কুলদীপ নায়ারের নেয়া ভুট্টোর সাক্ষাৎকার

২৭ মার্চ ১৯৭২ ভারতের ইংরেজি দৈনিক স্টেটসম্যান -এ কুলদীপ নায়ারের নেয়া পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলি ভুট্টোর সাক্ষাৎকারটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক দলিল। কুলদীপ বাংলাদেশ সম্পর্কে, পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা সম্পর্কে কঠোর ও বিব্রতকর কিছু প্রশ্ন করেন। সদ্য প্রয়াত খ্যাতিমান সাংবাদিক কুলদীপ নায়ারকে (জন্ম ১৪ আগস্ট ১৯২৩-মৃত্যু ২৩ আগস্ট ২০১৮) শ্রদ্ধা জানাতে সাক্ষাৎকারটি ভাষান্তরিত হলো।

কুলদীপ নায়ারগড়পড়তা একজন ভারতীয় বিশ্বাস করেন, যেখানে পাকিস্তান অতীতে ভারতকে বারবার আক্রমণ করেছে, সুযোগ পেলে চীনের সাহায্য নিয়ে আবার আক্রমণ করবে; সেখানে পাকিস্তানের চার ডিভিশন সমান সংখ্যক যুদ্ধবন্দি ফেরত দেয়া উচিত নয়।

জুলফিকার আলি ভুট্টোআমি সাধারণ মানুষের চিন্তাকে সম্মান করি, কারণ তারা সাধারণত সঠিকটাই ভাবে। কিন্তু চলুন আমরা একটি পরিবর্তনের জন্য কাজ করে প্রমাণ করে দেই যে, তারা ভুল ভাবছেন। বিবেচনা করা দরকার আমাদের জনশক্তির কোনো অভাব নেই। আমরা চার-পাঁচ ডিভিশন সৈন্য গড়ে তুলতে পারি। আমাদের সম্পদ থাকলে দশ ডিভিশনও সম্ভব। মানবসম্পদের যে ঘাটতি নেই, তা হচ্ছে একটি জবাব। দ্বিতীয় জবাবটি হচ্ছে, আমরা যদি এ ধরনের আন্তরিকতাবিহীন উদ্দেশ্য নিয়ে এগোই, চীন আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে না।

কুলদীপ: ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ‘কোনো যুদ্ধ নয়’ চুক্তির কী হলো?

ভুট্টো: সবাই, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানে শব্দের দাসে পরিণত হয়। দুর্ভাগ্যবশত স্বাধীনতার স্রষ্টাগণ— একদিকে মিস্টার নেহরু, অন্যদিকে আমাদের নেতারা পুরনো ব্রিটিশ টার্ম ব্যবহার করে নিজেদের কনফেডারেশনভুক্ত কিংবা কোনো যুদ্ধ নয়, চুক্তিভুক্ত করার চেষ্টা করলেন। পাকিস্তানে ‘কোনো যুদ্ধ নয়’ মানে আত্মসমর্পণ করা— শব্দের দ্যোতনা এমনই। যে মুহূর্তে মিস্টার নেহরু ‘কোনো যুদ্ধ নয়’ চুক্তির কথা বললেন; লিয়াকত আলী খান সাহেব বললেন এর মানে আত্মসমর্পণ। তখন থেকে যারা ক্ষমতায়, প্রত্যেকেই বলেছেন এ চুক্তির অর্থ আত্মসমর্পণ করা।

এখনই সমস্যার মূলে তাত্ক্ষণিকভাবে নয়, ধীরে ধীরে পৌঁছলে দেখা যাবে— আমাদের দিক থেকে কোনো কালক্ষেপণ হয়নি। সবকিছু বিবেচনায় এনে চুক্তির মতো ভারী শব্দ ব্যবহার না করে আমরা যৌথ ইশতেহার কিংবা অন্য কোনো দলিলে সম্মতি দিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে চুক্তি, যুদ্ধ ঠেকানো, সরাসরি দরকষাকষি, সালিশ, মধ্যস্থতা, সৌহার্দ— এসব কথা বলে নয়; আমরা সমাধান খুঁজতে পারি। এতে অচলাবস্থার একটি বড় অগ্রগতি হবে।

