম। গভর্নর ফরমানকে অত্যন্ত সম্মান দেখালেন এবং তার পক্ষে সম্ভব সব ধরনের সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। তারপর গভর্নরের জন্য আনা একটি ছোট উপহার তাকে দেয়া হলো। ১২ মে টমাস কুলে হারাপুর এলেন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ, অন্য ইংরেজরা তার সঙ্গে যোগ দেয়। নিজেদের আবাসন তৈরি না হওয়া পর্যন্ত সময়ের জন্য আমরা একটি বাড়ি ভাড়া করলাম, এটি কোম্পানির অন্যান্য কাজে ব্যবহূত হবে… ১৪ মে দুজন ইংরেজ বণিক বেরিয়ে গৃহনির্মাণের উপযোগী একটি জমি খুঁজে পেলেন। তারা সেখানে রাজার ডিক্রি দেখালেন— এ জমি দখলের জন্য কেউ তাদের কিছু বলল না (কার্যত রাজকার্যে রাজার হুকুমে যখন জমির প্রয়োজন হয়, তার জন্য কোনো মূল্য প্রদান করা হয় না)। কটকের গভর্নর আগা মুহাম্মদ জামান তাদের সর্বাত্মক সহায়তা করেন।

বার্টন যে ফরমানের কথা বলেছিলেন, তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। সম্ভবত রাজার দেয়া কোনো ফরমান তাদের হাতে ছিল না। এটি সম্ভবত ওড়িশায় সুবাদার কিংবা কটকের নবাবের দেয়া ডিক্রি হয়ে থাকতে পারে।

শুরুর দিকে বাংলার কোম্পানির কর্মচারীদের মনে মোহময় একটি বিশ্বাস কাজ করত— রাজার (মোগলদের তারা রাজা মনে করত) নির্দেশে লেখা কোনো ফরমান তার অধস্তন সবাই আইন হিসেবে মানতে বাধ্য।

১৬৩৬ সালের ২৮ এপ্রিল তিনি লিখেছেন—

‘অন্য রাজকুমারদের ফরমানের মতো সহজেই রাজার ফরমানও জোগাড় করা সম্ভব… এটা এতই সম্মানীয় দলিল যে এটা দেখিয়ে সহজেই সম্পদ ক্রয় করা যায়। সবাই রাজাকে সম্মান করে কিন্তু সবাই মান্য করে না।’

কাজেই এ ফরমানে তেমন বেশি কিছু এসে যায় না; বরং গভর্নরের সঙ্গে সমঝোতা করার ওপর নির্ভর করে ফরমান অনুযায়ী বাস্তবায়ন কিংবা ফরমানের প্রত্যাখ্যান।

ইংরেজরা ফরমানের প্রহেলিকায় মজে ছিল। সম্রাটের ফরমানকে তারা ইংলিশ ক্রাউনের চার্টারের মতো বাধ্যতামূলক ও কার্যকর মনে করেছে।

কাজেই মোগল সম্রাটের ফরমান মান্য করার কথা থাকলেও স্থানীয় গভর্নর কিংবা ভাইসরয়ের সিদ্ধান্তই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সনদে প্রদত্ত অধিকার অনুযায়ী কোম্পানিকে বাণিজ্য করতে দেননি মুর্শিদাবাদের নবাব। কার্যত লর্ড ক্লাইভের অধীনে সামরিক আধিপত্য ইংরেজদের হাতে না আসা পর্যন্ত ফরমানের পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে যে, হরিহরপুর ও বালাসোরে কোম্পানির ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠিত করার পর সুরাটের ইংরেজ বণিক কার্টরাইট বাদশাহ শাহজাহানের কাছ থেকে বাংলায় বাণিজ্য পরিচালনার সনদ গ্রহণ করেন এ শর্তে যে, তাদের জাহাজ কেবল পিপলি বন্দরেই সীমিত থাকবে। স্টুয়ার্ট তার লেখায় ভুল বলেছেন যে, পিপলিতে ইংরেজরা তাদের ‘বাংলার ফ্যাক্টরি’ স্থাপন করে। এটা পিপলিতে হবে না, হবে হুগলিতে, ১৬৫০ সাল। সার্জন গ্যাব্রিয়েল বোউটন তার চিকিৎসাসেবা দিয়ে বাদশাহ শাহজাহানের প্রিয় কন্যা প্রিন্সেস জাহান-আরাকে সারিয়ে তুলে ইনাম হিসেবে নিঃস্বার্থভাবে বাদশাহর কাছে কোম্পানির বাণিজ্যের সব ধরনের অধিকার চেয়েছিলেন— এ কাহিনীটি পুরোপুরি বিশ্বাস করার মতো নয়। তবে উইলিয়াম ফস্টারের গবেষণায় (গ্যাব্রিয়েল বোউটন অ্যান্ড দ্য গ্রান্ট অব ট্র্যাডিং প্রিভিলিজেস টু দ্য ইংলিশ ইন বেঙ্গল) এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ভাবী বাদশাহ শাহজাদা সুজাকে প্রভাবিত করে ১৬৫১ সালে তিনি কোম্পানির হুগলি ফ্যাক্টরির জন্য ‘নিশান’ আদায় করেছিলেন। সুজা তখন বাংলার সুলতান এবং রাজমহল তার রাজধানী। এজন্য ৩ হাজার টাকা পেশকাশ প্রদান করে কোনো রকম শুল্ক প্রদান করা ছাড়া বাণিজ্যের অধিকার পেয়ে যায় ইংরেজ কোম্পানি।

