বাণিজ্যযুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য বেশ দুশ্চিন্তার

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়েছে, তাতে জড়িয়ে পড়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও মেক্সিকো। এর প্রভাব নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক সেলিম রায়হান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজীব আহমেদ

 

বিশ্ববাণিজ্যে কয়েক দশক ধরে বাণিজ্য উদারীকরণ প্রাধান্য পেয়েছে। এখন কি উল্টো পথে হাঁটা শুরু হলো?

সেলিম রায়হান: প্রথম কথা হলো, এ ধরনের একটি বাণিজ্যযুদ্ধ যে শুরু হতে পারে, তা কারও ভাবনায় ছিল না। এত দিন বিশ্ববাণিজ্য জেনারেল অ্যাগ্রিমেন্ট ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড (গ্যাট) ও বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) অঙ্গীকার ও নিয়মনীতি অনুযায়ী হয়েছে। শক্তিশালী দেশগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারে সম্মান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর সবকিছু ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে বাণিজ্যযুদ্ধের কথা কিন্তু কেউ চিন্তাও করতে পারেনি। জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের (এসডিজি) মতো যেসব বৈশ্বিক উদ্যোগ নিয়েছে, তার সঙ্গে বাণিজ্যক্ষেত্রের এসব ঘটনা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এখন পর্যন্ত বাণিজ্যযুদ্ধ সীমিত পর্যায়েই রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিশ্ববাণিজ্যে এর প্রভাব কী হতে পারে?

সেলিম রায়হান: আসলে প্রভাব নির্ভর করছে এ যুদ্ধ কত দিন চলবে এবং কতটুকু গভীরতর হতে পারে, তার ওপর। এর প্রভাবকে দুটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। একটি স্বল্পমেয়াদি, অন্যটি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি। স্বল্পমেয়াদি প্রভাব হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের কারণে চীনা বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আবার চীনের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি কিছুটা হলেও কমবে। এর বাইরে কিছু দেশ লাভবান হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে পণ্য আমদানি কমালে অথবা চীন থেকে রপ্তানিতে খরচ বাড়লে ওই সব পণ্যের অন্য রপ্তানিকারকদের সুবিধা হতে পারে।

মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে আশঙ্কার বিষয় এটা যে বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় বড় অর্থনীতির দেশগুলোতে পণ্যের দাম বেড়ে চাহিদায় ভাটা পড়তে পারে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যেকার এ যুদ্ধে ইউরোপ, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ জড়িয়ে পড়ছে। তারা পুরোপুরি জড়িয়ে পড়লে যুদ্ধ তীব্রতর হবে। তখন সেখান থেকে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা সৃষ্টির আশঙ্কা আছে। অবশ্য আমি আবারও বলছি, এটা পুরোপুরি অনিশ্চিত। কারণ, কী হয়, তা কেউ বলতে পারে না। দেখা গেল এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের ওপর বাণিজ্যযুদ্ধের কী প্রভাব পড়তে পারে? এ ক্ষেত্রে কি বাংলাদেশের দুশ্চিন্তার কারণ আছে?

সেলিম রায়হান: বাণিজ্য পরিবেশ যখন আন্তর্জাতিক নিয়মনীতিনির্ভর হয়, ঝুঁকিবিহীন হয়, তখন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সুবিধা হয়। অনিশ্চিত পরিবেশ তৈরি হলে আমাদের জন্য চিন্তার। এখন যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়েছে, সেখান থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশের কিছু লাভ হতে পারে। কিছু পণ্যের দাম কমতে পারে, যা বাংলাদেশ আমদানি করে। আবার কিছু পণ্যের রপ্তানি বাড়তে পারে। তবে ইউরোপ-আমেরিকায় যদি পণ্যের চাহিদা কমে যায়, তাহলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের গতি কমার আশঙ্কা থাকে। আরেকটি বিষয় হতে পারে, সেটি হলো নিজ দেশ থেকে রপ্তানিতে শুল্কের মুখে পড়ে চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে তাদের কারখানা সরিয়ে নেওয়ার চিন্তা করতে পারে। অবশ্য আমরা সে সুযোগ কতটুকু নিতে পারব, সেটাও ভাবার বিষয়। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ এখন ২০০ কোটি ডলারের কিছু বেশি। নানা সমস্যায় আমরা বেশি পরিমাণে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারছি না।

বাণিজ্য যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার ও নিয়ননীতি মানে না, তখন নানা ঘটনা ঘটে। চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আরোপ করছে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতার কথা বলে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীও আছে, যারা সুরক্ষা চায়। এসব গোষ্ঠীর কেউ বাংলাদেশের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ভারসাম্য নেতিবাচক বলে বাড়তি শুল্ক আরোপের কুপরামর্শ দিতে পারে। আবার ক্যারিবিয়ান ও আফ্রিকার দেশগুলোও বাংলাদেশের ওপর শুল্ক আরোপের দাবি করতে পারে।

ডব্লিউটিও কি তাহলে একটি মৃত সংগঠনে পরিণত হলো?

সেলিম রায়হান: আন্তর্জাতিকভাবে ট্রাম্পের ওপর যে চাপ দেওয়া হচ্ছে, তাতে এমনও হতে পারে যে তিনি ডব্লিউটিও থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলেন। এখন তিনি যেটা করছেন, সেটা আসলে বেরিয়ে যাওয়ার শামিল। আসলে ট্রাম্প যেটা করছেন, সেটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো কিছু হবে না। দেশটির অর্থনীতিবিদেরা সেটা বলা শুরু করেছেন। তবে ট্রাম্প সম্ভবত অর্থনৈতিক সুফলের চেয়ে রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনেই বেশি নজর দিচ্ছেন।

বাংলাদেশের এখন কী করার আছে?

সেলিম রায়হান: আসলে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তেমন কোনো ভূমিকা নিতে পারবে না। আমরা সমপর্যায়ের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে মিলে বিশ্ববাণিজ্যে অঙ্গীকার ও নিয়মনীতির ওপর জোর দিতে পারি। নইলে বিশ্বব্যাপী যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা বিশ্বসভায় উল্লেখ করতে পারি। আমাদের আসলে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। বাণিজ্য ও ব্যবসা পরিবেশের উন্নতির দিকে নজর দিতে হবে। প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে।

আমাদের কি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি করার দিকে নজর দেওয়া উচিত?

সেলিম রায়হান: এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আসলে দীনতা দেখিয়েছে। আমরা কোনো দেশের সঙ্গেই বাণিজ্য চুক্তি করতে পারিনি। বিভিন্ন দেশ আগ্রহ দেখিয়েছে, আমরা সিদ্ধান্ত নিতে বছরের পর বছর সময় লাগিয়ে না করে দিয়েছি। বাণিজ্য চুক্তির দু-একটি অভিজ্ঞতা অর্জন করতে না পারলে আমরা দক্ষতা অর্জন করতে পারব না। বাংলাদেশের উচিত বাণিজ্য চুক্তির দিকে নজর দেওয়া এবং বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দক্ষ লোক নিয়োগ দেওয়া। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। আমাদের আসলে নিজেদেরই বাণিজ্য চুক্তি করার জন্য এগিয়ে যেতে হবে।

 

সূত্র : প্রথম আলো