কবিতা কী, কেন, কীভাবে?

কবিতা কী?- এটা খুব সহজ প্রশ্ন নয় কবির পক্ষে। এ প্রশ্নটাই ব্যক্তিভেদে একেক রকম হয়ে যায়। কেননা যারা কবিতা লেখেন তাদের সবার অনুভবের ঐক্য একরকম নয়।

পাবলো নেরুদা বলেছিলেন, কোনো কবিকে এ ধরনের প্রশ্ন করা অনেকটা কোনো মহিলাকে তার বয়স জিজ্ঞেস করার মতো।

কবিরাওতো সামাজিক জীব। সাধারণের সঙ্গে তারাও একই সমাজে বাস করেন। একই রাষ্ট্রের উৎপাদিত শস্যাদি খেয়ে জীবন বাঁচায়। সাধারণের সঙ্গে একই স্কুলে-কলেজে তারাও লেখাপড়া চালিয়ে যান; কিন্তু এদের মধ্যে কারও ওপর জ্বিন আছড় করে কবিতার।

যদিও রূপকার্থে অনেক চমকপ্রদ বাক্য তৈরি করা যায়; কিন্তু এটার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার দিকে নজর দেয়া যাক। জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সাগানের মতে মানব মস্তিষ্কের প্রধানতম কর্টেক্সগুলো হচ্ছে সেরিব্রল কর্টেক্স এবং আর কমপ্লেক্স।

ডারউইনের ন্যাচারাল সিলেকশনের পথে যে যোগ্যতার প্রশ্ন দেখা দেয় সেটা হচ্ছে টিকে থাকার যোগ্যতা। সব ধরনের প্রাণীর জন্যই পৃথিবী প্রতিকূল।

সেসব প্রতিকূলতাকে সরাসরি অথবা কৌশলে বশ অথবা পরিহার করতে পারাকে যোগ্যতা বলে। টিকে থাকার প্রশ্নে প্রাণী চরিত্রে যে শিকার মনোবৃত্তির বিকাশ, শিকারসংক্রান্ত চিন্তা বলয়ের অধীনে মস্তিষ্কের যে প্রকৃত অংশের বিকাশ তাকে বিজ্ঞান বলছে রয়্যাল কমপ্লেক্স বা আর কমপ্লেক্স।

ইতোমধ্যে মানুষ খাদ্য, বাসস্থান, বন্যা, দুর্ভিক্ষ, ভূমিকম্প কিংবা অগ্ন্যুৎপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। ইত্যাদি কারণে যাযাবর বৃত্তির যে প্রক্রিয়া তাকে গ্রহণ করতে হল।

তার অবসর সময়চেতনা প্রকৃতির সঙ্গে তার ভাব-অভাব অথবা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি দুর্বোধ্য টান ইত্যাদির চিন্তাসমগ্রের বিকাশের ক্রমপথে মস্তিষ্কের অন্য প্রধান যে কর্টেক্সের আবির্ভাব বিজ্ঞান তার নাম রাখে সেরিব্রল কর্টেক্স। যে কারণে মানুষ গান শোনে, কবিতা পড়ে অথবা লেখে, প্রেম করে, শ্রদ্ধাবোধে জড়িত হয়, তার চোখে সহমর্মিতার অশ্রু গড়ায়।

সামন্তীয় যুগে কবিকুলের স্থান ছিল রাজসভা। রচনা করতেন মহাকাব্য, পুঁথি, মর্সিয়া। এসব গীত হতো জনতার মাঝখানে, মুখে মুখে। কিন্তু বেশিরভাগ সামন্তীয় শাসকই ছিল দখলদার, দস্যু, অত্যাচারী প্রকৃতির। এদের মধ্যে ঘটেছে আর কমপ্লেক্সের চরমতম বিকাশ।

ইতিহাসের কুখ্যাত শাসক চেঙ্গিস খান। এ অশিক্ষিত পাশবিক শাসক যিনি সভ্যতার প্রভূত ক্ষতি করেছেন, তিনি শেষ জীবনে পাগল হয়ে ওঠেছিলেন অমরত্ব পাওয়ার আশায়।