বালাসোর থেকে মাসুলিপত্তম যাওয়ার পথে দস্যুর কবলে পড়লে পল ওয়াল্ডগ্রেইভের কাছ থেকে অন্যান্য দ্রব্যের সঙ্গে এ মূল্যবান দলিলটিও হাতছাড়া হয়ে যায়।

অত্যাবশ্যকীয় এ দলিলের কপি বের করার জন্য কোম্পানির বিলেজ সাহেব রাজমহলে সুলতানের দরবারে মিনতি জানান, সার্জন বোউটনের ভৃত্য জেমস প্রাইস একই রকম লেখাসংবলিত একটি নিশানের অনুলিপি উদ্ধার করে দেয়।

সুলতান শাহ সুজা ছিলেন বাদশাহ শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র। তিনি দিল্লির সিংহাসন দখল করতে চাইলে শাহজাহানের তৃতীয় পুত্র আওরঙ্গজেব তাকে পরাস্ত করেন এবং তিনি আরাকানিজদের হাতে নিহত হন। এটি মোগল ইতিহাসের একটি স্মরণীয় অধ্যায়। ১৬৫৯ থেকে মোগলদের পতন নেমে আসে, যখন ময়ূর সিংহাসনের জন্য ভাইদের আত্মঘাতী লড়াই শুরু হয়। ভ্রাতৃঘাতী লড়াইয়ে ভূমিকা নিতে গিয়ে শাহ সুজা চরম মূল্য দেন।

ওয়াল্টার ক্লাভেল ১৬৭৬ সালের ডিসেম্বরে লেখেন—

হুগলির সুবিধে জায়গাটি গঙ্গা নদীর তীরে, অনেক শাখা নদী এখানে এসেছে মিলেছে, যোগাযোগের অনেক বেশি সুযোগ। এটা আগে পর্তুগিজদের দখলে ছিল, এখান থেকে বছরে ৬০ থেকে ১০০টা বাণিজ্য জাহাজ ছাড়ত। ৪২ বছর ধরে তা আবার আরব বণিকদের দখলে চলে যাওয়ার পর বাংলার নবাব হিসেবে গভর্নর রাজমহল কিংবা ঢাকা যেখানেই থাকুন না কেন, এখানকার বাণিজ্যের সব কর তুলে নেন। কিন্তু ১৬৬৩-তে নবাব শায়েস্তা খানের সময় থেকে (প্রকৃতপক্ষে সময়টা হবে ১৬৬৬) হুগলি তার ব্যক্তিগত জায়গিরের অংশ হওয়ায় সেখানে নবাবের নামে যথেচ্ছাচার হতে থাকে। ছয় থেকে আট মাসের মাথায় হিসাব গুটিয়ে লভ্যাংশ প্রদানের হুকুম দেয়া হয়। তাতে এমনকি মূলধন থেকেও টাকা দিয়ে দিতে হয়। হুগলিতে বণিকদের প্রায় ৫০ শতাংশ লভ্যাংশ কর হিসেবে নবাবকে দিয়ে দিতে হয়, এতে বণিকদের মধ্যে ভীষণ অসন্তোষ বিরাজ করছে। তাছাড়া নবাবের উৎসব ভোজ, নিজের কিংবা ছেলের জন্মদিন, ছেলের খত্না, ছেলে বা মেয়ের বিয়ে, নবারের ঢাকা যাওয়া-আসার খরচ— হাজারো রকম কর দিতে দিতে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে।

