আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে অঞ্চলভিত্তিক কর্মকৌশলের সুপারিশ

ব্যাংক হিসাব থাকা মানেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নয়। এ কার্যক্রম তখনই সফল হবে যখন সব মানুষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ পাবে। সেটা হতে পারে কর্মসংস্থান, সেবা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে। এ জন্য দরকার কাজের সুযোগ সৃষ্টি ও দক্ষতা বাড়ানো। তা ছাড়া জাতীয় পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণে ফিনটেক বা প্রযুক্তিভিত্তিক আর্থিক সেবার বিকল্প নেই। তবে এ ধরনের প্রযুক্তিভিত্তিক সেবায় গ্রাহক পরিচিতির তথ্য যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তা ছাড়া পরিসংখ্যানভিত্তিক তথ্যের সঙ্গে বাস্তব তথ্যের ব্যবধান অনেক বেশি থাকায় এসব তথ্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে সঠিক কৌশলও প্রণয়ন করা সম্ভব নয়। এ জন্য সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও অঞ্চলভিত্তিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ কৌশল গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ কৌশলপত্র’ প্রণয়নসংক্রান্ত জাতীয় পর্যায়ের কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ যৌথ উদ্যোগে ‘বিজনেস ফাইন্যান্স ফর দি পুওর ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে ইউকে-এইডের সহায়তায় এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

গতকাল থেকে পরবর্তী ১০ দিনের জন্য ছুটিতে গেলেও কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুহিত বলেন, ‘বিভিন্ন পদ্ধতিতে আমরা আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ কার্যক্রম বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। এর জন্য ব্যাংকের শাখা বিস্তৃত করা এবং সবার কাছে ব্যাংকের সেবা পৌঁছে দেওয়া দরকার। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন খুব বড় নয়। কারণ ব্যাংকের শাখা এখন সারা দেশে ১০ হাজারের কিছু কম আছে। ১৬ কোটি মানুষের জন্য এটা মোটেই যথেষ্ট না।’

অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাস্তবায়নের পথে কিছু স্পষ্ট বাধা আছে এবং কিছু অস্পষ্ট বাধা আছে। এসব বাধা দূর করতে পারলে এই কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।’

দেশের সব পর্যায়ের মানুষের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য অ্যালায়েন্স ফর ফিন্যানশিয়াল ইনক্লুশনের (আফি) প্রথম সারির সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিকভাবে আয়োজিত মায়া ডিক্লারেশন এ স্বাক্ষর করাসহ জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ কৌশলপত্র প্রণয়নের অঙ্গীকার করে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ যুক্তরাজ্য সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশের ‘জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ কৌশলপত্র’ এর একটি সম্পূর্ণ খসড়া তৈরির উদ্যোগ নেয়। ওই কৌশলপত্রের ডায়াগনস্টিক স্টাডি রিপোর্টসহ চূড়ান্ত খসড়াটি ২০১৮ সালের অক্টোবরে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় জমা দেওয়া হবে। এলডিসি থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার সরকারের যে লক্ষ্য, তার সঙ্গে সংগতি রেখে এই কৌশলপত্রের সময়কাল ২০১৯-২০২৪ সাল নির্ধারণ করা হয়েছে।

এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের এ লক্ষ্য অর্জনে কৌশলপত্রের খসড়া তৈরি করেছে। সেই খসড়ার ওপর সংশ্লিষ্টদের মতামত এবং অন্যান্য পরামর্শ নেওয়ার জন্য এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। খসড়া তুলে ধরেন বাংলাদেশ ব্যাংকের উপপরিচালক আসিফ ইকবাল। অনুষ্ঠানের মুক্ত আলোচনা পর্বটি পরিচালনা করেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ইউনুসুর রহমান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক রুশিদান ইসলাম রহমান আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য অঞ্চলভিত্তিক কর্মকৌশল নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের উপদেষ্টা এস কে সুর চৌধুরী বলেন, মানুষ যাতে দক্ষতা ও শ্রমের বিনিময় করার সুযোগ পায় সে রকম বাজার তৈরি করতে পারাই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি।

সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক কামরুল ইসলাম বলেন, গ্রামাঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে বিনিয়োগ খুবই কম। কোনো মফস্বল ব্যাংক শাখা বছরে ২৫ কোটি টাকা আমানত পেলে, সেখানে ঋণ বিতরণ হয় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা, তাও কর্মীদের ঋণ বেশি। অপ্রচলিত খাতকে সহযোগিতা করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

বিকাশের সিইও কামাল কাদির বলেন, নতুন নীতিমালা অনুযায়ী মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে এখন থেকে ঋণ বিতরণ ও আদায়ের সুযোগ রয়েছে। ব্যাংকগুলো দেশব্যাপী বিস্তৃত এই প্ল্যাটফরম ব্যবহার করতে পারে।

শিওর ক্যাশের সিইও ড. শাহাদাত খান বলেন, পেমেন্ট সিস্টেমসে অনেক ব্যবস্থা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে সমন্বয় দরকার।

বিআইবিএমের মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংক হিসাব মানেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নয়। এই হিসাবধারীরা যখন ব্যাংকের মাধ্যমে বিনিয়োগে আসবে তখনই তাকে অন্তর্ভুক্তি বলা যাবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক জুলহাস উদ্দিন বলেন, বলা হচ্ছে সাড়ে ৮ কোটি ব্যাংক হিসাব আছে, কিন্তু এসব ব্যাংক হিসাব কত মানুষের তার কোনো তথ্য নেই। আবার ১০ টাকায় বিশেষ ব্যবস্থায় খোলা হিসাবগুলোর কত ভাগ সচল তাও স্পষ্ট নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক লীলা রশিদ বলেন, ডিজিটাল আর্থিক সেবা সম্প্রসারণে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পেমেন্ট সিস্টেমসের কাজগুলো সম্পৃক্ত করার কোনো উদ্যোগ নেই। তা ছাড়া এখনো পর্যন্ত মোবাইল সংযোগধারীদের তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া হয়নি ব্যাংকগুলোকে।

এলাকাভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশল প্রণয়নের বিষয় একমত পোষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, দেশ এগোচ্ছে। নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন নিয়ে কর্মকৌশল প্রণয়ন করা হচ্ছে। এখন আমাদের দক্ষ লোক দরকার।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ বলেন, আর্থিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হলে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। অর্থ বিনিয়োগের জন্য উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি থাকতে হবে। দরকার দক্ষতা, উদ্ভাবনী আইডিয়া। যাতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছাড়া দক্ষতা কাজে লাগানো যায়। তিনি জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশলে এসব বিষয় যুক্ত করার পরামর্শ দেন।

অর্থসচিব আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, এখনো অনেক মানুষ প্রকৃত আর্থিক নেটওয়ার্কে আসেনি। এমনকি সরকারি কর্মীদের অনেকের ব্যাংক হিসাব নেই। প্রযুক্তিগত লেনদেন বাড়াতে হবে।

জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নীতিমালা গবেষণা কর্মকাণ্ডের প্রধান পরামর্শক মোস্তফা কে মুজেরি বলেন, সবার জন্য আর্থিক সেবা নিশ্চিত করতে সরকারি বেসরকারি সব খাতের সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার।

ডিএফআইডির কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ জেন এডমন্ডসন বলেন, বাংলাদেশে এখনো অনেক মানুষ রয়েছে যারা কোনো আর্থিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে নেই। আবার অনেকের দক্ষতা থাকলেও সুযোগ ও অর্থায়নের অভাবে তা কাজে লাগাতে পারছে না। আবার বৈষম্যও রয়েছে। এসব দূর করতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশল কাজে দেবে। তবে সে জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার।

 

সূত্র : কালের কণ্ঠ