তার অমাত্যরা অমরত্বের দাওয়াইসহ অনেক চিকিৎসককে নিয়ে আসতেন তার কাছে। তিনি তাদের তৈরি দাওয়াই তাদের খাওয়াতেন আর সঙ্গে সঙ্গে শিরশ্ছেদ করতেন। দেখতে চাইতেন মৃত্যুর পরও দাওয়াই গুণে তারা বেঁচে উঠেন কিনা।

অবশেষে তিনি চৈনিক ঋষি, মহাস্থবির কবি চাংচুংকে তার দরবারে এনে অনেক লোভ দেখিয়ে জানতে চান অমর হওয়ার কোনো দাওয়াই সম্পর্কে তিনি জানেন কিনা।

কেননা ততদিনে চাংচুংয়ের জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বময়। তিনি সব প্রশ্নের জবাবে কোনো কথা না বলে শুধু চীনা কায়দায় তার বুড়া আঙুল দুটি দেখালেন। আর বললেন, অমর হওয়ার উপায় প্রেম, জীবে দয়া, তলোয়ার কিংবা রাজ্যজয় নয়।

সত্যিই তো অবাক লাগে কত শত সহস্র রাজারানী গত হয়ে গেল, কবিতা বা কবি, হোমর বা লিওপার্দি, সেনেকা বা হাফিজ, রুমি, জামি বা খৈয়াম, হুইটম্যান বা জন ডানের কবিতা বেঁচে আছে নির্বিঘ্নে।

আরেক শাসক তৈমুর যখন পারস্য দখল করলেন। সিরাজ নগরীতে একদিন তিনি ডেকে পাঠালেন সেই সময়ের প্রখ্যাত কবি হাফিজকে। তৈমুর কবিকে জিজ্ঞেস করলেন : কী লিখ শায়েরী? শোনাওতো একটা।

হাফিজ পড়লেন

আমার সিরাজ-বধূয়া যদি গো

দিল পরে মোর হাত বুলায়

পা’র তলে তার লুটিয়ে দেব গো

সমরখন্দ আর বুখারায়।।

তৈমুর ক্ষেপে গিয়ে বলেন, বহু বছর যুদ্ধ করে, শতশত সৈন্যর প্রাণের বিনিময়ে আমি সমরখন্দ দখল করেছি আর আপনি কিনা সিরাজের একটা মেয়ের জন্য তা বিলিয়ে দিতে চাইছেন?

হাফিজ নিজের ছেঁড়া পোশাকের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলেন, জাহাপনা দেখতেই পাচ্ছেন এ অমিতব্যয়িতার জন্যই তো আজ আমার এ দুর্দশা।

আর সম্রাট বাবরতো একজন প্রকৃত কবি। যেখানেই তিনি যেতেন সেই এলাকার কবিদের খুঁজে বের করতেন। তার প্রচুর কালজয়ী বয়েত এখনও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নিয়মিত উচ্চারিত হয়। এ কবিতা প্রেমের জন্য তাকে বহুবার রাজ্য হারাতে হয়েছিল। শাসনকার্য ছিল তার জন্য অভিশাপ।

একজন কবি প্রকৃত অর্থে স ষ্টা, স্বনির্মিতির। যখন একটি কবিতা সৃষ্টিকর্ম চলে তখন কবি একজন অসহায় আর দ্বিধাদ্বন্দ্বে অস্থির পোয়াতি মহিলার মতো। তার সৃজনশীল স্বেচ্ছাচারিতা তার জীবনেও প্রতিফলিত হয়। এ স্বেচ্ছাচারিতার জন্য তাকে অনেক দুঃখ ভোগ করতে হয়। যদিও এ স্বেচ্ছাচারিতাই তাকে মৌলিক ও আলাদা করে তোলে।

সে চায় একইসঙ্গে প্রেম ও বিরহ, যুদ্ধ ও শান্তি। কারণ কে না জানে যে যত বেশি প্রেমিক সে তত বেশি বিদ্রোহী। যে কবি সে সম্পূর্ণ হৃদয়পন্থী উদ্বাস্তু। এজন্য মায়াকোভস্কির ও এসনিনের কাছে জীবনের চেয়ে মৃত্যু অধিক কাম্য।