ওয়াল্টার ক্লাভেলের বর্ণনায় রাজার দপ্তর ও নবাবের দপ্তরের বিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং বণিকরা কেমন শোষণের শিকার, তাও বোঝা যায়। স্টুয়ার্ট লিখেছেন: প্রিন্স আজিমুশ্বান চাইলেন ইউরোপ থেকে যত ধরনের দ্রব্যসামগ্রী বাংলায় আসবে, তিনি হবেন তার একক এবং একমাত্র বণিক। সুতরাং তিনি সব বন্দরে নিজের লোক নিয়োগ করলেন। তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দেয়া হলো বন্দরে আসা সব জাহাজের মালপত্র তারা কম দামে কিনে নেবে, তারপর যথেষ্ট লাভ রেখে তা পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করবে। ইংরেজ বণিকদের বিরুদ্ধে ঐশ্বর্যশালী হয়ে ওঠার অভিযোগ থাকলেও তারা হুগলির উজানে বাণিজ্যিক পণ্য পৌঁছানোর চেষ্টা করত। স্থানীয় উৎপাদনকারীদের উৎপাদন করার জন্য আগাম অর্থ দিতে হতো। তাঁতিরা এগিয়ে না এলে ইংরেজরাই টাকা নিয়ে তাদের কাছে যেত। কাসিম বাজার কুঠি খোলা হয় ১৬৫৮ সালে। ১৬৫৯ থেকে ইংরেজরা আবার প্রতিবেশী পাটনায় ঢুকে পড়ল। ১৬৫৮ সালের ৪ ডিসেম্বর ঢাকায় কুঠি স্থাপনের অনুমোদন দেয়া হলো। জিন দ্য থেভেনট ১৬৬৬ সালে ঢাকায় একটি ইংরেজ বাণিজ্যিক স্থাপনার কথা বললেন, ১৬৬৯-এর আগে এটা কার্যকর হয়ে ওঠেনি। এ সময় একজন চিফ নিয়োগ দেয়া হয়।

রাজমহল মুদ্রা বানানোর জন্য কোম্পানির কাছ থেকে ধাতবদ্রব্য কিনল। তাতে কোম্পানির সঙ্গে নবাবের বোঝাপড়ার পথ সুগম হলো। ১৬৭৬  সালের ১৪ অক্টোবর স্ট্রেনশাম মাস্টার তার ডায়েরিতে লিখেছেন, যেহেতু  রিচার্ড এডওয়ার্ডস মাননীয় কোম্পানির হয়ে রাজমহলের টাঁকশালে যাচ্ছেন, কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণে তিনি ভূমিকা রাখবেন এবং কোম্পানির মালদাতে পদক্ষেপ সুগম করবেন।

এডওয়ার্ড সাহেব ভালোই কাজ দেখালেন, তবে ১৬৮০ সালের আগে মালদায় বা তার ধারেকাছে কুঠি স্থাপিত হয়নি।

স্ট্রেনশামের মালদা ডায়েরিতে বলা হয়েছে, ২২ এপ্রিল ১৬৮০ মালদার অবস্থা আতঙ্কজনক, চার-পাঁচশ ঘোড়া নিয়ে আসা রাজার একটি বাহিনী বিনোদ রায়ের বাড়ির হিন্দু মন্দির ভেঙেছে, তার বাড়িতে আড়াই লাখ টাকা পেয়েছে। একজন বৃদ্ধাকে খুন করেছে।

শাহজাহানের ছেলেদের মধ্যে যখন লড়াই চলছে, হুগলি ফৌজদার ও ইংরেজদের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়। ইংরেজ কোম্পানি বিনা শুল্কে বাংলায় বাণিজ্য চালাবে, সেজন্য সুবেদারকে ৩ হাজার টাকা বার্ষিক পেশকাশ প্রদান করবে।

সুলতান শাহ সুজাকে তাড়িয়ে আনা জেনারেল মীর জুমলা বাংলার ভাইসরয় হয়ে রইলেন এবং তার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করলেন।