অতীত আমাদের কী শিক্ষা দিয়েছে? আমরা তিনটি যুদ্ধ করেছি। এতে আমাদের কোনো লাভ হয়নি। দার্শনিক বিবেচনায় আপনাদেরও কোনো লাভ হয়নি। যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এল, বোঝা গেল ঢাকার পতন আপনাদের কোনো লাভ এনে দেয়নি। আপনারাও কিছু পাননি, আমরাও কিছু পাইনি, মাঝখান থেকে আমাদের দুই দেশেরই অনেক ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় যে যুদ্ধ, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ; আমরা তা করিনি— যে নৈতিক যুদ্ধের জন্য আমাদের আগামী প্রজন্মের আশীর্বাদ পেতাম। কাজেই আমরা এখন বসতে পারি, আপনাদের তৃপ্ত করতে পারি, আমরা আর যুদ্ধের কিংবা মুখোমুখি সংঘর্ষের নীতি আর অনুসরণ করতে যাচ্ছি না।

কুলদীপ: কিন্তু আপনি তো সংঘর্ষের পক্ষে ছিলেন, বদলে গেলেন নাকি?

ভুট্টো: সংঘর্ষ নিয়ে আমি লজ্জিত নই। আমিও আপনাদের প্রধানমন্ত্রীর মতো বিশ্বাস করি— আমাদের প্রাথমিক চিন্তা হতে হবে প্রথমত. আমাদের দেশ এবং আমাদের জনগণকে নিয়ে। সংঘর্ষের নীতিটি আমাকে ব্যাখ্যা করতে দিন। পাকিস্তান দুটি সামরিক জোটের সদস্য ছিল, কিন্তু এ চুক্তির ভারটাই বরং আমাদের বহন করতে হয়েছে। আমরা কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি— তৃতীয় বিশ্বে বিচ্ছিন্ন। দেশের ভেতরও মানুষ জানতে চেয়েছে— এ জোটে গিয়ে আমাদের কী লাভ হয়েছে। রাজনৈতিক লাভ হয়নি, সামরিক দিক দিয়ে লাভ হয়েছে। আমরা ভেবেছি— এ চুক্তিভুক্ত থেকে যতটা সম্ভব সুবিধা নিই। একটা সময় সামরিক প্রশ্নে বিগপুশ বলতে যা বোঝায়, আমরা ভারতের চেয়ে ভালো অবস্থানে ছিলাম, কারণ আমরা সামরিক সহায়তা পেয়েছি। ১৯৬৫ পর্যন্ত এ অবস্থা বহাল ছিল। শান্তিপূর্ণভাবে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হচ্ছিল না। আমরা সামরিক দিক দিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলাম। এজন্য আমাদের দোষের ভারও বইতে হয়েছে। এটা বলাই রাজনৈতিক বিচক্ষণতা যে, চলুন আমরা এ সমস্যাটি চিরতরে মিটিয়ে ফেলি।

সেজন্য ১৯৬৩ পর্যন্ত মনে করা হয়েছে, সামরিকভাবে সুবিধাজনক স্থানে থাকলে আমরা সমস্যাটির দ্রুত সমাধান করতে পারব, আমরা নৈতিকভাবে অনুভব করছিলাম— যেহেতু ভারতও কাশ্মিরীদের তাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব তাদের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছে। আমাদেরও তা-ই করা উচিত। কিন্তু এখন সে পরিস্থিতি বিরাজ করছে না। এটা আমি অন্যদের চেয়ে ভালো জানি। কাশ্মীর সমস্যা ভবিষ্যতেও থেকে যাবে।

কুলদীপ: তার মানে কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের পথ নেই?