এজন্য পূর্ব ইউরোপের কবি হেরবেট, মিউশকে ভিনদেশে পাড়ি জমাতে হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নে স্তালিন জমানায় বিদ্রোহী কবি-সাহিত্যিকদের বলা হতো শুঁয়াপোকা। এদের কপালে থাকত নির্বাসন। বলা হতো রাশিয়ার বাইরে থাকলেই এরা আপনা আপনি শুকিয়ে মরে যাবে। কিন্তু ইভান বুনিন, যোশেফ ব্রদস্কি, সলোঝিনিৎসিন, ইয়েভতুশেঙ্কু বিস্তার করেছেন অনেক ডালপালা।

পোলিশ কবি চেশোয়াভ মিউশ যিনি কবিতায় একসময় বলেছিলেন কাকে বলে কবিতা যদি তা না বাঁচায় দেশ কিংবা মানুষকে, তাকেই আবার বলতে হয় কোনো দেশকে ভালোবেসোনা দেশগুলো চট করে উধাও হয়ে যায়।

কবিকে অবশ্যই খুঁজে নিতে হবে এমন কোনো প্রতিবেশ যেখানে তার কবিতা পড়ে আনন্দ পাওয়ার যথেষ্ট অবকাশ থাকে। যেখানে সে নিরাপদে প্রসব করতে পারে তার সন্তানাদি। পূরণ করতে পারে সন্তানগুলোর দাবি।

এ কারণে রিলকের ত্যাগ মহৎ। মহৎ ও নৈতিক র্যাঁবোর অভিমান। কবিতা আত্মা সত্য আর মানবিকতার রক্তিম সংস্করণ। কবির জীবন কবিতার ওপর বিশাল প্রভাব রাখে।

ব্যক্তিগত জীবনে একজন অসৎ কবি সৎ ও মহৎ কবিতা লিখতে পারেন বলে মনে হয় না। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, কবিকে পাবে না খুঁজে তার কবিতায়। ভিন্ন অর্থে এটা আংশিক সত্য হলেও সামগ্রিক অর্থে মিথ্যা।

কবিকে খুঁজে পাওয়ার একমাত্র জায়গা হচ্ছে তার কবিতা। যে কারণে জনসাধারণ একজন কবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে যদি অন্ধত্ব ও প্রচার তাকে ধ্বংস না করে।

কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের ত্যাগ প্রসঙ্গে মার্কিন লেখক ক্যাথরিনা এন পোর্টার বলেন, সেও তো সভ্যতার অন্যতম দাবিদারদের একজন, কেন সে মধ্যবিত্ত মানসিকতাকে লালন করবে। কেন সে একগাদা জাগতিক সন্তানাদির পিতামাতা হয়ে নিজের সময়কে প্রথাগতভাবে হত্যা করবে।

বিশুদ্ধ কবিতার সন্ধানে আত্মাকে জাগিয়ে রাখতে রিলকে জার্মানির গ্রামে নানাবাড়িতে শিশুসন্তানকে রেখে সস্ত্রীক পাড়ি জমিয়েছিলেন প্যারিতে।

যেখানে তিনি রদার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। তার ‘তরুণ কবিকে চিঠি’ বইটি যে কোনো মর্মসন্ধানী কবির জন্য গুরত্বপূর্ণ।

আদি এবং এ যন্ত্রযুগেও কবিই সভ্যতার রক্ষী বাহিনীর একমাত্র গরিলাযোদ্ধা। সব অমানবিক অত্যাচার ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সেই একমাত্র সোচ্চার। কবিতাকে যারা নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল তারাই বলতে গেলে আজ নিষিদ্ধ। কিন্তু কবিতা বেঁচে আছে যেন কিছুই হয়নি এ রকম ভাব করে।

যিনি কবি, তার থাকবে সর্ব আঙ্গিককে গ্রহণ করার ক্ষমতা। সবসময়ের জন্য তার দ্বার থাকবে উন্মুক্ত। কেননা তার অভিজ্ঞতা মিশে যাবে রক্তে। তাকে পান করতে হবে গোটা বিশ্বটাকেই।