নবাবের বাহিনী কোম্পানির একটি যবক্ষারের (বারুদ তৈরিতে ব্যবহূত) নৌকা আটকে দিয়েছিল। ১৬৬০ সালে নবাবের একটি জাহাজ অবরোধ করে কোম্পানি প্রতিশোধ নিল। পরে তারা নবাবের কাছে নামমাত্র ক্ষমা চাইলেও এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৬৬৩-৬৪ সালের দিকে মীর জুমলার মৃত্যুর কারণ আসাম অভিযানে তার কঠোর শ্রম ও কষ্ট। তার মৃত্যুর পর সুবাদারি পেলেন সম্রাট আওরঙ্গজেবের মামা ও রাজদরবারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব শায়েস্তা খান।

স্টুয়ার্ট লিখেছেন, এ সময়ের আগে (শায়েস্তা খানের সুবাদারি গ্রহণ ১৬৬৪ সালে) গঙ্গা নদীতে কোনো ইংরেজের জাহাজ চলাচলের অনুমতি ছিল না, তবে দেখা যাচ্ছে শায়েস্তা খানের অনুমতি নিয়ে ১৬৬৯ সাল থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজ কোম্পানির অন্যান্য জাহাজ মোহনা থেকে পথ দেখিয়ে আনতে শুরু করে। ১৬৭২ সালে কোনো প্রকার শুল্ক না দিয়ে বাংলায় বাণিজ্যের আদেশ জারি করেন সুবেদার শায়েস্তা খান। শায়েস্তা খানের সময় থেকেই ফরাসি ও দিনেমাররা বাংলায় তাদের বাণিজ্যিক তত্পরতা শুরু করে।

আওরঙ্গজেবের অধীনে মোগল কর্মকর্তারা ইংরেজদের নাস্তিক বিবেচনায় তাদের সঙ্গে অত্যন্ত হীন আচরণ করতেন। তাদের ওপর জিজিয়া কর ধার্য করেন। অধিকন্তু, সুরাটে কোম্পানির দ্রব্যসামগ্রীর মূল্যের ওপর শতকরা সাড়ে তিন ভাগ শুল্ক প্রদানে বাধ্য করা হয়, বাংলায়ও একই পরিমাণ শুল্ক দাবি করা হয়।

১৬৮০ সালে কোম্পানি আওরঙ্গজেবের ফরমান পেয়েছিল কিন্তু তা ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। বার্ষিক ৩ হাজার টাকার বিনিময়ে বাংলায় বাণিজ্যের অধিকারই ছিল কার্যকর দলিল। এভাবেই একটি বাণিজ্যিক কোম্পানির বিনীত কর্মচারী হিসেবে ইংরেজরা বাংলায় প্রবেশ করে। তাদের বাণিজ্যের স্বাধীনতা ও সুরক্ষার জন্য নির্ভর করতে হয় স্থানীয় ক্ষমতার সদিচ্ছার ওপর।

ফরমান ও পরোয়ানায় এ ক্ষমতাসীনদের সদিচ্ছার ও ইংরেজ কোম্পানির আইনসম্মত অধিকারের প্রকাশ ঘটে। এটাও ভুললে চলবে না, ১৬৬১ সালে ব্রিটিশ সরকার কোম্পানিকে যে চার্টার দেয়, তাতে কোম্পানিকে ‘দুর্গ নির্মাণ করার, সেনাবাহিনী গড়ে তোলার এবং অ-খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার’ ক্ষমতা প্রদান করে।

কোম্পানির বাণিজ্য স্বার্থ রক্ষা করার জন্য দুর্গ নির্মাণ আসন্ন বলে বোঝা গেল এবং বাংলায় ইংরেজদের অবস্থানের ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হলো।

আওরঙ্গজেবের ফরমান লাভের পর নিঃসন্দেহে উচ্ছ্বসিত কোম্পানি ১৬৮২ সালে বাংলায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির কথা চিন্তা করে বাংলাকে মাদ্রাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এখানে স্বতন্ত্র প্রশাসন চালু করল। কোম্পানির একজন ডিরেক্টর উইলিয়াম হেজেসকে বঙ্গোপসাগরে তাদের চিফ এজেন্ট বা গভর্নর নিয়োগ করে পাঠিয়ে দিল। নতুন গভর্নর বিশ্বাস করলেন, তার দরকষাকষি করার উচ্চতর ক্ষমতা দিয়ে আগের সব পরোয়ানা ও ফরমানের সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠবেন। এর আগে মাদ্রাজের ফোর্ট সেইন্ট জর্জের (১৬৪৪ সালে মাদ্রাজ উপকূলে প্রতিষ্ঠিত দুর্গ) গভর্নর দুবার বাংলা সফরে এলে বাণিজ্যের সমস্যাগুলো দূর করতে যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তাতে সফল হননি; বরং ১৬৮২ সালে হুগলিতে তাদের বাণিজ্য সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