ভুট্টো: কাশ্মীরের ভাগ্যনিয়ন্তা কে হবে, তা নির্ধারণের দায়িত্ব সেখানকার জনগণের, কোনো দেশ বা ব্যক্তির নয়। পরিস্থিতিই তা করেছে। কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তান ও ভারত উভয় দেশই কাশ্মীরকে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব দিয়েছে। মিস্টার নেহরু সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এ নিয়ে জাতিসংঘের সিদ্ধান্তও রয়েছে। এখন এটা নীতিগত প্রশ্ন। এতে তৃতীয় বিশ্ব লাভবান হচ্ছে, পূর্ব ইউরোপের একাংশ লাভবান হচ্ছে। আমি যদি ভিয়েতনাম ও লাতিন আমেরিকার মানুষকে সমর্থন করতে পারি, তাহলে কাশ্মীরের অধিকারকে কেন প্রত্যাখ্যান করব? এর জন্য ভারত আংশিক দায়ী, কারণ তাদের সংবিধানে কাশ্মীরের জন্য বিশেষ বিধান রেখেছে। এর জন্য অবশ্যই কারণ থাকতে হবে। কাশ্মীরকে সংবিধানে এনে ভারতই স্থায়ী সমাধানকে পিছিয়ে দিচ্ছে। যতক্ষণ কাশ্মীরের জনগণ তাদের স্বশাসনের অধিকার চাইবে, তাদের কেউ থামিয়ে রাখতে পারবে না। আমি বলতে চাচ্ছি, ভারত নিজের অবস্থানে অনড়, আমরা আমাদের অবস্থানে। আপনারা মনে করেন কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ দুই অবস্থানের মধ্যে অনেক সুযোগ রয়েছে, যা সমস্যা ও উত্তেজনাকে লাঘব করে নিয়ে আসতে পারে। আমরা শান্তিরেখা সৃষ্টি করে অস্ত্র-বিরতি করতে পারি। কাশ্মীরের মানুষকে দুই দেশেই স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে দেই। একটা থেকে আরেকটা ঘটনা হবে। আজই সবকিছু সমাধানের দায়িত্ব মিসেস গান্ধী বা আমার ওপর কেন অর্পিত হবে। আমি সঠিক পথে একে গতিশীল করে দিই। একজন অন্যজনের কাজ থেকে গ্রহণ করবে, একদিনে ঝাড়পোছে পাটাতন পরিষ্কার হবে না। উপমহাদেশে এক ঝটকায় সব পরিষ্কার করে সমাধান করার পথ নেই।

কুলদীপ: আপনি কি কাশ্মীর অস্ত্র-বিরতি রেখাকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে গ্রহণ করতে তৈরি আছেন?

ভুট্টো: মিস্টার শরণ সিং (ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী) আমাকে এর চেয়ে আরো উত্তম রেখা দিতে চেয়েছেন। আগে চলুন কাশ্মীরের জনগণকে দুই দেশেই স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকার দেই এবং বিষয়টি কিছু সময়ের জন্য যেমন আছে, তেমনই থাকুক। এ নিয়ে আমাদের তাড়াহুড়োর দরকার নেই। আমাদের সাম্প্রতিক যুদ্ধের সমস্যাগুলো আগে মিটিয়ে অন্যগুলো নিয়ে আলোচনায় বসি। এ নিয়ে আমাদের বিশ্ব-আদালতে যাওয়ার দরকার নেই, জাতিসংঘকেও ডাকতে হবে না।

কুলদীপ: আমাদের কেউ কেউ বিশ্বাস করে, ভারতের সঙ্গে শত্রুতার কারণে চীনই পাকিস্তানকে তার কুড়াল সরাতে দিচ্ছে না। আপনি কি মনে করেন?

ভুট্টো: আমার অভিজ্ঞতা এমন নয়। চীনের সঙ্গে আমার প্রথম যোগাযোগ ১৯৬৩ সালে, যখন আমরা তাদের সঙ্গে সীমান্ত চুক্তি সই করি। চীন বলছে, ভারত ও পাকিস্তান কাশ্মীর সমস্যা দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে সমাধান করুক। কেবল ১৯৬৪ সালে চীন পাকিস্তানের প্রস্তাব সমর্থন করেছে যে, কাশ্মীরের জনগণই হবে তাদের ভাগ্যনিয়ন্তা, সিদ্ধান্ত হবে তাদেরই। আমাদের দ্বন্দ্ব যদি কোনো তৃতীয় পক্ষের স্বার্থেও হয়ে থাকে, আমাদের উচিত হবে— নিজেদের স্বার্থটা আগে দেখা, দোষের দায়ভার আমাদেরই।

কুলদীপ: শেখ মুজিবকে মুক্তি দেয়া আপনার একটি সাহসী সিদ্ধান্ত। আপনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন না কেন— বাংলাদেশ তো এখন বাস্তবতা।

ভুট্টো: আমরা সেদিকেই এগোচ্ছি। কিন্তু যতক্ষণ না আমার তার সঙ্গে দেখা হচ্ছে, আমি কিছুই করতে পারছি না।

কুলদীপ: আপনার অগ্রাধিকার কোনটি? মিসেস গান্ধী ও শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ?