প্রত্যেক কবির হৃদয়ের উৎসার বিশ্বহৃদয়ের ভেতর। তাকে জানতে হবে পৃথিবীর কোন কবি কী রেখে গেছেন তার জন্য। এরপর আছে গ্রহণ আর বর্জন।

এজরাপাউন্ড বলেন, কোন কবি কত পরিশ্রমী ও আন্তরিক তার প্রমাণ তার আঙ্গিক গত চেতনায়। পাঠ ও অভিজ্ঞতার জন্য যেমন তার তৎপরতার দরকার, তেমনি তার দরকার অলস সময়ের।

অলস মস্তিষ্ক শুধু শয়তানের আড্ডাখানা নয় কবিতারও প্রজনন ক্ষেত্র। কবিতা লিখতে গিয়ে অনেকেরই সম্মান, অর্থ, প্রতিপত্তি সব ভেসে যায়। হায়, চাকরি বাঁচানো ও জীবিকা চিন্তায় যারা অস্থির এ পথ তাদের নয়।

কবি ইতোমধ্যে দু’চোখ কালো কাপড়ে বেঁধে সম্পূর্ণ অজানার উদ্দেশে পর্বতশিখর থেকে লাফ দেয়া একজন। তিনি জানেন না কোথায় তিনি পাতিত হবেন। লাফ দেয়া আর ভূপাতিত হওয়ার মধ্যবর্তী সময়টাই কবি জীবন।

প্রচার ও যশোলাভের অতিরিক্ত ইচ্ছা তাকে ভুল পথে নিয়ে যায়। কবিতা লেখা ও কবিতা খোঁজা ছাড়া এ সম্পর্কিত অন্য কোনো বিষয় যেমন যত্রতত্র কবিতা ছাপার প্রতিযোগিতা, ইতিহাসে স্থান পাওয়ার জন্য ইঁদুর দৌড় অস্তিত্বের সঙ্কটের কষ্টকর উপলব্ধিতে নিজেকে জাহির করার উদগ্র প্রয়াস তাকে হাস্যকর করে তুলতে পারে। প্রকৃত কবি ইতিহাসে স্থান চান না, তিনি ইতিহাস তৈরি করেন।

মহামানব ও বৈজ্ঞানিকদের মতো কবিও সভ্যতার জন্য অপরিহার্য। সে ক্ষেত্রে কবি নিজেও একজন পৃথিবীর অভিভাবক। পুরস্কারের সঙ্গে তার সম্পর্ক নির্লিপ্ততার।

বাংলা ভাষার সত্তর দশকের কবি রণজিৎ দাস এক সাক্ষাৎকারে জবান দেন ‘পুরস্কার আর কবির সম্পর্ক অনেকটা বুটজুতা আর গোলাপ ফুলের সম্পর্কের মতো বেঢপ। সে ব্যস্ত নিরীক্ষায়। জীবনানন্দ যার সার্থক উদাহরণ। অমিয় চক্রবর্তী কবিজীবনকে বলেছিলেন বেদনার যুগ। তিনি ক্ষেত্রে কবির নাম দেয়া যায় বেদনার সন্তান।

মৃত্যুশয্যায় জীবনানন্দকে যখন প্যাথিড্রিন দেয়া হচ্ছিল তখন আচমকা তিনি বলেছিলেন ‘আমি কোটি কোটি প্যাথিড্রিন নিয়েছি’। এ উদ্ভট অসংলগ্ন চিৎকার থেকে বেরিয়ে আসে কবিজীবনের আদি সত্য।

কবি নিজের মদে নিজেই মাতাল। যে কোনো ভালো নেশাখোরের সঙ্গে তার এত মিল কেন তিনি জানেন না।

পৃথিবীকে যিনি ঘর বলে মেনেছেন তাকে চারদেয়ালের ঘরে বেঁধে রাখা যায় না। যিনি হোমারের বংশধর, সতত সঞ্চারমান। তিনি তো সেই আত্ম-উন্মাদ বিশ্বহৃদয়েরই অংশ।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কবিতার শরীরে সূক্ষ্ম পরিবর্তন আসে। এটা মৌলিক কবিরা দ্রুত বুঝতে পারেন বলে মনে হয়। বিশেষ করে আঙ্গিক ও ভাষায়। যে কারণে একটার পর একটা মুভমেন্ট তৈরি হয়। যদিও আরোপিত কোনো কিছু স্থায়িত্ব পায় না।