কোম্পানির প্রধান গ্রাহক বালাচন্দ্রের অভিযোগ ও গালাগাল শুনে নতুন গভর্নর উইলিয়াম হেজেস ১৬৮২ সালের অক্টোবরে শায়েস্তা খানের কাছে কিছু নালিশ পেশ করার জন্য ঢাকা রওনা হলেন। এরপর যা ঘটল তা গভীর মনোযোগের দাবি রাখে। স্থানীয় রাজস্ব কর্মকর্তা পরমেশ্বর দাস গভর্নর ও তার দলটিকে জাহাজে পাল খাটানোর অনুমতি দিলেন কিন্তু গোপনে একটি সশস্ত্র দলও পাঠিয়ে দিলেন, যাতে দূরে গিয়ে এ দলটিকে অবরোধ করে। যাত্রার পর অবরুদ্ধ হয়ে পাঁচদিন এ ইংরেজ দলের খুব অবমাননাকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কেটে গেল। তাদের ছাড়া হলে হেজেস রাতের বেলা ঢাকা রওনা হলেন। আরো অনেক লাঞ্ছনা সয়ে গভর্নর উইলিয়াম হেজেস ২৯ অক্টোবর ঢাকায় পৌঁছলেন। তিনি রাজধানী ঢাকায় ছয় সপ্তাহ অবস্থান করে প্রয়োজনীয় দরকষাকষি করেন।

হেজেস লিখলেন, একটি ফরমান লাভের জন্য সাত মাসের মধ্যে এই প্রথম ঢাকায় এলাম, আমদানির ওপর শতকরা পাঁচ ভাগ শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়ও আছে, এমনিতেই আমরা শতকরা দেড় ভাগ দিই, এটা তার অতিরিক্ত, আমাদের মালপত্র আটকানো বন্ধ করা থেকে বিরত থাকতে হবে, আমি পরমেশ্বর দাসকে তার জায়গা থেকে সরিয়ে দিতে চাই; আমি চাই আমাদের জন্য নবাব সম্রাটের কাছ থেকে একটি ফরমান জোগাড় করে দিন। ঈশ্বর যদি আমাকে সময় দেন, আমি চাই আমার জীবদ্দশায় তা আমার হাতে আসুক এবং কোম্পানি সব ধরনের মধ্যবর্তী বাধা ও সমস্যা থেকে মুক্ত থাকুক। সবার প্রত্যাশার বাইরে আমি ঢাকা সফরে যে সাফল্য লাভ করেছি, এজন্য ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই।

কিন্তু গভর্নর উইলিয়াম হেজেসের সব প্রত্যাশাই ছিল কেবল মরীচিকা, কল্পিত সাফল্যে তিনি আনন্দিত হয়েছেন। তিনি ভাবলেন এবার স্বাধীন হয়েছেন, এখন স্বাধীনভাবে কোম্পানির সংস্কারকাজে হাত দেবেন; ১৭৬৫ সালে লর্ড ক্লাইভ যেমন করেছেন। তারও ১০৪ বছর আগে ১৬৬১ সালে উইলিয়াম হেজেস মনে করেছিলেন, একটি নোংরা গোয়াল তাকে পরিষ্কার করতে হবে।

ক্লাইভ কোম্পানির যেসব লোককে দুর্নীতিগ্রস্ত বলে চিহ্নিত করেছেন, তাদের ভারত থেকে চাকরিচ্যুত করে তাড়িয়েছেন। কিন্তু ক্লাইভ দেখলেন কিছুকালের মধ্যেই তারা লন্ডন হেড অফিসে বেশ জাঁকিয়ে বসেছেন এবং ক্লাইভের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বোর্ডের অধিকাংশ সদস্য তাদেরই সমর্থন করেছেন। কিন্তু উইলিয়াম হেজেসের না ছিল ক্লাইভের মতো পদ, না ছিল ব্যক্তিগত ক্ষমতা।

