সাভারের সেই একই চিত্র

রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে সাভারে নেওয়ার পর এক বছর চার মাস পেরিয়ে গেলেও চামড়া শিল্পনগরের অবস্থার বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি। এত দিনেও কঠিন বর্জ্য ফেলার বিষয়টি সুরাহা করতে পারেনি শিল্প মন্ত্রণালয়। কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারে (সিইটিপি) নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক ক্রোমিয়াম পুনরুদ্ধার বা রিকভারি ইউনিট চালু হয়নি। রাস্তাঘাট সংস্কারের কাজ সবে শুরু হয়েছে।

বছরখানেক আগে যেভাবে নদীদূষণ হতো, তা এখনো বন্ধ হয়নি। বর্জ্যের ভাগাড়ের বাঁধ ভেঙে বারবার তা নদীতে পড়ছে। পাইপলাইন উপচে বর্জ্য নালা দিয়ে নদীতে গিয়ে মিশছে। সিইটিপি থেকে যে পানি নদীতে ফেলা হচ্ছে, তাতেও মাত্রার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকছে।

এ অবস্থায় ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসছে। আগামী মাসে শিল্পনগরে ট্যানারিগুলো তাদের পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করে চামড়া প্রক্রিয়া শুরু করবে। উদ্যোক্তারা বলছেন, গত ঈদুল আজহার মতো এবারও খারাপ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। ট্যানারির উৎপাদনে হয়তো কোনো সমস্যা হবে না, কিন্তু নদীদূষণের মাত্রা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঈদুল আজহার পর সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে শিল্পসচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, চামড়া প্রক্রিয়াকরণে বিশেষ কোনো সমস্যা হবে না। কঠিন বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা রয়েছে। তরল বর্জ্য পরিশোধনের জন্য সিইটিপি ভালোভাবে চলছে। তিনি বলেন, এবার পরিদর্শন দল থাকবে। তারা তদারকি করবে।

সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে গত বছর এপ্রিলে হাজারীবাগের ট্যানারিগুলোর গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও টেলিফোন সংযোগ বন্ধ করে দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। ফলে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য হয় ট্যানারিগুলো। সাভারের হেমায়েতপুরে ধলেশ্বরী নদীর তীরে ১৯৯ দশমিক ৪০ একর জমিতে বিসিকের গড়ে তোলা চামড়া শিল্পনগরে জমি পাওয়া ১৫৪টি ট্যানারির মধ্যে এখন পর্যন্ত ১১৩ ট্যানারি উৎপাদন শুরু করেছে। বাকিরা পিছিয়ে আছে।

চামড়া শিল্পনগরে গত দেড় বছরে কী কী অগ্রগতি হয়েছে, জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। বরং আমরা অবনতি দেখছি। ট্যানারিগুলো হাজারীবাগ ছেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সাভারে গুণগত পরিবর্তন আসেনি।

এখনো নদীদূষণ
চামড়া শিল্পনগরের বর্জ্যে নদীদূষণ হচ্ছে তিন ভাবে। প্রথমত, ভাগাড়ের বাঁধ বারবার ভেঙে বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ছে। ক্রোমিয়াম রিকভারি ইউনিট চালু না হওয়ায় বর্জ্য থেকে আলাদা করার পর স্লাজসহ ক্রোমিয়াম বর্জ্যের ভাগাড়ের পাশে রেখে দেওয়া হচ্ছে। সেই ক্রোমিয়াম বৃষ্টির পানির সঙ্গে গিয়ে আবার ভাগাড়ের বর্জ্যের সঙ্গে মিশছে। সেটা নদীতে পড়ছে। দ্বিতীয়ত, সিইটিপিতে রাসায়নিক যথাযথভাবে প্রয়োগ না করায় বর্জ্য পুরোপুরি পরিশোধিত হচ্ছে না। সেই পানি নদীতে ফেলা হচ্ছে। তৃতীয়ত, পাইপলাইন উপচে বর্জ্য বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের নালা দিয়ে আগের মতোই নদীতে পড়ছে।

