জলবায়ু পরিবর্তনের গতি শ্লথ করে দেবে মৃত্তিকার মানোন্নয়ন

কৃষিজমি ও চারণভূমির মৃত্তিকার মানোন্নয়নের জন্য সাধারণ ও সহজ পদ্ধতিই যথেষ্ট। মৃত্তিকার মানোন্নয়নের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডল থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ করে নেয়া সম্ভব। এভাবে মৃত্তিকা উন্নয়নের পদক্ষেপ নেয়া হলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন তথা জলবায়ু পরিবর্তনের গতিকেও শ্লথ করে দেয়া যাবে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলের এক সাম্প্রতিক গবেষণায় এ তথ্য উঠে আসে।

কাভার ক্রপ (ভূমি ক্ষয় রোধ, জমির উর্বরাশক্তি ও মাটির মান রক্ষা ও পানি, আগাছা ইত্যাদি ব্যবস্থাপনার নিমিত্তে বোনা ফসল) বপন, পশুপালনে যথাযথ ব্যবস্থাপনা অনুসরণ ও চারণভূমিতে কলাইজাতীয় শস্য আবাদের মাধ্যমে ভূমির মানোন্নয়ন সম্ভব। গবেষণায় উঠে আসে, বৈশ্বিকভাবে এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে বায়ুমণ্ডল থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বন অপসারণ করা সম্ভব হবে। মাটিতে এ কার্বন সংরক্ষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সীমিত রাখার যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তাকে আরো কার্যকর করে তোলা যাবে।

গবেষণাটির প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল, এ ধরনের কার্যক্রম হাতে নেয়া হলে তা বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে দশমিক ১ ডিগ্রি (দশমিক ১৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট) সেলসিয়াস পর্যন্ত কমাতে সক্ষম হবে কিনা। গবেষণায় দেখা যায়, কার্বন নিঃসরণ প্রতিরোধে নেয়া জোরালো উদ্যোগগুলোর সঙ্গে এ ধরনের পদক্ষেপের সমন্বয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে ভালো ফল অর্জন করা যাবে। শুধু উন্নততর কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ২১০০ সাল পর্যন্ত বর্ধিত বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে দশমিক ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমানো সম্ভব।

এ বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স, পলিসি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক হুইন্ডি সিলভার বলেন, ‘কার্বন সঞ্চয় নিয়ে দীর্ঘকাল কাজ করে যাওয়াদের একজন হিসেবে আমি সবসময়ই ভেবেছি, বৈশ্বিক পর্যায়ে মাটিতে কার্বন সঞ্চয়ের মাধ্যমে কি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবধান গড়ে দেয়া সম্ভব?’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা দেখতে পেয়েছি, গোটা বিশ্বেই এক্ষেত্রে পরিবর্তন এনে দেয়ার মতো একগাদা কর্মসূচি নেয়া সম্ভব। এখানে সবচেয়ে বড় বার্তা হলো এটাই, আমরা পারব। এটা সম্ভব (বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সীমিতকরণ)’।

গবেষকরা জানান, ফসল সংগ্রহের পর অক্সিজেনশূন্য পরিবেশে অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর মাধ্যমে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গতিকে আরো ধীর করে দেয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে দশমিক ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস (দশমিক ৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত তাপমাত্রা কমানো সম্ভব হবে।

হুইন্ডি সিলভার জানান, ‘কার্বন নিঃসরণ বন্ধে জোরালো পদক্ষেপগুলোর সঙ্গে উন্নততর কৃষি ব্যবস্থাপনার মিশেলেই এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো ফল লাভ করা সম্ভব। যদি বায়ুমণ্ডলে কার্বন নিঃসরণের হার নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভূমিতে কার্বন সঞ্চয়ের মাধ্যমে উষ্ণায়নকে নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপটিও খুব একটা কার্যকর হবে না।

গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন হুইন্ডি সিলভার। অন্যদিকে গবেষণায় উঠে আসা ফলাফলের ভিত্তিতে নিবন্ধ লেখায় নেতৃত্ব দিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলের শিক্ষার্থী অ্যালেগ্রা মায়ার। এছাড়া গবেষণার সার্বিক কার্যক্রমে আরো অংশ নিয়েছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস গ্রুপের সদস্য জেক হাউসফেদার ও লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু জোনস। অনলাইন জার্নাল ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেসে’ সম্প্রতি নিবন্ধটি প্রকাশ হয়।

কৃষি ব্যবস্থাপনার ওপর বৈশ্বিকভাবে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে মাটিতে কার্বন সংরক্ষণে কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত কৃষি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তথ্য পর্যবেক্ষণ, বিভিন্ন মডেল তৈরি এবং এর ভিত্তিতে এসব ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির বহুল প্রচলনের সম্ভাব্য প্রভাবগুলো নির্ণয় করে দেখা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