চিলির বিজ্ঞানী কবি নিকানর পাররা লিখেছিলেন ‘লিখ যা তোমার খুশি/কেবল তা যেন শাদা কাগজের চাইতে উৎকৃষ্ট হয়।’ শাদা কাগজের চেয়ে উৎকৃষ্ট হতে গেলেই তো তাকে কবিতা হতে হবে।

মনে হয় তিনি কবির অসীম স্বাধীনতার কথাই বলতে চেয়েছেন। একাডেমিক ভীতির ভেতর যেহেতু কোনো সৃজনশীলতা সম্ভব নয়, তাই তিনি সাদা কাগজ থেকেই শুরু করতে বলেন। নিকানর পাররার নিজের কবিতাগুলোই এর প্রকৃত উদাহরণ।

রবীন্দ্রনাথও প্রথমদিকে কবিতার পরিবর্তন বুঝতে পারেননি। শেষের দিকে তিনি নিজেই এ ধাঁচে লিখতে শুরু করেন, ‘নাগিনীরা চারদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস।’ এ কবিতাটি আধুনিক কবিতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

সত্যিকার অর্থেই কবিতা এক মেটাফিজিক্যাল থট। অভিজ্ঞতা এবং স্মৃতি একজন কবির ভেতর রসায়ন হয়ে শব্দ জাদুবাক্যে পরিণত হওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকে।

জিএম কোয়েতজি ‘ফো’ নামের উপন্যাসে তা চমৎকার দেখিয়েছেন। উপন্যাসের চরিত্রের সঙ্গে লেখকের যে আর্ন্তনীতিক সম্পর্ক তা যে কোনো স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির সম্পর্ককে নির্দেশ করে। একইসঙ্গে এ সম্পর্ক আনন্দ ও কষ্টের। বিষাদ ও একাকিত্বের।

জনরুচির গালে এক থাপ্পড় মেরেছিলেন মায়াকভস্কি। মনে হয় যারা কবিতায় দুর্বোধ্যতার কথা বলেন, মাল-মশলা নিয়ে চিন্তা করেন আর কবিতা না পড়ার হুমকি দেন কিংবা খুব বিনীত চাতুর্যের সঙ্গে বলেন তিনিও একদা কবিতা পড়তেন, তিনিও কবিতার পাঠক।

পাঠকেরও অন্তত কবিতাপাঠ মুহূর্তের সততার দরকার। তারও দরকার কবিতার সূক্ষ্ম পরিবর্তনের সঙ্গে নিজের রুচিরও পরিবর্তন সাধন করা।

তিনি যদি এ সময়ের কবির কাছে নজরুলীয় বা রাবিন্দ্রীক কবিতা চান তবে তিনি অশিক্ষিত পাঠক। অতীতে জীবিত, বর্তমানে মৃত। অশিক্ষিত পাঠকের বাহবা আর মুনাফাখোর প্রকাশকদের খুশি করতে গিয়ে বহু কবি নষ্ট হয়ে গেছেন। ডামাডোলে হারিয়ে ফেলেছেন নিজেদের।

কবিতার গণপাঠক কল্পনাতীত। কবিকেও নিজের কবিতা সম্পর্কে কঠোর হতে হয়। স্বরচিত অনেক কবিতা থেকে দাঁতের ডাক্তারের মতো অনেক শব্দ লাইন তাকে উপড়ে ফেলতে হয়।

ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তিনি কবিতাটি সম্পর্কে হবেন অধিক যত্নবান, অধিক নির্মম, অধিক সন্দেহপরায়ণ। পাঠকের তোয়াক্কা করার সময় তার নেই। কারণ কবিতার যারা পাঠক তারাও কবি। একজন কবির মতোই তারাও সম্ভবত: ছন্নছাড়া মায়াবী ফকির।

লেখক:জাহেদ সরওয়ার

 

 

সূত্র: যুগান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