চামড়া শিল্পনগর প্রকল্প নিয়ে গত সোমবার শিল্পমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিসিক জানায়, তরল বর্জ্য পরিশোধন করার পর যে পানি নদীতে ফেলা হয়, তাতে ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক ক্রোমিয়াম ও কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড বা বিওডির সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি মিলছে। বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (বিওডি) সহনীয় মাত্রার নিচেই থাকছে। তাদের মতে, সিইটিপি কাজ করছে, যদিও তা আদর্শ পর্যায়ের নয়।

বর্জ্য পুরোপুরি পরিশোধনের সক্ষমতা অর্জনে দেড় বছর যথেষ্ট সময় কি না, জানতে চাইলে সিইটিপি নির্মাণে পরামর্শক দলের প্রধান ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সময় যথেষ্ট। তবে চীনা ঠিকাদারি কোম্পানি প্রয়োজনীয় রাসায়নিক প্রয়োগ করছে না। এটা প্রয়োগ করলে প্রচুর পানি ডাম্পিং ইয়ার্ডের জায়গায় ফেলতে হবে। তখন আবার বাঁধ ভেঙে বর্জ্য নদীতে যাবে।

ট্যানারি স্থানান্তরের পর এক বছর চার মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু চামড়া শিল্পনগরের অবস্থার বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসেনি।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে পাইপলাইন উপচে নালা দিয়ে নদীতে যে বর্জ্য পড়ছে, সেগুলোকে সুয়ারেজের বর্জ্য বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু গত মঙ্গলবারও গিয়ে দেখা গেছে, শিল্পনগরের বিভিন্ন জায়গায় পাইপ উপচে বর্জ্য নালায় গিয়ে মিশছে এবং তা ট্যানারির তরল বর্জ্য।

ভাগাড়ে বাঁধ ভাঙার খেলা
চামড়া শিল্পনগরে চামড়ার উচ্ছিষ্ট, ঝিল্লি, চামড়ার টুকরা ইত্যাদি কঠিন বর্জ্য ফেলার জন্য ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণ করতে পারেনি বিসিক। গত বছর উৎপাদন শুরুর পর ট্যানারিগুলো ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণের জন্য প্রায় পাঁচ একর জমিতে তৈরি করা বিশাল একটি পুকুরে বর্জ্য ফেলা শুরু করে। সেখানে গত বছরই বিশাল একটি ভাগাড় তৈরি হয়েছে। এই ভাগাড়ের দেয়াল ভেঙে অনেকবার বর্জ্য নদীতে গিয়ে পড়েছে। সর্বশেষ পড়েছে গত মাসে।

স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, ভাগাড়টির এক কোনায় নদীর পাশে মাটির বাঁধ দুর্বল। ফলে ভাগাড়ে বর্জ্য যখন বেশি হয়ে যায় এবং বৃষ্টিপাতের কারণে পানি বেড়ে যায়, তখনই বাঁধ ভেঙে যায়। শিল্প মন্ত্রণালয়ে বৈঠকের কার্যপত্রে এ বিষয়ে বলা হয়, ডাম্পিং ইয়ার্ড থেকে ধলেশ্বরী নদীতে যে অপরিশোধিত বর্জ্য যাচ্ছিল, তা জুনের শেষ সপ্তাহে মেরামত করা হয়। কিন্তু পরে তা কে বা কারা ভেঙে দেয়। এ বিষয়ে ১৯ জুলাই সাভার থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় জমজম সিটি নামের একটি আবাসন প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক মো. ফিরোজ বলেন, বাঁধ যে ভেঙে যেতে পারে, তা চিঠি দিয়ে ও মৌখিকভাবে বিসিককে জানানো হয়েছে। তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে জুলাই মাসের মাঝামাঝিতে বাঁধ ভেঙে যায়। আবার তা মেরামত করা হয়েছে।

সূত্র : প্রথম আলো 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest

সংস্করণ