ভুট্টো: জরুরি সমস্যা সমাধানের প্রশ্নে আপনারা এবং আমরা আর তা আজই। পূর্ব পাকিস্তান আক্ষরিক অর্থেই হাজার মাইল দূরে। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু সেখানে আমাদের সৈন্যরা তাদের সৈন্যদের মুখোমুখি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সেখানে তাদের নিরস্ত্র করা এবং যুদ্ধবন্দিদের বিষয় রয়েছে। যুদ্ধবন্দিদের নিয়ে আসুন। এটা আমাকে যন্ত্রণা দিচ্ছে— নারকীয় যন্ত্রণা। কিন্তু শিগগিরই দেখবেন এটা আপনার জন্য উৎপাদন-প্রতিরোধক বৈরী হয়ে উঠেছে— ক্রমহ্রাসমান উৎপাদনের পথ ধরে। আপনারা যদি তাদের মুক্তি না দেন, আমি আমার জনগণের কাছে ফিরে যাব এবং বলব, আপনারা যে ‘কনসেশন’ চাইছেন, আমি মানুষের মাংসের বিনিময়ে তা করতে পারব না। তারপর এখানে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বে; জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস— এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়ন, যার সঙ্গে আপনাদের চেয়ে আমাদের সীমান্ত নৈকট্য বেশি।

যারা মিসেস গান্ধীকে পাকিস্তানি মানুষের মাংস নিতে বলছেন, তারা তাকে সঠিক উপদেশ দিচ্ছেন না। আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভুল। আপনাদের অবশ্যই বুঝতে হবে, আমি যদি বেরিয়ে যাই— পাকিস্তান প্রকাশ্যে হোক কিংবা পুতুল সরকারের মাধ্যমে হোক— হবে সামরিক বাহিনী শাসিত। এতে ভারতের কোনে লাভ হবে না।

কুলদীপ: আমার মনে হচ্ছে, পাকিস্তানের মানুষ বাংলাদেশে তাদের সেনাবাহিনীর নৃশংসতা সম্পর্কে অবহিত নয়। মুসলমানরা শুধু হিন্দুদের হত্যা করেনি, মুসলমানদেরও হত্যা করেছে। এ সম্পর্কে আপনি কী বলেন?

ভুট্টো: ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছে। আমরা তা ক্ষমাও করতে পারি না, তা উপেক্ষাও করতে পারি না। আমাদের হিসাবমতে, ৪৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ উপমহাদেশের মানুষ সভ্য। কিন্তু তারা যখন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, তারা বন্য হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালে তা-ই ঘটেছে। অনেক জাতির ক্ষেত্রে এমনটা হয়েছে— গ্রিক, জার্মান, ফ্রেঞ্চ।

কুলদীপ: জেনারেল টিক্কা খানকে পাকিস্তানের কমান্ডার-ইন-চিফ পদে নিয়োগদান ভারতকে এ ধারণা দিয়েছে যে, পাকিস্তান সংকট আরো বাড়াতে চায়।

ভুট্টো: হ্যাঁ, এ ধারণার কথা আমি জানি। কিন্তু টিক্কা খান ইয়াহিয়া খানের নীতির বিরোধিতা করেছেন এবং বরাবর তা প্রতিকার করে এসেছেন। ইয়াহিয়া তাকে সরাননি, বরং টিক্কা খান তার সঙ্গে চালিয়ে যেতে চাচ্ছিলেন না। তিনি একজন পেশাদার সৈনিক। তার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ছিটেফোঁটাও নেই। তিনি খুবই একনিষ্ঠ, সেনাবাহিনী তার আদেশের অনুগত। কেউ যখন সেনাবাহিনীর মতো একটি প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করেন, দুটো দিক দিয়ে তার সদস্যদের ছেঁটে দিতে পারেন— যদি তাদের মধ্যে রাজনীতি ঢুকে যায় এবং যদি তারা অদক্ষ হন। একজন জেনারেলের মধ্যে যদি রাজনীতির পোকা ঢুকে না থাকে এবং তিনি যদি প্রথম শ্রেণীর পেশাদার সৈনিক হন, তাহলে তাদের পেছনে আমাকে ঘুরতে হবে না; টিক্কা খানকে নিয়ে আপনাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই; দেখবেন তার উপস্থিতি আমাদের সমঝোতা আলোচনার কোনো ছায়াই ফেলবে না।