গোয়াল পরিষ্কার করতে গিয়ে কিছু লোককে চাকরিচ্যুত করলেন কিন্তু বিভিন্ন ধরনের কেলেঙ্কারির পরও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা লন্ডন অফিসের আস্থা উপভোগ করে চলেছেন। তার কার্যক্রম নিয়ে হতভম্ব হয়ে হেড অফিস তাকেই বিদায় করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৬৮৪ সালের ১৭ জুলাই গভর্নর উইলিয়াম হেজেস চাকরি হারানোর তিক্ত সংবাদটি পেলেন।

হেজেস লন্ডন অফিসকে জানিয়েছিলেন, মুসলমান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি লড়াই অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এক বছরের বাণিজ্য ঝুঁকি নিয়ে তিনি একটি দুর্গ নির্মাণের প্রস্তাব দেন। হেড অফিস মনে করল, ইংরেজরা যদি মুসলমান রাজা ও তার পারিষদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামে তাহলে তারা সহায়তার জন্য ওলন্দাজদের কাছে টানবে। মোগলদের ওপর আক্রমণ চালাতে হলে তা বাংলা থেকে কেন করতে হবে, বোম্বে (মুম্বাই) থেকে আক্রমণ চালানোটাই হবে যুক্তিযুক্ত। আর বাংলা আক্রমণ করতে হলে চট্টগ্রাম অবরোধ দিয়ে শুরু নয় কেন?

এর মধ্যে কোম্পানির অধিকর্তাদের সামরিক স্পৃহা জেগে ওঠে। তারা রাজা জেমসের কাছ থেকে অনুমতি আদায় করে বোম্বের গভর্নরকে নির্দেশ পাঠান— সুরাট থেকে এবং অন্যান্য পরনির্ভর ফ্যাক্টরি থেকে জাহাজ প্রত্যাহার করে নিয়ে মোগলদের অবরোধ করা হোক। বাংলার নেতৃস্থানীয় ব্রিটিশ ও কুঠিয়ালরা বালাসোর চলে আসবেন এবং সেখান থেকে তাদের জাহাজে তুলে নেয়া হবে। ভারতে তাদের একটি শক্তিশালী বাহিনী গড়ে উঠবে। ঢাকা কোম্পানির আল্টিমেটামে সাড়া না দিলে লেফটেন্যান্ট কর্নেল জব চার্নককে চট্টগ্রামের গভর্নর ঘোষণা করে লড়াইয়ে শামিল হতে বলা হবে। বছর শেষ হওয়ার আগে ইংল্যান্ড থেকে ৩০০ সৈনিক এসে হুগলিতে অবস্থান নেবে।

জব চার্নকের অধিকারে ছয় জাহাজের বহর, প্রত্যেকটিতে কোম্পানির সশস্ত্র সৈন্য। কিন্তু কেবল তিনটি জাহাজ উপসাগরে পৌঁছতে পারল। ক্যাপ্টেন জন নিকলসনের অধীনে বিউফোর্টে ৭০টি বন্দুক ও ৩০০ নাবিক/নৌসেনা, ক্যাপ্টেন ম্যাসনের অধীনে ন্যাথানিয়েলে ৫০টি বন্দুক এবং ১৫০ জন সৈন্য আর জাহাজ রস্টারে ১২টি বন্দুক ও ২০ জন সৈন্য। তাদের সহযোগী হিসেবে যোগ দিয়েছে স্থানীয় কিছু খ্রিস্টান, সংকর পর্তুগিজ, কিছু রাজপুত এবং স্থানীয় পিয়ন। অন্যদিকে নবাব পাঠিয়েছেন গভর্নর আব্দুল গনির অধীনে তিন হাজার সৈন্য এবং ১১টি বন্দুক। ইংরেজদের পক্ষের একজন এবং নবাবের পক্ষে ৬০ জন নিহত হয়। মনে করা হয়, গভর্নর আব্দুল গনি ছদ্মবেশে পালিয়ে যান। তার পরও ইংরেজদের হুগলি কুঠি পুড়িয়ে দেয়া হয়। ইংরেজরা হুগলি থেকে ভাটিতে সুতানুটিতে চলে যায়। এখানেই হয় আধুনিক কলিকাতার গোড়াপত্তন।

নবাব সময় নিচ্ছিলেন বাংলা থেকে ইংরেজদের চিরতরে তাড়িয়ে দেবেন; ওদিকে জব চার্নক রাজার লবণগোলায় আগুন দেন, খিদিরপুরের কাছে থানা দখল করেন। নিকলসন দখল করেন হিজিলি দ্বীপ।