কুলদীপ: পাকিস্তানে বাঙালিদের কী হবে?

ভুট্টো: আমি তো বুলবুলিটাকেই খাঁচা থেকে ছেড়ে দিয়েছি। এখন আমি বাঙালিদের বদলে যুদ্ধবন্দিদের কথাই ভাবতে পারি। আমি আশা করি, আমাকে এ পথে যেতে হবে না; কিন্তু এছাড়া আমার হাতে কিছু নেই।

কুলদীপ: পেছনে তাকিয়ে আপনি কি বলবেন দ্বিজাতিতত্ত্ব ব্যর্থ হয়েছে?

ভুট্টো: আমাদের দেশেও কেউ কেউ এ কথা বলছেন। আমি বাস্তববাদী মানুষ, আদর্শবাদী নই। আমি বলব না যে, দ্বিজাতিতত্ত্ব একেবারে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, তবে এটায় ফাটল ধরেছে। আমরা যদি এভাবে চলতে দেই, বিতর্ক শেষ হয়ে আসবে। দেশ তো আগের চেয়ে ছোট হয়ে এসেছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দিকে দেখুন।

কুলদীপ: ভারত-পাকিস্তান কমন মার্কেট নিয়ে কী বলবেন? আমাদের দরকার গ্যাস, আপনাদের দরকার কয়লা।

ভুট্টো: এখন কয়লার আর তেমন দরকার নেই, পূর্ব পাকিস্তানের জন্য প্রয়োজন ছিল। নীতিগতভাবে আমরা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য শুরু করব। বিশ্লেষকরা এসবের পদ্ধতি নির্ধারণ করবেন। কারণ অনেক দিন ধরে আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নেই। কমন মার্কেটের প্রশ্নে আমার কোনো আপত্তি নেই, তবে এ ধরনের ব্যবস্থাপনার জন্য আমরা এখনো তৈরি নই। এমনকি ইউরোপিয়ান কমন মার্কেট দাঁড়াতেও তো সময় লেগেছে! আমরা মূলত কাঁচামাল উৎপাদন করি। ভারতের যে শিল্পমান, আমরা সেখানে পৌঁছিনি। পারস্পরিক সহযোগিতা সহজ হবে না। তবে সময় এটা ঠিক করে নিতে পারবে।

কুলদীপ: আপনি কি উপমহাদেশে একটি কনফেডারেশনের কথা বিবেচনা করবেন?

ভুট্টো: কেন, এর জন্য কি কোনো আকুলতা আছে? এটা তো ব্যর্থতার আলামত। আমি ব্যক্তিগতভাবে কনফেডারেশন ধারণার বিরুদ্ধে। যদি কনফেডারেশন বিবেচনা করতে হয়, একে দক্ষিণে এবং পশ্চিম এশিয়ার দিকে তাকাতে হবে। ইরান, তুরস্ক ও আফগানিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো। তাই বলে আমরা উপমহাদেশকে পৃষ্ঠদেশ দেখাতে পারি না। আমরা ভৌগোলিক অবস্থান থেকে সরে যেতে পারি না।

কুলদীপ: দুই দেশের মধ্যে সাংবাদিক বিনিময়ের কথা কি ভাববেন?

ভুট্টো: কেন নয়? আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্বহাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি চাই— ভারতীয় হকি টিম এসে লাহোর স্টেডিয়ামে খেলে যাক। একইভাবে আমিও চাইব আমার দল ভারতে যাক। আমি চাই ডাক্তার, আইনজীবী এবং অন্য পেশার লোকজনও এর আওতায় আসুক।

অনুবাদ: এম এ মোমেন

 

 

সূত্র: বণিক বার্তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