১৬৮৬ সালে মে মাসে সুবেদার শায়েস্তা খানের জেনারেল আবদুস সামাদ ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে হুগলি পৌঁছেন। ২৮ মে ৭০০ মোগল ঘোড়া ও ২০০ গোলন্দাজ ইংরেজ দুর্গ আক্রমণ করে। ক্যাপ্টেন ডেনহামের কমান্ডে দুর্গ থেকে পাল্টা আক্রমণ করা হয়। এদিকে জব চার্নকের পরিকল্পনায় ভীষণ শব্দের একটি ড্রামবাদক দল ড্রাম পেটাতে পেটাতে দুর্গের দিকে এগোলে আবদুস সামাদের বাহিনী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। যুদ্ধ শুরু করেই ইংরেজরা বিজয় উৎসবে মেতে উঠেছে— এ চাল ধরতে না পেরে আবদুস সামাদ যুদ্ধ বিরতি চুক্তির পতাকা উত্তোলন করেন। ইংরেজরা তাদের শক্তি ও অধিকার আরো সংহত করে।

জব চার্নকের কাজকর্মের মিশ্র সংবাদ লন্ডনে পৌঁছে, সেখানে সিদ্ধান্ত হয় ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হিথ তার স্থলাভিষিক্ত হবেন এবং জব চার্নক ফিরে যাবেন মাদ্রাজ। ততদিনে দূরদর্শী ইংরেজ দিল্লির সম্রাটকে হাতে নিয়ে নিয়েছে। সম্রাট ঢাকায় নবাবের কাছে লিখলেন যে, তিনি ইংরেজদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। তারা যখন বাংলায় ফিরে যাবে আর কোনো ঝামেলার সৃষ্টি করবে না। তারা আগের মতোই তোমার সরকারের সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালনা করবে।

ক্যাপ্টেন হিথ পৌঁছার আগেই শায়েস্তা খান বাংলার গভর্নরের পদ ত্যাগ করেন। নতুন গভর্নর বাহাদুর খান ঢাকা শহরে ইংরেজদের কিছু সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন এবং কুঠিয়ালদের জেলে পাঠান। অসন্তুষ্ট সম্রাট শিগগিরই তাকে অপসারণ করে বিহার থেকে ইব্রাহিম খানকে তার স্থলাভিষিক্ত করেন। তার সঙ্গে জব চার্নকের পূর্ব আঁতাত ছিল। তিনি চার্নককে মাদ্রাজ থেকে বাংলায় চলে আসতে অনুরোধপত্র পাঠান। কিন্তু জব চার্নক বেঁকে বসেন, সম্রাটের ফরমান না পেলে তিনি আসবেন না। ইব্রাহিম খান ফরমান প্রদানের জন্য সম্রাটকে লেখেন। ১৬৯০ সালের ২৪ আগস্ট জব চার্নক তার পরিষদ ও কুঠিয়ালদের নিয়ে সুতানুটিতে নামেন। এটি স্মরণীয় ব্রিটিশ ভারতের পরবর্তী রাজধানীর ‘ফাউন্ডেশন ডে’।

জব চার্নক বাংলার নবাবের পরোয়ানা পেলেন। বার্ষিক ৩ হাজার টাকা পেশকাশ প্রদান করে বিনা শুল্কে বিনা বাধায় বাংলার যেকোনো প্রান্তে বাণিজ্যের অধিকার ইংরেজ কোম্পানিকে প্রদান করা হলো এ পরোয়ানায়।

এরপর ব্রিটিশ রাজত্ব প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। আজকাল কেউ কবি রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের কবিতার পঙিক্তগুলোকে ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করছে না:

একদা ২০০ বছর আগে ব্যাপারি এসেছিল, শান্ত ও আনত

যেখানে সে দাঁড়ায় দুর্বল পা এগোয় না আর

যতদিন না তার বাণিজ্য

সাম্রাজ্যে পরিণত হয়; সে তার সেনাবাহিনী

উত্তরে ও দক্ষিণে পাঠায়

পেশোয়ার থেকে সিংহল চষে বেড়ায়

সবই তার নিজের এখন।

(ফার্মিঙ্গারের রচনা সংক্ষেপিত ও কিপলিংয়ের কবিতা আংশিক অনুদিত)

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গরি। অনুসৃতি: এম এ মোমেন

 

 

 

সূত্র: বণিক বার্তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